উত্তরার ফ্ল্যাটটিতে আনোয়ার হোসেন একাই থাকতেন। অবসর নেওয়ার পর মানুষটি আরও গুটিয়ে গিয়েছিলেন। সময় মেপে হাঁটা, সময় মেপে খাওয়া, আর রাত ঠিক দশটার মধ্যে ঘুম। তাঁর ঘরের জানালাগুলোতে সব সময় পর্দা টানা থাকত। আলো, বাতাস বা বাইরের কোলাহল কোনোটাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল না। তিনি বলতেন,
“পর্দা খোলা থাকলে মানুষ বেশি দেখা যায়, মানুষ বেশি দেখলে ঝামেলাও বাড়ে।”
তাই নিচতলার দারোয়ান যখন বললেন, সকাল সাতটা পেরিয়ে গেলেও আনোয়ার সাহেব হাঁটতে নামেননি, তখন কথাটা একটু অস্বাভাবিকই শোনাল। দুপুর গড়িয়ে গেল, ফোনে কোনো সাড়া নেই।
বিকেলে দরজা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ঘরের ভেতরে ঢুকেই প্রথমে যেটা চোখে পড়ল, সেটা দেহ নয়, জানালার পর্দা। খোলা। পুরোটা সরানো। আনোয়ার হোসেনের ঘরে এমন দৃশ্য কেউ আগে দেখেনি।
তিনি বসে ছিলেন ড্রয়িংরুমের চেয়ারে, যেন একটু আগে মাত্র চোখ বুজেছেন। ঘরে কোনো ভাঙচুর নেই। টেবিলে মোবাইল রাখা, মানিব্যাগ ঠিক জায়গায়। মৃত্যুটাকে শান্ত বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেই শান্তির মধ্যেও কিছু একটা যেন ঠিক মিলছিল না।
উপপরিদর্শক ইমতিয়াজ রহমান ঘরটা ধীরে ধীরে দেখছিলেন। তিনি ছোট জিনিসে চোখ রাখেন। বড় ঘটনার চেয়ে ছোট অস্বাভাবিকতাই তাঁকে বেশি ভাবায়।
টেবিলের ওপর একটি দাবার বোর্ড রাখা। ঘুঁটিগুলো বাক্সে নেই, কিন্তু বোর্ডে সাজানোও না। যেন খেলা শুরু করার কথা ছিল, কিন্তু আর শুরু হয়নি।
চায়ের কাপ মাত্র একটি। পাশে আরেকটা নেই।
টেবিলের নিচে পড়ে থাকা একটি চশমা তাঁর নজর এড়ায় না। আনোয়ার হোসেন চশমা ব্যবহার করতেন না। পড়ার সময়ও নয়।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আসে সন্ধ্যায়। ঘুমের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে।কিন্তু ডাক্তার নিশ্চিতভাবে স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলতে পারছেন না। ঘরে কোনো জোরাজুরির চিহ্ন নেই, আবার সবকিছু স্বাভাবিকও নয়।
এই বাসায় নিয়মিত আসতেন তিনজন। বড় ছেলে আরিফ মাঝেমধ্যে এসে টাকার কথা বলতেন। ছোট মেয়ে নীলা সম্প্রতি দেশে এসেছেন, বাসায় এলেই ফ্ল্যাট বিক্রি নিয়ে তর্ক হতো। আর ছিলেন ফারুক, আনোয়ার হোসেনের পুরোনো বন্ধু।
ফারুকের একটা অভ্যাস ছিল। তিনি দাবা খেলতেন, আর খেলতেন জানালার পাশে বসে। আলো ভালো আসে, এই যুক্তিটা তিনি সব সময় দিতেন। আনোয়ার হোসেন আপত্তি করতেন না। ফারুক এলে পর্দা সরানো হতো, শুধু ওই সময়টুকুর জন্য।
ইমতিয়াজ রহমান ফোনের কল লিস্ট দেখলেন। শেষ কলটি এসেছে রাত নয়টা আটচল্লিশে। নম্বরটি ফারুকের কিন্তু ফারুক বললেন,
“আমি তো নয়টার আগেই বের হয়ে গেছি। সেদিন খেলাই হয়নি।”
খেলা না হলে দাবার বোর্ড কেন খোলা?
খেলা না হলে পর্দা কেন খোলা?
প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা আশা করছি আমাদের পাঠকের কাছ থেকে। বুদ্ধি খাটিয়ে বের করুন, আসলে কে খুন করেছে আর কেন। উত্তর আমাদের লিখে পাঠান।

