বৃহস্পতিবার, মে ১৪, ২০২৬
33.5 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅভিযানের গল্পসিআইডি পরিচয়ে অপহরণ ও চাঁদাবাজি চক্রের রহস্য উদঘাটন

সিআইডি পরিচয়ে অপহরণ ও চাঁদাবাজি চক্রের রহস্য উদঘাটন

মোঃ আবদুল হাদী 
,

শহরের উত্তর প্রান্তে সন্ধ্যা নামলেই বাতাস ভারী হয়ে আসে। ব্যস্ত সড়কের আলো, গাড়ির হর্ন আর মানুষের ভিড়ের মধ্যেও এক ধরনের অদৃশ্য চাপ কাজ করে। সেই সন্ধ্যায় আরমান কবির (ছদ্মনাম) ঠিক এই চাপা অস্থিরতার মধ্যেই অফিস থেকে বের হয়েছিলেন। আরমান কবির খুব বড় কেউ নন। আবার ছোটও নন। মাঝারি মানের ঠিকাদারি ব্যবসা, ব্যাংকে ঋণ আছে, নিয়মিত কর দেন। সমাজে যাদের বলা হয় নিরাপদ মানুষ। তিনি কখনো ভাবেননি, এই নিরাপদ পরিচয়টাই একদিন তাকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

সন্ধ্যা সাতটার কিছু পর তার মোবাইল ফোনে একটি অপরিচিত নম্বর ভেসে ওঠে। কণ্ঠটি সংক্ষিপ্ত, ভারী, প্রশ্নহীন।“আপনি আরমান কবির? আপনার ব্যাপারে কিছু তথ্য এসেছে। কথা বলা দরকার।” আরমান জানতে চেয়েছিলেন কোথা থেকে বলছেন, কী বিষয়ে। কিন্তু আগেই পরিচয় জানানো হয়-পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিটের নাম। শব্দগুলো পরিচিত, অথচ অস্বস্তিকর।“এখন ফোনে নয়। আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন। দশ মিনিটের মধ্যে একটি সাদা রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াবে।”ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই তার সামনে একটি সাদা রঙের গাড়ি এসে দাঁড়ায়। গাড়িতে ওঠার মুহূর্তেই আরমান বুঝতে পারেন, কিছু একটা ঠিক নেই। ভেতরের পরিবেশ অস্বাভাবিকভাবে নীরব। সামনে বসা লোকটি আয়নায় তাকায়, কিন্তু কথা বলে না। পেছনের জন কোমরের কাছে হাত রাখে। কোনো মারধর নেই, কোনো উচ্চ স্বরে কথা নেই। শুধু নিঃশব্দ কর্তৃত্ব। গাড়ি চলতে থাকে। শহরের আলো ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যায়। রাস্তার নাম হারিয়ে যায়। শুধু বাঁক আসে, একটার পর একটা। আরমান বোঝার চেষ্টা করেন কোথায় যাচ্ছেন, কিন্তু ফোন নেই, সময় নেই, প্রশ্ন করারও সুযোগ নেই। শেষমেশ গাড়ি থামে একটি আধা-নির্মিত ভবনের সামনে। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে আলো। খুব উজ্জ্বল নয়, খুব অন্ধকারও নয়। ঠিক এমন আলো, যেখানে মানুষ নিজের অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে। তাকে একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসানো হয়।

“আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে।” সামনে রাখা হয় একটি ফাইল। ভেতরে কাগজ, ছবি, ব্যাংক স্টেটমেন্টের মতো প্রিন্ট। সত্যি কি না বোঝার সুযোগ নেই। শুধু বলা হয়, সহযোগিতা করলে বিষয়টা এখানেই শেষ হবে। সহযোগিতা মানে কী, সেটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। প্রথমে আসে টাকার কথা। অঙ্কটা বড়, কিন্তু অসম্ভব নয়-আপনার ব্যবসার নিরাপত্তার জন্য। এরপর আসে ভয়। তারপর আসে লজ্জা। আরমানের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর তাকে অন্য একটি ঘরে নেওয়া হয়। সেখানে ক্যামেরা। আলো একটু বেশি। তাকে এমন অবস্থায় বসানো হয়, যা কোনো স্বাভাবিক মানুষের জন্য লজ্জাজনক ও অপমানজনক। এগুলো কেবল প্রমাণ হিসেবে থাকবে। কণ্ঠে ছিল হুমকি, কথায় ছিল নিশ্চয়তা। এক রাতের মধ্যে যা যা হওয়ার কথা নয়, সবই ঘটে যায়। পরদিন ভোরে তাকে শহরের এক প্রান্তে নামিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এই ঘটনা ভুলে যান। যোগাযোগ করবেন না। নিয়ম মানলে কিছু হবে না। আরমান কবির বাড়ি ফেরেন। কিন্তু আগের মানুষ হিসেবে নয়। পরবর্তী কয়েক দিন তিনি ঘুমাতে পারেন না। ফোন বাজলেই শরীর কেঁপে ওঠে। প্রতিটি অচেনা মুখে তিনি সেই রাতের ছায়া দেখতে পান। পরিবারকে কিছু বলেন না। সম্মান বাঁচানোর দায় ভয়কে আরও গভীর করে তোলে।

কিন্তু ভয় সব সময় চুপ থাকে না। কয়েক দিন পর আবার ফোন আসে-আরও টাকার দাবি। সেদিন আরমান সিদ্ধান্ত নেন, এই গল্প আর নিজের ভেতরে রাখবেন না। অভিযোগ জানানো হয়। তদন্ত শুরু হয় ধীরে, খুব ধীরে। কারণ এই ধরনের ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া কঠিন। ভুক্তভোগীরা কথা বলতে চান না। ভয়, লজ্জা আর সামাজিক চাপ সবাইকে চুপ করে থাকতে বাধ্য করে।

তবু তদন্ত যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয়, আরমান একা নন। একই কৌশল। একই ভাষা। একই ভয়। ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন ভিন্ন জায়গা। কিন্তু প্যাটার্ন এক। পরিচয় বদলায়, গাড়ি বদলায়, লোকেশন বদলায়, কিন্তু চক্র একই থাকে। তদন্তের একপর্যায়ে কয়েকজন সন্দেহভাজনের নাম সামনে আসে। তারা বিভিন্ন সময় মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার করেছে। কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম, কখনো বিশেষ ইউনিটের ছায়া। জিজ্ঞাসাবাদে তারা আত্মবিশ্বাসী, কারণ তারা জানে ভুক্তভোগীরা ভয় পায়।

কিন্তু ভয় সব সময় নীরব থাকে না। এই গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ এখনো কিছু প্রশ্ন খোলা রয়ে গেছে-এই চক্র কত বড়? কতজন এখনো চুপ করে আছেন? আর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন-আমরা কি পরিচয়ের পোশাক দেখেই খুব সহজে বিশ্বাস করে ফেলি?

এ ঘটনায় কেশবগঞ্জ (ছদ্মনাম) থানায় পেনাল কোডের ১৪৩, ৩৬৪, ৩৮৫, ৩৮৬, ৩৭৯ ও ৫০৬ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পরপরই তদন্তভার গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

তদন্তের গভীরে যেতে না যেতেই একের পর এক তথ্য সত্যকে স্পষ্ট করতে থাকে। সূক্ষ্ম ও বহুস্তরীয় বিশ্লেষণে সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম ইউনিট নিশ্চিত হয়, এটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; বরং ভুয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইল চালানো একটি সুসংগঠিত চক্রের কাজ। ডিজিটাল ফরেনসিক, মোবাইল কল ডিটেইল রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেনের গোপন প্রবাহ এবং সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে ধীরে ধীরে জটিল ধাঁধার পূর্ণচিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানব গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে সন্দেহভাজনদের চলাচলের নির্ভুল প্যাটার্ন তৈরি হয়। সেই ভিত্তিতে গড়ে ওঠে অপারেশনাল ব্লুপ্রিন্ট, বসানো হয় গোপন নজরদারি, রাখা হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ। সব তথ্য এক বিন্দুতে এসে মেলার পর শুরু হয় প্রতীক্ষিত অভিযান। নির্ধারিত মুহূর্তে টিমটি নীরবে লক্ষ্য স্থল ঘিরে ফেলে। সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সদস্যরা দ্রুত ও সমন্বিতভাবে অগ্রসর হয়।

ঘেরাও টের পেয়ে মো. হাসান মাহমুদ ও মো. আলম মিয়া (ছদ্মনাম) উভয়েই পালানোর চেষ্টা চালালেও সিআইডি সদস্যরা তাৎক্ষণিক কৌশলগত পদক্ষেপে তাদের গ্রেফতার করে। তল্লাশিতে উদ্ধার হয় ভুয়া পরিচয়পত্র, জাল নথিপত্র, একাধিক মোবাইল ফোন ও অপরাধে ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জাম। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে স্বীকারোক্তি-ভুয়া সিআইডি পরিচয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, অপহরণ এবং পরে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে অর্থ আদায়ই ছিল তাদের কৌশল। অবশেষে উন্মোচিত হয় দীর্ঘদিন ধরে ছায়ায় লুকিয়ে থাকা এই অপরাধচক্রের মুখোশ।

পরবর্তীতে আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ধৃতদের বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়। এভাবেই সিআইডির তৎপরতায় আরেকটি অপরাধচক্রকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় এবং একই সঙ্গে অপরাধীদের উদ্দেশে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়-যত সংঘবদ্ধ চক্রই হোক না কেন, আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অপরাধ করে রেহাই পাওয়া যায় না।

লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
সিআইডি, ঢাকা

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ