বাংলাদেশের প্রায় সকল সংকট, সংগ্রাম এবং বিভিন্ন ঘটনা-অঘটনের সময় যে বাহিনীটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে দায়িত্ব পালন করে, তা হলো বাংলাদেশ পুলিশ। সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অবৈধ আদেশ বাস্তবায়নের দায়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছে।
এসব ঘটনায় তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, আদেশটি কার কাছ থেকে এসেছে, তার চেয়ে বরং আদেশটি আইনসম্মত ছিল কি না এবং বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তা একজন সচেতন পেশাজীবী হিসেবে তা বোঝার সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নই দায় নির্ধারণে মুখ্য। আইন না জানার অজুহাত কিংবা অন্ধ আনুগত্য কোনোভাবেই দায়মুক্তির কারণ হয়নি।
এই বাস্তবতা বলে দেয়, আইনের বাইরে গিয়ে দেওয়া কোনো আদেশ বাস্তবায়ন করলে তার দায় শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নকারীকেই বহন করতে হয়। কাজের স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশেও একটি ঊর্ধ্বতন-অধস্তন কাঠামোভিত্তিক পদানুক্রমিক মডেল অনুসরণ করা হয় এবং সে অনুযায়ী একটি চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা হয়।
তবে বাস্তবতায় সব সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দেওয়া আদেশ নৈতিক, পরিস্থিতিসাপেক্ষে বৈধ কিংবা সম্পূর্ণ যৌক্তিক হবে, এমনটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। এসব পরিস্থিতিতে অধস্তন পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা যদি অনুধাবন করতে পারেন যে আদেশটি নৈতিকতার জায়গা থেকে নয়, কিংবা আইনসংগত ও যুক্তিসংগত বিবেচনার বদলে তা কোনো না কোনো প্রভাব বা পক্ষপাতিত্বের ফল, তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়, এই পরিস্থিতিতে একজন পুলিশ কর্মকর্তা কী করবেন?
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দেওয়া আদেশ যদি নৈতিকতার মানদণ্ডে সন্দেহজনক হয়, তবে কি সেই আদেশ বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করা উচিত? নাকি সেখানে দায়বদ্ধতার অন্য কোনো দিক রয়েছে? এই প্রশ্নে আইন কী বলে, সেটিই মূল আলোচনার বিষয়।
বৈধ আদেশ বলতে কী বোঝায়
একটি পুলিশি আদেশকে বৈধ আদেশ বলতে হলে তা কেবল কর্তৃত্বের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনগত ও নৈতিক কয়েকটি মৌলিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। সাধারণভাবে বলা যায়, একটি আদেশ তখনই বৈধ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা একই সঙ্গে নিচের চারটি শর্ত পূরণ করে।
আদেশদাতা কর্তৃপক্ষ আইনসম্মত হতে হবে
আদেশটি অবশ্যই এমন ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসতে হবে, যাঁর কাছে আইন অনুযায়ী সেই নির্দিষ্ট আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ওসি, এসপি, আদালত বা আইন দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের কথা উল্লেখ করা যায়। তবে শুধু পদমর্যাদা থাকলেই সব আদেশ বৈধ হয়ে যায় না। কোনো ব্যক্তি ঊর্ধ্বতন হলেও যদি নির্দিষ্ট বিষয়ে আদেশ দেওয়ার আইনগত ক্ষমতা তাঁর না থাকে, তাহলে সেই আদেশ বৈধ বলে বিবেচিত হবে না।
আদেশটি আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে
বৈধ আদেশ কখনোই সংবিধান, প্রচলিত আইন বা আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী হতে পারে না। আদেশদাতা যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, যে আদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন হয়, তা কোনো অবস্থাতেই বৈধ আদেশ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। আইন ভাঙার নির্দেশ আইনসম্মত হতে পারে, এই ধারণাটিই মৌলিকভাবে ভুল।
আদেশটি দায়িত্বসংক্রান্ত হতে হবে
আদেশটি হতে হবে পুলিশ সদস্যের পেশাগত দায়িত্ব ও কর্তব্যের সীমার ভেতরে। দায়িত্বের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক সুবিধা আদায় কিংবা কাউকে বেআইনি উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া নির্দেশ কখনোই বৈধ আদেশ হতে পারে না। পুলিশের ক্ষমতা জনগণের সুরক্ষার জন্য, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়।
আদেশটি মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে না
পরোয়ানা বা অভিযোগ ছাড়া গ্রেফতার, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, বেআইনি অস্ত্রপ্রয়োগ, গুম—এসব কাজের কোনো নির্দেশই বৈধ আদেশের আওতায় পড়ে না। মানবাধিকার ও নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে এমন কোনো আদেশ মান্য করার আইনগত বা নৈতিক বাধ্যবাধকতা পুলিশের নেই।
পুলিশ আইনের ধারা মোতাবেক আদেশ মানার বাধ্যবাধকতা
বেঙ্গল পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১ অনুযায়ী পুলিশ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী। এই আইনের মূল দর্শন হলো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের স্বার্থে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈধ আদেশ মানা প্রতিটি পুলিশ সদস্যের কর্তব্য। দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা আইনসম্মত আদেশ অমান্য করলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আইন নিজেই ‘বৈধ আদেশ’ শব্দটি ব্যবহার করে। অর্থাৎ, আইন অন্ধ আনুগত্য দাবি করে না; বরং আইনসম্মত আনুগত্য প্রত্যাশা করে।
ধরা যাক, থানার ওসি আপনাকে একটি চুরি মামলার আসামিকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। মামলাটি নথিভুক্ত, ঘটনার প্রাথমিক তথ্য রয়েছে এবং গ্রেফতারের আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট। এখানে আদেশ মানা শুধু বৈধ আদেশই নয়, বরং দায়িত্বের অংশ। এই ধরনের পরিস্থিতিতে আদেশ অমান্য করলে তাহলে কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য হবে এবং বিভাগীয় শাস্তি হতে পারে। অর্থাৎ, আইনসম্মত আদেশ মানা নিয়ে কোনো দ্বিধার সুযোগ নেই।
দণ্ডবিধিতে (পেনাল কোড ১৮৬০) বৈধ আদেশ অনুসরণে আইনগত সুরক্ষা
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৭৬ ধারা একজন পুলিশ সদস্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সুরক্ষা প্রদান করে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি আইন অনুযায়ী দেওয়া বৈধ আদেশকে তার উপর আরোপিত কর্তব্য হিসেবে সৎ বিশ্বাসে পালন করেন, তবে সেই কাজের জন্য তিনি অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন না।
পুলিশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, আইনসম্মত দায়িত্ব পালনকালে এবং বৈধ আদেশ অনুসরণ করে সম্পাদিত কোনো কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যকে ফৌজদারি অপরাধে দোষী করা যাবে না। মূলত এই ধারাটি দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যকে আইনের ভেতরে থেকে কাজ করার আত্মবিশ্বাস ও সুরক্ষা দেয়। আইনসম্মত আদেশ মেনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলে, তা যেন ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে গণ্য না হয়, এই নিশ্চয়তাই এখানে প্রদান করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে: একজন উপপরিদর্শক (এসআই) বৈধ সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে একটি বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করলেন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৭ ধারা মোতাবেক সেই বাড়িতে প্রবেশ করা গেলো না, তখন একই আইনের ৪৮ ধারায় অভিযান চলাকালে দরজা ভাঙতে হলো এবং কিছু আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলো। পরবর্তীতে বাড়ির মালিক অভিযোগ দায়ের করলেন।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এসআই আইনসম্মত আদেশ অনুযায়ী এবং দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে ওই কাজ করেছেন। সুতরাং, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৭৬ ধারা অনুযায়ী তিনি আইনগত সুরক্ষা পাবেন। কারণ এখানে তিনি কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনের নির্দেশনা অনুসরণ করেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
আরো একটি ভিন্ন উদাহরণ ধরা যাক: একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মৌখিকভাবে নির্দেশ দিলেন “ওকে একটু চাপ দাও, সত্যটা বের করো।” এই “চাপ দেওয়া” বাস্তবে হয়ে দাঁড়াল শারীরিক নির্যাতন। পরবর্তীতে বিষয়টি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী আদালতে গেলে, সেই পুলিশ সদস্য যদি বলেন, “আমি তো স্যারের আদেশেই করেছি,” আইন সেই যুক্তি গ্রহণ করবে না। দণ্ডবিধির ৭৯ ধারা এখানে স্পষ্টভাবে অবৈধ কাজের ক্ষেত্রে আদেশ পালন করার অজুহাতে দায় এড়ানো যায় না।
কারণ একজন সচেতন পুলিশ সদস্য হিসেবে তিনি জানতেন বা জানার কথা ছিল, নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি নেওয়া আইনবিরোধী। অনেক সময় মাঠপর্যায়ে একটি ধারণা শোনা যায়, “আমি তো নিজের সিদ্ধান্তে করিনি, স্যার বলেছেন।” কিন্তু এই ধারণাকে আইন স্বীকৃতি দেয় না। দণ্ডবিধির ৭৯ ধারা এখানে স্পষ্ট ভূমিকা পালন করে। এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো কাজ অবৈধ হয় এবং একজন সচেতন ব্যক্তি হিসেবে তা বোঝার সুযোগ থাকে, তাহলে শুধু আদেশ পাওয়ার অজুহাতে দায় এড়ানো যায় না। অর্থাৎ, আদেশটি যদি স্পষ্টভাবে আইনবহির্ভূত হয়, তাহলে তা পালনকারী ব্যক্তি নিজেও অপরাধের দায় বহন করবেন। এই জায়গায় এসে আইন স্পষ্ট করে দেয়, আদেশ মানা আর অপরাধে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়।
যদি কোনো আদেশে স্পষ্টভাবে আইন ভঙ্গের নির্দেশ থাকে, তবে সেটি মানা যাবে না। যেমন, বিনা আইনি কারণে কাউকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা, মিথ্যা মামলা দায়ের করা, বা বেআইনি পদ্ধতিতে স্বীকারোক্তি আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হলে তা পালন করা সরাসরি অপরাধে অংশগ্রহণের শামিল। একইভাবে, যদি কোনো আদেশ সংবিধানসম্মত মৌলিক অধিকার যেমন জীবন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেই আদেশ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
পুলিশ যেমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তেমনি নাগরিক অধিকার রক্ষার অন্যতম দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা অন্যায্য স্বার্থে দেওয়া আদেশ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হিসেবে গণ্য হয় না। এসব আদেশ মানা আইনসম্মত কর্তব্যের আওতায় পড়ে না।
অবৈধ আদেশ পেলে পুলিশের করণীয়:
কোনো আদেশ নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হলে প্রথম করণীয় হলো, আদেশটি স্পষ্টভাবে বুঝে নেওয়া, এটি দায়িত্বের আওতায় পড়ে কি না এবং আইনসম্মত কি না। মৌখিক আদেশ হলে প্রয়োজনে লিখিত নির্দেশ চাওয়া সম্পূর্ণ পেশাদার আচরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদি আদেশটি আইনগত ঝুঁকি সৃষ্টি করে, তাহলে শান্ত ও সম্মানজনক ভাষায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানানো যেতে পারে। আইন বা বিধির কথা তুলে ধরা কোনো অবাধ্যতা নয়, বরং এটি দায়িত্বশীলতার পরিচয়। পরিস্থিতি গুরুতর হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা প্রযোজ্য চ্যানেলে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করাও যথাযথ পদক্ষেপ। পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা অপরিহার্য। কিন্তু সেই শৃঙ্খলার ভিত্তি কোনো ব্যক্তি নয়; ভিত্তি হলো আইন। বৈধ আদেশ মানা যেমন কর্তব্য, তেমনি অবৈধ আদেশকে “না” বলাও আইন এবং আইনের প্রতি পুলিশ বাহিনীর দায়বদ্ধতা ও পেশাদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ।
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স
