অপারেশন টিমের সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সবার মনে বিপদের আশঙ্কা জাগল। কেননা ওপাশ থেকে কে যেন একজন বলে উঠল,
“ওরা সবাই এখানে।”কাকে বলল, তা বোঝা গেল না। আরিফ সাহেবের মনে হচ্ছিল, তাঁর পা যেন আটকে গেছে। কারণ তাঁর মাথার ভেতর একসঙ্গে কয়েকটি চিন্তা ঘুরছিল। এক, যদি শত্রুরা বুঝে ফেলে যে নেগোসিয়েশনের বাইরে তারা অ্যাকশনে গেছে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই তারা জিম্মিদের মেরে ফেলবে। আরেকটি চিন্তা, নেগোসিয়েশন টিমকেও তারা আক্রমণ করে হত্যা করতে পারে। তারপর লোকালয়ে চালাতে পারে গণহত্যা। হঠাৎ পাশে থাকা হাসান ফিসফিস করে বলল,“স্যার, আমরা ধরা পড়ে গেছি।” আরিফ সাহেব কালবিলম্ব না করে দ্রুত কিছু একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে দেরি না করে সাইলেন্সার লাগানো গুলি চালিয়ে দিলেন শুশি বাহিনীর সদস্যটির দিকে। এদিকে তাঁর ইয়ারপিসে ক্রমাগত বেজেই যাচ্ছে। হয়তো এই সৈন্যটির কাছ থেকে তারা কিছু শুনতে চাচ্ছে, কিন্তু প্রথম দিককার শব্দগুলো স্পষ্ট শোনা যায়নি। আরিফ সাহেবও ইয়ারলেস হাতে নিলেন। প্রায় অবিকল আঞ্চলিক (টিশুলিবা) ভাষায় বললেন, “বিয়ামপে, বাইওনসো আই ব্যামপে।”অর্থাৎ সবকিছু ঠিক আছে। আরিফ সাহেব খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সবাইকে বললেন, “হাতে সময় খুব কম। ওরা সন্দেহ করবে। সবাই দ্রুত সামনে এগোও।”
হঠাৎ রড তার হাত উঁচু করে সিগন্যাল দিল,
“চুপ থাকো।”
সকলেই নিঃশব্দে এগোতে লাগল। মাথার ওপর ঝুলে থাকা স্ট্যালাকটাইটগুলো থেকে পানি পড়ে ক্ষুদ্র টুপটাপ শব্দ তৈরি করছিল, যে শব্দ যেকোনো সময় তাদের অবস্থান ফাঁস করে দিতে পারে।হাসান নিচু স্বরে বলল, “ভেতরে দুইজন পাহারাদার… ফিসফিসানি শুনতে পাচ্ছি।”রশিদ চোখ টিপে সংকেত দিল, “ডান পাশে… অন্ধকারের কোণে।”NVG এর সবুজ আলোতে দেখা গেল দুজন সশস্ত্র শুশি যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। তারা কথায় ব্যস্ত। তাদের টর্চলাইট পাথরের ওপর আলো ফেলে আবার নিভে যাচ্ছে। রড ফিসফিস করে বলল, “তাদের নিঃশব্দে শেষ করতে হবে। গুলির শব্দে সবাই সতর্ক হয়ে যাবে।”
হাসান এগোল বামদিক দিয়ে, রশিদ ডানদিক ধরে। উভয়েই ছায়ার মতো অগ্রসর হলো। পায়ের চাপে পাথরের টুকরোগুলোও যেন শব্দ করতে ভয় পাচ্ছে। হঠাৎ পাহারাদার চমকে উঠল। দুটি ছায়া তাদের পেছনে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে এল। বুঝে ওঠার আগেই হাসানের হাত এগিয়ে গিয়ে এক পাহারাদারের মুখ চেপে ধরল, তারপর নিঃশব্দে ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করল। একই সময় রশিদও দ্বিতীয় পাহারাদারের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।মাত্র কয়েক সেকেন্ডেই দুটি দেহ নিথর হয়ে পড়ে রইল। এখন গুহার ভেতর আরও গভীর অন্ধকার।ম্যাক দ্রুত স্ক্যানার বের করল। পর্দায় সিগন্যালের ডট তীব্রভাবে জ্বলছে, জিম্মিরা খুব কাছে।
পাথরের দেয়ালের ভেতর থেকে ক্ষীণ একটি শব্দ ভেসে এল-মৃত্যুভয়ের মতো স্তব্ধ, চাপা কান্না। রশিদ কানে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, “এরা… জিম্মি? নাকি ”কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ গুহার গভীর থেকে প্রচণ্ড একটি শব্দ পাওয়া গেল। একটি লোহার দরজা সজোরে বন্ধ হলো।
চ্যাংপি চমকে উঠল, “ওরা কাউকে ভেতরে পাঠিয়েছে! আমরা দেরি করে ফেলেছি!”রড তার রাইফেল সামনে তুলল, “সিঁড়ি বা গুহার দ্বিতীয় চেম্বার থাকতে পারে। এগোও!”দল দ্রুত সামনের পথ ধরে এগোতে লাগল। হঠাৎ পথ দুটি ভাগ হয়ে গেল। বামদিক থেকে অল্প আলো আসছে, মনে হচ্ছে আগুনের আভা। ডানদিক সম্পূর্ণ অন্ধকার, কিন্তু সিগন্যাল সেই দিকেই বেশি। চ্যাংপি বলল, “দুই টিমে ভাগ হব?” রড মাথা নাড়লেন, “না। ভাগ হব না। শত্রু বেশি হলে আমরা শেষ।”হাসান বলল, “তাহলে ডানদিক।”ডানদিকে ঘুরতেই তারা দেখতে পেল একটি লম্বা সুড়ঙ্গ। দেয়ালগুলোতে আঁচড় আর আগুনের দাগ। মনে হচ্ছে শুশিরা এখানে সম্প্রতি কারো ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। একটি জায়গা থেকে রক্তের গন্ধ স্পষ্ট লাগছে। মাজেদ নিচু স্বরে বলল, “ওরা হয়তো জিম্মিদের নির্যাতন করে ভয় দেখাচ্ছে…”পরবর্তী বাঁকে পৌঁছতেই দলটি থমকে গেল। দেয়ালের পাশে তিনটি জংধরা লোহার দরজা। সব দরজাই বাইরে থেকে প্যাডলক লাগানো। ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই। রড ফিসফিস করে বললেন, “জিম্মিরা ভেতরে থাকতে পারে… কিন্তু কোন দরজায়?”ম্যাক স্ক্যানার লাগাতে গেল। ঠিক সেই সময় গুহার পেছন দিক থেকে কারো পায়ের শব্দ দ্রুত ছুটে আসছে
Run-একটি আর্তচিৎকার। রশিদ আতঙ্কিত গলায় বলল, “আমাদের পেছন থেকে কেউ আসছে!” মাজেদ দৌড়ে গিয়ে প্রথম দরজার প্যাডলক ভাঙতে উদ্যোগী হলো। আরিফের কণ্ঠ এবার হেডসেটে গমগম করে উঠল, “না! কোনো দরজা খুলবে না! এটা ট্র্যাপ হতে পারে!”কিন্তু ঠিক তখনই দ্বিতীয় দরজার ভেতর থেকে শোনা গেল-একটি শিশুর করুণ কান্না। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। হাসান দরজার ভেতরে আলো ফেলে বলল, “একটি শিশু? এখানে?”চ্যাংপি বলে উঠল, “এটা জিম্মিদের কেউ!” রড প্যাডলক ভাঙতেই এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ! দরজার পেছন দিকেই ছিল একটি স্টান গ্রেনেড-শুশিদের ফাঁদ! হাসানের হাত গুরুতরভাবে আহত হলো। রশিদ ছিটকে পড়ে গেল পাথরের দেয়ালে। সামনে আগুনের গোলা ছড়িয়ে পড়ল। ম্যাক চিৎকার করে উঠল, “ওরা জানত আমরা আসব!” বিস্ফোরণের ধোঁয়া দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তৈরি করল। লুইস দ্রুত আহতদের টেনে এক কোণে নিয়ে গেল। রড আহত অবস্থায় বলল, “এটা কোনো জিম্মি ছিল না! স্টান গ্রেনেডের সাউন্ড—ট্র্যাপ! ওরা আমাদের বোকা বানিয়েছে!” ম্যাক স্ক্যানারের দিকে আবার তাকাল। কিন্তু এখন কোনো সিগন্যাল নেই। ডটটি হঠাৎ অদৃশ্য। “অসম্ভব!” ম্যাক চেঁচিয়ে উঠল। “ফায়ারফ্লাই ভাঙা যায় না! তাহলে সিগন্যাল কোথায় গেল?” ঠিক তখনই ইয়ারপিসে রাইসার কণ্ঠ ভেসে এল, “মিস্টার আরিফ! টিলার দিক থেকে নতুন তথ্য এসেছে। শুশিরা একটি ট্রাকে জিম্মিদের স্থান পরিবর্তন করছে। ওরা গুহা থেকে বেরিয়ে গেছে!” দল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ম্যাকের কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “মানে… আমরা ভুল জায়গায়?” রাইসা বললেন, “ফায়ারফ্লাই যেটাকে ট্র্যাক করছিল, তা ছিল তাদের ডামি যোগাযোগ যন্ত্র। ওরা সিগন্যাল জ্যামার ব্যবহার করেছে।” আরিফের কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠল, “সবাই শুনুন। গুহাটি ছিল ফাঁদ। জিম্মিরা আর এখানে নেই।”এক মুহূর্তে পুরো অপারেশন ধ্বংসের মুখে।চ্যাংপি হতাশ হয়ে বলল, “তাহলে আমরা… পরাজয়ের খুব কাছাকাছি?”এই পরাজয় যে মৃত্যুর সমান, তা কারো অজানা নয়। আরিফ শান্ত কিন্তু ভেতরে দৃঢ় সাহসে ভরা কণ্ঠে বললেন, “হার নয়। এখনই শুরু হচ্ছে আসল লড়াই।”বিস্ফোরণের ধোঁয়া এখনো গুহার ভেতর ভাসছে। আগুনের লালচে আলো পাথরের দেয়ালে অঙ্কিত ছায়া সৃষ্টি করছে, যেন গুহার ভেতর যমদূতেরা খেলছে। আহত হাসান ব্যথায় কাতরাচ্ছে, কিন্তু সময় নেই। আরিফ সাহেব ওয়াকিটকিতে কঠিন কণ্ঠে বললেন, “সকল টিম সদস্য প্রস্তুত হন। শুশিরা জিম্মিদের ট্রাকে করে স্থান পরিবর্তন করছে। আমাদের এখনই গুহা ছেড়ে পাহাড়ের পূর্ব ঢালের পথে ছুটতে হবে।” রড আহত হাসানের হাত পেঁচিয়ে বেঁধে দিল।“তুমি চলতে পারবে?”হাসান দাঁত কামড়ে উত্তর দিল, “আমি ঠিক আছি। আমাকে পেছনে ফেলবেন না।” আরিফ তার কাঁধে হাত রাখলেন, “আজ কাউকে ফেলে যাওয়ার প্রশ্নই নেই।” “দাঁড়াও, বাইরে যুদ্ধ অপেক্ষা করছে।”
গুহার বাইরে অপেক্ষমাণ ভয়ংকর নীরবতা গুহার মুখে পৌঁছাতেই দলটি থমকে গেল।বাইরেও একই অন্ধকার, কিন্তু কোথাও কোনো শব্দ নেই।ম্যাক বলল, “সিগন্যাল ব্যাহত করা হয়েছে। আমাদের চোখ আর কান এখন নিজেরাই।” হঠাৎ মাটির নিচে হালকা কম্পন। একটা ভারী কিছু, সম্ভবত ট্রাক। চোখের সামনে দিয়ে খুব দূরে, একটি ফাঁকা স্থানে আলো নড়ে উঠল। রড বলল, “ওটাই তাদের ট্রাক। দূরত্ব তিনশ মিটার।”চ্যাংপি উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল, “We go now”রড চিৎকার করে উঠল, “No! They may have sentries”
সত্যিই অল্প দূরে ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে কয়েকটি ছায়া নড়ল। সশস্ত্র শুশিদের সিকিউরিটি ইউনিট পাহাড়ের ঢালে টহল দিচ্ছে। আরিফ হাত তুলে সিগন্যাল দিলেন, “Shadow Move।” এর অর্থ আলো ছাড়া, শব্দ ছাড়া, সাপের মতো অগ্রসর হতে হবে।দলটি নিচু হয়ে, পাথরের আড়াল ধরে, টানা পনেরো মিনিট নিঃশব্দে এগোতে লাগল। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে এল শিশুদের কান্না-জিম্মিরা যে খুব বেশি দূরে নয়, সেটাই তার প্রমাণ।
পাহাড়ের ঢালে মারণফাঁদ।
হঠাৎ একটি গুলির শব্দ! ঠিক মাথার ওপর দিয়ে একটি বুলেট ছুটে গেল। চ্যাংপি চিৎকার করে উঠল,
“Ambush!”শুশিরা অন্ধকারেই অপেক্ষা করছিল। চারদিক থেকে ছয়-সাতজন ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা পাহাড়ের ঢাল ব্যবহার করে ওপর থেকে গুলি বর্ষণ করতে লাগল। রড চেঁচিয়ে উঠল, “Cover fire না! সাইলেন্সার-শব্দ তুলবে না!”দল দ্রুত পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিল। শত্রুর সংখ্যা বেশি, কিন্তু নিশানা দুর্বল, ওরা আতঙ্ক ছড়াতে গুলি করছে। AFRDC সৈন্য কিয়ামা বলল, “ওরা আমাদের ডানদিক ঘিরে ফেলছে, হালকা মেশিনগান আছে!” ঠিক তখনই লুইস ধীরে, নিখুঁত নিশানায় বামদিকের এক শুশি যোদ্ধাকে নিঃশব্দে নামিয়ে ফেলল। রড ডানদিক থেকে আরও দুজনকে সাইলেন্সার শটে নিঃশব্দে হত্যা করল। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আক্রমণ ভেঙে পড়ল। শুশিদের ছয়জন নিথর হয়ে পড়ে রইল। কিন্তু পরিস্থিতি মোটেও অনুকূলে নয়, ট্রাকের শব্দ তখন দূরে ক্ষীণ হয়ে গেছে। জিম্মিদের নিয়ে শুশিরা পালিয়ে যাচ্ছে। স্পেশাল অপারেশন্স টিম দৌড়ে পাহাড়ের নিচের পথে নেমে এল। চ্যাংপি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “.They are too far… too far..”আরিফ থেমে গেলেন। তাঁর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। “না। অন্ধভাবে দৌড়ালে আমরা হারাব। আমাদের জানতে হবে ওরা জিম্মিদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।” ম্যাক হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “আমরা যদি জ্যামার ভেদ করতে পারতাম…” আরিফ তার কাঁধে হাত রাখলেন। “এখন প্রযুক্তি নয়, বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগাও। শুশিদের আচরণ বিশ্লেষণ করো।”ম্যাক চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল, “যদি তারা অবস্থান বদলায়, তারা যাবে নদীর দিকে। নদীপথ তাদের দ্রুততম পালানোর রাস্তা। আর জিম্মিদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে তারা এমন জায়গায় থামবে; যেখানে পানি, খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় আছে।
কিয়ামা বলল,
“একটাই জায়গা আছে কাছাকাছি, মোকাফা জঙ্গল। সেখানে একটা পরিত্যক্ত খনি আছে। শুশিরা আগে সেটা কয়েকবার ব্যবহার করেছে।”আরিফের চোখ জ্বলে উঠল। “সেখানেই যাচ্ছে ওরা।”চ্যাংপি উত্তেজিত গলায় বলল, “তাহলে কী অপেক্ষা? Let’s go!”রড মাথা নাড়িয়ে বলল,
“এক মিনিট।” মোকাফা জঙ্গল মানে ঘন গাছপালা, খাড়া ক্লিফ, শত্রুর লুকানোর অসংখ্য সুযোগ। তার ওপর আমাদের ফোর্স কম।আরিফ গভীর শ্বাস নিলেন। তারপর বললেন,
“আমি এখনই শহর থেকে কমান্ডো ব্যাকআপ চাইছি। তারা এক ঘণ্টার মধ্যে নিকটবর্তী হেলিপ্যাডে অবতরণ করবে। আমরা তাদের সঙ্গে সেখানে মিলিত হব। আজ রাতেই মোকাফা জঙ্গলে ঢুকতে হবে।”ঠিক তখনই একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য এল। রাইসা ওয়াকিটকিতে ফিরে এলেন শ্বাসভাঙা কণ্ঠে,
“মিস্টার আরিফ… নতুন তথ্য এসেছে।”“বলুন।”
“শুশি গোষ্ঠীর ভেতরে বিভাজন চলছে। কাম্বার ডান হাত স্যামেকা-সে নাকি নিজেই ক্ষমতা নিতে চায়। আর সে জিম্মিদের ব্যবহার করতে চায় আলাদা চাল হিসেবে।”সবাই থমকে গেল। চ্যাংপি বলল, “মানে তারা নিজেদের মধ্যে লড়াই করবে?” রাইসা বললেন, “হ্যাঁ। স্যামেকা হয়তো চাইছে কাম্বা ব্যর্থ হোক। সে জিম্মিদের অন্য স্থানে রাখতে চাইতে পারে। এটাই আমাদের সুযোগ… অথবা বড় বিপদ।” আরিফের চোখে এবার অন্য ধরনের আগুন জ্বলে উঠল। “যদি শুশিরা ভেতরে ভেঙে পড়ে, তাহলে আমরা জিম্মিদের ছিনিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাব।” তিনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সবাই শুনুন। এখন আমরা শুধু…” অপারেশন চালাচ্ছি না, আমরা সময়ের সঙ্গে দৌড়াচ্ছি, এবং শত্রুর ভেতরের যুদ্ধকে আমাদের অস্ত্র বানাচ্ছি।
রড দাঁড়িয়ে বলল,
“Sir, tonight… either we win or we die in the shadows।”আরিফ মাথা নেড়ে বললেন,“আজ রাতেই শেষ হবে এই দানবীয় খেলা। মোকাফা জঙ্গল অপেক্ষা করছে।” দলটি আবার রওনা হলো অন্ধকার পাহাড়ের ভেতর, যেখানে প্রতিটি কদমেই আছে মৃত্যুর শঙ্কা, আর প্রতিটি সেকেন্ডে জিম্মিদের জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে।
মোকাফা জঙ্গল
অপারেশন টিম মোকাফা জঙ্গলে প্রবেশ করল অত্যন্ত সন্তর্পণে। পাহাড়ি পথের শেষ মাথায় যেন প্রকৃতি নিজেই দেয়াল তুলে দিয়েছে। উঁচু গাছের ঘন ছায়া, ভেজা মাটি, আর অজানা সব আওয়াজ-মাঝে মাঝে চিকচিক করে ওঠা কোনো জন্তুর চোখ। এখানে সময় নেই, দিকনির্দেশনা নেই, আছে শুধু টিকে থাকার প্রবৃত্তি। তারা যখন জঙ্গলের ভেতরে ঢুকল, তখন রাত প্রায় শেষের পথে। ভোরের আগের এই সময়টুকুই সবচেয়ে বিপজ্জনক-দৃষ্টি ঝাপসা, শরীর ক্লান্ত, আর সিদ্ধান্তে সামান্য ভুল মানেই মৃত্যু। আরিফ সাহেব হাত তুলে সবাইকে থামালেন,
“এখান থেকে এক মুহূর্তের জন্যও কেউ আলাদা হবে না। শুশিরা জঙ্গল ভালোভাবে চেনে। ওরা আমাদের দেখছে কি না আমরা জানি না।” রড নিচু গলায় বলল,“স্যার, সামনে পরিত্যক্ত খনির ব্রিজ। খুব সরু।” ব্রিজটা কাঠের, পুরনো। নিচে গভীর খাদ, যেখানে পড়লে আর ওঠার সুযোগ নেই। একসময় এখানে খনিজ তোলা হতো। এখন জায়গাটা শুশিদের অস্থায়ী ঘাঁটি। ঠিক তখনই কিয়ামা ফিসফিস করে বলল, “শব্দ… ভেতর থেকে।”আরিফ কান পাতলেন। মৃদু কণ্ঠ, একাধিক মানুষের। আর একটি শিশুর কান্না। সবাই থমকে গেল। এবার আর কোনো সন্দেহ নেই-জিম্মিরা এখানেই।
শুশিদের ভেতরের যুদ্ধ
খনির ভেতরটা অন্ধকার, তবে এক কোনায় টর্চের আলো জ্বলছে। লুকিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েই দলটি দেখল দুই শুশি নেতার মুখোমুখি অবস্থান। একজন কামএমবি।চোখে নিষ্ঠুরতা, হাতে অস্ত্র। আরেকজন স্যামেকা-কণ্ঠে উত্তেজনা, আচরণে আগ্রাসী। স্যামেকা চিৎকার করে বলছিল,
“তুই বেশি লোভ করেছিস, কাম্বা! ওরা আমাদের ফাঁদে ফেলেছে!” কাম্বা দাঁত চেপে উত্তর দিল,
“চুপ কর! জিম্মিরা আমার হাতেই থাকবে। টাকা আসবেই।” স্যামেকা এগিয়ে এসে বলল,
“আর যদি না আসে? তখন কী করবি? আমরাই সবাই মরব!” এই তর্কের মাঝেই এক শুশি যোদ্ধা ছুটে এল। “বস! শান্তিরক্ষীদের নড়াচড়া দেখা গেছে। ওরা খুব কাছে।” মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে গেল। কাম্বা বন্দুক তুলল। “জিম্মিদের নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকে পড়ো। একজনও যেন জীবিত না যায় যদি আমরা ধরা পড়ি।” এই কথাটা আরিফ সাহেব স্পষ্ট শুনলেন। তার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আরিফ খুব দ্রুত হিসাব কষলেন। হেলিকপ্টার ব্যাকআপ আসতে এখনো অন্তত বিশ মিনিট। ততক্ষণে জিম্মিদের হত্যা করা হলে সব শেষ। তিনি ওয়াকিটকিতে নিচু স্বরে বললেন,“রাইসা, আমাদের সময় শেষ হয়ে আসছে। আমি হেলিকপ্টারের জন্য অপেক্ষা করতে পারছি না।” রাইসা এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, “তাহলে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে “হবে স্বল্প বাহিনী নিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আক্রমণ, নাকি অপেক্ষা করা। তবে তখন জিম্মিদের জীবন নিয়ে বড় শঙ্কা থাকবে।” আরিফ এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করলেন। তারপর চোখ খুলে বললেন,
“আমরা এখনই আঘাত করব।”
শেষ মুহূর্তের আক্রমণ
আরিফ হাতের সিগন্যাল দিলেন। অপারেশন ‘অন্ধকারের বজ্রপাত’ চূড়ান্ত ধাপ। রড ও লুইস ডানদিক দিয়ে নেমে গেল। চ্যাংপি বামদিক ঘুরে প্রবেশ নিল। বাংলাদেশি অফিসাররা পেছনের সুড়ঙ্গের পথ বন্ধ করতে এগিয়ে গেল। প্রথমে গুলি না ছুড়ে বরং আগের কৌশলে ছুরিকাঘাত করে নিঃশব্দে দুটি শুশি পাহারাদারকে হত্যা করা হলো। এরপর ভেতরে বিশৃঙ্খলা। কেউ চিৎকার করছে, কেউ দৌড়াচ্ছে। কাম্বা বুঝে গেছে সে ফাঁদে পড়েছে। সে জিম্মিদের দিকে বন্দুক তাক করল। চিৎকার করে বএমবি “এক পা সামনে এলে এদের শেষ!” ঠিক সেই মুহূর্তে স্যামেকা হঠাৎ পেছন থেকে কাম্বার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল, “এইটা তোর জন্য!” গুলির শব্দ।কাম্বা মাটিতে পড়ে গেল। স্যামেকার বিশ্বাসঘাতকতাই মুহূর্তটি বদলে দিল। আর স্যামেকা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হলো। একই সময়ে বাইরে হাসান আর মাজেদ একে একে শুশি বাহিনীর পাঁচজনকে স্নাইপার গুলিতে নিথর করে দিল, যারা বাইরে পাহারা দিচ্ছি
জিম্মি উদ্ধার
চ্যাংপি আর রড একসঙ্গে জিম্মিদের দিকে ছুটে গেল।দোয়েল নামের এক ইউএনএইচসিআর কর্মী কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমরা ভেবেছিলাম… আমরা আর বাঁচব না।”আরিফ নিজে এসে এক জিম্মির কাঁধে হাত রাখলেন, “আপনারা নিরাপদ। এখন শুধু আমাদের সঙ্গে থাকুন।” ঠিক তখনই বাইরে থেকে হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে এল। আকাশ ভেদ করে আলো নেমে এল জঙ্গলের ওপর। সব শেষ হয়নি, কিন্তু সবচেয়ে কঠিন রাতটা পেরিয়ে গেছে। আরিফ হালকা নিঃশ্বাস ফেললেন। তার চোখ আবার সেই অন্ধকারের দিকে গেল। তিনি জানেন, কিনশাসার ছায়া এখনো পুরোপুরি সরে যায়নি। হেলিকপ্টারের শব্দ ধীরে ধীরে জঙ্গলের ওপর ঘনিয়ে এল। ওপর থেকে কমান্ডো বাহিনী অবতরণ করল। ততক্ষণে মোকাফা জঙ্গলে এক নিষ্ঠুর, শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি উদ্ধার অভিযানের রাত শেষ হলো। গাছের ফাঁক দিয়ে ভোরের আবছা আলো খনির ধ্বংসপ্রায় কাঠামোর ওপর পড়ছে। এখানে কিছুক্ষণ আগেও মৃত্যু ও আতঙ্ক রাজত্ব করছিল, আর এখন নীরবতা।
জিম্মিদের সবাইকে নিরাপদ বেষ্টনীতে আনা হয়েছে। কেউ আহত, কেউ নিঃশব্দে কাঁদছে, কেউ আবার নির্বাক হয়ে বসে আছে-যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, তারা এখনো বেঁচে আছে। মেডিকেল টিম দ্রুত কাজ শুরু করেছে। একজন ইউএনএইচসিআর কর্মী আরিফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন,
“আপনারা না এলে… আমরা আর ফিরতাম না।” আরিফ সাহেবের চোখে আনন্দের অশ্রু ঝরছে। তিনি জানতেন, জীবন রক্ষার এই আনন্দের মুহূর্ত সারা রাতের সব কষ্ট এক নিমিষেই দূর করে দেয়। আহত হাসানকে হেলিকপ্টারে তোলা হলো। বিস্ফোরণে তার বাঁ হাত চিরদিনের মতো অকেজো হয়ে গেছে। শুয়ে শুয়ে সে ম্লান হাসি দিয়ে আরিফ সাহেবের দিকে তাকাল। “স্যার, হাতটা গেল… কিন্তু মানুষগুলো তো বেঁচে আছে।” আরিফ সাহেব তার কাঁধ শক্ত করে ধরে বললেন, “তুমিই আমাদের বিজয়, হাসান।” একজন FARDC সেনা আর ফিরল না। একটি গুলির আঘাত পাহাড়ি পথে তার জীবন কেড়ে নিয়েছে। সবাই নীরবে অশ্রু ফেলল এক সহকর্মীর মৃত্যতে।
শুশি গোষ্ঠীর শেষের শুরু
কাম্বার মৃত্যতে শুশি গোষ্ঠী আর সংগঠিত থাকল না। স্যামেকাকে আটক করে শহরে নিয়ে আসা হলো। পরের দিন কিনশাসার অস্থায়ী ট্রাইব্যুনালে তাকে হাজির করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘটনাটিকে বলল—
“A successful UN-led hostage rescue operation.” কিন্তু আরিফ সাহেব জানেন, বাস্তব গল্পটা আরও কত ভয়ংকর। এই একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পতন মানেই সহিংসতার শেষ নয়। পাহাড়গুলো এখনো আছে। খনিজ আছে। আর আছে সেই অদৃশ্য শক্তিগুলো, যারা দেশে বা দেশের বাইরে বসে এই জনপদে অশান্তির আগুন জ্বালায়। অভিযানের পরদিন সন্ধ্যায় ক্যাম্পের ছাদে একা দাঁড়িয়ে ছিলেন আরিফ। সাহেব। দূরে কিনশাসার আলো জ্বলছে, নদীর পানি শান্তভাবে বয়ে যাচ্ছে যেন কিছুই ঘটেনি। রাইসা পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“আপনি ঠিক সিদ্ধান্তটাই নিয়েছিলেন।” আরিফ সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,
“না, ঠিক সিদ্ধান্ত নিইনি। কারণ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের সিদ্ধান্ত আমি নিলেও তার মূল্য সবাই সমানভাবে দেয়নি। আমরা হারিয়েছি এক সহযোদ্ধাকে, আর হাসান হারিয়েছে তার হাত।” বলতে বলতে আরিফ সাহেবের গলা ধরে এল। ক্ষণিকের জন্য চোখের অশ্রু লুকালেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে যোগ করলেন,
“শান্তিরক্ষী হওয়া মানে যুদ্ধ করা নয়। শান্তিরক্ষী হওয়া মানে যুদ্ধের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানবতাকে বাঁচানো, যদিও তাতে নিজের ভেতরের শান্তিটুকু হারাতে হয়।”
কয়েক সপ্তাহ পর আরিফুর রহমানের মিশন রোটেশন শেষ হয়। বিদায়ের দিন ক্যাম্পে আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ হয়নি। ছিল শুধু কয়েকটি নীরব হাত মেলানো, চোখের ইশারা, আর সম্মানের দৃষ্টি। হেলিকপ্টারে ওঠার আগে তিনি একবার পেছনে তাকালেন। পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে আগের মতোই নীরব, রহস্যময়।
তিনি জানেন, কিনশাসার ছায়া এখানেই শেষ হয়নি। হয়তো আবার অন্য কোনো নাম, অন্য কোনো গোষ্ঠী, অন্য কোনো আগুন। কিন্তু অন্তত এই রাতে কিছু মানুষ বেঁচে ফিরেছে। আর সেটুকুই একজন শান্তিরক্ষীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
হেলিকপ্টার আকাশে উঠে গেল। নিচে কিনশাসার পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এল, একসময় মিলিয়ে গেল।
(সমাপ্তি)
লেখক
প্রভাষক,
বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ
দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ
