একদিকে দ্রুত অভিযান, সফল উদ্ধার ও ঝুঁকি নেওয়ার সাহস; অন্যদিকে দীর্ঘসূত্রতা, থেমে যাওয়া তদন্ত আর অদৃশ্য বাধা। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের পুলিশিং ব্যবস্থা। পুলিশ কেন সব সময় তাদের দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে না, কোন কোন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তাদের পেশাগত স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং তার প্রভাব তদন্তে কীভাবে পড়ে-সেই প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে এই লেখা।
রাজধানীতে অপহরণের শিকার হয় এক স্কুলছাত্র। তার বাবার আহাজারি নজরে আসে প্রধানমন্ত্রীর। তৎক্ষণাৎ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো সমন্বিতভাবে মাঠে নামে এবং অপহৃত শিশুটিকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে। মুক্তিপণের দাবিকে কেন্দ্র করে অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ চলাকালেই তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীর একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অপহরণের মাত্র সোয়া এক ঘণ্টার মধ্যেই স্কুলছাত্রটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
দক্ষভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ পুলিশ জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী অভিযান, বড় অপরাধচক্র ভাঙন এবং দুর্যোগকালীন উদ্ধার তৎপরতায় উল্লেখযোগ্য সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা এবং ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেন সব অপরাধ দ্রুত সমাধান হয় না। কেন কিছু মামলার তদন্ত কার্যক্রম বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কেন কখনো কখনো তদন্তের গতি থেমে যায়। এখানেই সামনে আসে পুলিশের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি।
বাংলাদেশ পুলিশ কার্যকর হলেও তারা সব সময় স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, রাজনৈতিক প্রভাব, বদলি ও পদায়নের অনিশ্চয়তা, কখনো কখনো পরোক্ষ চাপ-সব মিলিয়ে পুলিশের পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। উল্লিখিত বাস্তবতার পেছনে যে কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণগুলো কাজ করে, সেগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট ধারায় ব্যাখ্যা করা যায়। এগুলো আলাদা আলাদা হলেও বাস্তবে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। প্রথমত, প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ পুলিশ প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত একটি বাহিনী। অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন প্রশাসনিক স্তরের মৌখিক বা লিখিত নির্দেশনার অপেক্ষা করতে হয়। এর ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। অনেক সময় সংবেদনশীল মামলায় এই বিলম্ব তদন্তের গতি ও কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাত। সংবেদনশীল বা আলোচিত অনেক মামলায় রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় অবস্থান কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা তদন্তকে জটিল করে তোলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার এশিয়ার একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করে। জ্যাকম্যান ও ম্যাট্রিয়ট ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখান, বাংলাদেশে পুলিশকে অধিকাংশ সময় জাতীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরশীল সম্পর্কের ভেতরে কাজ করতে হয়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভাষার আড়ালে রাজনৈতিক স্বার্থই মূল প্রভাব ফেলে।
কে কখন গ্রেপ্তার হবে, কার বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে-এসব প্রশ্ন অনেক সময় আইনগত প্রমাণের চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়। এমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফলে তদন্তের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয় এবং আইনের সমান প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, যা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত। বিশেষ করে, গত দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী সরকারের সময়ে পুলিশকে দলীয়করণ ও নিপীড়নের হাতিয়ার তথা পুরোপুরি রাজনৈতিক যন্ত্রে পরিণত করা হয়েছিল।
তৃতীয়ত, বদলি ও পদায়নের অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ পুলিশের একটি বড় বাস্তবতা হলো ঘন ঘন বদলি। কোনো কর্মকর্তা একটি মামলার গভীরে যাওয়ার আগেই অন্যত্র বদলি হয়ে যেতে পারেন। এর ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের আইনের শাসন সূচক ২০২৫ এবং আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের ২০০৯ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ: গেটিং পুলিশ রিফর্ম অন ট্র্যাক-তুলে ধরা হয়েছে যে, ঘন ঘন ও পরিকল্পনাহীন বদলির ফলে তদন্তের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় এবং পুলিশের সামগ্রিক দক্ষতা হ্রাস পায়, বিশেষত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে।
পাশাপাশি, অনেক সময় কোনো সিদ্ধান্তে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহল অসন্তুষ্ট হলে শাস্তিমূলক বদলির আশঙ্কা অনেক কর্মকর্তাকে দমিয়ে ফেলে, যা দৃঢ় ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে।
চতুর্থত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অস্পষ্টতা। পুলিশ জবাবদিহিতার বাইরে নয়; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই জবাবদিহিতা পেশাগত মানদণ্ডের বদলে ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। কোথায় পেশাগত ভুলের জন্য জবাবদিহিতা প্রযোজ্য হবে, আর কোথায় নীতিগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দায় কার ওপর বর্তাবে-এই সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রেই পরিষ্কার নয়।
ফলে একজন কর্মকর্তা জানেন না, সঠিক পেশাগত সিদ্ধান্ত নিলেও পরবর্তীতে সেটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে কি না। তদন্তের ফলাফলের বদলে সিদ্ধান্তটি কার স্বার্থে বিরূপ হয়েছে, সেটিই কখনো কখনো মূল্যায়নের মূল মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের অস্পষ্ট জবাবদিহিতা কাঠামো পেশাগত মান উন্নয়নের বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থবিরতা সৃষ্টি করে, যা কার্যকর পুলিশিংয়ের পথে গভীর অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
পঞ্চমত, বহুমুখী চাপ ও প্রত্যাশা। একজন পুলিশ কর্মকর্তা একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং জনসাধারণের প্রত্যাশার মুখোমুখি হন। এসব চাপ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে অনেক সময় মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান গৌণ হয়ে পড়ে।
এসব কারণেই বাংলাদেশ পুলিশ মোটাদাগে যথেষ্ট দক্ষ ও সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও সব অপরাধ দ্রুত সমাধান করতে পারে না। সমস্যাটি যতটুকু সক্ষমতার, তার চেয়ে বেশি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও পেশাগত স্বাধীনতার অভাবের। এই জায়গাগুলোতে সংস্কার না এলে পুলিশের দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি সংবেদনশীল মামলার তদন্ত এগোতে গেলে নানা দিক থেকে প্রশ্ন, নির্দেশ কিংবা অদৃশ্য সীমারেখা সামনে এসে দাঁড়ায়। কে গ্রেপ্তার হবে, কখন হবে, কীভাবে হবে-এসব সিদ্ধান্ত সব সময় কেবল তদন্তের তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। এর ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানেন, তাঁরা কী করতে পারেন, আবার কী করতে পারলেও করা যাবে না। এই দ্বন্দ্বই কার্যকর পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
উল্লিখিত শিশু উদ্ধারের ঘটনাটির দিকে আবার তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ বা বাধা ছিল না। সময় নষ্ট করার মতো অনুমতির জটিলতা ছিল না। সিদ্ধান্ত ছিল দ্রুত, দায়িত্ব ছিল পরিষ্কার, আর লক্ষ্য ছিল একটিই-শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা। সেই স্বাধীনতা এবং আস্থাই কাজটিকে সহজ করে দিয়েছে। যদি প্রতিটি অপরাধ তদন্তে পুলিশ এমন স্বাধীনতা পেত, তবে অনেক জটিল মামলাই হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সমাধান সম্ভব হতো।
এখানে বলা হচ্ছে না যে পুলিশকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখতে হবে। বরং প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো, যেখানে পুলিশ পেশাগত সিদ্ধান্তে স্বাধীন হবে, কিন্তু আইনি ও নৈতিক কাঠামোর ভেতরে থেকে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বদলে অপরাধ দমনের স্বার্থে পুলিশি ক্ষমতা ব্যবহৃত হবে-এই নিশ্চয়তা থাকলে জনগণের আস্থাও আরও দৃঢ় হবে।
অতএব, প্রশ্নটি পুলিশ পারবে কি পারবে না, সেটি নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, আমরা কি পুলিশকে কাজ করার মতো পরিবেশ ও স্বাধীনতা দিতে পারছি। যতদিন এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না মিলবে, ততদিন সফল অভিযানের গল্পগুলো ব্যতিক্রম হয়েই থেকে যাবে, নিয়ম হয়ে উঠবে না।
লেখক
প্রজেক্ট ম্যানেজার
ইন্টেলিস সল্যুশন লি.

