হোমপ্রবন্ধনিরাপত্তার পেছনের ব্যয়: পাঁচটি দেশের পুলিশ বাজেটের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

নিরাপত্তার পেছনের ব্যয়: পাঁচটি দেশের পুলিশ বাজেটের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

ধরুন, আপনি একটি দেশ চালাচ্ছেন। নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান। সবচেয়ে সহজ সমাধান কী মাথায় আসে? বেশিরভাগ মানুষের উত্তর হবে-পুলিশ বাড়াও, বাজেট বাড়াও। কিন্তু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি দেশের তথ্য মেলালে দেখা যায়, বাস্তবতা এত সরল নয়। বরং তথ্যগুলো প্রচলিত ধারণাকে অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জ করে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভুটান ও ইন্দোনেশিয়া-এই পাঁচটি দেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুলিশ বাজেট, সদস্যসংখ্যা এবং গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬-এর তথ্য পাশাপাশি রাখলে যে চিত্র ফুটে ওঠে, তা নীতিনির্ধারকদের জন্য ভাবনার খোরাক হতে পারে। মোট বরাদ্দের নিরিখে এই তালিকায় ভারত সবার উপরে। ভারতের কেন্দ্রীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বরাদ্দ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে ইন্দোনেশিয়া, যার ন্যাশনাল পুলিশ বাজেট বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯৮ হাজার ৬ কোটি টাকা। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের পুলিশ বাজেট ১৮ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। এরপর পাকিস্তান, যার ফেডারেল পুলিশ ও সিভিল আর্মড ফোর্সেসের বরাদ্দ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৪ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। আর সবশেষে ভুটান। ক্ষুদ্র হিমালয়ঘেরা এই রাজ্যের ল অ্যান্ড অর্ডার সেক্টরে ব্যয় প্রায় ৭৪৪ কোটি টাকা। মোট অঙ্কের এই তুলনা সামগ্রিকভাবে একটি প্রাথমিক চিত্র বুঝতে সহায়তা করলেও বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন হয়, যখন আমরা এই সংখ্যাগুলোকে দেশগুলোর অন্তর্নিহিত বিভিন্ন সূচক অনুযায়ী দেখা হলে চিত্রটি ভিন্ন হতে পারে। বড় অর্থনীতি, বৃহৎ জনসংখ্যা এবং বড় প্রশাসনিক কাঠামোর দেশে মোট বরাদ্দ স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে পারে।

তাই শুধু মোট বাজেট দেখে কোনো দেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার বা পুলিশিং সক্ষমতা বিচার করা যথেষ্ট নয়। তুলনার জন্য দরকার মোট জাতীয় বাজেটের মধ্যে এই খাতের অংশ, সদস্যসংখ্যা এবং সদস্যপ্রতি আনুমানিক ব্যয়ের হিসাব। পুলিশ সদস্যসংখ্যার দিক থেকে ভারত এই তালিকায় সবচেয়ে বড় বাহিনী-প্রায় ২১ লাখ ৬২ হাজার সদস্য। এরপর ইন্দোনেশিয়া ৪ লাখ ৩৬ হাজার, পাকিস্তান ৩ লাখ ৫৪ হাজার, বাংলাদেশ ২ লাখ ১০ হাজার এবং ভুটান ৫ হাজার ৫০ জন। জনসংখ্যার অনুপাতে বাহিনীর আকার দেখলেও চিত্রটি কৌতূহলোদ্দীপক। প্রতি এক লাখ নাগরিকের জন্য পাকিস্তানে পুলিশ সদস্য সবচেয়ে বেশি-১৮২ জন। ভুটানে ১৫৯, ইন্দোনেশিয়ায় ১৫৮, ভারতে ১৫৫। আর বাংলাদেশে সবচেয়ে কম-মাত্র ১২৭ জন।

অর্থাৎ, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের পেছনে পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় ৫৫ জন কম পুলিশ রয়েছে। জাতীয় বাজেটের শতাংশ হিসেবে বরাদ্দের জাতীয় বাজেটের শতাংশ হিসেবে বরাদ্দের দিকে তাকালে চিত্রটি আরও আকর্ষণীয় হয়। ভুটানের ল অ্যান্ড অর্ডার সেক্টর মোট বাজেটের প্রায় ৪.১ শতাংশ, যা এই তালিকায় সর্বোচ্চ। ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল পুলিশ বাজেট মোট বাজেটের প্রায় ৩.৯২ শতাংশ। ভারতের কেন্দ্রীয় পুলিশ ও নিরাপত্তা-সম্পর্কিত বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ৩.১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ পুলিশের বাজেট মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ২.৩২ শতাংশ। পাকিস্তানের ফেডারেল পুলিশ ও সিভিল আর্মড ফোর্সেসের বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় ১.৮৩ শতাংশ। এই তথ্যের মাধ্যমে দেখা যায়, কোনো দেশের মোট বরাদ্দ বড় হলেই সেটি মোট বাজেটের তুলনায় বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে-এমন নয়। আবার মোট বরাদ্দ ছোট হলেও ছোট অর্থনীতির দেশে সেই খাতের অংশ তুলনামূলকভাবে বড় হতে পারে। ভুটান তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

অর্থাৎ, ভুটানের বরাদ্দ সবচেয়ে কম হলেও মোট বাজেটের অনুপাতে ল অ্যান্ড অর্ডার সেক্টরের অংশ সবচেয়ে বেশি। তাই নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণে “মোট টাকা” এবং “মোট বাজেটের অংশ”-দুটি মানদণ্ডই একসঙ্গে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের পুলিশ বাজেট মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ২.৩২ শতাংশ। এই হার পাকিস্তানের ফেডারেল পুলিশ ও সিভিল আর্মড ফোর্সেস বরাদ্দের চেয়ে বেশি, তবে ভুটান, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতের সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের তুলনায় কম। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আলোচনা শুধু “বরাদ্দ কম কি না”-এখানে আটকে থাকলে চলবে না। বরং দেখতে হবে, এই বরাদ্দের কত অংশ সরাসরি মাঠপর্যায়ের পুলিশিং, থানাসেবা, তদন্তের মান, প্রযুক্তি, যানবাহন, জনবল ব্যবস্থাপনা, সাইবার সক্ষমতা, ফরেনসিক সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ব্যবহার হচ্ছে। বাজেট, সক্ষমতা ও শান্তিপূর্ণতার সম্পর্ক

এখন আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তুলনায়-গ্লোবাল পিস ইনডেক্স ২০২৬। এটি একটি আন্তর্জাতিক সূচক, যা প্রতি বছর ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক্স অ্যান্ড পিস প্রকাশ করে। এই সূচকে বিশ্বের দেশগুলোকে তাদের শান্তিপূর্ণ পরিবেশের মাত্রা অনুযায়ী র‍্যাংক করা হয়। র‍্যাংকিং নির্ধারণে মোট ২৩টি সূচক ব্যবহার করা হয়, যা তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে-সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা (যেমন অপরাধের হার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা), চলমান সংঘাত (যেমন অভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক সংঘর্ষ) এবং সামরিকীকরণ (যেমন সামরিক ব্যয়, অস্ত্রের উপস্থিতি)। প্রতিটি সূচকের জন্য একটি স্কোর নির্ধারণ করা হয় এবং সবগুলো মিলিয়ে একটি সামগ্রিক স্কোর তৈরি হয়। যে দেশের স্কোর যত কম, দেশটি তত বেশি শান্তিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই তালিকায় ভুটানের অবস্থান সবচেয়ে ভালো-র‍্যাংক ১৬, স্কোর ১.৫৪। ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ৬৯, স্কোর ১.৯১। বাংলাদেশ ১১৭তম, স্কোর ২.২১। ভারত ১২৭তম, স্কোর ২.৪০। পাকিস্তান ১৫২তম, স্কোর ২.৯১। এই ক্রমটি থেকে বোঝা যায়, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা খাতে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও শান্তিপূর্ণতার ফলাফল শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরাদ্দ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে। পর্যাপ্ত বাজেট থাকলে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, যানবাহন, তদন্ত সরঞ্জাম, সাইবার সক্ষমতা, ফরেনসিক সহায়তা, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের সেবার মান উন্নত করা সম্ভব হয়। তাই আইনশৃঙ্খলা খাতে বিনিয়োগকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, বাজেটের অঙ্ক একা চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে না। ভুটান মোট অঙ্কে সবচেয়ে কম বরাদ্দ করলেও মোট বাজেটের অনুপাতে ল অ্যান্ড অর্ডার সেক্টরে উচ্চ বরাদ্দ রাখছে এবং জিপিআই-তেও তার অবস্থান এই তালিকায় সবচেয়ে ভালো। কিন্তু এই ফলের পেছনে বাজেটের পাশাপাশি দেশটির ছোট জনসংখ্যা, সামাজিক কাঠামো, প্রশাসনিক বাস্তবতা, অপরাধপ্রবণতার ধরন এবং সামগ্রিক শাসনব্যবস্থাও এতে ভূমিকা রেখেছে।

ইন্দোনেশিয়ার ন্যাশনাল পুলিশ বাজেট মোট বাজেটের তুলনায় উচ্চ-প্রায় ৩.৯২ শতাংশ। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দেশটি নিরাপত্তা সক্ষমতা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ করছে। তবে জিপিআই সূচকে দেশটির অবস্থান ৬৯তম হওয়া মনে করিয়ে দেয় যে, শান্তিপূর্ণতার সামগ্রিক অবস্থান নির্ভর করে মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতার ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পুলিশের বাজেট মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ২.৩২ শতাংশ। এই বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে তদন্তের মান, থানাভিত্তিক সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, ফরেনসিক সহায়তা এবং জনআস্থাভিত্তিক পুলিশিংয়ে বাস্তব উন্নতি আনা সম্ভব।

তাই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো-বাজেট কতটা দক্ষভাবে নিরাপত্তার ফলাফলে রূপান্তরিত হচ্ছে। সারকথা হলো, যথাযথ বাজেট অবশ্যই দরকার; কিন্তু সেই বাজেটকে সঠিক খাতে, সঠিক পরিকল্পনায় এবং জবাবদিহি মূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহার করতে হবে। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখায়, পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা খাতে বরাদ্দ একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সক্ষমতা তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে বাজেটের অঙ্ক একা কোনো দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিশ্চয়তা দেয় না। কার্যকর পুলিশিং নির্ভর করে সেই বরাদ্দ কতটা পরিকল্পিতভাবে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, তদন্ত সক্ষমতা, থানাসেবা, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। তাই বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা হলো-অনুমোদিত বাজেটকে জনসেবা, জনআস্থা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো।

সর্বাধিক পঠিত

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ