হোমপ্রবন্ধঅপরাধ বিশ্লেষণমব সহিংসতা ও মব জাস্টিস: একটি বহুমুখী পর্যালোচনা এবং নীতিগত প্রস্তাবনা

মব সহিংসতা ও মব জাস্টিস: একটি বহুমুখী পর্যালোচনা এবং নীতিগত প্রস্তাবনা

শরিফুল ইসলাম
,

বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য মব ভায়োলেন্স এবং মব জাস্টিস দুটি বড় আতঙ্কের কারণ। মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মব জাস্টিসের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ ছাড়াই একদল উত্তেজিত জনতা নিজেদের হাতে আইন তুলে নেয় এবং সন্দেহভাজন অপরাধীকে শারীরিক নির্যাতন অথবা হত্যা করে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের ঘটনা প্রায়ই গুজব বা মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতেই মব ভায়োলেন্স ও মব জাস্টিস একটি সভ্য সমাজের মৌলিক নীতি ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি একটি গুরুতর সামাজিক ও আইনি সমস্যা হিসেবে চিন্তার উদ্রেক করেছে। যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে আগে তার স্বরূপ জানতে হয়। মব ভায়োলেন্স ও মব জাস্টিসের ধারণাগত উৎস, এর পেছনের সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ, বাংলাদেশের আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থা, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, এই সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের সম্ভাব্য ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হলে তা একটি টেকসই সমাধান খুঁজে পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

 ঐতিহাসিক ও শব্দগত প্রেক্ষাপট: মবোক্রেসি থেকে মব জাস্টিস

মব জাস্টিস কোনো বিচ্ছিন্ন বা আধুনিক সামাজিক ব্যাধি নয়; বরং এর শেকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। এর মূল ধারণাটি উৎসারিত হয়েছে মব রুল বা অচলচ্রাসি থেকে, যা এমন এক ধরনের রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে বৈধভাবে কাউকে শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা ভূলুণ্ঠিত হয়। এই পরিস্থিতিতে উচ্ছৃঙ্খল জনতা তাদের দৃষ্টিতে অপরাধী ব্যক্তিকে কোনো যথাযথ আইনি বিচার ছাড়াই বেআইনিভাবে শাস্তি প্রদান করে। মব শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ মোবাইল ভুলগুস থেকে, যার অর্থ অস্থির বা চঞ্চল জনতা। ১৬৮০-এর দশকে যুক্তরাজ্যের গৌরবময় বিপ্লবের সময় এই শব্দটি প্রথম মব হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই শব্দগত উৎস থেকে একটি গভীর বিশ্লেষণ উঠে আসে-মব সহিংসতা সরলভাবে কেবল ক্রোধ বা আবেগের ফল নয়। বরং এটি এমন এক ধরনের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, যেখানে আইনসিদ্ধ কর্তৃপক্ষের প্রতি জনমানুষের আস্থা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়। যখন একটি রাষ্ট্র তার বিচার ও শাস্তি প্রদানের বৈধ ক্ষমতা হারাতে শুরু করে, তখন সমাজ নিজেই একটি বিকল্প, সহিংস বিচারব্যবস্থা তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে যে, মব জাস্টিস কেবল অপরাধ দমনের একটি ব্যর্থতা নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গভীর সংকটের প্রতিফলন। এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাই প্রকাশ করে না, বরং শাসনব্যবস্থার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কেন ব্যক্তি জনতা হয়ে ওঠে?

মব ভায়োলেন্সের নেপথ্যে শুধু সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণই নয়, কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবকও বিদ্যমান। এই ধরনের সহিংসতার অন্যতম প্রধান উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও মিথ্যা তথ্য। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগার মতো ভিত্তিহীন গুজব অথবা ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ সহজেই জনতাকে উসকে দিতে পারে এবং নিরপরাধ মানুষকে সহিংসতার শিকার করে তোলে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী গুস্তাভ লে বোঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, জনতার ভিড়ে ব্যক্তিসত্তা বিলুপ্ত হয়। যার ফলে ব্যক্তি তার নিজস্ব নৈতিকতা ও অপরাধ বোধ হারিয়ে ফেলে। এই সম্মিলিত মনোভাব দ্বারা তাড়িত হয়ে একজন ব্যক্তি এমন অপরাধে অংশ নিতে পারে, যা এককভাবে তার পক্ষে করা অসম্ভব। অধ্যাপক উইলিয়াম আইজ্যাক থমাস এই পরিস্থিতিকে একটি সাইকোপ্যাথ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা সমাজে বিচারহীনতা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে তৈরি হয়। এই মানসিক বিকৃতির কারণে গণপিটুনিসহ অন্যান্য ভয়াবহ অপরাধ অহরহ ঘটতে থাকে। এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনকে কেবল ব্যক্তিবিশেষের সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে। রাষ্ট্র যখন বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ভয়ভীতি ছড়ানোর মতো বেআইনি কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে অথবা সেগুলোয় নীরব সম্মতি দেয়, তখন সমাজের উন্মত্ত অংশটি এই আচরণকে বৈধ মনে করে। এই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা নীরব সম্মতিই জনতার মনে এই ধারণা জন্ম দেয় যে, আইন হাতে তুলে নেওয়া এক ধরনের ‘সামাজিক সংস্কার’ বা ‘পুণ্যের কাজ’। এই মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটই মব সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি, যা একটি দুষ্কৃতকারী চক্র তৈরি করে এবং সহিংসতাকে সমাজে এক ধরনের বৈধতা দেয়।

মব সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি: কারণ ও প্রভাবের আন্তঃসম্পর্ক

গণপিটুনির পেছনের কারণগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটি কার্যকারণ সম্পর্ক দ্বারা সংযুক্ত। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, যেমন আইন প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি, জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি গভীর অনাস্থা সৃষ্টি করে। এই আস্থাহীনতা থেকেই মানুষ নিজেদের হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি করে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুসংহত কাঠামো ভেঙে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ‘ফ্রি-ফ্লোটিং এজেন্ট অব ডিসঅর্ডার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই দুই পরিস্থিতির সঙ্গে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো মিথ্যা ও উসকানিমূলক গুজব (ট্রিগার) যোগ হয়, তখন সেটি সম্মিলিত ক্রোধ ও সহিংসতার জন্ম দেয়। এই অর্থে গণপিটুনি কেবলই একটি অপরাধ নয়, বরং একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ, যেখানে রাষ্ট্র তার বৈধ ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থ হচ্ছে এবং জনতা বিকল্প সহিংস বিচারব্যবস্থা তৈরি করছে। অনেক সময় মব সহিংসতা ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ, শত্রুতা ও প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দমন-পীড়নের মাধ্যম হিসেবেও মব ভায়োলেন্সকে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশের আইনি বিধান: অপ্রতুলতা ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে গণপিটুনিকে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে কোনো স্বতন্ত্র আইন নেই, যা এই অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরওজটিল করে তুলেছে। তবে প্রচলিত দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে গণপিটুনির বিচার করা সম্ভব। যেমন, দণ্ডবিধির ধারা ৩০২ (হত্যার জন্য শাস্তি), ৩০৪ (হত্যার সমতুল্য অপরাধের জন্য শাস্তি), ৩২৩ (স্বেচ্ছায় আঘাতের জন্য শাস্তি) ও ৩৩৫ (উসকানিতে গুরুতর আঘাতের জন্য শাস্তি) এই ধরনের অপরাধের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে। এছাড়া, ধারা ৩৪ অনুযায়ী গণপিটুনির ঘটনায় অংশগ্রহণকারী সকল ব্যক্তি সমানভাবে দায়ী থাকবেন। বাংলাদেশের সংবিধানও এই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট সুরক্ষা প্রদান করে। সংবিধানের ৩৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির আইনগত অধিকার (আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা) নিশ্চিত করা হয়েছে। মব জাস্টিস এই সাংবিধানিক অধিকারের একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে আইন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, আইনের আশ্রয় নেওয়ার এসব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও গণপিটুনির বিচার ও শাস্তি কার্যকরভাবে হয় না। এর অন্যতম কারণ হলো বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী ও ভিকটিমের নিরাপত্তার অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। এটি প্রমাণ করে যে, আইন প্রণয়নই একমাত্র সমাধান নয়। বরং আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেও উদ্যোগী হতে হবে।

বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৪ অনুযায়ী, গণপিটুনির ঘটনায় অংশগ্রহণকারী সকল ব্যক্তি সমানভাবে দায়ী থাকবেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন: জীবনের অধিকারের সুরক্ষা

মব জাস্টিস আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিশ্বজনীন ঘোষণাপত্র (ইউডিএইচআর) এবং বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (আইসিসিপিআর) অনুচ্ছেদ ৬-এর পরিপন্থী। আইসিসিপিআরের অনুচ্ছেদ ৬ অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষের জীবনের সহজাত অধিকার রয়েছে এবং এই অধিকার আইন দ্বারা সুরক্ষিত হবে। কোনো ব্যক্তির জীবনকে বেআইনিভাবে বা যথেচ্ছভাবে হরণ করা যাবে না, এমনকি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও নয়। জীবনের অধিকারকে একটি জুস্ কোযেন্স বা আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যতামূলক নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেহেতু মব জাস্টিস বৈধ বিচারিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যায়, সেহেতু এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই বিষয়টি একটি রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক ও আইনি বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে এবং এই সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে।

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও প্রতিরোধ কৌশল

গণপিটুনির সমস্যা কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের অনেক দেশেই একই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গণপিটুনি প্রতিরোধে একটি স্বতন্ত্র আইন দি ওয়েস্ট বেঙ্গল (প্রিভেনশন অফ লিনচিং) বিল, ২০১৯ প্রণয়ন করেছে, যেখানে দোষী ব্যক্তির জন্য মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই আইন বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী আইনি মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আফ্রিকায় ঘানা, নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোতেও মব জাস্টিস একটি গুরুতর সমস্যা। সেখানেও মূল কারণগুলো বাংলাদেশের মতোই-বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও পুলিশের প্রতি জনগণের অনাস্থা। এসব দেশে মব ভায়োলেন্স ও মব জাস্টিস প্রতিরোধে যেসব কৌশল অনুসরণ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা, গুজব প্রতিরোধে গণমাধ্যম ও সরকারের সমন্বিত প্রচার এবং অপরাধের জন্য কঠোর ও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা। এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর ও সমন্বিত কৌশল তৈরিতে সহায়তা করবে।

প্রতিরোধে করণীয়: পুলিশ ও অন্যান্য অংশীজনের ভূমিকা

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা (পুলিশ): গণপিটুনি রোধে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশকে অবশ্যই জনস্বার্থে কাজ করার জন্য পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, কারণ রাজনৈতিকীকরণ এবং আস্থার সংকটই মব সহিংসতার মূল কারণ। গুজব প্রতিরোধের জন্য পুলিশকে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এর উৎস চিহ্নিত করতে হবে। কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য।

বিচার বিভাগ ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা: মব জাস্টিসের মূল কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি ভেঙে ফেলার জন্য বিচার বিভাগকে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস করে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। গণপিটুনির ঘটনায় অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে, যা ভিকটিম ও তাঁদের পরিবারের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে।

অন্যান্য অংশীজনের ভূমিকা: মব সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, অন্যান্য অংশীজনেরও ভূমিকা রয়েছে। মিডিয়াকে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্যের বিপদ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। নাগরিক সমাজ গণপিটুনির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান পরিচালনা করতে পারে।
একই সঙ্গে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত বিচার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় ব্যাপক সংস্কার আনা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

শেষ কথা
মব সহিংসতা ও মব জাস্টিস একটি বহুমুখী সমস্যা, যার মূল কারণ হলো আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার গভীর সংকট এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই সংকট কেবল আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা নয়, বরং একটি ভঙ্গুর সামাজিক ব্যবস্থার লক্ষণ। এটি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত এবং বহুমাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

লেখক
প্রভাষক
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ