কুড়িগ্রাম জেলায় চাকরিকালীন একদিন আমার বড় মেয়েকে ডাক্তার দেখানোর জন্য সদরে গিয়েছিলাম। আমি তখন সহকারী পুলিশ সুপার, উলিপুর সার্কেল হিসেবে কর্মরত। উলিপুর থেকে সদরের দূরত্ব প্রায় ২০ কিমি।
উলিপুর থানা কম্পাউন্ডে আমার ডুপ্লেক্স অফিস-কাম-বাসা ছিল। আমার নতুন সংসারে এক বছরের একটি মাত্র মেয়ে। ঘরের ফার্নিচার বলতে একটি খাট, একটি টেবিল ও একটি আলনা ছিল। মেয়েটির আদর-যত্নের কমতি না থাকলেও ঘরে সোফা বা কার্পেট না থাকার কারণে তার ঠান্ডা লাগার কমতি ছিল না।
সারা দিন ঠান্ডা মেঝেতে হামাগুড়ি দেওয়ার পাশাপাশি এক পা, দুই পা করে হাঁটা এবং খেলা করার কারণে প্রায়ই সে ঠান্ডাজনিত অসুখে ভুগত। শীতকালে কুড়িগ্রামের আবহাওয়া খুব বৈরী আকার ধারণ করে। জেলাটি হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে প্রচণ্ড শীত পড়ে। এমনকি মাঝেমাঝে সপ্তাহখানেকের জন্য সূর্যের দেখা মেলে না।
মেয়েটির ঠান্ডাজনিত অসুখের কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। ডাক্তার সাহেব আমার এক ব্যাচমেটের আত্মীয়। সেই সুবাদে আমার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। এতদিনে আমরা তাকে পারিবারিক ডাক্তার হিসেবে মনে করা শুরু করেছি। তিনি একটি ক্লিনিকে চেম্বার করেন।
আমার মেয়েকে তাকে দেখিয়ে নিচতলায় এসে দাঁড়ালাম। বছর কুড়ির একজন সদ্যপ্রসূতিকে দেখতে পেলাম। খুব চিন্তিত মনে অসহায়ের মতো এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে তার ৩-৪ বছর বয়সী মেয়ে ও মাঝবয়সী মা। মায়ের কোলে তার ৫ দিন বয়সী একটি মেয়ে।
সন্ধ্যা পার হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়ছে। তাদের কারও গায়েই তেমন শীতবস্ত্র দেখলাম না। অনুমান করা যাচ্ছিল, তারা বেশ দরিদ্র পরিবারের। তাদের দেখেই আমার মনের মধ্যে বেশ খারাপ লাগা শুরু হয়েছে।
নিজ তাগিদেই কথা বলে জানতে পারলাম, প্রসূতির স্বামী একজন দিনমজুর। সহায়-সম্বল বলে তেমন কিছুই নেই। অন্যের বাড়িতে কৃষাণ দিয়েছে বিধায় সঙ্গে আসতে পারেনি। নবজাতককে ডাক্তার দেখানোর জন্য ভূরুঙ্গামারী থানার চর এলাকা থেকে গতকাল তারা সদরে এসেছে। গত রাতে তারা সরকারি হাসপাতালের কোনো একটি জায়গায় ঘুমিয়ে রাত পার করেছে। গোসল ও খাওয়ারও তেমন ব্যবস্থা হয়নি। সামান্য কিছু টাকা নিয়ে বের হয়েছিল। দুদিন খরচের পর ১৩০ টাকার মতো অবশিষ্ট আছে।
বয়স্ক মহিলাটির পরনে একটি কম দামি সুতি শাড়ি। রাতের বেলা তার বড় নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়েছিল। মেয়েটি রাতের বেলা প্রস্রাব করে আঁচল ভিজিয়ে দিলে মহিলাটি শাড়ির আরেক পাশ দিয়ে তাকে জড়িয়ে রাখে। এভাবে বেশ কয়েকবার প্রস্রাব করার কারণে মহিলাটির সম্পূর্ণ শাড়িটি ভিজে যায়। তাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো কাপড় না থাকায় শাড়িটি বদলাতে পারেনি। ভেজা শাড়িটি একসময় তার গায়েই শুকিয়ে যায়।
কাছে টাকা কম থাকায় সিরিয়ালম্যান নাকি রোগীর সিরিয়াল দিচ্ছে না। তারপরও তারা ডাক্তার দেখানোর আশায় দাঁড়িয়ে আছে।
বড় মেয়েটি তার নানির শাড়ি ধরে কান্না করেই চলেছে। হয়তোবা মেয়েটির রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। না হয় ক্ষুধার কারণে সে এমনটি করছে। ক্রমশ রাত বেড়ে যাচ্ছে, তাই আমরা উলিপুরের উদ্দেশে রওনা করলাম।
বাসায় ফিরে নিজের মধ্যে প্রচণ্ড অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল। মেয়েটিকে আর্থিক সাহায্য না করার অপরাধবোধ, মানবিকতা না দেখানোর যন্ত্রণা। আমার কাছে সে সময় যৎসামান্য টাকা ছিল। তারপরও আমি তাকে কিছু. দিয়ে সাহায্য করতে পারতাম। বাচ্চাদের জন্য অন্তত দুটো সোয়েটার, মহিলার জন্য একটি শাড়ি কিনে দিতে পারতাম। এমনকি ছোট বাচ্চাটাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য ফি-টা দিতে পারতাম।
আমি সেদিন তাদের জন্য কিছুই করিনি। বিবেকের অপরিপক্বতা নাকি বুঝতে না পারার কারণে সেদিন এমনটা করেছিলাম, তা আজও বের করতে পারিনি। কিছুদিন আগেও আমার মিসেসকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সেও আমার মতো এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।
তেরো-চৌদ্দ বছর আগের ঘটনা হলেও প্রায় সময়ই মনে পড়ে। এখন আমার বিবেক বলে, আমি সেদিন তাদের সাহায্য না করে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়েছিলাম। মাঝেমধ্যে অপরাধবোধটি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝরে এবং আমি কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ি।
আর কল্পনা করি, যদি আবার তাদের দেখা পেতাম, তাহলে সেদিনের অমানবিকতার প্রায়শ্চিত্ত করে নিজের বিবেককে শাণিত করে নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না।
লেখক
বিশেষ পুলিশ সুপার
সিআইডি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা

