বুধবার, জুন ৩, ২০২৬
33.4 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

লা সেন নদীর তীরে

দীন মোহাম্মদ
,

বিমান যখন প্যারিসের ওরলি বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল, তখন চারদিকে সোনারাঙা ঝকঝকে রোদ। ভেবেছিলাম, প্যারিস বলে কথা! মোনালিসার শহর। এয়ারপোর্ট হবে জাম্বো সাইজের কিছু একটা! খালি মানুষ যাচ্ছে আর আসছে। তেমন কিছু না। ছোট্ট একটা এয়ারপোর্ট। মানুষ বলতে আমাদের বিমানে যারা ছিলেন, তারাই বিভিন্ন ইমিগ্রেশন ডেস্কের লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

ইমিগ্রেশন অফিসার তীক্ষ্ণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘কমঁ তালে ভু? হাউ আর ইউ ডুইং?’
বলি, ‘জে ভি বিয়ান, মারসি। অফিসিও দো পুলিস দো ল’এনইউ।’ ইউএন আইডি দেখাই।
‘কুঁ আলে ভু জে সোজুরনে? হোয়ার আর ইউ গোয়িং টু স্টে?’
এই তো মুশকিল। আমরা উঠব কোথায়? সেনজেন ভিসা আবেদনের মন ভরে গেল। অবশেষে আমরা প্যারিসে পা রাখলাম। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ফ্রান্স হলো ছবির দেশ, কবিতার দেশ। আর প্যারিস হচ্ছে লুভরের শহর, মোনালিসার শহর, লা সেন নদীর শহর, আরও কত কী!

অদ্ভুত সুন্দর করে রাস্তা, ট্যাক্সিওয়ে, ওয়াকওয়ে তৈরি করা। ট্যাক্সির রাস্তা দিয়ে একটা একটা ট্যাক্সি আসছে, যাত্রী নিচ্ছে, চলে যাচ্ছে। এখানে যারা ট্যাক্সি নেবে তাদের সিরিয়াল, আবার ট্যাক্সিওয়ালাদেরও সিঙ্গেল ফাইলে সিরিয়াল। আমাদের দেশের মতো কেউ মওকা বুঝে সিরিয়াল ভাঙার চেষ্টা করছে না। গোটা ইউরোপীয় জাতটাই সিরিয়ালের খুব ভক্ত। টয়লেট থেকে শুরু করে ট্রেন স্টেশন, সবখানে সিরিয়াল।

এবার হলো আরেক সমস্যা। মামুনের ঠিকানা আমরা জানি, ইংলিশ দো প্যান্টিন বললেই হবে। এখন ড্রাইভাররা বলছে, ‘পা দ’আংলে, সোলেমঁ দ্যু ফ্রঁসে।’ নো ইংলিশ, অনলি ফ্রেঞ্চ!

জলিল মামুনের নম্বর বের করে রিং করল। মামুন বলে, কোনো সমস্যা নাই, মোবাইল ড্রাইভারকে দেন, আমি বিস্তারিত বলে দিচ্ছি।

কোনো সাদা চামড়ার পুরুষ-মহিলা ড্রাইভার মোবাইল নেবে না। কথাও বলবে না। আমাদের এক রকম হটিয়ে দিয়ে পরবর্তী যাত্রী নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ রাজি হয় না। মোবাইল থেকে কোনো রোগজীবাণু সংক্রমণ হবে? নাকি ভাবছে যে, এসব কালো-বাদামি এশিয়ান মুসলিমগুলো লাদেনের চেলা? এমনও হতে পারে যে, সিরিয়ালে ফ্রেশ যাত্রী থাকতে এসব ঝামেলা কী দরকার!

ডজনখানেক ড্রাইভার হাইকোর্ট দেখানোর পর ক্লান্তি-বিরক্তিতে যখন উদ্বিগ্ন হয়ে গেছি, তখন এক অ্যারাবিয়ান ড্রাইভার দেখে আশা জাগল। সে দয়া করে মোবাইল নিয়ে মামুনের সঙ্গে কথা বলে আমাদের গাড়িতে উঠতে বলল। জানা গেল, এই লোকটার নাম হাসান। বাড়ি মরক্কোর আগাদির। দশ-বারো বছর ধরে প্যারিসের রাস্তায় ড্রাইভারি করে। আমরা যতই শহরের দিকে যাচ্ছি, ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি। ছয়-আট লেনের রাস্তাগুলো কেউ কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না পর্যন্ত! কারও সঙ্গে কারও দেখা হওয়া তো দূরে থাক, যেখানে মোলাকাত হওয়ার কথা, সেখানে রাস্তা হয় আন্ডারপাস, নয়তো ওভারপাস দিয়ে চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হুঁশ করে পাহাড়ের তলা দিয়ে বানানো কোনো টানেলের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। রাস্তার দুপাশে পাইন, রেন, জলপাই গাছের সবুজ ঘন শামিয়ানার নিচ দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। নানা কিসিমের গাড়ি চলছে। হঠাৎ হঠাৎ দুই-একটা আঠারো-বিশ চাকার বিশালাকার দোতলা ভ্যানে দশ-বারোটা নতুন গাড়ি তুলে কোথায় যেন ছুটে চলেছে।

এয়ারপোর্ট থেকে ইংলিশ দো প্যান্তিন দশ-বারো কিলোমিটার রাস্তা। কোথাও কোনো সিগন্যাল নেই, কোথাও কোনো ক্রসিং নেই, কোনো জ্যাম নেই। মানুষ ঘড়ি ধরে মাইলেজ হিসাব করে যে কোনো স্থানে সময়মতো পৌঁছতে পারে।

আমরা মামুনকে চিনি না। জলিলের আত্মীয়। জলিল দূর থেকে তাকে চিনতে পেরে গাড়ি থামাল। ট্যাক্সি ভাড়া আর পরিচয় পর্ব সেরে পাশেই মামুনের ফ্ল্যাটে আসতেই রুমে ঢুকে মামুন ঘোষণা দিল, ‘সবাই টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে আসেন, আমি আপনাদের জন্য ইলিশ রান্না করেছি।’

সুদূর প্যারিসে বাংলার ইলিশ! আমাদের বিস্মিত চোখের দিকে তোয়াক্কা না করে কিচেনে আরও কী সব রান্নাবান্নায় মনোযোগ দিল। হাসান মামুনের রুমমেট। দুজন মিলে এ রুম ভাড়া করেছে। মাসে ভাড়া ছয়শ পঞ্চাশ ইউরো। বাংলাদেশের তুলনায় এক রুমের ভাড়া হিসেবে এটি অনেক। এ টাকায় ধানমন্ডি-গুলশানে গোটা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়া যায়। বেড ফেলার মতো রুমে জায়গা নেই। দুই পাশে দুইটা লোহার দোতলা খাট। ওপর-নিচে করে চারজন একসঙ্গে থাকা যাবে। একজন নিচের ফ্লোরে থাকতে হবে।

শুয়ে শুয়ে হাসানের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। যশোর বাড়ি। অভাব-অনটনের সংসার। ডিগ্রি পাস করে কোনো ভালো কাজ জুটাতে না পেরে ঠিক করল ইউরোপ যাবে। নিজের আর পরিবারের ভাগ্য ফেরাবে। সহায়-সম্বল, জমিজমা বিক্রি করে দালাল-সিন্ডিকেট মারফত ইউক্রেনের ভিজিট ভিসা জোগাড় হলো।

ঢাকা থেকে কিয়েভ যেতে-আসতে ভাড়া এক লাখের বেশি হওয়ার কথা না। টাকা দিতে হলো পাঁচ লাখ। কিয়েভের স্থানীয় দালাল তাকে বুঝে নিয়ে কোনো গভীর জঙ্গলে নিয়ে তুলল। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হলো। চোখের সামনে পাসপোর্ট ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলে দেওয়া হলো। বলা হলো, তোমার পাসপোর্ট হলো তোমার শত্রু। পাসপোর্ট না থাকলে তোমার দেশ নির্ধারণ করা যাবে না। তোমাকে জোর করে কেউ কোথাও পাঠাতে পারবে না।

দুই দিন দুই রাত বন, পাহাড়, পোকামাকড়, জীবজন্তু মোকাবিলা করে রাতের আঁধারে পোল্যান্ডের এক দালালের নিকট তুলে দেওয়া হলো। পোল্যান্ডে হলো আরেক বিপদ। দালাল নাকি কোনো অ্যাডভান্স পায়নি। তাকে মাথাপিছু পাঁচশ ডলার করে না দিলে মারবে ধরবে, যেতে দেবে না। মাটির নিচে দরজা-জানালা বন্ধ গুহার মধ্যে বন্দি করে রাখবে, পুলিশে দিয়ে দেবে। ভয় দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে জনপ্রতি দুইশ ডলারে রফা হয়ে গেল।

ঠিকমতো খাওয়া নেই, ঘুম নেই, গোসল নেই, মানবেতর জীবন। রাখা হলো গরু-ছাগলবোঝাই এক খামারবাড়িতে। দিনে একবার করে দুই টুকরো ব্রেড-পানি। তখন বসে বসে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করত। দেশে যদি সিএনজি রিকশা চালাত, তা-ও অনেক ভালো ছিল। এসব ভেবে আর লাভ নেই। ফিরে যাওয়ার আর উপায় নেই। তাছাড়া বাবা-মাকে নিঃস্ব করে সবকিছু বেচে পথে নেমে এসব নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই।

এক দিন শেষ রাতে চারজনকেই এক কাভার্ড ভ্যানে তোলা হলো। শাকসবজি, ফলমূল, মাছের কার্টনের মধ্যে ফলস কার্টন বা শর্ক অবজারভার হিসেবে মাঝে মাঝে তাদের সেট করল। হাত বেঁধে মুখে টেপ মেরে গুঁজে দেওয়া হলো, পথে যেন কোনো কথা বা শব্দ করতে না পারে।

শুরু হলো কষ্টের দীর্ঘযাত্রা। যতই সময় যায় ভ্যানের ভেতর অক্সিজেন কমতে থাকে; শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হাত-পা-মুখ মনে হয় আমার না। ঠিকমতো সাড়া দেয় না, সব অঙ্গ নষ্ট, অকেজো হয়ে যাচ্ছে। বাঁচার আর পথ নেই। বাবা-মার মুখ খালি মনে পড়ে। দেশে এই টাকা দিয়ে কোনো পোলট্রি, মুরগি বা গরুর ফার্ম দিলে কত ভালো হতো। এভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে বেঘোরে প্রাণটা যেত না। মারা গেলে লাশও বাংলাদেশে পৌঁছবে না। পাসপোর্ট, সকল কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। বেওয়ারিশ হিসেবে কোনো অজানা স্থানে দাফন করে দেওয়া হবে! দাফন না-ও জুটতে পারে।

এক রাত এক দিন পরে কে যেন ঝুঁকে মাথায় পানি ঢালছে। আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরে এল। আরও দুজন টিকে গেছে। বাকি দুজন রাস্তায় মারা গেছে। পুলিশি হাঙ্গামার ভয়ে তাদের রাস্তার পাশে এক গভীর গিরিখাদে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পোকামাকড় আর শেয়াল-কুকুরের খাবার হয়ে নিখোঁজের তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

সারা জীবন তাদের পরিবারের লোকজন কান পেতে বসে থাকবে। জানবে না, তাদের কলিজার টুকরো আর কখনো ফিরে আসবে না। কেউ কারও পরিচয় জানে না। কেউ কারও বাড়িতে কোনো খবর দিতে পারবে না। এ রকমই কড়া নিয়ম।

বন-জঙ্গলে ঝুলতে ঝুলতে আসতে হয়। এমন নিয়মকানুন মেনে ইউরোপে আসা নাকি টারজান ভিসা! হাসান অবশ্য এখন বেশ ভালো অবস্থায় আছে। ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টে মামলা করে বসবাসের অধিকার পেয়েছিল। এখন তার ফ্রান্সের পিআর আছে। একটা পাঁচতারা হোটেলে শেফ হিসেবে কাজ করে। মাসিক বেতন প্রায় চার হাজার ইউরো। তিন মাস পরপর দেশে যায়। গত মাসে বিয়ে করে এসেছে। দুপুর আর বিকালের মালাবদলের সময় আমরা বাসা থেকে বের হলাম। ফুটপাত ধরে কয়েক গজ হাঁটতে হবে। ফুটপাতে কোনো হকার নেই। এই শেষ দুপুরে রাস্তাও প্রায় ফাঁকা। দৈবাৎ দুই-একটা গাড়ি হুট করে চলে যাচ্ছে, আবার নিস্তব্ধতা। আমাদের জুতো-স্যান্ডেলের শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই।

ফুটপাতগুলো কোনো দামি শপিংমলের পার্কিং চত্বরের মতো পুরু টাইলস দিয়ে ঘাটে ঘাটে থরে থরে সাজানো। পাশাপাশি ওয়াকওয়ে আর সাইকেলওয়ে। কংক্রিটের সাইকেল রাস্তাগুলোও যথেষ্ট চওড়া। চার-পাঁচটা সাইকেল অনায়াসে পাশাপাশি চলতে পারবে। এত লম্বা দীর্ঘ সাইকেল রাস্তায় কোথাও কোনো সাইকেলচালক নেই। এ দেশে মানুষের সংখ্যা কি এত কম? আমাদের তো হাটে-ঘাটে-মাঠে সবখানে মানুষ গিজগিজ করে। কে কাকে ধাক্কা দিয়ে আগে যাবে, সেই ধান্ধায় তক্কে তক্কে থাকে।

ফুটপাতের এক কোণায় অনেকটা আন্ডারপাসের সিঁড়ির মতো মেট্রো সাইনবোর্ড আর স্টেশনের নাম লেখা দেখে বোঝা যাচ্ছে, এটা বিখ্যাত প্যারিস মেট্রোর আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন। এটি মস্কোর পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ব্যস্ততম মেট্রো নেটওয়ার্ক। মোট ষোলোটি মেট্রো লাইনের ২০০ কিলোমিটার রাস্তা। মোট স্টেশনের সংখ্যা তিনশর মতো। বেশিরভাগ স্টেশনের নামকরণ করা হয়েছে স্ট্রিট বা স্কোয়ারের নামে।

প্যারিস শহরে ১৩টি ট্রাম লাইন, এয়ারপোর্ট শাটল, সাব-আরবান রেল, শহরতলি এলাকার জন্য ৫টি পিইআর লাইন এবং শহর এলাকার জন্য আছে মেট্রো লাইন। মেট্রো লাইনের ওপরই প্যারিসবাসীর আস্থা বেশি। ২০০৭ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, প্যারিস মেট্রোতে প্রতিদিন অনুমান পঁয়তাল্লিশ লাখ মানুষ যাতায়াত করে থাকেন।

মামুনের ইশারায় আমরা পাতালপুরির রাস্তা দিয়ে রাজকন্যা উদ্ধারে যাচ্ছি। যত নিচে নামি ঝকঝকে আলো, দেয়ালভর্তি বাহারি অ্যাড, প্রচুর বাতাসে বোঝাই যায় না পাতালপুরি যাচ্ছি। সিঁড়ি, দেয়াল, ফ্লোরের সব মার্বেল পাথর আর দামি টাইলস। প্রয়োজনে নিজের মুখ দেখে চুল ঠিক করে নেওয়া যায়।

আমার গদগদ ভাব দেখে কিনা জানি না, মজিদ খেই খেই করে ওঠে, ‘সারাজীবন গাঁও-গ্রামে সাইকেলের প্যাডেল মেরে আর হাঁটু কাদা ছেনে বড় হয়েছো তো, এ জন্য একটু বিস্ময় তো লাগবেই! শহরে এসে পিচের রাস্তা দেখে বাড়ি গিয়ে পাকা রাস্তার স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গিয়েছো। এ জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড সিঁড়ি-প্যাসেজ দেখে এত নকরা!’

নকরা কী করলাম? আর কী অন্যায় করলাম। এভাবে অপমান? আমার মনে হয় রাগ করা উচিত। এই সুন্দর পরিবেশে রাগ করব না বলে মনস্থির করেছি।মামুন মেশিনে কার্ড ঢুকিয়ে আমাদের পাঁচটা করে কার্ড কিনে দিল। প্রতি কার্ড দুই ইউরো করে। এই ছোট, এক ইঞ্চি বাই দুই ইঞ্চি সাইজের শক্ত কাগজের টিকিট দিয়ে বাস, ট্রাম, মেট্রোতে যে কোনো এক ধরনের যানবাহনে একক জার্নি করা যায়। একবার যে কোনো স্টেশনে নেমে যাত্রা শেষ না হওয়া পর্যন্ত যতবার ইচ্ছা মেট্রো ট্রেন পরিবর্তন করা যায়। নির্দিষ্ট কোনো স্টেশন বা চাইলে যে স্টেশনে শুরু করেছি, সেখানেও ফিরে আসা যাবে। স্টেশন থেকে ওপরে sortie বা এক্সিট দিয়ে বের হয়ে আসলে আর স্টেশনে নামা যাবে না। সুন্দর সিস্টেম!

মামুন টেনে আমাদের ওয়ালম্যাপের নিকট নিয়ে গেল। বলল, ‘প্যারিস মেট্রোতে চলাফেরা খুব সহজ। আপনাদের একবার দেখিয়ে দিলেই বুঝে যাবেন। ম্যাপে দেখলাম, প্যারিসের সকল স্টেশনের অবস্থান দেখানো আছে। প্রথমে দেখবেন, আপনি কোন স্টেশনে আছেন। সেটা খুঁজে বের করেন। এরপর দেখবেন, আপনি যাবেন কোথায়। সেটা খুঁজে বের করেন। এখন দুইটা স্থানকে কোন কোন লাইন কানেক্ট করেছে, সেটা বের করেন। যদি একই লাইনের স্টেশন দুইটি হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। সংশ্লিষ্ট ট্রেনে উঠলেই হলো। আর যদি ভিন্ন ভিন্ন লাইন পরিবর্তন করে যেতে হয়, তাহলে দেখেন, আপনাকে কোথায় নেমে লাইন চেঞ্জ করতে হবে। ট্রেন পরিবর্তন করে কত নম্বর লাইনের ট্রেন ধরতে হবে। আর প্রত্যেক স্টেশনে তো অ্যারো দিয়ে আপনাকে গাইড করবে, আপনার লাইনের ট্রেন কোন ফ্লোর থেকে ছাড়বে। স্টেশনে নেমে দেখবেন দশ মিনিট পরপর ট্রেন।’

আমরা এখন আছি এগ্লিজ দো প্যনতিনে। আর আইফেল টাওয়ার যেতে আমাদের নামতে হবে বীর হাকেইম।রুট বুঝিয়ে দিয়ে মামুন তার কাজের রেস্টুরেন্টে চলে গেল। আমরা এন্ট্রি গেটগুলোর সামনে এসে হাতলে একটা করে টিকিট দিলে চার-পাঁচটা দাগ দিয়ে অন্য মাথা থেকে বের করে দেয়। রোলিং বারগুলো ঠেলে এখন মাত্র একবার ভেতরে ঢোকা যাবে। আর টিকিট চেকিং হাতলের ভদ্রতাজ্ঞান দেখে অবাক হতে হয়। টিকিটটাকে নিজের হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে সিল-ছাপ্পড় মেরে বের করে দেয় না। একটু বাঁধানো থাকবে, যাতে যাত্রী সেটা অন্য মাথা থেকে সংগ্রহ করে নিতে পারেন। নিচে পড়ে যেন যাত্রীর কষ্ট না হয়!

স্টেশনে নেমে মনে হলো, এখানে দিনরাতের পার্থক্য ঘুচে গেছে। চারদিকে পরিষ্কার ঝকঝকে আলো। আমার চোখ আটকে গেল স্টেশনের মাঝামাঝি দেয়াল ঘেঁষা এক দোকানের দিকে। পাশাপাশি দুইটা বড় ফ্রিজের সাইজে কাচে মোড়া শোকেস। জুস, মিনারেল, চকলেট, ব্রেডজাতীয় খাবারে ঠাসা। প্রত্যেক আইটেমের গায়ে একটা করে কোড দেওয়া আছে। দাম কত, তা-ও লেখা আছে। পয়সা ফেলে কোড নম্বর টিপে দিলে হুড়মুড় করে ভেতরে নানা কর্মযন্ত্র হবে। শেষে নিচ দিয়ে ক্রয় করা দ্রব্য বের হয়ে আসবে। যদি কিছু পয়সা ফেরত পাওয়ার থাকে, তা-ও ঝনঝন করে বের হয়ে দাঁত খিঁচিয়ে হাসবে।

জলিল বলে, ‘দেখেছেন, এই যন্ত্র বেটা কতজনের ভাত মেরেছে। হরদম বেচাবিক্রি করে যাচ্ছে। দুই-চারটে ফাস্টফুড-জাতীয় দোকান থাকলে কতজনের কর্মসংস্থান হতো? আমাদের রেলস্টেশনের চিপার মধ্যে বসে দিব্যি লোকজন ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছে। ট্রেনলাইনের আশপাশেও কোনো ময়লা-আবর্জনা নেই। কোনো পানের পিক, গুলের দাগ, সিগারেটের বাঁট না থাকলে কেমন খালি খালি লাগে। নিদেনপক্ষে কিছু ছেঁড়া কাগজ তো থাকতেই হয়!

ট্রেনলাইনের কালো অন্ধকার গহ্বর থেকে হুড়মুড় করে টনটন বাতাস মাথায় করে এনে স্টেশনে ফেলে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে দাঁড়াল। ট্রেন থেমে গেলে সকল দরজা অটো খুলে গেল।

সামনের বগিতে ঝটপট উঠে দেখি লোকজনের প্রচুর চাপ। জলিল আর মজিদকে দেখা যাচ্ছে না। মুহূর্তের মধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিল। দেখি, প্ল্যাটফর্মে তারা দাঁড়িয়ে আছে। ভিড়ের কারণে উঠতে পারেনি, নাকি মজা দেখার জন্য আমাকে মই দিয়ে গাছে উঠিয়ে মই সরিয়ে দিল? যদি তা-ই হয়, তবে এটা কেমন মশকরা! এই প্যারিস শহরের নাড়ি-নক্ষত্র কি আমরা কিছু চিনি? হারিয়ে কোন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব, তার ঠিক আছে? বেড়ানোর আনন্দই তখন মাটি হয়ে যাবে।

অথবা সত্যি হয়তো তারা ভিড়ের কারণে ট্রেনে উঠতে পারেনি। এখন কী করা যায়? ভাবতে ভাবতেই বগির ভেতরে সাউন্ড সিস্টেমে পরবর্তী স্টেশনের নাম বলা হলো, হচি। ট্রেন থামতেই নেমে পড়লাম। ওরা আসলে নিশ্চয়ই এ স্টেশনে আমাকে দেখে নেমে যাবে। ট্রেনের কাচের গ্লাসের দেয়াল ভেদ করে দিব্যি সারা স্টেশন দেখা যায়। আমি আর একটু সুবিধাজনক স্থানে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওরা এলে একসঙ্গে আবার যাত্রা করলাম।

বীর হাকেইম স্টেশনে নেমে পাতালপুরি ভেদ করে যখন মর্তে আবির্ভূত হলাম, তখন চারদিকে ঝকঝকে বিকাল। পাশেই সেন নদীতে ট্যুরিস্ট লঞ্চের হইহুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। চারপাশে প্লেইন, হর্স চেস্টনাট, সপোরা, ম্যাপল গাছের ঘন জমাট আলোছায়া। গাছের আঁচল বিছানো মোসে দো ক্যুই ব্রানলি ধরে সোজা তাকালে চোখে পড়ে, নিঃশব্দে ঠায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আইফেল টাওয়ার!

হাঁটতে হাঁটতে আইফেল টাওয়ারের সামনে সেন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে প্রথমে মনে হলো, এই বিরাট লোহা-লক্কড়ের জাল এখনই মাথার ওপর ভেঙে পড়বে না তো? ভেঙে পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ১৮৮৭-৮৯, দুই বছর ধরে গুসতাভ আইফেল ১,০৬৩ ফিট উচ্চতার এই আইরন টাওয়ার তৈরি করেছিলেন। একাশি তলা ভবনের সমান উঁচু।

সেন নদীর বহু পানি গড়িয়ে ইংলিশ চ্যানেলে পড়েছে। চার পায়ে দাঁড়িয়ে প্যারিস শহরের নানা উত্থান-পতন সহ্য করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে জার্মানরা প্যারিস দখল করে নেয়। একটানা চার বছর ধরে চলে জার্মান শাসন। ১৯৪০ সালে জার্মানরা মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হয়ে পিছু হটার সময় অ্যাডলফ হিটলার তার জেনারেল ডায়েটরিখ ফন চোলটিটজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্যারিস শহরের সব মন্যুমেন্ট ধ্বংস করে দাও। সে যাত্রায় আইফেল টাওয়ার নাটকীয়ভাবে টিকে যায়।

টাওয়ারের নিচে এ মুহূর্তে মানুষ গিজগিজ করছে। কত কিসিমের মানুষ! দুনিয়ার হেন প্রান্ত নেই, যেখান থেকে দুই-একজন আসেনি। দূর থেকে মনে হবে লোকজনের জটলা। কাছে এলে দেখা যাবে, সবাই আসলে লাইনে আছে। হলুদ ফিতা দিয়ে এস-এর মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এমনভাবে চ্যানেলের লাইন তৈরি করা হয়েছে যে, অল্প স্থানে অল্প হাঁটা দূরত্বে অনেক মানুষকে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষমাণ রাখা যাবে।

লাইনের শেষ মাথায় দাঁড়ালাম। সোজা মাথা বরাবর টাওয়ার। ওপরে তাকালে নানা রকম লোহার পাতযুক্ত শরীরের ঢেউ চোখে পড়ে। দূর থেকে মনে হবে টাওয়ারের পা মনে হয় দুইটা, আসলে চারটা। এতে দশ হাজার টনের লোহা-লক্কড়ের ভারকেন্দ্র নিচের দিকে রেখে কাঠামোকে সুস্থির রাখা সম্ভব হয়েছে।

পায়ের ভেতর দিয়ে ঘোরানো ছোট ছোট সিঁড়ি রাখা হয়েছে। এ সিঁড়ি দিয়ে তিনতলা পর্যন্ত ওঠা যায়। চতুর্থ তলায় উঠতে হলে লিফট ছাড়া গতি নেই। লিফট ব্যবহার করে মানুষ এখন হরদম ওঠানামা করছে।

১৯৪০ সালে জার্মান বাহিনী প্যারিস দখল করলে ফ্রেঞ্চরা লিফট কেবল কেটে দিয়েছিল। অ্যাডলফ হিটলারের লোকজন সিঁড়ি দিয়ে শীর্ষে উঠতে পারেনি। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে ওটা আর ঠিক করা যায়নি। টিকিটের লাইন খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। হাতের ডানদিকের সারিটা সামনে, বাঁদিকের সারিটা আমাদের পেছনে। আইফেল টাওয়ারের মতো যাত্রী কিউও জটিলতায় ভরা। টাওয়ারের নিচ থেকে কেউ বুঝবে না যে, টাওয়ারের উত্তর পাশ দিয়ে হরদম যাত্রী ওঠানামা করছে।

টাওয়ারের বিভিন্ন ফ্লোরে হাজার হাজার মানুষ ঘোরাফেরা করছে। দ্বিতীয় তলায় আস্ত একটা রেস্টুরেন্ট ‘অ্যালটিটিউড ৯৫’, তৃতীয় তলায় রেস্টুরেন্ট ‘জুলেস ভার্ন’ প্রচুর কাস্টমার জুটিয়ে সার্বক্ষণিক চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। রেস্টুরেন্টে ওঠার জন্য তাদের আলাদা লিফটেরও বন্দোবস্ত করা আছে।

ডান পাশের সামনের লাইনে থাকা ষাটোর্ধ্ব এক প্রৌঢ়া, বেঁটে-মোটা তামাটে মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন, ‘আর ইউ কলম্বিয়ান?’
ও, মরণ জ্বালা! আমি কলম্বিয়ান হতে যাব কেন? দক্ষিণ আমেরিকার লোকজন তো সবাই সাদা। আমি তো সাদা না। এশিয়ান। বাদামি চামড়ার ভেতো বাংলাদেশি। রাতে ভাত না খেলে ভালো ঘুম হয় না!

বললাম, ‘না, না, বাংলাদেশ।’
‘ও বাংলাদেশ, ইটস ইন ইন্ডিয়া। আই নো।’
তুমি আমার কচু জানো। বাংলাদেশ একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লাল-সবুজ পতাকা। আমি আর জবাব দিলাম না।

কাউন্টার থেকে টিকিট কাটলাম। বিভিন্ন ফ্লোরে চড়ার জন্য বিভিন্ন ভাগ। সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠার জন্য টিকিট মূল্য তেরো ইউরো। তেরো ইউরো দিয়ে টিকিট কেটে পরবর্তী কক্ষে প্রবেশ করলাম।

এখানে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে ওয়েস্ট ব্যাগ ভালো করে তল্লাশি করা হলো। আর্চওয়ে বসানো আছে। শরীরের কোনো গোপন কুঠুরিতে কোনো আয়রন স্প্লিন্টার আছে কি না, দেখা হচ্ছে।

একটা লিফলেটে আইফেল টাওয়ারের গোটা ইতিহাস লেখা আছে। আইফেল সাহেব এই টাওয়ারটি স্পেনের পূর্বাঞ্চলীয় ভূমধ্যসাগরীয় তীরবর্তী সুন্দর শহর বার্সেলোনাতে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। ১৮৮৮ সালের বার্সেলোনাতে অনুষ্ঠিত বিশ্বমেলাকে সামনে রেখে তিনি এ ডিজাইন করেছিলেন। কিন্তু বার্সেলোনা সিটি কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল, এই টাওয়ারের ডিজাইন অদ্ভুত, ব্যয়বহুল এবং শহরের নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইফেল সাহেব হাল ছাড়লেন না। স্বপ্নকে কীভাবে বন্দরে নোঙর করাতে হয়, তা তিনি জানতেন। প্রস্তাব করলেন, ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় বিশ্বমেলার প্রবেশপথে নির্মাণ করা হোক। প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো।

তিনশ শ্রমিক প্রায় ১৮ হাজার বিশুদ্ধ বড় অর্থাৎ পাডেল রড দিয়ে দুই বছর নিরলস পরিশ্রম করে এটি তৈরি করেন। ১,০৬৩ ফিট উঁচু টাওয়ারটি ১৮৮৯ সালের মার্চ মাসে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে চালু করা হয়।

নির্মাণের পর অনেক সমালোচনা, কটূক্তি টাওয়ারটি ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে ঠায় মাথা পেতে নিয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, এটা একটা লোহা-লক্কড়ের জঞ্জাল। কেউ বলেছেন, এটা দেখলে চোখ জ্বালা করে। শিল্পী-সাহিত্যিক সমাজ থেকে তীব্র সমালোচনা করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করা হয়েছে।

ঔপন্যাসিক গি দ্য মোপাসাঁ প্রায় প্রতিদিন টাওয়ার রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে যেতেন। একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন যান? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, এটাই প্যারিসের একমাত্র জায়গা, যেখান থেকে কেউ আইফেল টাওয়ার দেখতে পারবে না। তার মতো অনেকেই এটিকে ঘৃণা করতেন।

কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, আইফেল টাওয়ার পরবর্তী বিশ বছর টিকে থাকবে। ১৯০৯ সালে ভেঙে ফেলা হবে। কিন্তু যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এটি আর কখনো ভাঙা হয়নি। বর্তমানে রেডিও, টেলিভিশন সম্প্রচার ও যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্যটক আকর্ষণ করা মন্যুমেন্টের স্থান দখল করে নিয়েছে।

টাওয়ারের পাবলিক লিফট এত লোড নিয়ে পরিবর্তনশীল অ্যাঙ্গেলে, ঠায় ভার্টিক্যালি দাঁড়িয়ে, যাত্রীদের কোনো আঁচ লাগতে দেয় না। লিফট কোম্পানিকে যথেষ্ট ইঞ্জিনিয়ারিং নৈপুণ্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার যথেষ্ট জায়গা নিয়ে চারপাশে রেলিংঘেরা করিডোর দিয়ে ঘুরে ঘুরে প্যারিস শহরের সঙ্গে সখ্য গড়ে নেওয়া যায়। চতুর্থ তলায় শুধুমাত্র লম্বা খাড়া লিফট দিয়ে ওঠা যায়। লিফটে ওঠার সময় একটু ভয় ভয় লাগবে। এই সব লোহা-লক্কড় ভেঙে সবকিছু নিয়ে পড়বে না তো? এই ফ্লোরে ফ্লোরে রেস্টুরেন্ট, এত লোকজনের সমাগম, পদচারণা, দুনিয়ার তাবৎ ভাষার মিষ্টি হাস্য, ঠাট্টা-মশকরা বাইরে থেকে, নিচে থেকে, দূর থেকে কোনো মালুমই করা যায় না!

চতুর্থ তলায় মিউজিয়াম কক্ষ। আইফেল সাহেবের নানা ব্যক্তিগত দ্রব্যাদি, পুরোনো হাইড্রোলিক লিফট, ছবি, ভাস্কর্য, গ্লাসঘেরা কক্ষে সাজানো আছে। চারপাশে রেলিংঘেরা চত্বরে অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ দূরবীন দিয়ে প্যারিস শহরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখার জন্য হিড়িক লেগে গেছে।

সাদা চোখেই গোটা প্যারিস শহর দেখা যাবে। অক্ষ ধরে ধরে লম্বা রশ্মি-স্কেল দিয়ে দাগ টেনে টেনে রাস্তা আর বাড়িঘরগুলোকে বসানো হয়েছে। রাস্তার প্রস্থ অনুসারে বিল্ডিংয়ের উচ্চতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এক এলাকার বাড়িঘরগুলো সব একই প্যাটার্নের। কোথাও গথিক, রোমানো-বাইজান্টাইন, নিও-ক্ল্যাসিসিজম, নিও-বারোক প্যাটার্নের স্থাপত্য স্টাইল ব্যবহার করে ম্যাচের বাক্সের মতো থরে থরে সাজানো। দূরে আধুনিক সুউচ্চ সব বিল্ডিং নিয়ে গড়ে উঠেছে বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট লা ডিফেন্স শহর। শহরতলি এলাকার সবকিছু দেখা যায়। ছাদের ডিসপ্লে বোর্ডে দুনিয়ার তাবৎ রাজধানী শহরের নাম ও আকাশপথের দূরত্ব লেখা আছে। ঢাকার নামটা দেখে ভালো লাগল।

টাওয়ারের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে চ্যাম্প দ্য মার্সের ঘন সবুজ ঘাসের বিশাল চত্বর। প্যারিস শহরের সবচেয়ে বড় সবুজ মাঠের আয়োজন এখানে। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি, কপোত-কপোতি, ছেলে-বুড়ো সবুজ আঁচলে শুয়ে-বসে-হেলে জীবনের সেরা বিকালটা উপভোগ করে নিচ্ছেন।

আরও কিছুটা দূরে ইকোলে মিলিটায়ার, অর্থাৎ মিলিটারি স্কুল। আর দূরে ঝাপসা মন্টপারনাস টাওয়ার। দুই টাওয়ারের মধ্যবর্তী গোটা চত্বরকে মনে হয় বড় কোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে। অনায়াসে এখানে বিমান ল্যান্ড করতে পারবে। ১৭৮৩ সালের ২৭ আগস্ট এখানেই জ্যাক চার্লস ও রবার্ট ভ্রাতৃদ্বয় বিশ্বে প্রথম হাইড্রোজেন বেলুন উড়িয়েছিলেন।

রোমানরা চ্যাম্প দ্য মার্স পার্কের গোড়াপত্তন করেছিলেন। নাম রেখেছিলেন ক্যাম্পাস মার্টিয়াস, রোমান ভাষায় যার অর্থ হলো মার্স ফিল্ড, অর্থাৎ রোমানদের যুদ্ধদেবতা মার্সের নামে নামকরণ করা হয়। সৈনিকরা এটি ড্রিলিং এবং মার্চিং গ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন।

রোমানরা এ শহর প্রায় চারশ বছর শাসন করেছেন, খ্রিস্টপূর্ব ৫২ থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দে জার্মানদের নিকট পরাজিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। এরপর ইংলিশ, রাশিয়ান, আবার জার্মানরা হানা দেয়। প্রতিবার জার্মান শাসনের সময় প্যারিসের উন্নতি থমকে গেছে। এ সবুজ চত্বর প্যারিসের বহু উত্থান-পতন বুক পেতে বরণ করে নিয়েছে।

সূর্য দিনের ধুলো-ময়লা ঝেড়ে ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দূরে লা ডিফেন্সে লাল রশ্মির ভাঙা টুকরোগুলো গ্লাস আর ইতালিয়ান মার্বেল পাথরের বিল্ডিংয়ে ঝরে গলে ফোঁটা ফোঁটা নিচে পড়ছে। আরও নিচে আমাদের পা বরাবর সেন নদীতে কোনো এক পর্যটক লঞ্চের সারেং পুকপুক করে দুইবার হর্ন দিয়ে কিসের সিগন্যাল দিলেন? ভেঁপুর শব্দ নদীর মজবুত বাঁধানো পাড়ে বাড়ি খেয়ে সামান্যই আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাল। লা সেন নদী আর কত সহ্য করে যাবে!

সারেং কী ঘোষণা করে দিলেন, আজকের এই সোনাঝরা মেদুর দিনটিও তলিয়ে যাচ্ছে মহাকালের অতল গর্ভে? কাল যে আলো ফুটবে, তারই-বা নিশ্চয়তা কী?

লেখক
কমান্ড্যান্ট (অ্যাডিশনাল ডিআইজি)
আরআরএফ, রাজশাহী

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ