আমার দেশের বাইরে যাওয়ার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলছি। শান্তি পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, পবিত্র একটি দেশ দিয়েই আমার এই যাত্রা শুরু হচ্ছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সেই পবিত্র মক্কা নগরী পর্যন্ত, পুরো পথটিই আমার কাছে ছিল অন্য রকম এক অনুভূতির।
আমার দেশ আমার কাছে অনেক পবিত্র। তবে হুজুরে পাক (সা.)-এর পুণ্যভূমি আমার কাছে আরও বেশি পবিত্র। আকাশে উড্ডয়ন থেকে শুরু করে সেখানে অবতরণ পর্যন্ত পুরো সময়টা কেটেছিল ধুকপুক করে । সে বছর প্রথম সরকারি হজ ফ্লাইটের দুদিন আগে আমরা বাংলাদেশ হজ অফিসে পৌঁছাই। যেহেতু বিমান মিকাত অতিক্রম করবে, তাই বিমানেই দুই রাকাত সালাত আদায় করে এহরাম বেঁধে নিলাম।
বিমান উড়তে উড়তে একসময় মেঘের সমুদ্রে পৌঁছে গেল। চারদিকে সাদা মেঘের ঢেউ। সেই অপার্থিব দৃশ্য দেখে মন যেন অজানার পথে হারিয়ে যাচ্ছিল। সৃষ্টির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখে বারবার মনে হচ্ছিল, যিনি এই আসমান সৃষ্টি করেছেন, তাঁর ঘর না জানি কতই না সুন্দর!
মেঘে মেঘে বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। এরপর মেঘের রাজ্যে রাত নামল। ডিমলাইটের মতো মৃদু আলোয় আলোকিত আকাশে বিমান ছুটছিল পাখির মতো।
গভীর থেকে গভীরতর আবেগ নিয়ে রাতের অন্ধকারে ওপর থেকে দেখলাম ঝলমলে বেলোয়ারি ঝালরে সাজানো জেদ্দার ব্যস্ততম বন্দর, কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। চোখ দুটি নিজের অজান্তেই বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ধীরে ধীরে দম নিয়ে সৌন্দর্যময় রজনী অবলোকন করলাম।
ঝাঁকুনি দিয়ে উড়োজাহাজ জেদ্দার মাটিতে অবতরণ করল। ছোট ব্যাকপ্যাক নিয়ে ধীরে-সুস্থে নেমে গেলাম। ইমিগ্রেশন শেষে সেখান থেকে বাস আমাদের নিয়ে গেল কনভেয়ার বেল্টের কক্ষে। নিজের লাগেজ দুটো বুঝে নেওয়ার পর বাস আমাকে নামিয়ে দিল হোটেল মরগ্যানে।
ক্লান্ত হলেও আমি মধ্যরাতেই বের হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু অচেনা শহর হওয়ায় রাতে আর বের হলাম না। পরদিন বেলা হলে বের হলাম পবিত্র কাবাঘরের উদ্দেশে।
অন্য রকম এক আবেগ কাজ করছিল আমার ভেতরে। মহান আল্লাহ আমাকে এই পবিত্র নগরীতে নিয়ে এসেছেন, যেখানে প্রিয় নবী বড় হয়েছেন। যে নগরীতে প্রথম পবিত্র কুরআনের আয়াত নাজিল হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার কথা ভেবে বিস্মিত হচ্ছিলাম। তবু নিজেকে শান্ত রাখছিলাম।
মিশফালা ব্রিজ কুবরি থেকে সোজা কাবা শরীফের দিকে হাঁটতে লাগলাম। কেউ একজন বলল, পাঁচ মিনিট হাঁটলেই কাবাঘর। কিন্তু সেই তথ্য ভুল প্রমাণ হলো। আরও কমপক্ষে বারো মিনিট হাঁটলাম।
গেট ৭৯ দিয়ে প্রবেশ করতেই কালো মখমলের ওপর সোনালি কারুকাজ করা গিলাফের দিকে চোখ পড়ল। তখন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। চোখের কোণ ভিজে উঠল। বিসমিল্লাহ! আল্লাহু আকবার। প্রথমবার যখন কাবাঘর চোখে পড়ে, তখন যে দোয়া করা হয়, সে দোয়াই নাকি কবুল হয়। স্রষ্টার শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন কাবা বা হারাম শরীফ, যেখানে সব ধরনের খারাপ কাজ নিষিদ্ধ। ‘কাবা’ শব্দের অর্থ উঁচু। বলা হয়ে থাকে, কাবাঘর মানবজাতির জন্য প্রথম প্রার্থনার ঘর। কাবা শরীফ কখন নির্মিত, তা নিয়ে বিভিন্ন মত আছে। তবে গ্রহণযোগ্য মতগুলোর একটি হলো, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্দেশে ফেরেশতারা বায়তুল মামুরের নিচে এটি নির্মাণ করেন। পরে ইব্রাহিম (আ.) এবং ইসমাইল (আ.) ঘরটি পুনর্নির্মাণ করেন। মূলত মানবজাতির জন্য নির্ধারিত প্রথম ইবাদতঘরটি বাক্কা বা মক্কায় অবস্থিত, যা মানবজাতির জন্য বরকতময় ও পথনির্দেশক।
আমার চোখে দেখা পৃথিবীর কোনো স্থাপত্য, কোনো প্রত্নতত্ত্ব কিংবা অন্য কোনো নিদর্শনের সঙ্গে কাবা শরীফের তুলনা করা সম্ভব হলো না। এই মহিমা, এই প্রশান্তি, এই নিবিড় বাঁধন একেবারেই আলাদা। দুপুরে সোনালি রোদের চকচকে আলোয় এর রূপ যেন চোখ ঝলসে দেওয়ার কথা; কিন্তু সেই আলোও এখানে শান্তির দোলায় এমনভাবে খেলা করছিল যে, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল।
এখানে পুরুষ ও নারীদের প্রার্থনার জন্য পৃথক পৃথক জোন আছে। মুসল্লিরা হাজরে আসওয়াদের বিপরীত কর্নার বরাবর সবুজ বাতি দেখে তাওয়াফ শুরু করেন এবং সাত পাক শেষ করেন। মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত সালাত আদায়ের পর ওমরাহব্রত হাজিরা সাফা পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যান। বেদনাঘন আবেগ নিয়ে চোখের পানি ফেলে মুসল্লিরা সাঈ সম্পন্ন করেন। ‘সাফা স্টার্ট হেয়ার’ থেকে শুরু করে মারওয়া পর্যন্ত এক চক্কর, এরপর মারওয়া থেকে সাফা আরেক চক্কর। এভাবে পর্যায়ক্রমে সাত চক্কর শেষ হলে মুসল্লিরা মাথা মুণ্ডন করেন বা চুল ছেঁটে নেন।
সাফা হলো আবু কুবাইস পর্বতের নিচে অবস্থিত একটি ছোট পর্বত। এটি কাবাঘরের প্রায় ১৩০ মিটার, অর্থাৎ ৪৩০ ফুট দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। মারওয়াও শ্বেত পাথরের একটি ছোট পর্বত, যা কাবার উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ৩০০ মিটার, অর্থাৎ ৯৮০ ফুট দূরে অবস্থিত। এটি কাইকান পর্বতের সঙ্গে সংযুক্ত। সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানকে বলা হয় মাসআ। একসময় এটি মসজিদুল হারামের বাইরে ছিল। যতদূর জানা যায়, ১৩৭৫ হিজরি সাল পর্যন্ত স্থানটি পৃথক অবস্থায় ছিল। পরবর্তীতে সাফা ও মারওয়া এলাকা মসজিদুল হারামের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়।
পবিত্র এই স্থানে সাঈ করতে করতে বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল ইতিহাসের কথা। আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে এই জনমানবশূন্য উপত্যকায় রেখে যাওয়ার পর থেকেই মূলত মক্কার ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
একসময় হাজেরা (আ.)-এর কাছে থাকা খাবার ও পানি ফুরিয়ে যায়। তৃষ্ণায় কাতর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে আর বুকের দুধ খাওয়াতে পারছিলেন না তিনি। পানির সন্ধানে তিনি সাতবার সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে দৌড়ান। দ্রুত আশপাশ পর্যবেক্ষণের জন্য শিশুপুত্রকে নিরাপদ স্থানে রেখে প্রথমে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করেন। সেখানে কিছু দেখতে না পেয়ে মারওয়ার দিকে ছুটে যান। এভাবে দুই পাহাড়ের মধ্যে বারবার ছুটে বেড়ান তিনি।
প্রচণ্ড রোদ ও উত্তাপের মধ্যে সন্তানের জন্য এক মায়ের এই নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাঁদের সাহায্যের জন্য ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-কে প্রেরণ করেন। আল্লাহর নির্দেশে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে পানির ঝরনা। সেই ঝরনাই আজকের জমজম কূপ। মরুর বুকে উৎসারিত এই বরকতময় পানি যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করে আসছে।
সাঈ করতে করতে আমিও নিজের জীবনের কথা ভাবছিলাম। মহান আল্লাহ আমাকেও নানা পরীক্ষার মধ্যে রেখেছেন। তিনি তো সব মুশকিল আসানকারী। তাহলে কেন আমার সমস্যাগুলো এখনো দূর হচ্ছে না? এমন নানা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। একসময় দু’চোখ অশ্রুতে ভরে উঠল।
ঠিক তখনই এক ভিনদেশি বয়স্ক নারী আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেয়া হুয়া, বেটা?” আমি কোনো উত্তর দিলাম না। নীরবে তাঁকে এড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। কাবা শরীফ থেকে ফেরার পথে মনে হলো, এখানে সবচেয়ে জনপ্রিয় গেট সম্ভবত কিং ফাহাদ গেট। প্রায়ই হাজীদের জিজ্ঞাসা করতে দেখা যায়, “গেট সেভেনটি নাইন কোথায়?”
আশপাশের দোকানগুলোয় তাকালে দেখা যায়, দেয়ালে দেয়ালে রাজা ও প্রিন্সের ছবি ঝুলছে। এখন নারীরা আগের চেয়ে অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করছেন। রিসিপশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাঁদের কর্মব্যস্ত উপস্থিতি চোখে পড়ে। সিম বিক্রি থেকে শুরু করে নানা পণ্যের বাহারি দোকানেও তাঁরা কাজ করছেন। এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন, কাবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মাতাফের অ্যাটেনডেন্ট হিসেবেও অনেক নারী দায়িত্ব পালন করছেন।
হজ ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক টিমের অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। শুধু সরকারি হাজীদের নয়, বেসরকারিভাবে গমনকৃত হাজীদের খোঁজখবর নেওয়ার গুরুদায়িত্বও আমার কর্তব্যের অংশ ছিল। আমি যে মিশন বিল্ডিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ছিলাম, সেখানে মক্তব সাতের অনেক নারী কর্মরত ছিলেন। সেখানে একজন নারী চিত্রশিল্পীর সঙ্গেও আমার পরিচয় হয়েছিল। তাঁর চমৎকার সব চিত্রকর্ম আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছিল। আলবাইতের কয়েকজন নারী এখানে কাজ করতেন। তাঁদের দেখে মনে হলো, তাঁরাও আমাদের মতোই শংকর জাতিসত্তার মানুষ। কালো অ্যারাবিয়ান, সাদা অ্যারাবিয়ান, দুই ধরনের মানুষই আমি দেখেছি। তাঁরা এত আন্তরিক ও মিশুক ছিলেন যে, মনেই হয়নি তাঁরা ভিনদেশি কেউ।
সোয়াদ নামে এক সুন্দরী রমণীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সে খুব সুন্দর ইংরেজি বলত। আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, নাম বাউয়ান। সেও ছিল মিশুক প্রকৃতির। বিভিন্ন কাজের সূত্র ধরে পুলিশ অফিসার, স্থানীয় ম্যানেজমেন্ট, হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং মক্তব সাতের বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে হয়েছে। সৌদি আরবে ৪৮ দিন অবস্থানকালে মনে হয়েছে, ইংরেজি শেখার প্রতি তাদের খুব একটা আগ্রহ নেই।
বাংলাদেশ হজ অফিসে প্রায় প্রতি রাতেই আমাদের নিয়ে বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত হতো। হারিয়ে যাওয়া লাগেজ উদ্ধার করা, হারিয়ে যাওয়া হাজীদের তাঁদের হোটেলে ফেরত পাঠানো, ব্যালটি হাজীদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা, বেসরকারি এজেন্সিগুলো চুক্তি অনুযায়ী সেবা দিচ্ছে কি না, এ ধরনের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে স্যাররা নির্দেশনা দিতেন।
দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পেরেছি, জানি না। তবে এই কয়েক দিনে মায়ার বিভিন্ন বাঁধন গড়ে উঠেছিল। আমাদের সম্মানিত হাজীদের অধিকাংশই আমাকে মা বলে ডাকতেন। কারও কারও মেয়েও হয়ে উঠেছিলাম। এক নারী তো প্রতিবার হারাম শরীফে যাওয়ার আগে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করতেন। আমার মনে হয়েছিল, আমার আপন খালাও বোধহয় এতবার আমাকে এমন আপন করে আদর দেননি।
অনেকের মুখে আপা ডাক শুনেছি। কেউ কেউ ম্যাডামও ডাকতেন। দুজনের বড় বোনও হয়ে উঠেছিলাম। সেবা দেওয়াই যে পরম ধর্ম, তা আমি অন্তর দিয়ে অনুভব করেছি।
ভ্রমণ মানেই নতুন কোনো অনুভূতি। ভ্রমণ মানেই নতুন কোনো আনন্দ। ভ্রমণ মানেই কখনো নতুন কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা। ভ্রমণ মানেই স্মৃতির ঝুলিতে যোগ হওয়া নতুন কোনো অভিজ্ঞতা। আমার কাছে এই ভ্রমণ এক টুকরো মধুর আবেশ। বাক্কার দিনগুলো আমার সারা জীবনের জন্য মধুর হয়ে থাকবে।
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
হেলথ, ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড পেনশন

