গা ধুয়ে অজু শেষ করেই ধবধবে সাদা চাদরের ওপর বসে পড়ল তাজুল। জীবনের শেষ অজু। এর আগে এতটা গভীর মনোযোগে অজু করেনি তাজুল হোসেন। আধো ঘোমটায় বসা কারা মৌলভি খালেক একটু ঝুঁকে গিয়ে বলেন:
:ইঞ্জিনজা ছহি মতোন করেছেন তো? দুই রাকাত নফল নামাজ পড়েন। খোদার দরবারে কাঁদেন। মাফ চান।
তাজুল কিছুই বলে না। আড়চোখে তাকায়, লম্বা করে শ্বাস নিয়ে নামাজে দাঁড়ায়। আট বাই আটের ছোট্ট সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে গোটা দশেক লোক। কনডেম সেল। রাত এগারোটা। ঝিঁঝিঁ ডাকা রাতে সেলের ভেতর কারা মৌলভি খালেক, আর বাইরে গোটা দশেক লোকের দাঁড়িয়ে থাকার মানে তাজুলের অজানা নয়। আজ বিকেলে কোনো নোটিশ ছাড়াই দেখে গেছেন ভাই আর বৃদ্ধা মা। মা খুব যতড়ব করে নিয়ে আসা গুঁড়া চালের খুশবো ভাত নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছেন। মায়েরচোখের গড়িয়ে পরা জল মুছে দিতে দিতে তাজুল বলেছে,
: বিশ্বাস করো মা, আমি নিদুষি । আঁচলের ভাঁজে মুখ লুকাতে লুকাতে মা চলে গেলেন। এরপর জেলার এসে জানতে চান,
: আর কোনো ইচ্ছা আছে কি? তাজুল হোসেন জেলারকে অবাক করে দিয়ে বলে,
: আমার ছাররে দেখবার চাই। স্যার, মানে ডেপুটি সাহেব। এই যে এত আয়োজন, এত খাতির-যত্ন, এসবের মানে খুব সহজ। আজ তাজুলের ফাঁসি।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলের বাইরে অন্য অনেকের সঙ্গে ডেপুটি জেলারও দাঁড়িয়ে। তাজুলের প্রিয় স্যার। : ছার, আমি তো চলি যাব। তয় আফনে একটু মাইয়্যাডার মারে কইবেন, আমি কিন্তুক ঐ লোক না। আমারে ফাঁসানো হইছে।
ডেপুটি জেলার জয় নতুন জয়েন করেছেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রায় সকল হাজতি-কয়েদির কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। অনেকটা আপন লোক। কাঁচা বয়সের অফিসার। পড়াশোনা শেষে প্রথম চাকরি। জেলের সকলকে আপনি সম্বোধনে কথা বলেন। এখনো জটিলতা-কুটিলতা পেয়ে বসেনি। মনটা কাদা-মাটির। তাদের কথা শোনেন। অনেক সময় তাদের কুশলাদি বার্তা প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করে দেন। সময় পেলে কয়েদি-হাজতিদের খোঁজ নেন।
ফাঁসির আসামি তাজুল হোসেন তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা ডেপুটি সাহেবকে বলতে পেরেছে। ডেপুটি সাহেবের মনোযোগ দিয়ে শোনা তাকে তাজুলের প্রিয় স্যার করেছে। সাজাভোগী কয়েদিরা বাঁশ-বেতের কাজ করতে করতে যখন ফেলে আসা সোনালি দিনের গল্প বলে, ডেপুটি সাহেব মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তাজুলের গল্পও তার জানা।
কনডেম সেলে কোনো জানালা নেই। ওপরের দিকে ছাদ ঘেঁষে বাতাস প্রবেশের উপযোগী ছোট্ট ছিদ্র আছে। রুমের এক পাশে তিন ফিটের ইটের দেয়ালের আড়ালে টয়লেট। বাইরে থেকে কারারক্ষীরা সার্বক্ষণিক দেখতে পায় গতিবিধি।
তাজুলের নামাজ পড়া শেষ হয়েছে। মৌলভি খালেক জোরে জোরে তওবা পড়াচ্ছেন। বাইরে যমটুপি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন সহকারী জল্লাদ। কালো কাপড়ের বিশেষ কায়দায় তৈরি টুপি। পরালে গলা অবধি নেমে আসে। ফাঁসির বেদিতে নেওয়ার আগে পরিয়ে দেওয়া হয়। আশপাশে কিছুই দেখা যায় না।
তাজুল হু হু করে কাঁদছে। তার কান্নায় ভারী হয় রাতের আকাশ। ডেপুটি জেলার জয় কনডেম সেলের বাইরে দাঁড়িয়ে কাঠ-গম্ভীরভাবে। তার বারবার মনে হতে থাকে তাজুলের বয়ান। কামরাঙ্গীরচরে একটা করাতকলে কাজ করত তাজুল হোসেন। পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। বিয়ে করেনি। মা আর ভাইকে নিয়ে করাতকলের পাশেই থাকে। আর এই করাতকলের পেছনের দিকটায় খারাপ লোকের আড্ডা। জুয়া, তাস, নেশাপানি সবই চলে। তাজুল ওসবে নেই।
করাতকলের মালিক নিজেও লোক সুবিধের না। মেয়ে মানুষের নেশা আছে। আঁধার নেমে এলে করাতের আওয়াজ থেমে গেলে মাতলামির আওয়াজ বেড়ে যায়। মাঝেমধ্যে মেয়ে মানুষের ডাক-চিৎকারও ভেসে আসে। ভয়ে কেউ কাছে ভিড়ে না। যেদিন মেয়েটার লাশ পাওয়া গেল করাতকলের পেছনের তেঁতুলতলায়, সেদিন তাজুল করাতকলেই ছিল। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফেরেনি। একটা বড়োসড়ো গাছের গুঁড়ির আড়ালে চাটাই পেতে শুয়েছিল। বেঘোরে ঘুম। সকাল সকাল শোরগোলে ঘুম ভাঙলে অন্য অনেকের মতো সেও পেছন দিকটায় তেঁতুলতলায় যায়।
একটা এগারো কি বারো বছরের মেয়ে চিৎ হয়ে পড়েছিল। কেউ একজন করাতকল থেকে একটা ছেঁড়া লুঙ্গি এনে মেয়েটার নগ্ন শরীর ঢেকে দেয়। তাজুল একটু উঁকি দিয়েই বাড়ি চলে যায়। ওসব ঝুট-ঝামেলা তার পছন্দ নয়। তবে চিৎ হয়ে থাকা মেয়েটার জন্য তার বুকের ভেতর কেমন জানি চিনচিনে ব্যথা লাগে।
সন্ধ্যা নাগাদ বাড়িতে পুলিশ এলে সে জানতে পারে, মেয়েটি বোবা ছিল। তাজুলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। বোবা মেয়েটির নগ্ন শরীর ঢেকে থাকা লুঙ্গিটা তাজুলের ছিল বলে উপস্থিত কেউ কেউ শনাক্ত করেছে। তাজুল বোকার মতো পুলিশের কাছে জানতে চায়, কী তার অপরাধ? করাতকল মালিক পুলিশকে জোর গলায় বলেছে, ঐ রাতে তাজুল করাতকলেই ছিল। আর লুঙ্গিটাও তার।
মেয়েটির কোনো পরিচয় মেলেনি। দু-একজন তাকে বাজারের আশপাশে দেখেছে। বাক্হীন। ইশারায় কথা বলত। ঘটনার রাতে করাতকলের পেছনে আড্ডার আসর জমলেও পুলিশের কাছে ও কথা কেউ স্বীকার করেনি। বরং একটা কথাই চাওর হয়েছে, তাজুল কেন ঐ রাতে করাতকলে ছিল? আর তার লুঙ্গিটাই বা থাকবে কেন মেয়েটার শরীরে? কেউ একজন যে লুঙ্গিটা করাতকল থেকে এনে মেয়েটার শরীর ঢেকে দিয়েছিল, এ কথা বেমালুম চেপে গেছে সবাই।
ফলাফল, তাজুল জেলে। দীর্ঘ তদন্তে তাজুলের উপস্থিতি ছাড়া আর কিছুই পাননি তদন্তকারী কর্মকর্তা। ট্রায়ালেও তার পক্ষে বলার মতো কোনো সাক্ষী হাজির করতে পারেননি প্রসিকিউটর। করাতকল মালিকসহ পেছনে আড্ডা দেওয়া সকলেই তাজুলের বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে। তিন-তিনটে বছর কনডেম সেলের আট বাই আট ফিটের ঘরে বসে তাজুল হিসাব মেলাতে পারেনি। কেন সে জেলে? মেয়েটাই বা কে? কী হয়েছিল সেই রাতে?
ডেপুটি জেলার জয় ঘটনাটা শুনেছেন তাজুলের কাছে। আপিলের ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। লাভ হয়নি। উচ্চ আদালতে ফাঁসি বহাল রইল। ডেপুটি সাহেব তাজুলকে শুধু বলতে পেরেছেন, দিন শেষে খোদার বিচারই আসল। কনডেম সেলে রোজ ভিজিটে গেলে তাজুলকে একবার দেখে যান ডেপুটি জেলার। এক-আধটু গল্প করেন। ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন। রোজ ডেপুটি জেলার চলে যাওয়ার সময় তাজুল চিৎকার করে বলে,
: ছার, আমি কলাম কুনো দুষ করিনি।
তাজুলের মা আর ছোট ভাইটা ছাড়া কেউ দেখা করতে আসত না। মাঝে একবার করাতকল মালিক এসেছিল। তা-ও তার এক আত্মীয় আসামিকে দেখতে। কী মনে করে তাজুলকেও দেখে যায়। তাজুল মালিককে জিজ্ঞেস করেছে, কেন সে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিল? মালিক পাশ কাটিয়ে বলেছে,
: চিন্তে করিসনে, ছাড়াইয়া নিমুনে।
আর কখনো আসেনি মালিক। জেলে তার ভাই, স্বজন বলতে এই ডেপুটি জেলারই তার আপনজন। কারাগারের পশ্চিম দিকের এক কুঠুরিতে থাকে মকিম ফকির। আসামিরা বলে, মকিম আওলিয়া টাইপের মানুষ। কোন কালে যে জেলে এসেছে, অনেকেই জানে না। নথি ঘেঁটে ডেপুটি সাহেব দেখেছেন, মকিম মার্ডার কেসের যাবজ্জীবন সাজার কয়েদি। বয়স আশির ওপরে। চুল, দাড়ি, ভ্রু সবই ধবধবে সাদা। কথা বলে কম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। এবাদত-বন্দেগিতে সময় পার করে। সশ্রম কারাদণ্ডের আসামি হওয়ায় কাজ করা বাধ্যতামূলক। জেলার সাহেব দয়াপরবশ হয়ে মাছি মারার কাজ দিয়েছেন। মকিম বুড়া প্রতিদিন খেজুরের ডাল দিয়ে মাছি মারে। ডেপুটি সাহেব রোজ হিসাব নেন, কতটি মাছি মারতে পারল।
একদিন বেলায় বুড়োর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ বুড়ো বলে ওঠে, তাজুল নির্দোষ। কাজটা করেছে করাতকল মালিক। ডেপুটি সাহেব থমকে দাঁড়ান। কপাল কুঁচকে তাকান। আশ্চর্য! বুড়া তো তাজুলকে চেনে না। কনডেম সেলে একাকি থাকা আসামির সঙ্গে তো বুড়ার দেখা হওয়ার কথা না! ডেপুটি জেলার থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
: চাচা, তুমি জানলা কেমনে? বুড়া আকাশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে,
: সব তিনিই জানেন। বলেই মাছি মারতে শুরু করে। ডেপুটি সাহেব আরও একদিন অবাক হয়েছিলেন। বুড়ো তাকে দেখে বলে,
: তাড়াতাড়ি ঘরে যাও, চুলাটা নিভাইয়া আসো। আগুন লাগবো।
ডেপুটি সাহেব কেন যেন দৌড়ে বাসায় গিয়ে দেখেন, সত্যিই চুলাটা নেভানো হয়নি। ততক্ষণে আগুন রান্নাঘর ছড়িয়ে পড়ল বলে। ডেপুটি সাহেব সেই থেকে মকিম বুড়োকে সমীহ করেন। তাজুলের বিষয়টাও বিশ্বাস করেন। কিন্তু তাতে তাজুলের কোনো উপকার হবে না। শুধু দীর্ঘশ্বাসের দৈর্ঘ্যটা আরও বাড়ে। বারোটা বাজতে মিনিট পনেরো বাকি। তওবা পড়ানো শেষ করেছেন মৌলভি। মোনাজাত ধরেছে তাজুল। তার আর্তি ডেপুটি সাহেবের কলিজা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। তাজুলের চিৎকারে গমগম করে কালো আসমান।
: হে খোদা, তুই তো জানোস, আমি কুনো দুষ করি নাই।
জেলার এসে তাড়া দিয়ে গেছে। কুইক। টাইম শর্ট। জল্লাদের হাতে যমটুপি নড়াচড়া করে। মূল জল্লাদ সাহাজাহান সেলের দরজায়। হুঙ্কার ছাড়েন। মোনাজাত শেষ হয়। আর মাত্র মিনিট পাঁচেক বাকি। জল্লাদ ভেতরে ঢুকে কালো যমটুপি পরাতে গেলে তাজুল শেষবার চিৎকার করে বলে,
: আমার ছাররে শেষবার দ্যাখবার দেন।
এই চিৎকার ডেপুটি জেলারের ভেতরটা তছনছ করে দেয়। তার চোখ বেয়ে নেমে আসা জলের ধারা খাকি ইউনিফর্মের বোতাম ভেজায়। ডেপুটি জেলার তাজুলের চোখের দৃষ্টি নিতে পারেন না। চোখ নিচু করে অপারগতা আড়াল করেন। তাজুল বলে,
: বিদায়, ছার! মারে কইবেন, আমি নিদুষি।
যমটুপি পরা তাজুলের দুই বাহু দুই জল্লাদ উঁচু করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ফাঁসির বেদিতে। নিয়মমতো ডেপুটি জেলার সঙ্গে হাঁটেন। তাজুলের একেকটি পায়ের ছাপ এ পৃথিবীর একেকটি ধিক্কার হয়ে এগোয়। ডেপুটি জেলার জেলারের পেছনে এসে দাঁড়ান। তাজুল সিঁড়ি ভাঙছে বেদির। হাজার ওয়াটের বাল্বের আলোয় কিলবিল করছে পোকামাকড়ের মিছিল। তারা কি প্রতিবাদ করছে?
কেন্দ্রীয় কারাগারজুড়ে মৃত্যুর হিমশীতল নীরবতা। বাতাসে দম নেই। থেমে আছে। গুমোট। জেলারের হাতের আঙুলের ফাঁকে সাদা রুমাল। সিভিল সার্জনের পাশে কাপড়ে ঢাকা স্ট্রেচার। এডিএমের চোখ ঘড়ির কাঁটায়। তাজুলকে বেদিতে দাঁড় করানো হয়েছে। পায়ের নিচে কাঠের পাঠাতন। হাত পিছমোড়া দিয়ে বাঁধা। গলায় তিন দিন ধরে লাগাতার কলা আর গ্রিজ মেশানো ম্যানিলা রোপ। সাহাজাহানের অভ্যস্ত হাত নির্মমভাবে লিভারে সেঁটে আছে।
মাত্র তিরিশ সেকেন্ড! উনত্রিশ… আঠাশ… সাতাশ…। তাজুলের চিৎকারে কাঁপে খোদার আরশ।
: হে খোদা! তুই তো জানোস আমি নিদুষি। দুনিয়ায় বিচার পাইলাম না, আখিরাতে… তাজুলের অসমাপ্ত কথা আর শেষ হয় না। এক ঝটকায় ধপাস করে লটকে যায় তার দেহ। আড়াল হয় বেদির নিচে। নির্জীব দলা পাকিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে জেলারের হাতের রুমাল। চারদিকে ভেসে বেড়ায় তাজুলের অসমাপ্ত স্লোগান। ঠিক অসমাপ্ত বিচারের মতো…
লেখক
ডিআইজি
এসএস, ঢাকা মেট্রো (পশ্চিম)
সিআইডি, ঢাকা

