বুধবার, জুন ৩, ২০২৬
28.3 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

ক্ষমতার দায়

শুভ্র দেব
,

রমজান মাস। অগ্নিঝরা মার্চের শুরুর দিকে, ইউনিফর্ম চাপিয়ে বেলা ঠিক ২ ঘটিকার দিকে টিএসসি চত্বরে গেলাম। মহান একুশে বইমেলার ডিউটি পড়েছে। রমজান মাস হওয়ার কারণে যদিও জনসমাগম খুব কম ছিল, কিন্তু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হোলি উৎসবের কারণে গালে, মুখে এবং শরীরে আবির মাখানো বিভিন্ন বয়সের তরুণ-তরুণী মেলায় প্রবেশ করছিল।

রাজু ভাস্কর্যের ঠিক পেছনের দিকে, বাংলা একাডেমির দিকে যাওয়ার রাস্তায় আমার ডিউটি পড়েছে। যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যারিকেড দিয়ে লেন সরু করে দেওয়া হয়েছে। সবে মেলার গেট খোলার কারণে কিছু স্কাউট সদস্য যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বেছে বেছে কার্ড দেখে যানবাহন প্রবেশ করতে দিচ্ছে। দায়িত্বরত ইন্সপেক্টরকে সংশ্লিষ্ট পয়েন্টে যতগুলো ফোর্স আছে, তাদের ফল ইন করানোর জন্য বললাম।

কোনো ডিউটিতে গেলে আমার অভ্যাসবশত প্রথম কাজ হলো, সকল নারী-পুরুষ কনস্টেবল এবং তাদের ইনচার্জগণকে ব্রিফিং দেওয়া। ডিউটির শুরুতে ফোর্সের সঙ্গে এই আইসব্রেকটা করে ফেললে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আউটপুট পাওয়া যায়।

ইন্সপেক্টর সাহেব ফোর্সদের ফল ইন করালেন। তাদের বইমেলার ডিউটি বিষয়ক বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া শুরু করলাম। মিনিট দুয়েক পরে স্কাউটের ইউনিফর্ম পরিহিত এক যুবক হাতের মোবাইল ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আঙ্কেল, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কে?’ সে বলল, অপরিচিত লোক, তবে খুব জরুরি প্রয়োজনে কথা বলতে চাচ্ছে।

আমি কৌতূহলবশত মোবাইল ফোনটি হাতে নিয়ে বললাম, ‘কে বলছেন, প্লিজ?’ ওপাশ থেকে আতঙ্কিত এবং সন্ত্রস্ত গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। ভদ্রলোক প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় গড়গড় করে বললেন, ‘ভাই, প্লিজ, ওই ভদ্রমহিলা আমার স্ত্রী। একটু রাখেন, আমি আসতেছি।’

আমি বললাম, ‘আপনি শান্ত হোন। কোন মহিলা, বলেন তো?’ ভদ্রলোক কিছু বলার আগেই স্কাউটের সেই যুবকটি আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘আঙ্কেল, ওই যে দেখা যায়, বসে আছে মহিলা, তার কথা বলেছেন।’ আমি দেখলাম, টিএসসির সড়কদ্বীপে ভিড়ের মধ্যে বসে আছেন বোরকা পরিহিত একজন মাঝবয়সী মহিলা। উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন।

ফোনের ওপাশের ভদ্রলোককে বললাম, ‘ভাই, কোনো টেনশন করবেন না। আপনি সরাসরি শাহবাগ থানায় এসে যোগাযোগ করবেন।’ তিনি আশ্বস্ত হলেন এবং ফোন কেটে দিলেন। স্কাউটের সেই যুবকটি বলল, ‘আঙ্কেল, ওই মহিলা আমার কাছে এসে মোবাইল ফোনটি চান। আমি মোবাইল দিলে উনাকে কল দেন।’

স্কাউটের ছেলেটি থেকে চোখ সরিয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকাতেই দেখি, মহিলা উধাও। সঙ্গে সঙ্গেই আমার বডিগার্ড সাব্বির এবং একজন নারী কনস্টেবলকে খুঁজতে পাঠিয়ে দিলাম। সঙ্গে আমিও সড়কদ্বীপের ওপরে উঠে হাঁটাহাঁটি করে খুঁজতে শুরু করলাম।

মিনিট পাঁচেক পরে সাব্বির ওই ভদ্রমহিলাসহ আমার কাছে এলেন। ভদ্রমহিলার বয়স ৪০-এর কোঠায়। চেহারায় দীর্ঘ ক্লান্তির ছাপ। আমি দুজন নারী কনস্টেবলসহ তাকে ডিউটি পোস্টেই বসিয়ে রাখলাম এবং ওয়ারলেস সেটে শাহবাগ থানার অপারেটরকে ডেকে একটি মোবাইল পার্টি পাঠানোর কথা বললাম। নারী কনস্টেবলদের বললাম, ‘উনাকে এখানে বসিয়ে চোখে চোখে রাখা হচ্ছে তোমাদের স্পেশাল ডিউটি।’

ঘণ্টাখানেক অতিবাহিত হলেও থানা পার্টি আসতে পারল না। স্কাউটের যুবকটি মোবাইল হাতে আবার এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আঙ্কেল, ওনারা শাহবাগ মোড়ে চলে এসেছে। কোথায় যাবেন এখন?’

আমি বললাম, ‘টিএসসিতে চলে আসতে বলো।’ আরও মিনিট দশেক পরে ভদ্রলোক এলেন। তার সঙ্গে আরও দুই-তিনজন মহিলা, দুই-তিনজন মাঝবয়সী পুরুষ। আমি তাদের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় করলাম। হারিয়ে যাওয়া মহিলাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদলেন ভদ্রলোক।

কৃতজ্ঞতার সঙ্গে আমার সঙ্গে কথা বললেন। বললেন, ‘আমার স্ত্রী ডিমেনশিয়ার পেশেন্ট। মাঝে মাঝেই বাসা থেকে এমন বের হয়ে যায়।’

আরও বললেন, ‘আপনার এই অবদান ও সাহায্য কোনোদিন ভুলব না ভাই। পুলিশের প্রতি শ্রদ্ধা আমার অনেক বেড়ে গেল। আজ যদি খুঁজে না পেতাম, তাহলে আমার এই ছোট্ট কন্যাশিশুটাকে নিয়ে অকূল পাথারে পড়ে যেতাম।’

এতক্ষণে কোলের বাচ্চাটার দিকে চোখ গেল আমার। সঙ্গে আসা এক ভদ্রমহিলার কোলে বাচ্চাটি। মেয়ে বাবু, কত আর বয়স হবে। সাত কিংবা আট মাস। সে অবাক হয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। তার আঙুল দুটো ধরলাম, আমার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের কথা মনে পড়ল। চোখ দুটো ভিজে এল আমার।

মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে বললাম, উর্দির কল্যাণে এমন পরোপকার যেন সবসময় করতে পারি, আমার সেই ক্ষমতা বজায় রেখো, ঈশ্বর।

লেখক
সহকারী পুলিশ কমিশনার
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ