মব ভায়োলেন্স বা সংঘবদ্ধ আক্রমণকে আমরা এক অর্থে হিংসা বা সহিংস উপায়ে শক্তি প্রদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। বিরুদ্ধ মত বা প্রতিপক্ষ কিংবা ভিন্ন চিন্তাকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে কতিপয় ব্যক্তি যখন উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংগঠিত হয়ে সহিংস উপায়ে তাদের উদ্দেশ্য সাধন করে, তখনই আমরা সেটিকে মব ভায়োলেন্স বলে থাকি।
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষ গোত্রবদ্ধভাবে জীবনযাপন করত। তখন কোনো নিয়মনীতি বা দণ্ডের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল না। গোত্রপ্রধান তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিত। সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি আরোপের জন্য অপরাধের মাত্রা ও পরিমাণ অনুযায়ী শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হতো, যেটিকে আমরা দণ্ডনীতি হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি। এই দণ্ডনীতিতে ব্যক্তির অপরাধের মানদণ্ডের নিরিখে শাস্তি আরোপ করা হতো। পরবর্তীতে সমাজের সকল প্রতিষ্ঠান শাস্তির এই মানদণ্ড মেনে নেয়।
পক্ষান্তরে, মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ একটি গোষ্ঠী গুজব সৃষ্টি করে সহিংস উপায়ে প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য আদিম পন্থা বেছে নেয়, যেটিকে সংঘবদ্ধ সহিংসতা বা আক্রমণ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। মারধর, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, গণপিটুনি কিংবা হত্যার মাধ্যমে এ সকল সহিংসতার প্রয়োগ ঘটানো হয়ে থাকে। একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের ক্ষেত্রে এটি এক ধরনের বিকৃতি।
মব ভায়োলেন্সের সাধারণ বৈশিষ্ট্য
যেকোনো সমাজে মব ভায়োলেন্স বা সংঘবদ্ধ সহিংসতার জন্য একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। প্রথমে গুজব নামক অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেহেতু আমাদের সমাজ কাঠামো নানাভাবে বিভক্ত, সেহেতু সেই বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ায়। একটি পর্যায়ে সে গুজবের ডালপালা প্রসারিত হতে থাকে। জনগণকে একটু একটু করে সংগঠিত করতে থাকে। সমাজের সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করে দিনক্ষণ ঠিক করে মব ভায়োলেন্স সংঘটিত করার প্রস্তুতি নেয়। পরবর্তীতে সহিংস উপায়ে এ কাজটি করে। এটি করতে গিয়ে তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এর ফলে খুনের মতো বর্বর ঘটনার মাধ্যমে মব ভায়োলেন্সের পরিসমাপ্তি ঘটে।
আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতার মাত্রা এত বেশি যে, আমরা ভিন্নমত, ভিন্ন চিন্তাকে কোনোভাবে মেনে নিতে পারি না। হয় তুমি আমার পক্ষে, নতুবা আমার বিপক্ষে। এ ধরনের বাইনারি আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর কাজ করে। সমাজে নানা মত ও নানা চিন্তা যদি পরিপুষ্ট হয়, সে ক্ষেত্রে সমাজে উদারনৈতিক আবহ সৃষ্টি হয়। একটি বহুত্ববাদী সমাজের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে ভিন্ন চিন্তার সহাবস্থান থাকবে।
মব সহিংসতার ক্ষেত্রে আমরা এর বিপরীত দৃশ্য অবলোকন করি। যেকোনো মূল্যে আমার ইচ্ছা, চিন্তা, নির্দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সহিংস উপায়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেউ যদি এর বিরুদ্ধাচরণ করে, তাকে কঠোর হাতে দমন বা নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে।
মব সহিংসতার অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করি যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনে জনতা নিজেরাই বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নিজেদের তারা সমাজের একমাত্র অভিভাবক মনে করে। একই সঙ্গে তারা নিজেরাই ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এটি করতে গিয়ে সমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রয়োগ ঘটায় সহিংস উপায়ে।
সহিংস কাজটি করতে গিয়ে তারা স্থানান্তরিত আক্রমণ কিংবা সংঘবদ্ধ আক্রমণের মাধ্যমে টার্গেটকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার আদিম ও গোত্রীয় পন্থা বেছে নেয়। অত্যন্ত অমানবিকভাবে বিকৃত উপায়ে শক্তি প্রদর্শন করে যখন এ কাজটি করে, তখন সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার বোধ সৃষ্টি হয়। তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হত্যা বা খুন করতে দ্বিধা করে না।
মব ভায়োলেন্স ও রাষ্ট্র
যেকোনো সমাজ প্রথাগত দিক থেকে পরিচালিত হয় শৃঙ্খলা ও শাস্তির নিরিখে। ব্যক্তি শৃঙ্খলা মেনে না চললে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। ব্যক্তি আইনবিরুদ্ধ কাজ করলে স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্র তাকে কঠোর হাতে দমন করে। তা না হলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য।
১৮৬০ সালে প্রণীত দণ্ডবিধিতে শাস্তির মাত্রা ও পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। রাষ্ট্র নিরপেক্ষভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এর প্রয়োগ ঘটায়। রাষ্ট্রের অবস্থান এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট। রাষ্ট্র মনে করে, ব্যক্তি যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, সে ক্ষেত্রে সমাজে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে।
ইতিহাসের নিরিখে আমরা ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই যে, সে সময় অসংগঠিত ও নেতৃত্ববিহীন জনগণ নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হয়েছিল। এ রকম নৈরাজ্য বা রাষ্ট্রবিহীন অবস্থাকে কঠোর হাতে দমন করা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগায়।
রাষ্ট্র যদি মব ভায়োলেন্সের ক্ষেত্রে ন্যূনতম শৈথিল্য প্রদর্শন করে, তবে তা একপর্যায়ে বুমেরাং হয়ে যায়। আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মব সহিংসতাকে কঠোর হাতে দমনের কোনো বিকল্প নেই।
মব সহিংসতাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। এটিকে কঠোর হাতে কিংবা শূন্য সহনশীলতার মাধ্যমে দমন করা না হলে তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে। সমাজের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তখন মবের বিস্তার ঘটাবে। সমাজের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে সংহতি বিপন্ন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সংহতি টিকিয়ে রাখা এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের স্বার্থে মব সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনগণ প্রত্যাশা করে, রাষ্ট্র তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই মব ভায়োলেন্সকে প্রশ্রয় দেওয়ার সুযোগ নেই। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তা না হলে সংঘবদ্ধ সহিংসতা একসময় নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তা বা শৈথিল্যের অবকাশ নেই।
লেখক
সাংস্কৃতিক সংগঠক ও প্রাবন্ধিক

