আমাদের বাংলা ভাষায় এমন কিছু গালি রয়েছে, যেগুলো কেবল মেয়েদের উদ্দেশে ব্যবহার করা হয়। গালির মূল লক্ষ্য হলো কাউকে অপমান করা কিংবা আঘাত করা। রাগে, ক্ষোভে বা হীন কোনো উদ্দেশ্যে মানুষ সাধারণত গালি দেয়। কিন্তু মেয়েদের উদ্দেশে দেওয়া এই শব্দগুলো কাউকে শুধু অপমান আর আঘাতই করে না, বরং সমাজের গভীরে থাকা এক প্রকার নারীবিদ্বেষী মানসিকতার প্রকাশ ঘটায়।
কেমন সেটা? কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক। এই গালিগুলো এমন যে, তা সরাসরি নারীর চরিত্র, যৌনতা বা সামাজিক অবস্থানকে আঘাত করে। যেমন, বেশ্যা। এটি মূলত যৌন পেশায় নিয়োজিত নারীদের বোঝাতে ব্যবহৃত শব্দ। কিন্তু রাগ বা অপমানের বশে সাধারণ মেয়েদের উদ্দেশেও এটি ছুড়ে দেওয়া হয়।এরপরের বহুল প্রচলিত গালি হলো মাগী। এই শব্দটি দ্বারা একসময় গ্রামীণ বাংলায় নারীদের বোঝানো হতো। কিন্তু এখন এটি অপমানসূচক শব্দে পরিণত হয়েছে।
একইভাবে কুলটা, চরিত্রহীনা, নষ্টা জাতীয় শব্দগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়। এই গালিগুলো একচেটিয়াভাবে কেবল মেয়েদের জন্য ব্যবহৃত হয়।
এবার খেয়াল করা যাক, আমাদের সমাজে পুরুষদের উদ্দেশে ব্যবহৃত গালিগুলো কী রকম। বাংলা ভাষায় পুরুষকে লক্ষ্য করে ব্যবহৃত গালি সাধারণত তার অক্ষমতা, বোকামি, সাহসের অভাব বা দায়িত্বহীনতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যেমন, কাপুরুষ, অকর্মা, গাধা, ভীতু, বখাটে ইত্যাদি। এসব শব্দে পুরুষের সামাজিক ভূমিকা, কর্মক্ষমতা ও পৌরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। অর্থাৎ, পুরুষের গালিতে মূল আঘাত যায় তার সক্ষমতা ও দায়িত্বের ওপর; বোকামি বা দুর্বলতার ওপর। চরিত্র বা শরীরের ওপর নয়।
নারী ও পুরুষভেদে গালির এই যে আলাদা ধরন, তা কি একদিনে গড়ে উঠেছে? এর উত্তর হলো: না। মূলত এর পেছনে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট।
ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ প্রশাসন ও মিশনারিরা ভারতীয় সমাজকে পশ্চাৎপদ প্রমাণ করতে নারীর অবস্থানকে একটি বড় যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করত। এর জবাবে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু সমাজে এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এই সময়েই সমাজসংস্কার আন্দোলন শুরু হয়।
১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত হয়, যার পেছনে ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। ১৮৫৬ সালে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়, যার দাবিতে কাজ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
কিন্তু সংস্কারের এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি আরেকটি ধারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যেখানে নারীর শুদ্ধতা ও ঘরোয়া আদর্শকে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চায়।
ঔপনিবেশিক সময়ের ব্রিটিশ ইন্ডিয়াকে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বিশিষ্ট রাজনৈতিক তাত্ত্বিক পার্থ চ্যাটার্জির একটি বই রয়েছে, নাম দ্য নেশন অ্যান্ড ইটস ফ্র্যাগমেন্টস ।
এই বইয়ের একটি প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ব্রিটিশ শাসনের অধীনে যখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তখন জাতীয়তাবাদী চিন্তায় সমাজকে দুই ভাগে কল্পনা করা হয় বাহির ও অন্তর। বাহির হলো রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, আধুনিক শিক্ষা; আর অন্তর হলো পরিবার, সংস্কৃতি, ধর্ম, নৈতিকতা।
জাতীয়তাবাদীরা বাহিরের জগতে পাশ্চাত্যের আধুনিকতা আংশিকভাবে গ্রহণ করলেও অন্তরের জগৎকে রাখতে চায় সেই চিরচেনা, বিশুদ্ধ ও আধ্যাত্মিক রূপে। আর এই অন্তরের জগতের বিশুদ্ধতার প্রতীক করা হয় নারীকে। ফলে তারা নারীকে একদিকে শিক্ষিত ও আধুনিক হতে বললেও অন্যদিকে তাদের কঠোরভাবে শালীন, ঘরোয়া ও নৈতিক হতে বাধ্য করে। এই প্রেক্ষাপটেই নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভাষায় নারীকেন্দ্রিক গালির ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে আরেকজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তানিকা সরকারের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, উনিশ শতকের সমাজে আদর্শ নারীকে পবিত্র, সহনশীল ও ঘরকেন্দ্রিক হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তাঁর বই হিন্দু ওয়াইফ, হিন্দু নেশন–এ এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
তিনি বইটিতে বলেছেন যে, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম একসঙ্গে কাজ করে নারীর শরীর ও আচরণকে সম্মানের প্রতীক বানায়। এতে করে নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নারীর পোশাক, চলাফেরা, শিক্ষালাভ, এমনকি জনসমক্ষে উপস্থিতিও কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসে।
অর্থাৎ যে জাতীয়তাবাদ একদিকে নারীশিক্ষা ও কিছু সংস্কারের পক্ষে অবস্থান করে, সেই জাতীয়তাবাদই নারীর ওপর নৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠোর করে তোলে।
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে আমরা মুক্ত হয়েছি বহু আগে। নিজেরা একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, সেও অর্ধশত বছর পেরোল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নারী এই নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি পেয়েছে কি না।
দেখা যায়, আজও কোনো নারী নিজের মত প্রকাশ করলে তাকে চুপ করাতে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। রাজনৈতিক বিতর্কে প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে অহেতুক তার পরিবারের নারী সদস্যদের টেনে আনা হয়। এই চর্চা ছোটদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। তারা শেখে, কাউকে অপমান করতে চাইলে তার মা বা বোনকে লক্ষ্য করলেই যথেষ্ট। যেহেতু ভাষা আমাদের চিন্তাকে প্রভাবিত করে, তাই ভাষার ভেতর নারীর জন্য আলাদা করে এই অবমাননাকর শব্দগুলোর প্রয়োগ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কারণ এই শব্দগুলো অচেতনভাবেই সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
গালি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। কিন্তু নারীর প্রতি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা খুব কঠিন কিছু নয়। এর জন্য পরিবার, বিদ্যালয়, গণমাধ্যম-সব জায়গায় সম্মানজনক ভাষার চর্চা করতে হবে। ঘরে-বাইরে সবখানে, স্থান-কাল-পাত্র যাই হোক না কেন, নারীর প্রতি অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করতে দেখলে তার প্রতিবাদ করতে হবে। এই প্রতিবাদে একদিনে বদলাবে না সমাজ, কিন্তু যদি সর্বস্তর থেকে এ রকম প্রতিবাদের ধারা অব্যাহত রাখা যায়, এমন দিন হয়তো আসবে, যখন আমরা তার সুফল পেতে আরম্ভ করব।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে মুখের ভাষা শুধু শব্দ নয়, এটি একটি মানসিকতার প্রকাশ। তাই ভাষা বদলালে ভাবনাও বদলানো যায়। আর ভাবনা বদলাতে পারলে সমাজ বদলাতে কতক্ষণ?
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
এডমিন এন্ড ফাইন্যান্স
এপিবিএন হেডকোয়ার্টার্স

