১৯৪৩ সালে আর্থার গ্যালস্টন নামে একজন বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট পর্যায়ের গবেষণা করছিলেন। গবেষণাকালীন তিনি দুর্ঘটনাবশত এমন একটি রাসায়নিক উপাদান আবিষ্কার করলেন, যেটা সয়াবিন গাছে দ্রুত ফুল আসতে এবং গাছের পাতা ঝরিয়ে দিতে সাহায্য করে। দুর্ঘটনা বলছি এজন্য যে, পরবর্তীতে তার আবিষ্কৃত এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়।
ভিয়েতনাম ঘন জঙ্গলের দেশ। ভিয়েতনামি গেরিলাদের জন্য এই জঙ্গল ছিল আশীর্বাদের মতো। তারা যুদ্ধের সময় সেখানে লুকিয়ে থাকত এবং জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যুদ্ধের রসদ সরবরাহ করত। এজন্য মার্কিন বাহিনী তাদের মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছিল। তাই তারা জঙ্গলের দৃশ্যমানতা বাড়াতে আর্থার গ্যালস্টনের আবিষ্কৃত এই রাসায়নিক যৌগ জঙ্গলের ওপর ছিটিয়ে দেয়। ফলে সেখানকার প্রায় ৫০ লাখ একর বনভূমি ও ফসলি জমি মরুভূমিতে পরিণত হয়।
আর্থার গ্যালস্টন সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি যে, নিজের আবিষ্কার করা এই রাসায়নিক উপাদান কখনো এভাবে পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনবে। এই ভয়াবহতা দেখে তিনি ভীষণভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর ১৯৭০ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত কনফারেন্স অন ওয়ার অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিতে অংশ নিয়ে তিনি এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশ হত্যা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, কোনো নির্দিষ্ট জাতিকে ধ্বংস করা যেমন জেনোসাইড, ঠিক তেমনি কোনো একটা অঞ্চলের পরিবেশ ও বাস্তুসংস্থানকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ধ্বংস করা হলো ‘ইকোসাইড’। তিনি এটিকে মানবতার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব দেন।
এরপর বিশ^জুড়ে আরও কিছু পরিবেশ বিপর্যয়ের ভয়াবহ ঘটনার জেরে বিষয়টিকে অপরাধবিজ্ঞানের আওতায় আনা হয়. এর মধ্যে দুটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এক হলো, ১৯৮৪ সালে ভারতে ইউনিয়ন কার্বাইড কারখানার বিষাক্ত গ্যাসে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও পরিবেশ বিপর্যয়ের ঘটনা, যা ভোপাল গ্যাস বিপর্যয় নামে পরিচিত। আর পরেরটি ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটা চেরনোবিল দুর্ঘটনা, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয় এবং পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
বিশ শতকের শেষের দিকে এসব বিধ্বংসী ঘটনা গ্রিন মিমিনোলজি ধারণার সূত্রপাত করে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে অপরাধবিজ্ঞানের এই নতুন শাখাটিকে সামনে আনার যে বিজ্ঞানী, তার নাম মাইকেল জে লিঞ্চ। ১৯৯০ সালে তিনি তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য গ্রিনিং অব মিমিনোলজি’তে যুক্তি দেন যে, অপরাধবিজ্ঞানে কেবল রাস্তার অপরাধ নয়, বরং করপোরেট অপরাধ ও পরিবেশগত ধ্বংসযজ্ঞের দিকেও মনোযোগ দেওয়া উচিত।
পরবর্তীতে বিশ^ব্যাপী ইকোসাইড ও গ্রিন মিমিনোলজির মতো তাত্ত্বিক বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরিবেশগত অপরাধ প্রতিরোধ করতে সূচনা হয় আন্দোলনের। আর এই আন্দোলনের নেপথ্যে যে মানুষটার নাম উল্লেখ করতেই হয়, তিনি হলেন পলি হিগিনস। ‘পৃথিবীর আইনজীবী’ হিসেবে অভিহিত এই স্কটিশ ব্যারিস্টারকে আধুনিক ইকোসাইড আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে গণ্য করা হয়। মাইকেল লিঞ্চ মূলত যে তাত্ত্বিক ভিত্তি দিয়েছিলেন, পলি হিগিনস সেটাকে আন্তর্জাতিক আইনে রূপ দেওয়ার জন্য আমৃত্যু লড়াই করে গেছেন।
পলি হিগিনস প্রস্তাব করেন যে, শান্তি বজায় রাখার জন্য গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও আগ্রাসনের মতো চারটি বড় অপরাধের পাশাপাশি ইকোসাইডকে পঞ্চম আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এর সপক্ষে তার যুক্তি ছিল, যদি আমরা পরিবেশ ধ্বংসকে আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করি, তবে কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহী ওই অপরাধের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি অপরাধে দায়ী থাকবেন। অর্থাৎ কেবল কোম্পানিকে জরিমানা না করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিকেও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
২০১৭ সালে পলি হিগিনস ও জোয়ানা ম্যাস্টিকা যৌথভাবে ‘স্টপ ইকোসাইড’ নামে এক আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু করেন। পরে এই আন্দোলনটি কেবল আইনজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি গণআন্দোলনে পরিণত হয়। গত কয়েক বছরে এই আন্দোলন ব্যাপক রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য সাফল্য হলো, ২০২৪ সালে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে বেলজিয়াম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইকোসাইডকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইন পাস করে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সংশোধিত এনভায়রনমেন্টাল মাইম ডিরেক্টিভে ইকোসাইডের মতো অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে। পাশাপাশি ভ্যাটিকান সিটি ও ক্যাথলিক চার্চের প্রধান তৎকালীন পোপ ফ্রান্সিস ইকোসাইডকে পাপ ও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ইকোসাইডের মতো আন্দোলন এবং গ্রিন মিমিনোলজি নিয়ে আমাদেরও জোরেশোরে ভাবার সময় এসেছে। কারণ আমাদের দেশের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই দুটি বিষয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু গুরুত্বপূর্ণ বললে ভুল হবে; এ দেশের একজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে আমি মনে করি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একরকম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আমাদের দেশ জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ। বাংলাদেশের দুজন গবেষক সিরাজুল মুস্তাসিভ এবং কামাল উদ্দীন তাদের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশ পরিবেশগতভাবে অপরাধপ্রবণ এক দেশ। শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই এর ব্যাপকতা সমানভাবে বিদ্যমান। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রয়েছি। সুতরাং এ দেশের পরিবেশগত অপরাধের খাতগুলোকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই বিরাট জনগোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেওয়া শুধু চ্যালেঞ্জিংই নয়, অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এবার দেখা যাক, বাংলাদেশে পরিবেশগত অপরাধগুলো সাধারণত কী কী? পরিবেশগত বিপর্যয়ের কথা আসলে প্রথমেই মনে আসে আমাদের দেশের নদীগুলোর কথা। কলকারখানার বর্জ্যে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নদীর করুণ দশা হয়েছে। সেখানকার ইকোসিস্টেম প্রায় ধ্বংসের মুখে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ট্যানারি বর্জ্যে ধলেশ্বরী নদীর মৃতপ্রায় দশা। দেশের পাহাড়-জঙ্গল কেটে দখল করা হচ্ছে। যত্রতত্র ইটভাটা নির্মাণ মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে ও বায়ু দূষণ করছে।
সুন্দরবন থেকে অবাধে কাঠ চুরি হচ্ছে। বাঘ, হরিণ আর হাতির মতো বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার করা হচ্ছে। যার প্রভাবে পরিবেশ ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দূষিত হচ্ছে মাটি ও পানি। এর ফলে আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল ও মাছের মধ্যে প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভারী ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। প্লাস্টিকের লাগামছাড়া ব্যবহারে পরিবেশদূষণ চরমে পৌঁছেছে। এসবের ফলস্বরূপ মানুষজন রোগাক্রান্ত হচ্ছে। কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে, যা তাদের নানা প্রকার অপরাধে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে।
বাংলাদেশের আইনে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বেশ কিছু বিধান রয়েছে। এসব আইনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ এবং প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯। কিন্তু এসব আইন প্রয়োগের মাধ্যমে শাস্তির যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তা মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। পরিবেশগত অপরাধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কারাদণ্ডের চেয়ে জরিমানার ওপর বেশি জোর দেয়। জেল বা ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয় খুব কম। একজন শিল্পপতি যখন দেখেন যে নিয়ম মেনে পরিবেশ রক্ষা করার চেয়ে নিয়ম ভেঙে জরিমানা দেওয়া বেশি লাভজনক, তখন তিনি অপরাধটি করতেই পছন্দ করেন। গ্রিন ক্রিমিনোলজিতে এটিকে বলা হয় কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস অব ক্রাইম। শিল্পদূষণের ক্ষেত্রে জরিমানা কাজ না করার মূল কারণ এটাই। আধুনিক গ্রিন ক্রিমিনোলজিস্টরা এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রথমটি হলো জরিমানা নয়, কারাদণ্ড। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা না করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারীকে শাস্তির আওতায় আনা। দ্বিতীয়টি হলো মুনাফা বাজেয়াপ্ত করা। অর্থাৎ দূষণ করে কোম্পানি যে অতিরিক্ত মুনাফা করেছে, তা সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। অর্থাৎ জরিমানা হবে দূষণের ফলে অর্জিত লাভের চেয়েও বেশি। আর তৃতীয়টি হলো ব্ল্যাকলিস্টিং। অর্থাৎ দূষণকারী কোম্পানিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানিতে নিষিদ্ধ করা। এগুলো কার্যকর হলে ব্র্যান্ড ইমেজ রক্ষার জন্য তারা পরিবেশ রক্ষায় বাধ্য হবে।
গ্রিন ক্রিমিনোলজির সফল বাস্তবায়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এখানে পুলিশ কেবল আইনের রক্ষক নয়, বরং ফ্রন্টলাইন ইকো-ওয়ারিয়র বা পরিবেশের সম্মুখযোদ্ধা। পরিবেশ অধিদপ্তর সাধারণত জরিমানা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে। কিন্তু পুলিশ যখন দণ্ডবিধি ও পরিবেশ আইনের সমন্বয়ে সরাসরি অভিযুক্ত শিল্পপতি বা দখলদারকে গ্রেপ্তার করে, তখন সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা যায়। পলি হিগিনসের দর্শন অনুযায়ী, অপরাধী কোনো অদৃশ্য কোম্পানি নয়; বরং রক্ত-মাংসের মানুষ। এই ধারণাটি একমাত্র পুলিশই মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
এই বিষয়টি অনুধাবন করে আধুনিক বিশ্বে অনেক দেশে এনভায়রনমেন্টাল পুলিশ বা গ্রিন পুলিশ ইউনিট রয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশও তাদের অনুসরণ করতে পারে। প্রতিটি থানায় একটি এনভায়রনমেন্টাল ডেস্ক চালু করা যেতে পারে। এতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল কম থাকায় তারা সব জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু পুলিশ প্রতিটি ইউনিয়নে বিদ্যমান। পাহাড় কাটা বা নদী ভরাটের খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে ক্ষতি রোধ করতে পারে।
এছাড়া পরিবেশগত অপরাধের আলামত, যেমন বিষাক্ত রাসায়নিকের নমুনা সংগ্রহে পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে আদালতে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা সহজ হবে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে মিলে নদী দখলদার বা বনদস্যুদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এতে করে একটি প্রতিরোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
সর্বোপরি বলা যায়, পুলিশের দায়িত্ব কেবল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সঙ্গে তাকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃতি হত্যা কিংবা ইকোসাইডের হাত থেকে দেশের মাটি ও মানুষকে রক্ষা করা মূলত তাদের অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ।
গ্রিন ক্রিমিনোলজির দৃষ্টিতে পুলিশ যখন একটি গাছ, একটি বন্যপ্রাণী কিংবা একটি নদীকে রক্ষা করে, তখন তারা আসলে শুধুই পরিবেশগত অপরাধ নির্মূল করে না; বরং পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষা করে।
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, প্রশাসন ও অর্থ
এপিবিএন হেডকোয়ার্টার

