নিরাপত্তার দেয়াল হতে পারে সুউচ্চ, দুর্ভেদ্য। তবে সেই প্রাচীর সব ক্ষেত্রে অটুট সুরক্ষা দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিশ্ছিদ্র, নিরাপদ, শান্তির সুললিত স্বর্গেও স্রষ্টার নিষেধ মানেনি মানুষ। প্রলুব্ধ, প্রতারিত হয়েছে। ডেকে এনেছে নিজের বিপদ, অশান্তি। স্বার্থজড়িত মর্তে তো রীতিমতো বেপরোয়া কেউ কেউ। সহজাত সহিংস মানুষেরা পছন্দ করে না অহিংসার করিডোর। তারা শান্তির ঘরে সিঁধ কাটে, নিরাপত্তার প্রাচীর ডিঙিয়ে যায়। সুন্দর পরিবেশ ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলে সচেতনে, স্বেচ্ছায়, স্বার্থের টানে, প্রলোভনে।
কথায় আছে, প্রয়োজন যদি হয় উদ্ভাবনের জননী, তাহলে সংকট হলো জনক। আর যুদ্ধ হলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চূড়ান্ত পরীক্ষাগার। বিভিন্ন প্রলোভন, শক্তির দাপট, অজুহাত দেখিয়ে কিছু মানুষ অশান্তি, যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টি করে। মেতে ওঠে মানুষের রক্ত ঝরানোর পাশবিক উৎসবে। তখন হঠাৎ করে পুরোপুরি বদলে যায় জননিরাপত্তার ধরন।
সন্দেহ নেই, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মৌলিক প্রতিশ্রুতি হলো মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া, অধিকার রক্ষা করা। যুদ্ধকালে সেই নিরাপত্তা ব্যাহত হয় সবচেয়ে বেশি। কখনো কখনো নিরাপত্তার কাঠামো বদলে যায়। এমনকি সম্পূর্ণ ভেঙেও পড়ে। শান্তিকালে পুলিশ, আদালত, প্রশাসন ও জনগণের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে যা নিশ্চিত হয়, সেই স্বাভাবিক কাঠামো একেবারেই থাকে না।
জননিরাপত্তা শুধু আইন প্রয়োগের মতো বিষয় থাকে না। সেটা হয়ে যায় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। স্বাভাবিক সময়ে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে যায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদেরকে টার্গেট করে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীগুলো। সবচেয়ে শক্তিশালী মারণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা। প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কমানো, দুর্বল বা ধ্বংস করা, নির্মূল করার টার্গেট থাকে।
সরকার বদলে নিজেদের তাবেদারি সরকার প্রতিষ্ঠা করা, সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও আদর্শিক প্রসারই থাকে মূল লক্ষ্য। সেজন্য শত্রুপক্ষের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান, সামরিক-বেসামরিক, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক, কৌশলী নীতিনির্ধারকরা হন প্রধান শিকার। যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক অন্তর্ঘাতও সমান আকর্ষণীয় তাদের কাছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ, বেসামরিক নাগরিক, নারী-শিশু, যুদ্ধরত সৈনিক, ইউনিফর্মধারী বাহিনীর সদস্যরাও বিশেষ ঝুঁকিতে থাকেন। জাতির এই মহাসংকটে নাজুক হয়ে পড়ে জননিরাপত্তা। এমনকি যুদ্ধে আক্রান্ত কোনো কোনো দেশ নিয়ন্ত্রণ হারায় তার নিজস্ব ভূখণ্ড, রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের ওপরও। রক্তে লেখা ইতিহাসের ওই দুর্যোগকালে সাধারণ মানুষ হয় অনিরাপদ, অসহায়, বিপর্যস্ত।
আক্রান্ত দেশের প্রতিটি মানুষের নিজের প্রাণের ঝুঁকি থাকে, থাকে আপনজনকে বাঁচানোর তাড়না। স্বাভাবিক সময়ে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলো যেভাবে জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে, যুদ্ধকালে সেই পরিস্থিতি থাকে না। অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয় পুলিশকে। তখন কোনটা জননিরাপত্তা আর কোনটা প্রতিরক্ষা, সেই পার্থক্য নিরূপণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অক্সফোর্ড একাডেমিক রিসার্চ বলছে, যুদ্ধকালে জননিরাপত্তা আর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এতটাই অভিন্ন হয়ে পড়ে যে, সামরিক বাহিনী ও পুলিশের ভূমিকা তখন আলাদা করা দুরূহ হয়ে পড়ে। ঝাপসা হয় নীতি-নৈতিকতার সীমারেখা। এমনকি কোনো কোনো রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংগঠন যুদ্ধ ও অপরাধকে ‘প্রয়োজনীয় বা অপরিহার্য কাজ’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
ব্যক্তির জীবন, সম্ভ্রম ও মৌলিক অধিকার রক্ষা হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। থাকে না কোনো খাদ্যনিরাপত্তা। আশ্রয় হারিয়ে বহু মানুষ হয় উদ্বাস্তু, শরণার্থী। চিকিৎসার সুরক্ষা হয় সুদূরপরাহত। ভেঙে পড়ে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা। ব্যাংক-বিমা থেকে শুরু করে গৃহস্থের সম্পদ লুটপাট, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কালোবাজারি হওয়া, চোরাচালান বেড়ে যাওয়া হয়ে পড়ে স্বাভাবিক ঘটনা।
নেমে আসে খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ। স্পর্শকাতর স্থাপনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র, সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রাগার, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, সবকিছুর ওপরে নেমে আসে আঘাত। হঠাৎ নেমে আসা অনাহূত আঘাতে পুরো সমাজ হয়ে পড়ে বিশৃঙ্খল। শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে, তার চেয়ে বহুগুণ এবং বহুমাত্রিক ভয়ংকর আঘাত আসে। হিমশিম খায় সবগুলো সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সেক্টর।
যুদ্ধকালে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ হয়ে পড়ে দুর্বল। ওই শূন্যস্থান দখল করে নেয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। মানুষের দুর্ভোগের মাঝে ওরা গড়ে তোলে সংঘাত অর্থনীতি বা ওয়ার ইকোনমি। রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির বাইরে সম্পূর্ণ অবৈধ অর্থনীতি গড়ে ওঠে, যেখানে অস্ত্র, জ্বালানি, খাদ্য, মানবশ্রম সবই পরিণত হয় পণ্যে।
অবৈধ বাণিজ্য, অস্ত্র-গোলাবারুদ চোরাচালান, কালোবাজারি, মজুদদারি, প্রাকৃতিক সম্পদ, যেমন তেল, গ্যাস, খনিজ, কাঠ লুটপাট, মাদক ও মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, যুদ্ধ সহায়তার অর্থ আত্মসাৎ, শরণার্থী সংকটকে কাজে লাগানো, শিশু ও নারী পাচার, সব ধরনের সংকট সৃষ্টি করে কিছু মানুষরূপী অমানুষ।
ক্ষমতার শূন্যতায়, অর্থাৎ পাওয়ার ভ্যাকুয়ামে, যখন রাষ্ট্র পিছিয়ে যায়, তখন সামনে আসে মিলিশিয়া, সশস্ত্র গোষ্ঠী, অপরাধী নেটওয়ার্ক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। তারা রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করতে বিদ্রোহ করে। মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে বিভিন্ন অপরাধে জড়ায়। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক চক্রও হাত মেলায় তাদের সঙ্গে।
বিভিন্ন ধরনের ইস্যু সামনে এনে তারা অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলতে চায়। তারা ব্যস্ত রাখে আইন প্রয়োগকারী বাহিনীগুলোকে। সাজানো ছকেই চালায় ওই অধ্যায়। সক্রিয় হয় মদদপুষ্ট অপরাধীরা। একসঙ্গে রাজনৈতিক চাপ আর অপরাধী চক্রের উত্থানে গলদঘর্ম হয় পুলিশ।
বাড়তি শক্তি প্রয়োগ করতে গেলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। আবার নমনীয় হলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন অপরাধী চক্র রাজনৈতিক বা আদর্শিক রূপ ধারণ করে। একত্রে মিশে যায় রাজনীতি ও যুদ্ধাপরাধ। এক দুর্বোধ্য, বহুমাত্রিক ও সমাধান-দুরূহ সমস্যা এসে যায় আইন প্রয়োগকারীর সামনে।
যুদ্ধকালে পুলিশিংয়ে অসংখ্য সমস্যা আসে। সাধারণত যুদ্ধের আগেই সংকট প্রকট হয় যখন বিদেশি শত্রুর সঙ্গে হাত মেলায় দেশি বিশ্বাসঘাতকরা। প্রকাশ্য সশস্ত্র শত্রুর চেয়ে মোটেও কম বিপজ্জনক নয় ঘরের এই নীরব শত্রুরা। বরং কখনো কখনো নীরব শত্রু হয়ে ওঠে ভয়ংকর, প্রকাশ্য শত্রুর চেয়ে বিপজ্জনক। শত্রুর টার্গেট, কাঙ্ক্ষিত ইন্টেলিজেন্স সবই তুলে দেয় তাদের হাতে। বিভীষণ, মীরজাফর, জগৎশেঠদের মতোই তাদের ভূমিকা।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করেছিলেন একজন জেনারেল। সেই অভিযোগে প্রাণদণ্ড হয়েছে তার। ২০২৫ সালে হঠাৎ হামলা চালিয়ে বহু সংখ্যক জেনারেলকে হত্যা করে মোসাদ। বহু আগে থেকেই ইরানের অভ্যন্তরে প্রস্তুতি নিয়েছিল তারা। ড্রোনসহ বিভিন্ন অস্ত্র মোতায়েন করেছিল, যা দিয়ে নির্মূল করেছিল ইরানের ঊর্ধ্বতন সামরিক নেতৃত্ব। রক্ষা পাননি পরমাণুবিজ্ঞানী মোহসীন ফখরিজাদেহ। বিদেশি এজেন্টরা গোপনে কৌশলে কাজ করে।
রাষ্ট্রের চরম ক্রান্তিকালে সব পেশার মানুষের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমরা এখানে পুলিশের কিছু বিশেষ ভূমিকার ওপর আলোকপাত করব। পুলিশকে কিছু প্রস্তুতি নিতে হয় যুদ্ধের আগে থেকেই। কিছু ভূমিকা পালন করতে হয় যুদ্ধকালে। আবার যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরেও পুলিশকে পালন করতে হয় কিছু বিশেষ ভূমিকা।
যেকোনো নিরাপত্তা বিশ্লেষক, নিরাপত্তা সংস্থা আঁচ করতে পারেন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। বুঝতে পারেন যে, যুদ্ধ এগিয়ে আসছে। প্রস্তুতিটা তার আগেই নেন তারা। প্রতিপক্ষের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক যেমন সক্রিয়, তেমনি তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয় টার্গেট গ্রুপকেও। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং স্থাপনায় সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করেন তারা। সেই নিরাপত্তার কৌশলগত পরিবর্তন-পরিবর্ধনটা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় যুদ্ধের আগেই।
দেশের ভেতরে সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের ওপর নজরদারি বেড়ে যায় পুলিশের। জোরদার করা হয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা। এ সময় কিছু প্রশ্ন সামনে চলে আসে, কেউ কি নাগরিকদের মনোবলে আঘাত হানছে? অন্তর্ঘাতে জড়িত আছে কি কেউ? শত্রুর সঙ্গে কি ভেতরের কেউ হাত মেলাচ্ছে? দেশের অর্থনীতিতে কি কেউ আঘাত করতে যাচ্ছে? কোনো রাজনৈতিক শক্তি কি শত্রুপক্ষের সঙ্গে আঁতাত করছে? রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যাহত করার মতো নাশকতায় কেউ জড়িত হচ্ছে কি? জরুরি সেবা, খাদ্যনিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার মতো কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে কি? কোন কোন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ত? তাদের মূল বা প্রভাবশালী খেলোয়াড় কে? বিকল্প কে কে? তারা কার কার সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান করছে? কী কী তথ্য আদান-প্রদান করছে? যুদ্ধ বাধলে কেমন হতে পারে তাদের ভূমিকা? প্রতিরোধে করণীয় কী? ইত্যাদি।
পুলিশ নিরাপত্তা বিঘ্নকারী সরঞ্জাম, অস্ত্র-বোমা, গোলাবারুদ সংগ্রহ ও সরবরাহ করা অথবা নাশকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে তাদের ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। উগ্র ব্যক্তি বা চরমপন্থী সংগঠন, গোপন নেটওয়ার্ক, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল, রাজনৈতিক দাঙ্গা-সহিংসতার সম্ভাবনা, ভুয়া খবর, গুজব, বিভ্রান্তি ছড়ানো, মানুষকে উসকে দেওয়া, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা প্রভৃতি বিষয়ে নজরদারি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য, মিয়ানমার, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার যুদ্ধগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে পুলিশকে এক ধরনের বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো সামরিক শক্তি প্রয়োগের আগেই তৈরি করেছে যুদ্ধের মঞ্চ। প্রথমে মিডিয়া প্রচারণা দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছে। সেই সঙ্গে এনেছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। তৎপরতা বেড়েছে দেশি-বিদেশি শক্তিগুলোর।
হোটেল, গেস্টহাউস, ভাড়াবাসায় আগন্তুকের সমাগম বৃদ্ধি, সামাজিক ও বাণিজ্যিক গণমাধ্যমে উত্তেজনা বা ভীতি ছড়ানো, নিষিদ্ধ সংগঠনের গোপন মিটিং, নতুন সদস্য সংগ্রহের মাত্রা বৃদ্ধি, বিদেশি, বিশেষ করে শত্রুপক্ষ প্রভাবিত গণমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানোর মাত্রা বেড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে পেশাদার পুলিশ জনসম্পৃক্ততা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বাড়িয়েছে। প্রত্যেক সমাজে কিছু অপেশাদার, অবিশেষায়িত মানুষ থাকেন, যারা নিরাপত্তার কাজে নিবেদিতপ্রাণ। বিশেষ করে সংকট মোকাবিলায় তারা চুপ করে বসে থাকেন না। সেসব মানুষের নেটওয়ার্ক আগে থেকেই সক্রিয় রাখে পুলিশ।
যুদ্ধ-পূর্ববর্তী গোয়েন্দা তথ্যপ্রাপ্তি এবং যুদ্ধকালীন সহায়তা পেতে সেই কৌশল বেশ কার্যকর। এছাড়া পুলিশ নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে গোয়েন্দা তথ্য পেতে। জননিরাপত্তা এবং সামরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধকালে যেসব অপরাধের কথা বলা হলো, সেসব বহুমাত্রিক অপরাধ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব হলো পুলিশসহ সকল নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর। মানুষের মনে ভীতি, উত্তেজনা ছড়ানো, দেশের বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ ও আদর্শের মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির অপচেষ্টা চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো বন্ধ এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব হলো পুলিশের। সেটা বিচ্ছিন্নভাবে সম্ভব নয়। বরং নিরাপত্তা সব সময়ই সমন্বিত প্রয়াস।
অপরাধের মাত্রা ও ব্যাপ্তি এতটাই প্রসারিত হয় যে, নিয়মিত বাহিনীর সদস্য দিয়ে ঝুঁকির ন্যূনতম অংশও পূরণ করা সম্ভব হয় না। সেজন্য সব পেশার মানুষের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে।
যুদ্ধে হেরে যাওয়ার অর্থ হলো, নিজে দাস হওয়া এবং বংশপরম্পরায় দাসত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া; যেখানে সম্পদ, সম্মান, সম্ভ্রম ও মর্যাদার কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। দাস হওয়ার চেয়ে শহীদ হওয়া অনেক বেশি মর্যাদার, এই বাস্তবতা বোঝানোর ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
যুদ্ধে মানবিক ও প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, উপযুক্ত স্থানে সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আগন্তুক, অনাহূতদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক ও অন্যান্য যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় আড়ি পেতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়।
আধুনিককালে যুদ্ধে শুধু শত্রুসেনাই নয়, বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠী, অপরাধী নেটওয়ার্ক ও বিদ্রোহী দল সবাই একসঙ্গে কাজ করে। রুশ-ইউক্রেনে চলমান একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সম্প্রতি চোরাকারবারিদের সহায়তায় সীমান্ত দিয়ে রাশিয়ায় ড্রোন ঢুকিয়েছে ইউক্রেন। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের আওতার বাইরে গিয়ে সেই ড্রোন সক্রিয় করেছে। রাশিয়ার বিমানশক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে ওই আঘাত দিয়েই।
তাই সীমান্ত দিয়ে আসা সব যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহন যথাযথভাবে চেক ও সার্চ করা অনিবার্য। অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক আটক করা, সবগুলো গুদাম, কনটেইনার ক্রমাগত চেক-সার্চ করা যুদ্ধকালীন পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সন্দেহভাজন বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল প্রভৃতির ওপর প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হয়। কৌশলগত গ্রেপ্তার জরুরি হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশের গ্রামগুলো প্রতিরক্ষাবান্ধব। যুদ্ধকালে সেগুলোকে আরও নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন হয়।
কোন জায়গায় কতটুকু পরিখা খনন বা বাংকার তৈরি শত্রুপক্ষকে আটকানোর জন্য সহায়ক হবে, সেটা নির্ণয় করা হয় যুদ্ধের আগেই। কোন জায়গায় ব্রিজ-কালভার্ট ও অন্যান্য স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ, কতটা মূল্যে সেগুলোর সুরক্ষা দিতে হবে অথবা গুঁড়িয়ে দিয়ে শত্রুর অগ্রাভিযান বা সরবরাহ লাইন ভেঙে দিতে হবে, সেটিও খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরামর্শ এ ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্থানে স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শত্রুর গতি থামিয়ে দিতে হবে। এই কাজে পুলিশের ভূমিকা অনন্য।
যুদ্ধ এলাকার বেসামরিক লোকদের সরিয়ে নেওয়া, বিপন্ন, উদ্বাস্তু মানুষের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিপক্ষের সাইবার হামলা প্রতিহত করা, দেশীয় তরুণদের সম্পৃক্ত করা, নিরাপত্তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা, ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানানো, আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করা, পলাতক সৈনিকদের গ্রেপ্তারে সেনাবাহিনীকে সহায়তা করা, যুদ্ধাপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, বিদেশি দূতাবাসের কূটনীতিক, বিদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা দেওয়া, একই সঙ্গে গুপ্তচর চিহ্নিত করা, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, গ্রেপ্তারকৃত শত্রুসেনাদের ক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশনের অধীনে অধিকার নিশ্চিত করা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একই সঙ্গে দেশীয় পলাতক সৈনিকদের গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও পুলিশকে তৎপর থাকতে হয়। কারও মানবাধিকার যেন বিনষ্ট না হয়, সেই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। যুদ্ধকালে অনানুষ্ঠানিক বিচার নিয়ন্ত্রণ, মব জাস্টিস নিয়ন্ত্রণ, জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন নিয়ন্ত্রণ, কারারুদ্ধ অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধাবস্থায় সমাজের দুর্বল অংশের নিরাপত্তা দেওয়ার গুরুত্ব বেড়ে যায়। এ সময় সংসারবিচ্ছিন্ন নারী ও শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়। তাদের নিরাপত্তা দেওয়া পুলিশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ঘাপটি মেরে থাকা আরেকটি গ্রুপ খুব সক্রিয় হয়। সেটা হলো হানিট্রাপার। শত্রুপক্ষ সহজেই হানিট্রাপ করতে চায়। ঘায়েল করতে চায় প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের। সেই সোশ্যাল গার্ল বা সিলি গার্লদের নিয়ন্ত্রণ করা অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থাকে তাদের সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েও পুলিশ ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।
তখন রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানুষের অধিকার রক্ষা, অপরাধ, বিদ্রোহ, সন্ত্রাস দমনের মতো বড় বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামনে আসে। সেখানে থাকে ছোট, বড়, চেনা-অচেনা নানা অপরাধী। ক্ষমতার যত কাছে অবস্থান, অন্তর্ঘাত চালানোর সুযোগ ও সক্ষমতা ততটাই বেশি। তাই তাদের প্রতি নজরদারিটা বেশি প্রয়োজন।
যুদ্ধকালে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যা হয়। অনানুষ্ঠানিক বিচারের ঝুঁকি নেয় কেউ কেউ। কিন্তু সেটা বিপজ্জনক। অপেশাদার ব্যক্তিদের ভুল বিচার বিশাল এজেন্ডা, সেন্টিমেন্ট সৃষ্টি করতে পারে, যা সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুদ্ধকালে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সারা পৃথিবীতেই পুলিশ কিছু সাধারণ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। রাতের বেলা জনগণের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। জরুরি প্রয়োজনে রাষ্ট্র ব্ল্যাকআউট বা আলো নিভিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়। শত্রুর বিমান হামলা অকার্যকর করতে সেটা কিছুটা হলেও সহায়ক। ওই সময় সাধারণ মানুষের চলাফেরায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
নিতান্তই নিরুপায় হলে জরুরি মেডিকেল সহায়তার জন্য মানুষ বের হতে পারে। তবে তাকে বের হতে হয় নিজেকে শনাক্ত করা যায়, এমন আলো হাতে। হতে পারে লণ্ঠন বা মোমবাতি। নইলে পড়তে পারে ট্রিগারের নিশানায়।
দিনে-রাতে পুলিশকে নিশ্চিত হতে হয়, শত্রু ভেতরে প্রবেশ করেনি। তাই চেক করতে হয় নাগরিক সনদপত্র। পথে পথে বসাতে হয় চেকপোস্ট। কৌশলগত কারণে বারবার সেই চেকপোস্টের স্থান পরিবর্তন করে পুলিশ। খাদ্য ও জ্বালানি রেশনিং হলে ঠিকমতো সবাই পাচ্ছে কিনা, তা দেখাও পুলিশের কাজ।
গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জনগণের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা, চুরি, ঘরবাড়ি লুটপাট, ধ্বংসযজ্ঞ, সহিংসতা দমন পুলিশের বড় দায়িত্ব।
যুদ্ধের সময় সুযোগসন্ধানী শ্রেণির প্রাদুর্ভাব ঘটে। প্রাণভয়ে পালাতে থাকা মানুষদেরও সবকিছু কেড়ে নিতে চায় লোভী-লুটেরার দল। সুপ্রাচীনকাল থেকেই সেই দৃশ্য বিদ্যমান।
যুদ্ধকালে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, দায়িত্বরত পুলিশও হয় সহজ টার্গেট। খুব উন্নত অস্ত্র নেই পুলিশের। প্রতিপক্ষের সামরিক বাহিনীর বিপক্ষে দাঁড়ানোর জন্য নেই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তাই নিয়মিত দায়িত্ব পালন করলেও পুলিশ এক ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করে। অফিসের স্থান বদলায় ঘনঘন। বদলে ফেলে পোশাকও। পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারগুলো সেটা পারে না বলে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি। চারদিকে যুদ্ধ, বোমা হামলা, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগোতে হয়। জীবনের ঝুঁকি, মৃত্যুর মধ্যে নিজে বাঁচা, মানুষকে বাঁচানোর এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি কাজ করে সবার মাঝে।
যুদ্ধে শুধু গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্রের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয় আরেকটি অস্ত্র, তথ্যাস্ত্র। মানুষের মননে আঘাত করা হয়, যাকে বলে অন্তর্ঘাত। জনগণকে উজ্জীবিত করে শত্রুকে মোকাবিলায় ব্রত থাকেন কেউ। কেউবা ঝুঁকিগুলোকে সামনে আনেন। মানুষের প্রতিরোধী চেতনা, সাহসের দেয়াল ভেঙে দিতে চায়। ব্যবহার করে তথ্যাস্ত্র। ভুয়া, বানোয়াট খবর ছড়িয়ে দেয়। শত্রুকে দানবীয়, দুর্দমনীয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে।
বিপরীতে আক্রান্ত দেশ নিজেদের ঐক্যবদ্ধ, যেকোনো মূল্যে শত্রুকে প্রতিহত করার বাণী প্রচার করে। একটি উজ্জীবিত জাতি যে কতটা শক্তিশালী, তা যুগে যুগে প্রমাণিত হয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজয়ের পর মার্কিন বাহিনীর সদস্যরা সবাই বলেছিল, তারা জনগণের মননের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ। তাই হেরেছিল ওই যুদ্ধে।
ইরাক, আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রচারণাকে নিয়ে গিয়েছিল রোমান্টিক পর্যায়ে। যুদ্ধের প্রচারণাকে অনেকটাই আকর্ষণীয় উৎসবে রূপান্তরিত করে পশ্চিমারা। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে সংবাদ পাঠক-পাঠিকার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন ইউনিফর্ম পরিহিত অফিসারগণ। নিয়মিত সংবাদ উপস্থাপকরা হয়ে যান দর্শক-শ্রোতা।
সত্তরের দশকে মার্কিন জেনারেল সিডল গবেষণা করে যে এমবেডেড জার্নালিজম চালু করেছিলেন, সেটাও পলিসি ও প্র্যাকটিসে এক হয়ে যায়নি। ইরাকি, আফগানরা বিদেশি প্রচারণায় আর বিমোহিত হয়নি। যুদ্ধকালে জনমনে ঝুঁকিবোধ তৈরি করে, এমন তথ্য নিয়ন্ত্রণ করে সারা পৃথিবীতেই। সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণভাবে বড় ভূমিকা আছে পুলিশের।
ফিলিপ এম টেইলর এক গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা লন্ডনে বসে প্রচারণা চালিয়েছে। জার্মান সেনাদের মনোবল ভাঙতে চালিয়েছিল. ক্রমাগত ডিজাইনড প্রোপাগান্ডা। সেই কাজে ব্রিটিশরা স্বদেশি-বিদেশি প্রচারণা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করেছিল।
আজকের দিনে ইন্টারনেট, সামাজিক গণমাধ্যম সেই চ্যালেঞ্জকে তীব্রতর করেছে। হলুদ সাংবাদিকতার জনক হিসেবে পরিচিত র্যান্ডলফ হার্স্ট যেমন তার রিপোর্টার রেমিংটনকে কিউবায় পাঠিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি ছবি পাঠাও, আমি যুদ্ধ সাজাব। আজকের দিনেও যুদ্ধ সাজাতে, জনমত গঠন করতে, গতিবিধি নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয় তথ্যাস্ত্র।
পুলিশসহ সকল আইন প্রয়োগকারীর দায়িত্ব যথাযথভাবে মিডিয়া অ্যানালাইসিস করে জনগণের হৃদয় ও মস্তিষ্কের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সচেষ্ট থাকা। যুদ্ধের সময় সাংবাদিক পরিচয়ে গুপ্তচরবৃত্তি সবচেয়ে সহজ। তাই কে সাংবাদিক, কে ‘পঞ্চম বাহিনীর সদস্য’ আর কে গুপ্তচর, সেটা নির্ণয় করা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা এবং নিরাপত্তার জন্য উপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব।
ওই সময় পুলিশকে একটি বিষয়ে বেশ সতর্ক থাকতে হয়। মনে রাখতে হয় যে, যুদ্ধ-সংক্রান্ত কোনো সংবাদ প্রচার বা গ্রেফতারকৃত আসামিকে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকারের শীর্ষমহল। পুলিশ আগ বাড়িয়ে কোনো তথ্য দেবে না। নিতান্তই মিডিয়ার মুখোমুখি হলে জানিয়ে দেবে যে, যুদ্ধবিষয়ক সমস্ত তথ্য দেবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর। সেখানে যোগাযোগের অনুরোধ করবেন জিজ্ঞাসিত কর্মকর্তা।
এছাড়া যুদ্ধের ছবি-ভিডিও ধারণ বা প্রচারণা নিয়ন্ত্রণও যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে, সপক্ষের সৈনিকরা কী পোশাক ও অস্ত্র ধারণ করে আছে, কোথায় অবস্থান করছে, তা প্রকাশিত হলে ঝুঁকির কারণ হয়। তাই যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য বা ছবি-ভিডিও নিয়ন্ত্রণও যুদ্ধকৌশলের অংশ। সে ব্যাপারে শুধু জনসচেতনতাই নয়, আইন প্রয়োগও অনিবার্য।
যুদ্ধকালে সরকার ও সামরিক বাহিনীর ব্রিফিং ছাড়া অন্য সব তথ্য বিসর্জন দিতে হবে। নইলে দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রচারণা বা দেশদ্রোহের দায়ে কাঠগড়ায় উঠতে হতে পারে। আধুনিক যুদ্ধে আরেকটি বড় ঝুঁকি আসে সাইবার জগৎ থেকে। সরাসরি গুলি না চালিয়েও কোনো দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, গ্যাস, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা হ্যাক করে ফেলতে পারে হ্যাকাররা। সেনাবাহিনীর যোগাযোগ সিস্টেমে ঢুকে ভুল তথ্য দিতে পারে। ধ্বংস করতে পারে মিসাইল, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। নষ্ট করে দিতে পারে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে অর্থনৈতিক খাতে। গোপন নথি, সামরিক পরিকল্পনা চুরি করে ফেলতে পারে। সেই কাজ করতে পারে দেশি-বিদেশি শত্রুপক্ষ।
সাইবার আক্রমণ থেকে নাগরিক তথ্যকে সুরক্ষা দেওয়া, ডিজিটাল অবকাঠামো রক্ষা করা, অনলাইন গুজব ও বিভ্রান্তি নিয়ন্ত্রণ, মিথ্যা তথ্য সম্পর্কে সতর্ক করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, পুলিশের। পুলিশকে তার অধিক্ষেত্রের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে হবে। বিশ্বের বহু দেশের পুলিশ ট্যালেন্ট হান্ট, ট্রাবলশুটিং কম্পিটিশনের মাধ্যমে দক্ষ তরুণদের নিয়োগ দিয়েছে সাইবার নিরাপত্তায়। বাংলাদেশ পুলিশ এ ক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে। এ কারণে সাইবার ব্যাটালিয়ন গঠন এখন সময়ের দাবি।
আধুনিক যুদ্ধের ফলাফল ব্যাপকভাবে নির্ধারিত হয় জনগণের ভূমিকার ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই এসেছিল বেসামরিক পটভূমি থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে যেসব দেশ স্বাধীন হয়েছে, সবখানেই ছিল জনযুদ্ধ, গেরিলাযুদ্ধ। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান কোনোটাই এর ব্যতিক্রম নয়।
তাই জননিরাপত্তা হোক, হোক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সবখানেই নায়ক হলেন সাধারণ জনগণ। যুদ্ধকালে হোক, হোক শান্তিকালে, যারা যত মানুষকে সম্পৃক্ত, ঐক্যবদ্ধ, উদ্দীপ্ত করতে পারবেন, ততটাই সফল হবেন তারা।
আধুনিক যুদ্ধ তাই একটি সমন্বিত উদ্যোগ, যেখানে নীতিনির্ধারক, সামরিক বাহিনী, জননিরাপত্তায় নিয়োজিত বাহিনীসমূহ এবং জনগণ সম্মিলিতভাবে একটি দেশ ও জাতিকে রক্ষা করে থাকেন বিদেশি আক্রমণের হাত থেকে। জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ ১৯৭১ সালেও করেছে পুলিশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের বহু দেশে বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল, যা যুদ্ধকালীন জননিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করে। ওই সময় হঠাৎ সামরিক বাহিনীতে বহুসংখ্যক লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়।
যুদ্ধকালীন অর্থ সংগ্রহ, অস্ত্র বা উপকরণ জোগাড়, প্রশিক্ষণ দেওয়া, নজরদারি করার দায়িত্ব পুলিশেরই। এমনকি কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, পুরুষ পুলিশ সদস্যরা চলে গেছে যুদ্ধক্ষেত্রে, নারীরা নিয়েছে পুলিশি দায়িত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে চীনে নারীরা এই দায়িত্ব পালন করেন। জৈন সাহিত্য ও বৌদ্ধদের জাতকের গল্পে যক্ষী বা নারী আইন প্রয়োগকারী কর্তৃক দুর্ধর্ষ গোয়েন্দাগিরির বিবরণ মেলে।
জাতির সবচেয়ে সংকটময় সময়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দায়িত্ব পালন করে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী। রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের সময় থেকেই সামরিক বাহিনী ও পুলিশ অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দুটো সাধারণ স্তর আছে। একটি হলো অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিরসন, অন্যটি বাইরের আঘাত প্রতিহত করা। যুদ্ধকালে একই সঙ্গে হুমকির মধ্যে পড়ে ওই দুটোই। তখন নিরাপত্তা আর প্রতিরক্ষা আলাদা করা যায় না।
সেটাকে তুলনা করা যায় একটি বাদামের সঙ্গে। যদি বাদামের খোসা ভেঙে যায়, তবে ভেতরের বাদাম সহজলভ্য হয়ে যায় শত্রুর কাছে। আবার ভেতরের শাঁস বা বাদাম যদি নষ্ট হয়ে যায়, পচে যায়, তখন সহজেই ভেঙে যায় বাইরের খোসা। তাই কোনো দেশকে দখল করতে চাইলে ও পদানত করতে চাইলে নিরাপত্তার ওই দুটো স্তরকেই ভেঙে ফেলতে চায় প্রতিপক্ষ।
অভ্যন্তরীণ জননিরাপত্তা ও বাইরের প্রতিরক্ষা দুটোই হয় সমান টার্গেট। বাইরের আঘাত প্রতিরোধে সবসময়ই এগিয়ে থাকে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীগুলো। আর দেশের ভেতরে সুরক্ষা দেয় পুলিশ, আনসার-ভিডিপি। স্মরণাতীতকাল থেকে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটি চমৎকার রসায়ন আছে। অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলায় পুলিশ যখন হিমশিম খায়, তখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় সামরিক বাহিনী। আর যুদ্ধ হলে পুলিশ দাঁড়ায় সামরিক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে। কখনো কখনো মিশে যায় তাদের সঙ্গে।
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র ৩৩ হাজার পুলিশ সদস্য ছিল। তার মধ্যে প্রায় ১৪ হাজারই চাকরি ছেড়ে দেন। সরাসরি অংশগ্রহণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। এখনো আইন অনুযায়ী পুলিশের একাংশ অংশ নেবে সশস্ত্র যুদ্ধে। অন্যরাও যে বসে থাকবেন না, তাতে সন্দেহ নেই।
যুদ্ধ শুরু হলে স্বাভাবিক আইন থাকে না। চালু হয় সামরিক আইন। প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ে বিচারব্যবস্থা। সীমিত হয়ে পড়ে মানুষের স্বাধীনতা। ব্যাহত হয় যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা। কারফিউ জারি করা হয় নানা সময়ে। ফলে জননিরাপত্তা আর অধিকারভিত্তিক থাকে না, সেটি চলে যায় নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে।
এই পরিবর্তিত বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে হয় পুলিশ বাহিনীকে। জননিরাপত্তার নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠে সেনা-পুলিশ-আধাসামরিক বাহিনীর মিশ্রণ। এটি একটি জটিল কাঠামোতে রূপ নেয়। এই সমন্বয় অনেক সময় খুব ভালোভাবে কাজ করে। অনেক সময় আবার গ্যাপও হয়ে যায়। নেতৃস্থানীয় অফিসারদের দায়িত্ব হলো পারস্পরিক সহযোগিতা ও শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা। নইলে উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও জনগণ।
যুদ্ধকালে পুলিশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সামরিকীকরণ। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এটা বেড়েছে। আর শীতল যুদ্ধের সময় তা হয়েছে প্রবল। সামরিক পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে অন্যান্য গিয়ার, অস্ত্রশস্ত্র, যানবাহন, যোগাযোগ ও পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত ধাতস্থ হতে হয়। আইন অনুযায়ী এপিবিএন এই দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের পরিবর্তিত অস্ত্র এবং নানা কৌশলগত প্রযুক্তিতে বাহিনীটি ব্যাপকভাবে পিছিয়ে আছে। যুদ্ধের আবহে খাপ খাওয়াতে হলে পুলিশের এই ইউনিটটির সংস্কার প্রয়োজন। এককথায়, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পুলিশকে পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্বেগজনক দিকগুলো সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। আর্থিক ও লজিস্টিকস সাপোর্ট নিয়ে অভ্যন্তরীণ এবং বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে কৌশলগত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশিক্ষিত ও জটিল পরিস্থিতিতে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পুলিশ ও সেনা সদস্যদের মধ্যে নিশ্ছিদ্র ও নিরবচ্ছিন্ন সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেন যুদ্ধকালে সমঝোতার কোনো ঘাটতি না থাকে। প্রশিক্ষিত সদস্যদের এই মনোভাব বিরাজমান থাকতে হবে যে, যেকোনো সময়ে যুদ্ধ হতে পারে, তারা যুদ্ধের মধ্যেই আছে এবং যুদ্ধ করেই তাদের টিকে থাকতে হবে।
বহুসংখ্যক মানুষের প্রাণ আর সম্পদের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যুদ্ধ থামে। অনেক ব্যথা নিয়ে অনেকে ঘুমাতে যায়। কিন্তু পুলিশের জন্য রয়ে যায় অজস্র চ্যালেঞ্জ। রয়ে যায় যুদ্ধের রেশ। তখনো মানুষের হাতে অস্ত্র থাকে। তখনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সক্রিয় থাকে। পুলিশকে তখনো সজাগ থাকতে হয়। আবার নির্ঘুম রাত জেগে যেতে হয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে। যেতে হয় সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে নিয়ন্ত্রণে।
যুদ্ধ-পরবর্তী তদন্ত, বিচার, শরণার্থী পুনর্বাসন ও সুরক্ষা, স্থানীয় শাসন পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়। অপরাধের নেটওয়ার্কে থাকা মানুষগুলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনে নিয়োজিত থাকতে হয়।
লেখক
ডিআইজি
পিআরএল

