সুবিদিত যে, দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড আইনটি ১৮৬০ সালে প্রণীত হয় এবং ১৮৬২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয়। আমরা জানি, ১৮৫৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে সিপাহি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা এটিকে উপমহাদেশে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের ১০০ বছর পূর্তিতে জনগণের তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তাদের কুশাসনে সাধারণ মানুষের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। মূলত সিপাহি বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। এর এক বছর পর, অর্থাৎ ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ব্রিটিশ রাজের সূচনা ঘটে। এর ঠিক দুই বছর পর দণ্ডবিধি প্রণীত হয়। আলোচ্য নিবন্ধে দণ্ডবিধি প্রণয়নের সময়কে সমাজ, অর্থনীতি এবং অপরাধচিন্তার নিরিখে বিশ্লেষণ করা হবে। সংগত কারণে ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার সমাজ ও সামাজিক অর্থনীতি এবং অপরাধচিন্তার বিষয়টি তুলে ধরা হবে। আমরা জানি যে, কোনো সমাজ প্রাগত দিক থেকে পরিচালিত হয় শৃঙ্খলা ও শাস্তির নিরিখে। ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী তাদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ রাখা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে শাসনকে অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। এই নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক ও আইনি সম্মতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে, কেউ যদি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে, সেক্ষেত্রে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়।
এই ধারণাকে সামনে রেখে এবং ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে দণ্ড সম্পর্কিত আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা রেখে দণ্ডবিধি বা পেনাল কোড প্রণয়ন করা হয়েছে। এর শাস্তির বিষয়টি বিশ্লেষণ করে এ আইনের পেছনে ঔপনিবেশিক ভাবাদর্শগত প্রভাব, কর্তৃত্ব ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক মূল্যবোধ, দণ্ডনীতির মানদণ্ড এবং বিচ্যুত আচরণের বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবি রাখে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার অপরাধ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা রক্ষা ও সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রে পেনাল কোডের কার্যকারিতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দণ্ড বিষয়টিকে আমরা শাস্তি বললেও এর সঙ্গে শাসননীতি বা শাসনপ্রক্রিয়ার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
দণ্ড বলতে আমরা কী বুঝি?
ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার বিবর্তনের ক্ষেত্রে এখানকার ভৌগোলিক অবস্থা, নদ-নদীর চরিত্র, কৃষিজীবনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যায় না। সে সময় এ অঞ্চলে নদীনির্ভর অর্থনীতির অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়। এটি ছিল এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নদী ও জলপথগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পরিবহন এবং জীবিকার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করত।
সে সময় রাষ্ট্রের প্রতি প্রজার আনুগত্য নির্ভর করত খাজনা প্রদানের মাধ্যমে। খাজনা প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজেকে সে একজন অনুগত প্রজায় পরিণত করত। এর ব্যতিক্রম কখনো কাম্য নয়। ব্যত্যয় ঘটলে তা একজন প্রজার দুর্বিনীত মনোভাব ও ঔদ্ধত্যের প্রকাশ ঘটায়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার ওপর দণ্ডনীতি আরোপ করে।
সাধারণ অর্থে দণ্ড বলতে আমরা আইন বা নিয়ম ভঙ্গের কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর আরোপিত শাস্তির যন্ত্রণাদায়ক বা কষ্টকর ফলাফল বা শাসনকে বুঝিয়ে থাকি। কেউ অন্যায় বা অপরাধ করলে এবং সেটি প্রমাণিত হলে ব্যক্তির ওপর দণ্ড বা শাস্তি আরোপ করা হয়।
দণ্ডবিধি প্রণয়নের পূর্বে জমিদার, ইজারাদার, পত্তনিদার প্রভৃতি রঙ-বেরঙের মধ্যস্থতাকারী শোষকরা কৃষকদের ওপর যেসব নির্যাতন চালাত, তার একটি তালিকা তত্ত্ববোধনী প্রকাশ করেছিল, যা নিম্নরূপ:দণ্ডাঘাত ও বেত্রাঘাত, চর্মপাদুকা প্রহার, বাঁশ ও কাঠ দিয়ে বক্ষস্থল দলন, খাপরা দিয়ে নাসিকা কর্ণ মর্দন, মাটিতে নাসিকা ঘর্ষণ, পিঠে হাত বেঁকিয়ে বেঁধে বংশদণ্ড দিয়ে মোড়া দেওয়া, গায়ে বিছুটি দেওয়া, হাত-পা নিগড়বদ্ধ করা, কান ধরে দৌড় করানো, ফাটা দুখানা বাঁধা বাখারি দিয়ে হাত দলন করা, গ্রীষ্মকালে ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে পা ফাঁক করে দাঁড় করিয়ে, পিঠ বেঁকিয়ে পিঠের ওপর ও হাতের ওপর ইট চাপিয়ে রাখা, প্রচণ্ড শীতে জলমগড়ব করা ও গায়ে পানি নিক্ষেপ করা, গোণীবদ্ধ করে জলমগড়ব করা, বৃক্ষে বা অন্যত্র বেঁধে লঙ্কার ধোঁয়া দেওয়া, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে ধানের গোলায় পুরে রাখা, চুনের ঘরে বন্ধ করে রাখা, কারারুদ্ধ করে উপোস রাখা, গৃহবন্দি করে লঙ্কার ধোঁয়া দেওয়া।
উল্লিখিত শাস্তির মাত্রা ও পরিমাণ পর্যালোচনা করে আমরা বলতে পারি, শাস্তিসমূহের সুনির্দিষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ মানদণ্ড নেই। একটি ভারসাম্যপূর্ণ শাস্তির পরিমাপ নির্ধারণের জন্য দণ্ডবিধি প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। লর্ড ম্যাকলে দণ্ডবিধির খসড়া প্রস্তুত করেন এবং ১৮৩৭ সালে তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড অকল্যান্ডের নিকট উপস্থাপন করেন। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরীক্ষানিরীক্ষার পর ১৮৫৬ সালে লেজিসল্যাটিভ কাউন্সিলে উপস্থাপনের পর ১৮৬০ সালের ৬ অক্টোবর তা অনুমোদিত হয়।
আমরা জানি, দণ্ডবিধিতে কেউ অন্যায় বা অপরাধ করলে এবং সেটি প্রমাণিত হলে ব্যক্তির ওপর শাস্তি বা দণ্ড আরোপ করা হয়, যা নিম্নরূপ:
১. মৃত্যুদণ্ড
২. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
৩. কারাদণ্ড
৪. সম্পত্তির বাজেয়াপ্তি
৫. জরিমানা বা অর্থদণ্ড
দণ্ডবিধি ও ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার সমাজ
“টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশী,
হাড়ীত ভাত নাহি নিতে আবেশী”
-(চর্যাপদ-৩৩)
অর্থাৎ, টিলার ওপর আমার ঘর, আমার কোনো প্রতিবেশী নেই। আমার হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ নিত্য অতিথি আসে। অষ্টাদশ শতকে জমিদারদের নিপীড়ন, ইজারাদারদের লোভ ও অর্থলিপ্সা, সমাজে ধনী ও দরিদ্রদের সম্পদবৈষম্য মানুষের জীবনকে শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত করেছিল। একজন দিনমজুর সারা দিন পরিশ্রম করে গড়ে এক টাকা উপার্জন করতে পারত না। এই এক টাকায় সে চাল কিনবে না কুপি জ্বালাতে কেরোসিন কিনবে?-এ রকম সীমাবদ্ধতায় জীবন হয়ে পড়েছিল দুর্বিষহ। সমাজ ছিল নানা রকম অবহেলায় ভরপুর। একদিকে তথাকথিত বাবু কালচারের নামে বিলাসী জীবন ও অর্থব্যয়, ভোগ-বিলাসে একটি সুবিধাভোগী ও রাজানুগত শ্রেণির উদ্ভব এবং বিপরীতে দরিদ্র শ্রেণির নিয়মিত নিঃশেষণের কারণে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। কৃষি কারিগরি দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় উৎপাদন হয়ে পড়েছিল স্থবির।
যদিও গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধি ব্যবস্থার অধীন, এখানে তাদের ছিল নিজস্ব আচার ব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন এবং নিজস্ব গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির ওপর হস্তক্ষেপ গ্রামের মানুষ পছন্দ করত না। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথ ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল স্লো ও ধীরগতির। নদীকেন্দ্রিক বসতি গড়ে ওঠায় গ্রামীণ জনপদে কৃষি বিনিময় প্রক্রিয়া চালু ছিল। সে সময় যোগাযোগের প্রধান ও জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল নৌকা।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সুবে বাংলার নবাব সিরাজ উদ্দৌলার পরাজয় এবং ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে মীর কাশিমের রাজয়ের কারণে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিরঙ্কুশ আধিপত্য সূচিত হয়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে সমাজ, রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতিতে। এ সময় বাংলা থেকে নিয়মিতভাবে সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করা হতো। পলিমাটি দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলার উর্বর জমি, প্রাকৃতিক জলসেচ ব্যবস্থা, শান্ত ও পরিশ্রমী মানুষ ও বাংলার কৃষকের অপরিসীম গুণের কারণে পূর্ব বাংলার কিছু অঞ্চলে আর্থিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় বাজারের উপযোগী অনেকগুলো পণ্য বাংলায় উৎপন্ন হতো। বিভিন্ন ধরনের সুতি বস্ত্র, মসলিন ও রেশমের চাহিদা লক্ষ করা যায়। অষ্টাদশ শতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উদ্ভব ও শিল্প বিপ্লবের অভিঘাতে বাংলার সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটতে থাকে। মুসলমান সমাজ সামাজিক স্তর বিন্যাসের দিক থেকে আশরাফ ও আতরাফে বিভক্ত ছিল। আশরাফ বলতে আরব, পারস্য বা উচ্চ বংশীয় মুসলমান বংশোদ্ভূতদের বোঝায়, আর আতরাফ বলতে স্থানীয় হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত নিম্নবর্ণের মুসলমানদের বোঝায়। যদিও ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন তার লেখা ‘ইসলামের উত্থান ও বাংলা সীমান্ত’ গ্রন্থে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ধর্মান্তরের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। হিন্দু ধর্মে চতুরবর্ণ প্রচলিত ছিল, যা মনুস্মৃতি অনুযায়ী কর্ম ও গুণ অনুসারে মানুষকে চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করে। এ চার বর্ণ হলো-ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।
এ আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, অর্থ, বিত্ত ও ক্ষমতা কাঠামোর কারণে সমাজ ছিল বিভক্ত। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের ভাষায়, এই বিভাজন ছিল সম্পদের নিরিখে। আবার রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজ ও কমিউনিটির আবেদন বেশি থাকায় জনগণ সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলত। অনেক সময় প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা সমাজের নিয়ম-নীতিকে অস্বীকার করে নিজেদের নিয়ম-নীতি চাপিয়ে দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়।
দণ্ডবিধি ও পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক পটভূমি
ঊনবিংশ শতকে পূর্ব বাংলার নব্বই শতাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত। এদের প্রধান পেশা ছিল কৃষি। বাকেরগঞ্জ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ডব্লিউডব্লিউ হান্টার বলেছেন, ‘জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল। এখানকার প্রায় প্রত্যেক অধিবাসী, এমনকি গৃহভৃত্যগণও, অল্প অল্প জমির মালিক। তারা তাদের পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য ধান এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন করে থাকে। এ কারণে এখানে মজুরির বিনিময়ে শ্রমিক খুবই দুষ্প্রাপ্য।
গ্রামবাসীদের প্রধান খাদ্য ভাত, মাছ, শাকসবজি। কিন্তু সচ্ছল মুসলমানগণ খাদ্য হিসেবে প্রাণীজ আমিষ, বিশেষ করে হাঁস-মুরগি এবং খাসির মাংস পছন্দ করে।’
অষ্টাদশ শতকে বাংলার আর্থিক জীবনধারা ছিল দুই ভাগে বিভক্ত। প্রাক-পলাশী যুগে আর্থিক ব্যবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত অবাধ, মুক্ত ও স্বাধীন। পলাশী উত্তরকালে বাংলার অর্থনীতি ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারি বাণিজ্য এবং কোম্পানির কর্মচারী ও স্বাধীন বণিকদের বেসরকারি বাণিজ্য দ্বারা অনেকখানি নিয়ন্ত্রিত। এ শতকের দ্বিতীয় ভাগে আর্থিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি বাংলার কৃষক, কারিগর, কারুশিল্পী ও শ্রমিকের কল্যাণে তেমন লাভজনক হয়নি।
পূর্ব বাংলার যেসব এলাকা খাদ্যশস্যে উদ্বৃত্ত ছিল, সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা সমৃদ্ধ ছিল। বিপরীতে, অনেক এলাকার কৃষি ও ফসলি জমি অবস্থানভেদে ফসল উৎপাদনের উপযোগী না থাকা এবং বন্যা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি ঘটলে অধিকাংশ মানুষ ঋণের ওপর নির্ভর করত। পূর্ব বাংলায় প্রচলিত ঋণপ্রথা প্রাথমিকভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল ছিল। জমিদার, মহাজন এবং জোতদাররা গ্রামীণ ঋণের প্রধান উৎস ছিলেন, যা চড়া সুদের হারের কারণে কৃষকদের ঋণের জালে আবদ্ধ রাখত।
দণ্ডবিধি ও পূর্ব বাংলার অপরাধ জগৎ:
‘যেহেতু বন্দুকের গুলিতে বাকেরগঞ্জ জেলায় অসংখ্য খুনের ঘটনা ঘটেছে এবং যেহেতু এ ধরনের অপরাধ দমন জরুরি মনে করা হচ্ছে এবং জেলায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া যাবে না।
ভারতীয় অস্ত্র আইনের ১৮ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে লেফটেন্যান্ট গভর্নর অস্ত্র উৎপাদন, আগ্নেয়াস্ত্রে পরিবর্তন আনয়ন, গোলাবারুদ বিক্রয়, অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার অধিকার ১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৬ থেকে রহিত করা হলো। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্সধারী অস্ত্র নিকটস্থ পুলিশ স্টেশনে জমা প্রদানের জন্য যুক্তিসঙ্গত সময় নির্ধারণ করে দেবেন। তবে বন্যপ্রাণীর হাত থেকে বাঁচার জন্য যেখানে প্রয়োজন সেখানে কেবল চৌকিদারি পঞ্চায়েত প্রধান সদস্যদের বন্দুক সরবরাহ করা হবে।
– সি ডব্লিউ বোল্টন, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিফ সেক্রেটারি, বাংলা সরকার, ২২ আগস্ট ১৮৯৬।
পূর্ব বাংলার অপরাধজগৎ বিশ্লেষণে বাকেরগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ এলাকার ওপর আলোকপাত করলে ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ চোখে পড়ে। ১৮৯০ সালে বাংলার মোট জনসংখ্যার ৫.৪৬ ভাগ ছিল বাকেরগঞ্জ জেলায়। আর খুনখারাবির চোখ ধাঁধানো পরিসংখ্যানটি হচ্ছে ১৮৯১-৯৬ এর মধ্যে খুনের হিসাবে এ জেলা শীর্ষে উঠে আসে। বাংলার মোট খুনের ২০ ভাগ সংঘটিত হয়েছিল বাকেরগঞ্জে। সে সময় বাকেরগঞ্জে বন্দুকের ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর পেছনের কারণ ছিল অপরাধ দমনে জনগণের যে সহায়তা প্রদান করা উচিত ছিল, তা তারা করেনি। জনগণের অসহযোগিতার কারণে অনেক খুনের মামলা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলার বাকেরগঞ্জে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধ গড়ে ওঠেনি। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২ ধারা অনুসারে জনগণ পুলিশকে সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। অথচ দণ্ডবিধি অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বাকেরগঞ্জ জেলায় বন্দুকের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ খুনের ঘটনার জন্য জমিদারদের যোগসাজশ ছিল বলে তৎকালীন প্রশাসন মনে করত। এ ছাড়াও জমিজমা নিয়ে বিরোধ, সিঁধেল চুরি এবং নদীপথে ডাকাতির মতো অনেক ঘটনার বিবরণ আমরা সে সময়ের অপরাধ মানচিত্র বিশ্লেষণ করে জানতে পারি।
১৯৯৮ সালে, আমি যখন শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে পুলিশ একাডেমি, সারদা, রাজশাহীতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছিলাম, তখন একজন ইন্সপেক্টর আমাদের বলেছিলেন, পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহ এলাকার জুয়ার ঘটনা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭ প্রণীত হয়। সে সময় ময়মনসিংহ জেলার অনেকগুলো এলাকা ছিল হাওর-বাঁওড়বেষ্টিত। যেহেতু এক ফসলি জমির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ হতো, সেহেতু বছরের দুই-তৃতীয়াংশ সময় তারা থাকত বেকার ও কর্মহীন। সম্ভবত বিনোদনের অংশ হিসেবে তারা জুয়া খেলায় লিপ্ত হতো।
পূর্ব বাংলার ময়মনসিংহ জেলার গরু চুরি এবং মনুষ্য অপহরণের ঘটনার বিবরণ আমরা জানতে পারি। মূলত অপরাধের মাধ্যমে অন্যের সম্পত্তি চুরি কিংবা ডাকাতির মাধ্যমে করায়ত্ব করার অপরাধ প্রবণতা এ সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ব্রিটিশ শাসিত পূর্ববঙ্গে চুরির ক্ষেত্রে সোনা এবং রৌপ্যকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। অষ্টাদশ শতকে বিশেষত গ্রামবাংলা ও মফস্বলে মানুষের মধ্যে নগদ অর্থের লেনদেন সীমিত ছিল। সেখানে অবস্থানরত কৃষকেরা বাড়িতে সোনালংকার রাখতেন। চোর এবং ডাকাত দল এ বিষয়টিকে টার্গেট করতেন। আমার মরহুম আম্মা, মিসেস নূরুন নাহার বেগম রোজ, এর কাছে আমি ছোটবেলায় শুনেছিলাম, সন্দ্বীপে ডাকাত দল অগ্রিম দিন-তারিখ উল্লেখপূর্বক চিঠি পাঠিয়ে অবস্থানরত হিন্দুদের বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত করত। ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলায় পুলিশি ব্যবস্থা
শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো ও পুলিশের বাজেটের অভাব। সে সময় এক থানা থেকে আরেক থানার দূরত্ব অনেক বেশি ছিল। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সড়ক নেটওয়ার্ক না থাকায় বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য পুলিশের যথেষ্ট লোকবল ও যানবাহন ছিল না।
দণ্ডবিধি পর্যালোচনা করলে আমরা অনেক রকম অপরাধের বিবরণ দেখতে পাই। চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ, বেআইনি সমাবেশ, দাঙ্গা, সরকারি কর্মচারী কর্তৃক শোধ পারিশ্রমিক ব্যতীত বকশিস গ্রহণ, মুদ্রা জাল, নরহত্যা, প্রতারণা, মনুষ্য অপহরণ, অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন – এর সংজ্ঞা এবং এ ধরনের অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে দণ্ডবিধিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ধরনের অপরাধের শাস্তির প্রধান কারণ ছিল যেকোনো মূল্যে সমাজের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা করা। আমরা জানি, সমাজের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব না হলে সমাজ কাঠামো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব বাংলায় দণ্ডবিধি প্রণয়নের পটভূমি সমাজ, অর্থনীতি এবং অপরাধচিন্তার নিরিখে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, সে সময়ের জীবনযাত্রায় নিয়মিত রূপান্তর ঘটছিল। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে সমাজ একটু একটু করে পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। গ্রামাঞ্চলে ধনতন্ত্রের বিকাশ, পূর্ব বাংলায় রেলপথের সূচনা এবং রাষ্ট্রের আর্থিক উদ্বৃত্তের কারণে সামাজিক গতিময়তা বৃদ্ধি পায়। একসময়কার যৌথ জমি উত্তরাধিকারের কারণে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়ে। চাষযোগ্য জমি, বাস্তুজমি, জলাভূমি, বাগান, জলাশয় আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে।
ব্যক্তিগত সম্পদকে ঘিরে মানুষে মানুষে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্যক্তিগত স্বার্থ, লাভ এবং অন্যের সম্পত্তি বলপূর্বক দখলের মধ্য দিয়ে অপরাধপ্রবণতার আধিক্য লক্ষ করা যায়। সমাজের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, শাস্তির মানদণ্ড এবং চূড়ান্ত অর্থে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য দণ্ডবিধি প্রণয়ন অনিবার্য হয়ে পড়ে।
লেখক
বিশেষ পুলিশ সুপার
সিআইডি, ঢাকা
