ছিনলুং-যাকে চিনলুং, চিনলোন বা বেতের বল খেলা নামেও বলা হয়। এটি মায়ানমারের (বার্মা) ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় খেলা। সাধারণত ছয়জন খেলোয়াড়ের একটি দল বৃত্তাকারে দাঁড়িয়ে এই খেলা খেলে। বলটি হাতে তৈরি বেত দিয়ে বোনা হয়, আঘাত করলে ঝুড়ির মতো শব্দ হয়। খেলাটি অ-প্রতিযোগিতামূলক; উদ্দেশ্য হলো বলটিকে যতক্ষণ সম্ভব কৌশলীভাবে পাস করা, কিন্তু কোনোভাবেই যেন মাটিতে না পড়ে।খেলার নিয়মে হাত ছাড়া সব অঙ্গ ব্যবহার করা যায়—পা, হাঁটু, গোড়ালি, পায়ের তলা ও মাথা। খেলোয়াড়রা বৃত্তের চারপাশে হাঁটতে হাঁটতে বল একে অপরের মাঝে পাস করে, আর বৃত্তের মাঝখানে থাকা একজন খেলোয়াড় নৃত্যের মতো অনবদ্য বিভিন্ন চাল দেখায়।খেলার জন্য প্রয়োজন নমনীয়তা, তৎপরতা, সমন্বয় ও উচ্চ শারীরিক ফিটনেস। এজন্যই বয়স ৩০ পেরোলে অনেকের জন্য গতি ও কৌশলের তাল রাখা কঠিন হয়ে ওঠে।সাধারণত রোহিঙ্গা তরুণেরা প্রায় ১৪ বছর বয়সে ছিনলুং খেলা শুরু করে। রোহিঙ্গাদের কাছে ফুটবল সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও ছিনলুং ফুটবলের পরেই তাদের সবচেয়ে পছন্দের খেলা। কোথাও ছোট জায়গা পেলেই খেলা যায়—এটি ছিনলুংয়ের অন্যতম আকর্ষণ। এমনকি রাখাইনে বর্ষাকালে কাদায় অন্যান্য খেলা সম্ভব না হলেও তারা ছিনলুং খেলত। কখনও তিনজন বনাম তিনজনের দল জালের ওপারে (ভলিবলের নেটের মতো) প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণভাবে খেলা হয়, যা রোহিঙ্গা তরুণদের কাছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। মায়ানমার ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর বার্মিজ সংস্কৃতির স্বকীয়তা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন দেখা দেয়। শতবর্ষের প্রভাবের দরুন পোলোর মতো ব্রিটিশ খেলা তখনো জনপ্রিয় ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ছিনলুং হয়ে ওঠে বার্মিজ জাতীয়তাবাদের প্রতীক—ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত, নিজস্ব মৌলিক ঐতিহ্য। বিদ্যালয়গুলোতে শারীরিক শিক্ষার অংশ হিসেবে ছিনলুং যুক্ত করা হয়, যাতে শিশুরা শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত ও গর্ববোধ করতে পারে। প্রাচীন এই খেলার বয়স প্রায় ১,৫০০ বছর। বার্মিজ মার্শাল আর্ট ও নৃত্যের প্রভাব থাকায় এটিকে বার্মিজ সংস্কৃতিতে নৃত্যেরই এক রূপ ধরা হয়। এর ভিন্নধারা “তাপান্ডাইং” নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে ছিনলুং রাজপরিবারের বিনোদন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খেলার বৈচিত্র্য বেড়েছে; বল চালানোর শত শত কৌশল প্রচলিত হয়েছে। ইউরোপীয়দের কাছে ছিনলুং মূলত আদিবাসীদের খেলা হিসেবে গণ্য হলেও ১৯১১ সাল থেকেই ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে ছিনলুং দল পারফর্ম করতে থাকে। ১৯৫৩ সালে বার্মিজ সরকারের নির্দেশে বার্মা অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উ আহ ইয়েন ছিনলুংয়ের নিয়মবিধি রচনা করেন। এরপর ইয়াঙ্গুনে প্রথম আনুষ্ঠানিক ছিনলুং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে, যদিও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম, লাওস, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডে অনুরূপ খেলার প্রচলন থাকলেও মায়ানমার ছিনলুংকে বৈধভাবে নিজেদের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মান্ডালয়ের বিখ্যাত মহামুনি প্যাগোডার মাঠের ছোট স্টেডিয়ামে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় ওয়াসো ছিনলুং উৎসব। ওয়াসোর পূর্ণিমাকে ঘিরে এক মাসব্যাপী চলা এই উৎসবে সারা দেশ থেকে দল আসে, ঐতিহ্যবাহী সংগীতের তালে খেলা চলে এবং ধারাভাষ্যকার প্রতিটি গতিবিধি প্রাণবন্তভাবে বর্ণনা করেন। দলগুলো অন্য দলের বিরুদ্ধে নয়—একটি দল একসঙ্গে নিজস্ব সৌন্দর্য, স্টাইল ও ফর্ম প্রদর্শন করে; বিচারকরা সে অনুযায়ী মূল্যায়ন করেন।
২০১৩ সালে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে আয়োজিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান গেমসে ছিনলুং একটি পৃথক খেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। যদিও অংশগ্রহণকারী একমাত্র দেশ ছিল মায়ানমার, তবুও খেলার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়। ওই বছরে ছিনলুংয়ের আটটি বিভাগের মধ্যে ছয়টিতে তারা স্বর্ণপদক লাভ করে।
নৃত্য, কৌশল, বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং দলগত সৃজনশীলতার অনন্য সংমিশ্রণে ছিনলুং শুধু একটি খেলা নয়, বরং বার্মিজদের সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও জাতীয় আবেগের প্রতীক। আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এই খেলা একই উন্মাদনায় টিকে আছে—মাঠে জায়গা কম থাকলেও, প্রতিবন্ধকতা থাকলেও ছেলেমেয়েরা, তরুণেরা এক বৃত্তে দাঁড়িয়ে বল বাতাসে ধরে রাখার খেলায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে এখনো সমান আনন্দ পায়।
লেখক
পুনাক সদস্য

