রাতের ঢাকায় একটি পার্কের ভেতরের দৃশ্য। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাদকসেবনের সন্দেহে পুলিশ এক যুবককে থামিয়ে তার পরিচয় জানতে চায় এবং ব্যাগ তল্লাশি করে। যুবকের ভাষ্য, তিনি একজন ছাত্র। প্রতিদিনের কাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে ফেরার দ্রুততম পথ হিসেবে তিনি এই পথই বেছে নেন। তাদের কথোপকথনে আশপাশে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষ এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এই সন্দেহ কি অপরাধ প্রতিরোধের জন্য জরুরি ছিল, নাকি ছিল অতিরিক্ত কঠোরতার প্রকাশ? সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনা জনপরিসরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সকল অপরাধের প্রতি পুলিশের এই কঠোর অবস্থান সাধারণত একটি নির্দিষ্ট পুলিশি দর্শনকে প্রতিফলিত করে। এই দর্শনকেই সাধারণভাবে বলা হয় জিরো-টলারেন্স পুলিশিং।
কিন্তু এখানে একটি বড় বিতর্ক থেকেই যায়। ছোটখাটো অপরাধ দমনে কড়া পুলিশি আচরণ কি সত্যিই কার্যকর, নাকি এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে? জিরো-টলারেন্স পুলিশিং মূলত এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য শুরুতেই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে সামান্য অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। ধারণাটি হলো-নিয়ম ভাঙার সুযোগ যত কম দেওয়া যাবে, অপরাধ তত কম হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে রয়েছে সমাজবৈজ্ঞানিক যুক্তি, যা অপরাধকে শুধু ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; বরং সামগ্রিক পরিবেশ ও বিভিন্ন সামাজিক সংকেতের ফল হিসেবেও ব্যাখ্যা করে। এখানে আলোচনায় আসে ব্রোকেন উইন্ডোজ থিওরি। ১৯৮০-এর দশকে সমাজবিজ্ঞানী জেমস কিউ. উইলসন এবং অপরাধতত্ত্ববিদ জর্জ এল. কেলিং এই তত্ত্বটি উপস্থাপন করেন।
তাদের যুক্তি ছিল খুবই সরল-যদি একটি ভবনের একটি জানালা ভাঙা থাকে এবং দীর্ঘদিন তা মেরামত করা না হয়, তাহলে খুব দ্রুত সেই ভবনের অন্যান্য জানালাও ভাঙতে শুরু করবে। কারণ, ভাঙা জানালাটি এখানে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, এখানে কেউ নজরদারি করছে না বা কোনো নিয়ম কার্যকর নেই।
উইলসন ও কেলিং দেখাতে চেয়েছিলেন, মানুষ পরিবেশ থেকে সামাজিক সংকেত পড়ে নেয়। যখন কোনো এলাকায় ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকে, তখন সেখানে একটি আবহ তৈরি হয় যে, এখানে আইন প্রয়োগ দুর্বল এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল। এমন বার্তা ধীরে ধীরে আইন বা নিয়মভঙ্গকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ফলে অপরাধ বাড়ে-এজন্য নয় যে মানুষ হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়; বরং যেকোনো নিয়ম ভঙ্গ করলেও শাস্তির ঝুঁকি কম বলে মনে হয় এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ভয় কমে যায়।
এই তত্ত্বকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝাতে মনোবিজ্ঞানের একটি বহুল আলোচিত গবেষণার উদাহরণ দেওয়া হয়। গবেষক ফিলিপ জিমবার্ডো একটি পরীক্ষার আয়োজন করেন। তিনি লাইসেন্স প্লেটবিহীন, বনেট খোলা একটি পরিত্যক্ত গাড়ি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রঙ্কস এলাকায় রেখে দেন। গাড়িটির চারপাশে কোনো নজরদারি ছিল না। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই একটি পরিবার এসে গাড়ির ব্যাটারি ও রেডিয়েটর খুলে নেয়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গাড়িটির প্রায় সব মূল্যবান যন্ত্রাংশই সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ভাঙচুর। বিপরীতে, একই ধরনের আরেকটি গাড়ি ক্যালিফোর্নিয়ার পাওলো আল্টো এলাকায় রাখা হয়। সেখানে গাড়িটি দীর্ঘ সময় অক্ষতই ছিল। তবে জিমবার্ডো নিজে যখন স্লেজহ্যামার দিয়ে গাড়িটির একটি অংশ ভাঙেন এবং তা দর্শকদের সামনে ঘটে, তখন ধীরে ধীরে অন্যরাও ভাঙচুরে অংশ নেয়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, উভয় জায়গায় গাড়ি ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদের জিমবার্ডো বর্ণনা করেছেন সমাজের “সম্মানিত, পরিপাটি পোশাক পরা মানুষ” হিসেবে।
এই গবেষণা থেকে সমাজবিজ্ঞানী উইলসন ও কেলিং একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাদের মতে, মানুষ সব সময় ব্যক্তিগত নৈতিকতার দ্বারা পরিচালিত হয় না। অনেক সময় তার চারপাশের পরিবেশে শৃঙ্খলার অভাব, অবহেলা ও অযত্নই অপরাধকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলে। তাই যদি পুলিশ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ছোটখাটো বিশৃঙ্খলাও দ্রুত পরিষ্কার ও নিয়ন্ত্রণে রাখে, তাহলে অপরাধ ঘটার সুযোগ অনেকাংশেই কমে যায়। অর্থাৎ, অপরাধ শুধু অপরাধীর মানসিকতার ফল নয়; পরিবেশ ও সামাজিক অবহেলাও এতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়েই বাস্তবে হার্ডলাইন বা জিরো টলারেন্স পুলিশিং প্রয়োগ করা হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো এলাকায় নিয়মিত টহল, তল্লাশি এবং দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি না থাকলে ছোটখাটো অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বাড়তে পারে। বিপরীতে, যখন মানুষ বুঝতে পারে যে সেখানে নিয়ম কার্যকর আছে এবং নজরদারিও দৃশ্যমান, তখন প্রকাশ্যে মাদকসেবন, ছিনতাই, চুরি কিংবা বিশৃঙ্খল আচরণ কিছুটা কমে আসে। অনেক ক্ষেত্রে বড় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই ছোট অপরাধের পর্যায়ে হস্তক্ষেপ করা গেলে অপরাধের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়। গবেষণার ফলাফলও এই যুক্তিকে আংশিকভাবে সমর্থন করে।
বয়েডস্টুনের (১৯৭৫) সান ডিয়েগোভিত্তিক এক গবেষণায় দেখা যায়, যেখানে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল, সেখানে ডাকাতি, চুরি, হামলা ও অন্যান্য তথাকথিত ‘আউটডোর ক্রাইম’ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ, দৃশ্যমান পুলিশি হস্তক্ষেপ কমে গেলে অপরাধ দ্রুত বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। এই কারণেই জিরো-টলারেন্স পুলিশিংয়ের সমর্থকেরা বলেন, এটি শুধু অপরাধ দমনের পাশাপাশি সামাজিক শৃঙ্খলা পুনঃস্থাপনের একটি কার্যকর কৌশল। তাদের মতে, এই কঠোরতা শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং একটি বার্তা দেওয়ার জন্য যে সমাজ বা রাষ্ট্রে আইন আছে, নজরদারি আছে এবং নিয়ম ভাঙলে তার প্রতিক্রিয়ায় শাস্তি ভোগ করতে হবে।
শেরম্যান ও এক (২০০২) প্রস্তাবিত কিছু পরীক্ষামূলক গবেষণায়ও দেখা যায়, দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি ও নিয়মিত হস্তক্ষেপের ফলে স্বল্পমেয়াদে ‘আউটডোর’ বা প্রকাশ্য অপরাধ কমে আসে, যা সমর্থকদের এই যুক্তিকে শক্ত করে। গবেষণাগুলো দেখায়, এই পুলিশি হস্তক্ষেপ বা উপস্থিতি যতখানি দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক হয়, ততই ছোট অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় অপরাধের ক্ষেত্র সংকুচিত করতে পারে বলে তারা দাবি করেন।
এই যুক্তির পক্ষে প্রায়ই একটি বহুল আলোচিত নগরভিত্তিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯৯০-এর দশকে জিরো-টলারেন্স ও ব্রোকেন উইন্ডোজভিত্তিক পুলিশিং প্রয়োগের সময় ছোটখাটো অপরাধে গ্রেপ্তারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সময়কালে শহরটিতে সহিংস অপরাধ প্রায় ৫৬ শতাংশ এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ প্রায় ৬৫ শতাংশ হ্রাস পায়, যা সে সময় জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এই পরিসংখ্যানকে সমর্থকেরা প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন যে, ছোট অপরাধে কড়াকড়ি আরোপ করলে সামগ্রিক অপরাধ পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে এই সাফল্য নিয়েও গুরুতর সমালোচনা রয়েছে। অনেক গবেষকই মনে করেন, নিউ ইয়র্ক শহরের সহিংস ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধের এই বড় ধরনের হ্রাসের পেছনে জিরো-টলারেন্স পুলিশিংই একমাত্র বা প্রধান কারণ ছিল-এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। একই সময়কালে শহরটিতে পুলিশের জনবল এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায় এবং কারাবন্দির সংখ্যা প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়ে যায়, যা অপরাধ দমনে আলাদা প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি, ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে শহরটির বেকারত্বের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ কমে যায়।
কিছু গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শুধু কর্মসংস্থানের এই বৃদ্ধিই ডাকাতি ও যানবাহন চুরির মতো অপরাধ কমার বড় অংশ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। ফলে প্রশ্ন থেকে যায়-অপরাধ হ্রাসের কৃতিত্ব কতটা জিরো-টলারেন্স পুলিশিংয়ের, আর কতটা বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফল। এই বিতর্কগুলো দেখায়, অপরাধ পরিসংখ্যানের তাৎক্ষণিক উন্নতি দিয়ে কোনো পুলিশি কৌশলের সাফল্য চূড়ান্তভাবে বিচার করা যায় না। বরং প্রশ্ন উঠতে থাকে, এই কঠোরতার সামাজিক মূল্য কতটা এবং এই মূল্য কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পথে সহায়ক, নাকি তা নতুন ধরনের সংকট তৈরি করে।
তবে এই ধারণার বেশ কিছু সমালোচনাও রয়েছে। জিরো-টলারেন্স পুলিশিংয়ের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো, এটি অনেক সময় নিরপরাধ মানুষকে হয়রানির শিকার করে। সন্দেহভিত্তিক তল্লাশি এবং জিজ্ঞাসাবাদ, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পুলিশের প্রতি ভীতি ও অনাস্থা তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের অতিরিক্ত কড়াকড়ির ফলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। কারণ মানুষ পুলিশকে সুরক্ষার প্রতীক নয়, বরং শাস্তিমূলক ও নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এছাড়া, সামাজিকভাবে দুর্বল বা স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে অতিরিক্ত ও বৈষম্যপূর্ণভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করার অভিযোগও ওঠে, যার ফলে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
পরবর্তীতে জাল ও শাসুওয়া-এর গবেষণা ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধরনের পুলিশিং প্রক্রিয়া সামাজিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর অসমভাবে প্রয়োগ হয়, যার ফলে পক্ষপাতমূলক পুলিশিংয়ের অভিযোগ সচরাচরই দেখা যায়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা হলো, এই পদ্ধতি অপরাধের ভেতরগত সামাজিক কারণগুলোকে স্পর্শ করে না। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তির সামাজিক প্রেক্ষাপট বা পারিবারিক ভাঙন-এসব সমস্যার সমাধান কেবল কঠোর নজরদারি দিয়ে সম্ভব নয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যখন এসব সামাজিক ও অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন পরিবেশগত বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের মধ্যকার সরাসরি সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল বা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এমনকি নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের নিজস্ব ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, “কোয়ালিটি অব লাইফ” পুলিশিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হলেও সহিংস অপরাধ ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত অপরাধ হ্রাস পেয়েছে। যা প্রমাণ করে, জিরো-টলারেন্স পুলিশিং সাময়িকভাবে অপরাধ কমালেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার শিকড় অনেকটা অক্ষত থেকে যায়। এখানেই এসে তুলনামূলক বিশ্লেষণের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। জিরো-টলারেন্স পুলিশিং শুধুমাত্র কোনো ধারণা নয়; এটি বাস্তবে প্রয়োগ করতে গেলে বিপুল জনবল নিয়োগ, নিয়মিত টহল, চেকপোস্ট, নজরদারি প্রযুক্তি, যানবাহন, জ্বালানি এবং অপারেশনাল ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
প্রতিটি তল্লাশি, প্রতিটি অভিযান এবং প্রতিটি অতিরিক্ত পুলিশি উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত থাকে অর্থনৈতিক ও মানবিক ব্যয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই ব্যয়ের বিপরীতে যে পরিমাণ অপরাধ হ্রাস পায়, তা কি দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে, নাকি এটি কেবল সাময়িক চাপের ফল?
কোয়ালিটি অব লাইফ পুলিশিং হলো এমন একটি পুলিশি পদ্ধতি, যার লক্ষ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। এতে ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা-যেমন প্রকাশ্যে মাদক সেবন, উচ্চ শব্দ, ফুটপাত দখল বা উচ্ছৃঙ্খল আচরণের ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। ধারণাটি হলো-ছোট সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকলে বড় অপরাধের সুযোগ কমে যায়। এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; বরং সমাজে আইন-কানুন কার্যকর আছে-এই বার্তা দেওয়া।তবে এটি সংযতভাবে প্রয়োগ না হলে জনভোগান্তি এবং পুলিশের প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে।
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক এলাকায় কড়া পুলিশি নজরদারি শুরু হলে ছোটখাটো অপরাধ দ্রুত কমে আসে। চুরি, ছিনতাই, প্রকাশ্যে মাদকসেবন বা বিশৃঙ্খল আচরণ হঠাৎ করে হ্রাস পায়।
কিন্তু একই সঙ্গে দেখা যায়, পুলিশি উপস্থিতি কিছুটা কমলেই অথবা নজরদারি শিথিল হলেই সেই অপরাধগুলো আবার ফিরে আসে। অর্থাৎ, অপরাধ কমার কারণ সব সময় অপরাধীর আচরণগত পরিবর্তন নয়; বরং অপরাধ করার ঝুঁকি সাময়িকভাবে বেড়ে যাওয়াও এর একটি কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে, যেসব এলাকায় কড়া পুলিশিংয়ের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, সেখানে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যখন মানুষ পুলিশকে কেবল নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হিসেবে না দেখে সহযোগী হিসেবে দেখে, তখন অপরাধ সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ে। সন্দেহজনক তৎপরতা আগে থেকেই নজরে আসে, বিরোধ মীমাংসা অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগেই থেমে যায়। এই ক্ষেত্রে পুলিশ একা দায়িত্ব বহন করে না; সমাজ নিজেও অপরাধ প্রতিরোধের অংশ হয়ে ওঠে। আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো সামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনমূলক উদ্যোগ। অনেক ছোট অপরাধের পেছনে থাকে বেকারত্ব, আসক্তি, পারিবারিক ভাঙন বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। কেবল কড়া নজরদারি এসব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু যখন পুলিশের কঠোরতার সঙ্গে কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের পথ বা স্থানীয় পর্যায়ে সহায়ক কর্মসূচি যুক্ত হয়, তখন অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমে আসে। এই পরিবর্তনটি ধীর, কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই। এই বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, জিরো-টলারেন্স পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা প্রেক্ষাপটনির্ভর। জনবহুল বাণিজ্যিক এলাকা, পরিবহন কেন্দ্র বা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাময়িকভাবে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একই মাত্রার কঠোরতা যদি সব জায়গায়, সব সময় প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তা অপ্রয়োজনীয় সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে এবং পুলিশের প্রতি আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।
অতএব, প্রশ্নটি জিরো-টলারেন্স পুলিশিং ভালো না খারাপ-সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, কখন-কোথায় কঠোরতা প্রয়োজন, কোথায় সংযম জরুরি এবং কোন পরিস্থিতিতে মানবিক আচরণই সবচেয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ হিসেবে কাজ করে? অপরাধ দমন তখনই সবচেয়ে ফলপ্রসূ হয়, যখন শক্তি, সংবেদনশীলতা এবং সামাজিক আস্থার মধ্যে একটি সামগ্রিক ভারসাম্য তৈরি করা যায়।
লেখক
মাস্টার্স শিক্ষার্থী
ক্রিমিনোলজি বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

