হোমপ্রবন্ধসুখ আসলে ছোট ছোট অভ্যাসের ফল- জানুন সুখের ৮টি সহজ অভ্যাস

সুখ আসলে ছোট ছোট অভ্যাসের ফল- জানুন সুখের ৮টি সহজ অভ্যাস

সুখী হওয়া-একটা প্রক্রিয়ার নাম। যেমন একজন নিয়মিত ব্যায়াম করে তার ওজন কমায়, শক্তি বাড়ায়, স্থিতিশীলতা আনে; সুখকেও তেমনি কিছু সচেতন চর্চার মাধ্যমে জীবনে আনা যায়। সুখী হওয়া যায়। আজকে আমরা এমন কয়েকটি অনুশীলন নিয়ে কথা বলব, যা চর্চা করলে আজ থেকেই একটু একটু করে আপনি সুখী হতে শুরু করবেন। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে দেখবেন, আপনার সুখের পরিমাণ ১০-১৫% বেড়েছে। ব্যক্তিভেদে এটা ৪০-৫০% বা তারও বেশি হতে পারে। নির্ভর করছে অনুশীলনগুলো আপনি কতটা আন্তরিকভাবে করছেন, নিয়মিত করছেন এবং হতাশ হয়ে মাঝপথে ছেড়ে দিচ্ছেন কি না।

১. পথচলতি মানুষের সঙ্গে উষ্ণতা বিনিময়

১৯৩৮ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে একটি গবেষণা শুরু হয়েছিল-হার্ভার্ড স্টাডি অব অ্যাডাল্ট ডেভেলপমেন্ট। ৮৬ বছর ধরে চলা এই গবেষণার ফলাফল হলো-যারা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে তাদের জীবনে গুরুত্ব দিয়েছেন, মানুষকে পছন্দ করেছেন, মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, তারাই সবচেয়ে সুখী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সম্পর্কের এই উপকার পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে রাখলে যেমন পাওয়া যায়, তেমনি পথচলতি অচেনা মানুষ-যারা আপনার নিয়মিত সম্পর্কের মানুষ নন-তাদের কাছ থেকেও পাওয়া যায়। তাদের সঙ্গে যদি শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, সালাম দেন বা কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন, সেটাও আপনার হ্যাপিনেসের ওপর লক্ষণীয় প্রভাব ফেলতে পারে।

নিক ইপলি, শিকাগো ইউনিভার্সিটির বিহেভিয়োরাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং তাঁর দল এই বিষয়ে একটি গবেষণা করেন। শিকাগো শহরের লোকাল ট্রেন ও বাসের যাত্রীদের নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছিল বলে একে কমিউটার স্টাডি বলে। নিক ইপলি এবং তাঁর দল যাত্রীদেরকে মোট তিন ভাগে ভাগ করেন—

১. সলিটিউড গ্রুপ
২. সোশ্যাল গ্রুপ
৩. কন্ট্রোল গ্রুপ

সলিটিউড গ্রুপকে বলা হয়, তারা যেন সম্পূর্ণ চুপচাপ থাকে, কারও সঙ্গে কথা না বলে এবং নিজের কাজ-যেমন বই পড়া বা ফোন দেখায়-সময়টা পার করে। সোশ্যাল গ্রুপকে বলা হয়, তারা যেন ট্রেনের একজন সহযাত্রীর সঙ্গে কথা বলে (অবশ্যই এটি র‍্যান্ডম কেউ এবং আগে থেকে পরিচিত নয়)। বলা হয়, চেষ্টা করতে হবে গল্প করে যেন তার সঙ্গে সময়টা কাটায়। আর কন্ট্রোল গ্রুপকে বলা হয়, তোমরা প্রতিদিন যেভাবে যেতে-আসতে, সেভাবেই করো। বাড়তি কিছু করার দরকার নেই।

গবেষণা শুরুর আগে সোশ্যাল গ্রুপের যাত্রীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই যে অপরিচিতদের সঙ্গে কথা বলতে বলা হচ্ছে, এতে তাদের কেমন লাগছে। অনেকেই বলেছিলেন, অস্বস্তিকর লাগছে। কাজটি হয়তো বিরক্তিকর হতে পারে!
মজার ব্যাপার, দিনের শেষে যখন ফলাফল বিশ্লেষণ করা হলো, দেখা গেল-যারা অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তারা অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি সুখী এবং চাঙ্গা বোধ করছেন। এমনকি শুধু তারাই নন, যারা তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তারাও অনেক বেশি আনন্দ বোধ করছিলেন।

কীভাবে চর্চা করবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো-লম্বা-চওড়া আলাপের প্রয়োজন নেই। স্রেফ সুপারশপে বিল দেওয়ার সময় ক্যাশিয়ারের দিকে তাকিয়ে হাসুন এবং জিজ্ঞেস করুন, “আপনি কেমন আছেন? সারাদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই কাজটা করতে আপনার কেমন লাগে?”

অবশ্য এসব ক্ষেত্রে আপনি আপনার সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিক শিষ্টাচার-এসব দিক বিবেচনায় রাখবেন। আমাদের সংস্কৃতিতে কোনো পুরুষ নারীকে এ ধরনের প্রশ্ন করলে নারীরা বেশিরভাগ সময়ই এটাকে ভালোভাবে নাও নিতে পারেন। আবার কোনো নারী পুরুষকে এ ধরনের প্রশ্ন করলে পুরুষরাও ভ্রু কুঁচকাতে পারেন। অফিসের বা বাসার লিফটে যাচ্ছেন। পাথরের মতো মুখ না করে সহকর্মীদের সঙ্গে বা প্রতিবেশীদের সঙ্গে স্রেফ আবহাওয়া বা ওই দিনের কোনো সাধারণ বিষয় নিয়ে একটা বাক্য বিনিময় করুন। অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা শুরু করার একটি সহজ উপায় হলো-আপনারা দুজনেই এই মুহূর্তে যা দেখছেন বা অনুভব করছেন, তা নিয়ে কথা বলা।

যেমন, বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় বলতে পারেন, “আজকে বাসটা বোধহয় একটু বেশিই দেরি করছে, তাই না?” অথবা খাবার কেনার লাইনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন, “এখানকার খাবার কি খুব ভালো? আমি আজ প্রথম এলাম!” সপ্তাহে অন্তত একদিন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে বা জনাকীর্ণ স্থানে নিজের ফোনটি পকেটে রেখে দিন। এরপর দেখুন, কোন মানুষটিকে আপনি একটি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারেন। বেশিরভাগ মানুষ আসলে কথা বলতে চান, কিন্তু কেউ আগে শুরু করতে চান না। আপনি সেই প্রথম পদক্ষেপটি নিন।

অবশ্য যদি দেখেন, সামনের মানুষটি কানে হেডফোন লাগিয়ে আছেন বা বই পড়ছেন, তবে তাকে বিরক্ত করবেন না। যারা আপনার মতোই স্রেফ বসে আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন। মানুষকে জানার জন্য সত্যিকারের কৌতূহল দেখান। অপরিচিত কারও সঙ্গে কথা বলার সময় এমন ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন যা স্রেফ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে শেষ হয় না। যেমন, “আপনি এই এলাকায় কতদিন ধরে আছেন?” অথবা “এই বইটা কি পড়ার মতো? আমি এটা কেনার কথা ভাবছি!” অর্থাৎ, সামনের মানুষটিকে নিজের সম্পর্কে বা তার মতামত সম্পর্কে কথা বলার সুযোগ দিন। মানুষ নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পছন্দ করে, যা তাদের মস্তিষ্কে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।

এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন যে, কথা বললে লোকে আপনাকে পাগল ভাববে বা সন্দেহ করবে। বরং নিজেকে আশ্বস্ত করুন যে, বিজ্ঞানের মতে, আপনি এবং সামনের মানুষটি-দুজনেই এই আলাপের পর আগের চেয়ে বেশি সুখী বোধ করবেন। এমনকি যদি আলাপটি খুব ছোট হয়, তবুও এটি আপনার ‘সোশ্যাল ফিটনেস’ বাড়াতে সাহায্য করবে।

২. না থাকলে কী হতো-চিন্তা করা

আমরা সাধারণত আমাদের বর্তমান অবস্থা, প্রাপ্তি বা অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি না। অর্থাৎ, যতক্ষণ জিনিসটা হাতে না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হই, অস্থির হই, সবকিছু করতে পারি এমন ভাবি। কিন্তু যেই পাওয়া হয়ে যায়, অমনি এটি আর আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না।

এই অবস্থার সমাধানের জন্য হ্যাপিনেস গবেষকরা একটি অনুশীলনী নিয়ে এসেছেন, যাকে বলা হয় নেগেটিভ ভিজ্যুয়ালাইজেশন। মানে ধরুন, আপনার স্মার্টফোনটি নিয়ে আপনি চিন্তা করলেন-পরবর্তী সময়ে যখন এটি হাতে নেবেন, দেখবেন কোনোভাবে এটি নষ্ট হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গেই আপনার মাথায় একসঙ্গে অনেকগুলো চিন্তা খেলবে। আমি এখন কীভাবে যোগাযোগ করব? যদি গুগল কন্টাক্ট না নিয়ে থাকি, তাহলে তো এগুলো সব চলে গেল। ফোনে যেসব ছবি-ভিডিও ছিল, সেগুলোর ব্যাকআপ না নিলে সেগুলোও হারিয়ে গেল। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে যেসব রিসোর্স ছিল, সেগুলোও চলে গেল। অর্থাৎ, আপনার অনেকগুলো ক্ষতি হয়ে গেল। আসলে কিন্তু কিছুই হয়নি। আপনি কল্পনা করেছেন মাত্র। কিন্তু এই মাত্র কয়েক মিনিটের চিন্তার কারণেই এরপর যখন আপনি ফোনটা হাতে নেবেন, আপনি খুব কৃতজ্ঞ বা ভালো বোধ করবেন।

গবেষক কিউ এবং তাঁর সহকর্মীরা দম্পতিদের নিয়ে এই পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন। দাম্পত্য সম্পর্কে প্রায়ই এক ধরনের টেকেন ফর গ্রান্টেড মনোভাব তৈরি হয়। মানে, “ও তো আমার স্ত্রীই, যাবে কোথায়” অথবা “স্বামী তো আছেই”-এমন এক ধরনের স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। কিউ যখন দম্পতিদের ১৫ মিনিট ধরে লিখতে দিলেন যে, “তোমার এই স্বামী বা স্ত্রী বা পার্টনার যদি না থাকত, অর্থাৎ তার সঙ্গে যদি পরিচয় না হতো অথবা এরপর আর তাকে তুমি দেখতে না পাও-এরকম যদি হয়, তাহলে তোমার কেমন লাগবে?”

বিস্ময়কর হলো-নারী বা পুরুষ, প্রত্যেকেই ১৫ মিনিটের এই লেখার পরে তার সঙ্গীর প্রতি আগের চেয়ে একটু হলেও বেশি অনুভূতি, ভালোবাসা বা মমতা বোধ করেছেন। “ও তো আছেই, আর কী দরকার”-এরকম কোনো টেকেন ফর গ্রান্টেড অবস্থায় আর থাকেননি।

৩. বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়া

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন বর্তমানে মনোযোগী থাকে, তখন তার স্ট্রেস ও টেনশন কম হয়, সে ভালো বোধ করে। কিন্তু সমস্যা হলো, মন বর্তমানে খুব কমই থাকে। সে হয় অতীতে, নয়তো ভবিষ্যতে লাফালাফি করে। অতীতের আক্ষেপ বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে মাথা ঘামায়। আর তখনই তার মধ্যে অসন্তুষ্টি তৈরি হয়। তবে বর্তমানে মনোযোগ দেওয়া একটি কৌশলের ব্যাপার। কৌশলটি হলো-আপনি যখন কোনো অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাবেন, তখন চেষ্টা করবেন সেই অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে বেরিয়ে এক ধরনের পর্যবেক্ষক হিসেবে সেটিকে দেখার; অর্থাৎ, স্রেফ মাইন্ডফুল বা মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করা।

যেমন, এরপর যখন আপনি কোনো প্লেট ধুবেন, আপনি কল্পনা করবেন-আপনার প্লেটটি কিসের? পোর্সেলিন, কাচ, তামা না অ্যালুমিনিয়ামের? প্লেটের ধারটা কেমন? কী দিয়ে ধুচ্ছেন? ডিশ ওয়াশিং লিকুইড না পাউডার? পানিটা কীভাবে পড়ছে? পানি যখন পড়ছে, ফেনাগুলো কীভাবে সরছে। প্লেটের পিচ্ছিল ভাবটা কীভাবে কেটে গিয়ে প্লেটটা চকচকে ও পরিষ্কার হচ্ছে-ইত্যাদি। দেখবেন, মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট; কিন্তু আপনি অনেক গভীর ও তৃপ্ত বোধ করছেন!

৪. প্রতিদিন একটি কৃতজ্ঞতা!

কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়ার গুরুত্ব ও উপকারের কথা আমরা জানি। মানুষ যখন কৃতজ্ঞ বোধ করে, তখন ইতিবাচক হওয়া ও আশাবাদী হওয়া তার জন্য সহজ হয়। খারাপের মধ্যেও সে ভালোকে দেখতে পায়। সবচেয়ে বড় কথা-এতে করে তার মধ্যে সুখী হওয়া বা ভালো বোধ করার পরিমাণ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্টি সেলিগম্যান এবং তাঁর সহকর্মীরা একটি মজার এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছিলেন-গ্রাটিচিউড ভিজিট। তাঁরা গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বলেন, তারা যেন এমন একজনকে একটি চিঠি লেখেন, যার কাছে তারা অনেক কৃতজ্ঞ; কিন্তু কখনো সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেননি। এরপর চিঠিটি নিয়ে ওই ব্যক্তির কাছে যেতে এবং তাঁকে চিঠিটি পড়ে শোনাতে বলেন। অংশগ্রহণকারীরা তাই করেন। ফলাফল হলো-যাঁর কাছে যাওয়া হয়েছে এবং যাঁকে চিঠি পড়ে শোনানো হয়েছে, তিনি তো যারপরনাই খুশি হয়েছেনই; পাশাপাশি যিনি চিঠিটি লিখেছেন এবং গিয়ে পড়ে শুনিয়েছেন পরবর্তী এক মাস পর্যন্ত তিনি সুখী ছিলেন।

আপনিও চাইলে এই গ্রাটিচিউড ভিজিট করতে পারেন। আমরা এমনিতে অনেক কথা বলি! কিন্তু যে কথাগুলো আমাদের বলা দরকার, সে কথাগুলো আমরা খুব কম বলি বা বলি না। তো এই কৃতজ্ঞতার অনুশীলন প্রয়োজন। মানে একদিন করলাম, তারপর ১০ দিন ভুলে গেলাম-তাহলে হবে না। এজন্যই এখানে আমরা একটি প্রশ্ন দিচ্ছি, যা আপনি প্রতিদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন এবং উত্তরে একটি কৃতজ্ঞতার কথা লিখবেন। লেখা কেন? তাহলে এটি আপনার ভেতরে একটু বেশি ভিত্তিমূল হবে। আর সুবিধা হলো-এভাবে প্রতিদিন লিখতে লিখতে আপনার একটি লম্বা তালিকাও তৈরি হয়ে যাবে। যখনই মন খারাপ লাগছে বা কিছু করার নেই বলে মনে হচ্ছে, তালিকাটিতে একটু চোখ বুলান। দেখবেন, মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। অনেকে এই তালিকাটি তাদের ফোনের নোটসে করেন। এটিও ভালো প্র্যাকটিস। তাহলে যখনই মন চাইল, এটিতে চোখ বুলালেন। প্রতিদিনের এই প্রশ্নটি হলো—

“আজকের দিনের এমন একটি ঘটনা, স্মৃতি বা কথা-যা আমার ভালো লেগেছে, আমাকে আনন্দিত করেছে…”

এই প্রশ্নটি আপনি সকালে করতে পারেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে যারা জার্নালিং করেন, তাদের চিন্তার স্বচ্ছতা অনেক বেশি থাকে। আবার রাতেও করতে পারেন।

৫. স্মার্টফোনের পরিমিত ব্যবহার

সুখ বা হ্যাপিনেস নিয়ে যত ধরনের গবেষণা হয়েছে, তারা সবাই একমত যে আধুনিক মানুষের বর্তমান যে অশান্তি ও অস্থিরতা-তার অন্যতম কারণ স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও স্মার্টফোন আসক্তি। একটি গবেষণা হয়েছিল, যেখানে কোনো একটি ওয়েটিং রুমে কিছু মানুষকে বলা হয়, তারা যেন তাদের ফোনটি সঙ্গে না রাখে। বাকিরা যেভাবে থাকে, সেভাবেই ছিল। মানে ফোন সঙ্গে রাখা, ব্যবহার করা ইত্যাদি। দেখা গেল-যাদের সঙ্গে ফোন ছিল না, তারা রুমের অন্যান্যদের দিকে অনেক বেশি তাকিয়েছেন এবং অনেক বেশি হাসি বিনিময় করেছেন। অন্যদিকে, যাদের হাতে ফোন ছিল, তারা গড়ে ৩০% কম হেসেছেন এবং অন্যদের সঙ্গে আই কন্ট্যাক্ট এড়িয়ে গেছেন।

আরেকটি গবেষণায় ৩০০ জনেরও বেশি মানুষকে বলা হয়, তারা যেন তাদের বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে একটি রেস্টুরেন্টে ডিনার করেন। এর মধ্যে একটি গ্রুপকে বলা হয়, ফোনটি টেবিলের ওপর রাখতে (যাতে প্রয়োজনে মেসেজ বা নোটিফিকেশন দেখা যায়)। আরেকটি গ্রুপকে বলা হয়, ফোনটি পুরোপুরি দূরে বা ব্যাগের ভেতর রেখে দিতে। যাদের ফোন টেবিলের ওপর ছিল, তাদের মনোযোগ বারবার বিক্ষিপ্ত হয়েছে। এমনকি ফোন ব্যবহার না করলেও অবচেতন মন নোটিফিকেশনের অপেক্ষায় ছিল। এরা খাবার ও আড্ডার আনন্দ ১১% কম পেয়েছে এবং আড্ডার সময় বেশি বিরক্ত বোধ করেছে।

এই আচরণকে বলা হয় “ফাবিং” (ফোন + স্নাবিং)। অর্থাৎ, ফোনের কারণে সামনে থাকা মানুষটিকে অবজ্ঞা করা। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আড্ডার মাঝে ফোন বের করা হয়, তখন সঙ্গীর মস্তিষ্কে একটি রিজেকশন বা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সিগন্যাল যায়। এর ফলে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি সুখের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। এখন ফোন তো ব্যবহার করতেই হবে। দিনের মধ্যে অসংখ্য কাজের জন্য ফোন প্রয়োজন। তাহলে যেটা করতে হবে, তা হলো-ফোনের পরিমিত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মধ্যে একটি সীমারেখা তৈরি করা। কয়েকভাবে এটি করা যায়—

স্মার্টফোন ফাস্টিং: প্রতিদিন কিছু সময়-সেটা ঘণ্টাখানেক হতে পারে, ঘণ্টা দুয়েক হতে পারে-ফোনটিকে দূরে কোথাও রেখে কাজ

করা। মানে, কাছে থাকলে তো একটু পরপর দেখতে ইচ্ছা করবে। কিন্তু কাছে নেই, দেখাও হচ্ছে না-এ ধরনের একটি বিচ্ছেদ তৈরি করা। আপনি দেখবেন, এই দুই ঘণ্টা সময়কে মনে হবে দিনের সবচেয়ে প্রশান্ত সময়।যখনই আপনি ফোন হাতে নেবেন, নিজেকে ৩টি প্রশ্ন করুন—

১. কীসের জন্য?
আমি কি কোনো দরকারে ফোন নিয়েছি, নাকি স্রেফ অভ্যাসবশত?

২. এখনই কেন?
আমি কি বিরক্ত বোধ করছি? নাকি কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না বলে ফোন ধরলাম?

৩. আর কী করা যেত?
ফোন না ধরে কি আমি এক গ্লাস পানি খেতে পারতাম বা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে পারতাম?
এই ৩টি প্রশ্ন আপনাকে ‘অটো-পাইলট’ মোড থেকে বের করে এনে সচেতন করে তুলবে।

৬. তুলনা বন্ধ করা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট বলেছিলেন, তুলনা হচ্ছে আনন্দ হরণকারী। মানে, আপনি কোনো কিছু নিয়ে আনন্দিত, খুশি। যেই তুলনা এল, আপনার আনন্দ মাটি হয়ে গেল। “ওরটা তো আমার চেয়ে ভালো!”

আসলে তুলনার এই ব্যাপারটা মানুষের সহজাত, স্বভাবজাত একটি বৈশিষ্ট্য। কারণ মস্তিষ্ক সবসময় তুলনা করে। যেমন, আপনাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি তোমার বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট?” সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো আপনার মনে পড়ে যাবে এমন মানুষদের কথা, যারা আপনার চেয়ে বেশি বেতন পান। আপনার চেয়ে কম বেতন পান-এমন মানুষদের কথা আপনার মনে পড়বে না।

আপনাকে “সুন্দর” বলা হলে, হাতভরে সেই প্রশংসা নেওয়ার আগেই আপনার মনে হতে পারে এমন কিছু মানুষের কথা, যাদের আপনি নিজের চেয়ে সুন্দর মনে করেন।

কিন্তু এই তুলনা যখন নিজের আত্মবিশ্বাসের মাপকাঠি হয়ে যায়, তখন সেটি ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবন, সুযোগ, সীমাবদ্ধতা ও পথচলা এক নয়। শুধু অন্যের অর্জন দেখে নিজের জীবনকে বিচার করলে নিজের অগ্রগতিটাই চোখের আড়ালে চলে যায়। তাই তুলনার দিকটা বদলানো দরকার। অন্য কারও সাফল্যকে নিজের ব্যর্থতার প্রমাণ বানানোর বদলে নিজের আগের অবস্থার সঙ্গে বর্তমান অবস্থাকে মিলিয়ে দেখুন। আগে যেখানে থেমে যেতেন, এখন যদি সেখানে একটু এগোতে পারেন-সেটাই অগ্রগতি। অন্যের সাফল্য থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া যায়, কিন্তু নিজের মূল্য নির্ধারণ করা উচিত নিজের বাস্তবতা, চেষ্টা এবং উন্নতির ভিত্তিতে। আসলে আমরা আরেকজনের বাহ্যিক সত্তার সঙ্গে নিজেদের অন্তর্গত সত্তার তুলনা করি। “সে কত ভালো ছাত্র!”, “উনি কত বড় অফিসার!” এখন এই ভালো ছাত্র বা বড় অফিসার হওয়ার জন্য যে কাঠখড় তাদের পোড়াতে হয়েছে, তা কি আমি বা আপনি জানি? অথবা আমরা কি একই কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত? জানি না। তাহলে এই তুলনা আপনার জন্য সুখকর বা প্রশান্তিকর কিছু বয়ে আনবে না! 

৭. পণ্য নয়, অভিজ্ঞতার পেছনে ব্যয়

হার্ভার্ডের ৮৬ বছরব্যাপী গবেষণার একটি পর্যালোচনা হলো-মানুষ পণ্যের চেয়ে অভিজ্ঞতার পেছনে খরচ করলে বেশি সুখী হয়। ধরুন, আপনি একটি পণ্য কিনে খুশি হলেন। কিন্তু সেই খুশির স্থায়িত্ব কতক্ষণ? ধরুন, আপনি ঠিক করেছেন, নতুন আসা একটি ফোন কিনবেন। কেনার আগে কত জল্পনা-কল্পনা! কিন্তু যখন কিনে ফেললেন, সেই উচ্ছ্বাস কি থাকে? থাকে না। এবার চিন্তা করুন, বাবা-মা, ভাইবোন সবাই মিলে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন, অথবা বোটানিক্যাল গার্ডেনে গিয়েছিলেন, কিংবা কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। একসঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে সবাই বিচে নেমেছিলেন-সেই স্মৃতি কত বছর পর বছর ধরে সুখস্মৃতি হিসেবে সঙ্গে নিয়ে ঘুরেছেন?কারণ গবেষণা বলে, পণ্যের চেয়ে অভিজ্ঞতা মানুষকে বেশি সুখ দেয়। আপনি একটি জাদুঘরে যান, একটি সুন্দর মসজিদ ভিজিট করেন, বেড়াতে গিয়ে একটি পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হন-এই অভিজ্ঞতাগুলো আপনাকে বেশি সুখ দেবে।

৮. সময়ের প্রাচুর্য সৃষ্টি

এই বিষয়টি বুঝতে হলে আপনাকে ‘সময়ের প্রাচুর্য’ ধারণাটি বুঝতে হবে। সময়ের প্রাচুর্য হলো-আপনার সময় আছে, আপনি তাড়াহুড়ার মধ্যে নেই, যেটা করছেন সেটাতে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন, পরেরটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না-এরকম একটি অনুভূতি বা বাস্তবতা। সুখী হওয়ার জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর্থিক প্রাচুর্যের অধিকারী অনেককেই পাওয়া যাবে, যাদের জীবনে সময়ের প্রাচুর্য নেই। স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোনকে দেওয়ার মতো সময় তাদের নেই। ছুটির দিনেও তাদের অফিসে যেতে হয়। সন্ধ্যার পরও তাদের কাজ শেষ হয় না। এরা সারাক্ষণই ব্যস্ত। বসে দুদণ্ড কথা শোনার স্থিরতা তাদের নেই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো-অন্যকে সাহায্য করার সময়ও তাদের নেই। তো সময়ের প্রাচুর্য বাড়ানোর কয়েকটি কৌশল হলো-টাকা দিয়ে সময় কেনা। ধরুন, আপনি নিজে রান্না করে খেতে গেলে বাজার করা থেকে শুরু করে কাটাকুটি, চুলোয় চাপানো, কড়াই-হাঁড়ি ধোয়া-সব মিলিয়ে ৪৫ মিনিটের ব্যাপার।

এবার আপনি যদি ডিনারটি কোথাও থেকে কিনে নিয়ে যেতে পারেন এবং সেই ৪৫ মিনিট সময় যদি আপনার কোনো প্রিয়জনের সঙ্গে কাটান, তাহলে আপনি এই সময়ের প্রাচুর্যের স্বাদ পাবেন। অবশ্য তা বলে হোটেলের অস্বাস্থ্যকর খাবার প্রতিদিন কিনে খেতে গেলে আবার স্বাস্থ্যের প্রাচুর্য কমে যেতে পারে-সেটাও মনে রাখতে হবে। অন্যকে সাহায্য করা, অন্যের উপকারে কিছু করা-এটিও আক্ষরিকভাবে আপনার সময়ের প্রাচুর্যকে বাড়িয়ে দিতে পারে। বর্তমানে থাকা আমাদের সময় যত না কম, তার চেয়ে বেশি কম আমরা মনে করি। কারণ আমরা বর্তমানে থাকি না। হয় আমরা অতীত নিয়ে আফসোস করি, নয়তো ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা করি। যে কারণে আমাদের সময়ের প্রাচুর্যের অনুভূতি কমে যায়। বর্তমানে থাকার চেষ্টা করুন। যেটা করছেন, সেটাতে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস করুন। চট করে হবে না, অবশ্যই। আস্তে আস্তে হবে। আপনি টাইম এফ্লুয়েন্স বা সময়ের প্রাচুর্যের অনুভূতি পাবেন।

লেখক
কনটেন্ট প্রধান ও ক্রিয়েটিভ লিড
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ