হোমপ্রবন্ধঅভিযানের গল্পকাটা মাথা ও দ্বিখণ্ডিত লাশের রহস্য

কাটা মাথা ও দ্বিখণ্ডিত লাশের রহস্য

জয়িতা শিল্পী, পিএসসি
,

ঘটনার পেছনেও বহু ঘটনা থাকে। সেগুলো খুঁজে বের করা সব সময় সম্ভব হয় না, সুযোগও হয় না। তবু কিছু ঘটনা মানুষের মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। সেসব ঘটনায় অপরাধের নৃশংসতা, তদন্তের জটিলতা এবং মানুষের ভেতরের কালিমা একসঙ্গে সামনে আসে। মানিকগঞ্জের আল-আমিন মিয়া হত্যাকাণ্ড ছিল তেমনই একটি ঘটনা।

২০২৬ সালের ২৫ মার্চ বেলা পাঁচটার দিকে মানিকগঞ্জ সদর থানার ডিউটি অফিসারের মাধ্যমে সংবাদ পাওয়া যায়, সদর থানাধীন নবগ্রাম ইউনিয়নের কালীগঙ্গা নদীতে একটি মস্তকবিহীন লাশ পাওয়া গেছে। সংবাদ পাওয়ার পর পিবিআই মানিকগঞ্জের একটি চৌকস টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। প্রযুক্তির সহায়তায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মৃত ব্যক্তির নাম আল-আমিন মিয়া (ছদ্মনাম), বয়স ২৮ বছর, পেশায় অটোচালক। পিতা মৃত আব্বাস আলী (ছদ্মনাম), মাতা তহুরা বেগম (ছদ্মনাম)। তাঁর বাড়ি ঘিওর থানার রাথুরিয়া বানিয়াজুরি এলাকায়।

পরিচয় শনাক্তের পর থানা পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। আল-আমিনের বাড়ি ঘিওর থানায় হলেও মৃতদেহটি যেহেতু মানিকগঞ্জ সদর থানাধীন নবগ্রাম ইউনিয়নের পাঁচ বারইল এলাকার কালীগঙ্গা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, হত্যাকাণ্ডটি ওই এলাকায় ঘটেছে। তাই মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা রুজু হয়।

আল-আমিনের বড় ভাই মো. রাকিব মিয়া (ছদ্মনাম) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ২৪ মার্চ বেলা ১০টার দিকে আল-আমিন তাঁর অটো নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।

পরদিন কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে পাঁচ বারইল এলাকায় রনি মিয়া (ছদ্মনাম) নামে এক ব্যক্তি গোসল করতে গিয়ে পানির মধ্যে মানুষের দেহের অংশের মতো কিছু অনুভব করেন। স্থানীয়দের সহায়তায় থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ এসে মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরে আল-আমিনের ভাই রাকিব মিয়া ও তাঁর স্ত্রী সাদিয়া আক্তার (ছদ্মনাম) ঘটনাস্থলে এসে মৃতদেহটি আল-আমিনের বলে অনুমান করেন। তবে মৃতদেহটি মস্তকবিহীন হওয়ায় পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করতে পিবিআইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়।

এদিকে পিবিআইয়ের ছায়া তদন্ত চলতে থাকে। মস্তকবিহীন লাশ, নিখোঁজ অটোরিকশা এবং অজানা হত্যাকারী-সব মিলিয়ে মামলাটি ছিল অত্যন্ত জটিল। তদন্তের শুরুতে পিবিআইয়ের হাতে দৃশ্যমান কোনো বড় সূত্র ছিল না। তবে আল-আমিনের স্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া একটি তথ্য তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। হত্যাকাণ্ডের দিন আল-আমিনের মোবাইল ফোন থেকে তাঁর স্ত্রীর ফোনে একটি কল গিয়েছিল। ওপাশ থেকে একজন বলেন, তিনি সিংগাইরে আছেন এবং ফিরতে একটু দেরি হবে। কিন্তু আল-আমিনের স্ত্রী কণ্ঠস্বর শুনেই সন্দেহ করেন এবং বলেন, “আপনি তো আল-আমিন না।” এরপর ওপাশ থেকে তড়িঘড়ি লাইনটি কেটে দেওয়া হয়।

এই কলের সূত্র ধরেই খোঁজ পাওয়া যায় আল-আমিনের পরিচিত রহমতের বিষয়ে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে বের হয়ে আসে রহমতের কর্মস্থল ধামরাইয়ের কালামপুর। পিবিআই সতর্কভাবে পরিচয় গোপন করে পৌঁছে যায় কালামপুর। তদন্তে ধীরে ধীরে রহমতের জীবনের পেছনের গল্পও সামনে আসতে থাকে। আল-আমিন ছিলেন সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ। অটো চালিয়ে যা আয় হতো, তা দিয়েই তাঁর সংসার চলত। অন্যদিকে, আল-আমিনের পরিচিত রহমত আগে থেকেই কিছুটা অপরাধপ্রবণ ছিল। তদন্তকালে তার বিরুদ্ধে পূর্বের মাদক ও মারামারির মামলার তথ্য পাওয়া যায়।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রহমত ধামরাইয়ের কালামপুরে রাজমিস্ত্রির কাজ করত। আয় কম, সংসারে চাপ, জমিজমা নেই, বাবার সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো নয়-এসব কারণে তার মধ্যে অস্থিরতা কাজ করছিল। কালামপুরে কাজ করার সময় রহমতের পরিচয় হয় গ্যারেজ মালিক শাহীনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। শাহীন তাকে অটো জোগাড় করতে বলে এবং অটো বিক্রির প্রলোভন দেখায়। এরপর থেকেই রহমতের মাথায় আল-আমিনের অটো চুরির পরিকল্পনা আসে।

পরিকল্পনার কথা সে তার শ্বশুরবাড়ির এলাকার দুই পরিচিত কাজল ও রাজীবকে (ছদ্মনাম) জানায়। তারা রহমতকে সহায়তার আশ্বাস দেয়। চুরির আগে রহমত কৌশলে একদিন আল-আমিনের অটো শাহীনের গ্যারেজে নিয়ে গিয়ে দেখায়। শাহীন জানায়, অটোটি বিক্রি করলে ভালো টাকা পাওয়া যাবে।

২৪ মার্চ আল-আমিন অটো নিয়ে বের হলে রহমত তার সঙ্গে যোগাযোগ করে। সে আল-আমিনকে বলে, বেলা শেষে বেউথা ঘাটে আসতে; পরিবার নিয়ে অটোতে ঘুরবে। আল-আমিন এতে রাজি হন। রাত আটটার দিকে আল-আমিন বেউথা ঘাটে পৌঁছে রহমতকে ফোন দেন। রহমত আগে থেকেই সেখানে ছিল। এরপর আল-আমিনের অটোতে করে তারা নবগ্রাম, পাঁচ বারইল এলাকার দিকে যায়।

পথে রহমত কাজলকে জানায় যে, আল-আমিন অটো নিয়ে এসেছে। কাজল ও রাজীবও আগে থেকেই পরিকল্পনার কথা জানত। শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি গিয়ে তারা রাজীবকে পায়। এরপর রহমত আল-আমিনকে নদীর কিনারে নিয়ে যায়। সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী আল-আমিনের ওপর হামলা করা হয় এবং তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। পরে পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে তারা মৃতদেহ বিকৃত করে নদীতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

মৃতদেহ পানিতে না ডোবার কারণে সেটি নদীর কিনারে মাটি ও ধানের গোছা দিয়ে ঢেকে রেখে তারা চলে যায়। রহমত আল-আমিনের অটোর চাবি নিয়ে নেয় এবং ভোররাতে অটোটি ধামরাইয়ের কালামপুরে শাহীনের গ্যারেজে রেখে আসে।

কালামপুরে পৌঁছে পিবিআই আরও সতর্কভাবে অগ্রসর হয়। রহমতের পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তাদের আস্থা অর্জন করা হয়। এরপর ছদ্মবেশে পিবিআই সদস্যরা শাহীনের গ্যারেজে যায়। সেখানে জানা যায়, রহমত আগের দিন একটি অটো এনে রেখেছে এবং বলেছে, সে অটোটি কিনেছে।

স্থানীয় একজনের সহায়তায় পিবিআই টিম রহমতের কাজের সাইটে পৌঁছে। ভাগ্য ভালো ছিল, রহমতকে সেখানেই পাওয়া যায়। রহমতকে হেফাজতে নিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। প্রথমে সে জানায়, অটোটি শাহীনের গ্যারেজে আছে। এরপর আরও জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করে, আল-আমিনের অটো চুরি করতে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। জেরার একপর্যায়ে কাজল ও রাজীবের নামও প্রকাশ করে।

রহমতের দেওয়া তথ্য যাচাই করতে আরেকটি টিম কাজ শুরু করে। কাজল ও রাজীবের মোবাইল নম্বর, সিডিআর ও লোকেশন বিশ্লেষণ করা হয়। যেহেতু তারা তখনও রহমতের ধরা পড়ার খবর পায়নি, তাই নিজ নিজ বাড়িতেই ছিল। পিবিআইয়ের দ্বিতীয় টিম মোবাইল লোকেশনের সহায়তায় কাজল ও রাজীবকে হেফাজতে নেয় এবং পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে আসে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনের বক্তব্যে হত্যার পরিকল্পনা, অটো চুরি এবং প্রত্যেকের ভূমিকা পরিষ্কার হতে থাকে।

রহমত জানায়, হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি সে শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়েছিল। কাজলের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পিবিআই অভিযান চালিয়ে রহমতের শ্বশুরবাড়ি থেকে ছুরি এবং কাজলের বাড়ি থেকে হাতুড়ি উদ্ধার করে। এতে তদন্তের ভিত্তি আরও দৃঢ় হয়।

যদিও তখনও কাটা মস্তক উদ্ধার করা যায়নি, তবু হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন, আসামি গ্রেপ্তার, অটো উদ্ধার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার হওয়ায় প্রেস ব্রিফিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং আসামিরা যেন আদালতের সামনে স্বেচ্ছায় ঘটনার বিবরণ দিতে পারে, সে জন্য আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

২৮ মার্চ পিবিআই মানিকগঞ্জ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। আল-আমিনের অটোটি শাহীনের গ্যারেজ থেকে উদ্ধার করে পিবিআই কার্যালয়ে আনা হয়। ফলে সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার তদন্ত-অগ্রগতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়। তবু পিবিআই টিম থেমে থাকেনি। আল-আমিনের কাটা মস্তক উদ্ধারের জন্য নদীর ধারে তল্লাশি চলতে থাকে। স্থানীয় জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা নেওয়া হয়।

২৯ মার্চ বেলা ৯টার দিকে স্থানীয় মেম্বারের মাধ্যমে খবর পাওয়া যায়, হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনাস্থল থেকে আনুমানিক দুই কিলোমিটার দূরে নদীর পাড়ে একটি মানুষের মাথা পাওয়া গেছে। থানা পুলিশ ও পিবিআই দ্রুত সেখানে যায়। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না। পরে ময়নাতদন্ত শেষে এটি আল-আমিনের মাথা বলেই প্রমাণিত হয়। এরপরও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সংগৃহীত ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে পাঠানো হয়।

আল-আমিন হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে বাংলাদেশ পুলিশের অপারেশনাল সক্ষমতা। মামলা রুজুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার, আলামত উদ্ধার, অটো উদ্ধার এবং আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা পিবিআই মানিকগঞ্জের পেশাদারিত্বের বড় উদাহরণ। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, অটো চুরির মতো সামান্য লোভ কীভাবে একজন মানুষকে হত্যার মতো নৃশংস অপরাধে ঠেলে দেয়?

অপরাধী গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়। কেন মানুষ অপরাধে জড়ায়, কীভাবে অপরাধপ্রবণতা তৈরি হয়-সেই জায়গাগুলো নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন। নইলে আল-আমিনের মতো সহজ-সরল মানুষদের জীবন ঝরে যাবে, আর সমাজ বারবার একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াবে।

লেখক
পুলিশ সুপার
পিবিআই, মানিকগঞ্জ জেলা

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ