বুধবার, জুন ১৭, ২০২৬
33.9 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমলাইফস্টাইলসারদার সালতামামি

সারদার সালতামামি

সারোয়ার মুর্শেদ শামীম
,

পত্রিকায় নিজের রোলটি দেখে অনুচ্চ স্বরে চিৎকার করে উঠলাম, “অবশেষে ইহাকে পাইলাম!” এবার পুলিশ হইবার পালা। 

৩১ মে ২০০১ যোগদান করলাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এরপর ওরিয়েন্টেশন, পোশাক-পরিচ্ছদ প্রস্তুতের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে ১৬ জানুয়ারি রওনা করলাম বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির উদ্দেশে। রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলার সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশের এই একমাত্র পুলিশ প্রশিক্ষণ একাডেমিকে বলা যায় দেশের পুলিশ বাহিনীর আঁতুড়ঘর।

সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধে ডাচ বা ওলন্দাজ বণিকেরা এই অঞ্চলে নীল ও রেশমকুঠি স্থাপন করেন। সে সময় অঞ্চলটি ছিল রাজশাহী বা লস্করপুর পরগনা অঞ্চলের রেশমকুঠির সদর দপ্তর। সেজন্য সবাই  একে ‘সদরদহ’ বলে ডাকত।কালক্রমে অপভ্রংশের মাধ্যমে তা হয়ে যায় সারদাহ, সরদহ, সারদা।

আরেকটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চলে তখন বাঘের ব্যাপক উপদ্রব ছিল। সে কারণে একে ডাকা হতো ‘শেরদা’, অর্থাৎ বাঘের গ্রাম নামে। সেখান থেকেই একসময় নামটি রূপ নেয় সারদাহ বা সারদায়।

১৪২ দশমিক ৬৬ একর সবুজ ভূমিতে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সৌষ্ঠবে ভরপুর সারদায় পৌঁছালাম মেঘলা বিকেলে। প্রথমেই চোখে পড়ল আলীবাবার সদর ফটকের মতো এক প্রবেশদ্বার। পৌঁছামাত্রই যেন চিচিং ফাঁক। প্রবেশের পর একইভাবে কপাট বন্ধ।

প্রাচীন কড়ই ও রেইনট্রি, বট, জারুল, হিজল, তমাল, কাঠগোলাপ, বনজ, ঔষধি গাছসহ নানা ফুলের সমাহার আর বড় কুঠি-ছোট কুঠির প্রতিবিম্ব পদ্মার ঢেউয়ে ভেসে চলা, সব মিলিয়ে মায়াবী এক পরিবেশ আমাদের বরণ করে নিল।

আমাদের পেয়ে সারদা যেন বলল, “ইহাদের পাইলাম!”

পুলিশ একাডেমির আঙিনায় কুঠি রয়েছে দুটি। বড় কুঠিটি বর্তমানে অফিসার্স মেস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর ছোট কুঠিটি প্রিন্সিপালের বাসভবন। জনশ্রুতি রয়েছে, পুলিশ একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রথম প্রিন্সিপাল এইচ চেমনি লঞ্চযোগে এই স্থান অতিক্রমের সময় বলে উঠেছিলেন, “ইউরেকা! অবশেষে তোমারে পাইলাম।”

প্রভিন্সিয়াল পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে বিহার ও ওড়িশার জন্য ভাগলপুর নির্বাচিত ছিল। বাংলা ও আসামের জনতাকে কেচে-ছেঁচে পুলিশে রূপান্তরের জন্য মেজর চেমনি শহরের আড়ালে একটি উন্মুক্ত দহের সন্ধানে ছিলেন। সে সময় বৃহত্তর ভারতবর্ষের গাজীপুর থেকে কলকাতা রুটে নিয়মিত লঞ্চ চলাচল করত। মেজর চেমনি এই রুটে ভ্রমণের সময় চারঘাট স্টিমার স্টেশনে নামলেন। প্রথম দর্শনেই সারদার এই অবগুণ্ঠিত প্রকৃতিখণ্ড তাঁর কাছে ফুলকুমারীর মতো ধরা দিল।

সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। তিনি গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে এই অঞ্চলে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করেন। অবশেষে ১৯১২ সালে ইহার ঘোমটা খসিয়া পড়িল। মেঘবালিকার চোখে-মুখে-কেশে লাগিল প্রসাধনীর প্রলেপ। জাগিয়া উঠিল পুলিশ একাডেমির সারদা, প্রকারান্তে সারদার পুলিশ একাডেমি।

আমাদের সারদাজীবনের শুরুতেই ছিল বৃষ্টির আশীর্বাদ। কারণ বৃষ্টিতে মাঠকর্ম বন্ধ থাকে। নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দুদিন সময় পাওয়া গেল। শুরু হয়ে গেল এক বছরের প্রশিক্ষণ। ব্যাটম্যানের অতি কসরতে মালিশে-পালিশে কালো বুটের দেহটি অতি উজ্জ্বল রূপ ধারণ করলেও ভেতরটি যেন নরকাগ্নি। ফলে প্রথম দিন বুটের সঙ্গে পরিচয়টি হলো নিদারুণ।

বুট-বিশেষজ্ঞ জ্যোতিষসম্রাট শিরীন খাতুনের ‘এর চ্যালেঞ্জ’ জাতীয় পরামর্শে ইহার কঠিন দেহ কোমল করার জন্য মাঝে মাঝে ফুটানো পানিতে ভিজিয়ে রেখেছি। সখ্য সৃষ্টির লক্ষ্যে রাত-বিরাতে বুট পরে বদ্ধ ঘরে ঠকঠক করে হেঁটেছি। ভেবেছিলাম, বোঝাবুঝি শেষ, এবার স্টেজে মেরে দেব।

আজ ওরিয়েন্টেশন পর্বে দৌড়িয়ে প্রায় সবাই স্টেজে মার খেয়েছে। বুটের ভেতর মিছরি সাহেব ছুরি চালিয়েছেন। কারও আঙুলের অগ্রভাগ, কারও গোড়ালির পশ্চাৎভাগ, কারও পায়ের ওপর-নিচ ক্ষতিগ্রস্ত। কোনো রকমে আমরা নিজ কাঁধে ভর করে আবাসস্থলে ফিরি। তবে সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আমরা বুটের দেহ-মন লাভ করি। জোয়ানের প্রথম ভরসা তার পদযুগল, যা ক্রমেই কঠিন আকার ধারণ করে।

গল্প-কবিতার সব স্থানেই পাখির কিচিরমিচিরে প্রাণিকুলের ঘুম ভাঙে। সারদা বিপরীত। এখানে প্রশিক্ষণার্থীদের কিচিরমিচিরে পাখিদের ঘুম ভাঙে। প্রাক-ভোরে দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে পিটি পোশাকে মাঠে ছুট। পিটি শেষে আবার ফিরে আসি।

এরপর প্যারেড। বুট-পরিচ্ছদ পরে আবার মাঠে। সারদার মাঠে নামলেই এক চক্করে ১ দশমিক ৭ কিলোমিটার। সঙ্গে সাড়ে চার কেজির থ্রি নট থ্রি। চক্কর ওস্তাদের মনমতো না হলে আবার বোনাস চক্করের ব্যবস্থাও রয়েছে। এই নিয়ম নারী-পুরুষ সবার জন্য একই। কেজি দেড়েক ঘাম ঝরিয়ে প্যারেডের সমাপ্তি।

এরপর হুড়মুড় করে গোসল, পোশাক পরিধান, নাশতা শেষে আইনের ক্লাস। পৌঁছাতে বিলম্ব হলে এখানেও রয়েছে বোনাস চক্কর। দূরের রাইডিং স্কুলে যাওয়া-আসায় আবার দৌড়।

আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ক্লাসে বেআইনিভাবে ঘুমানোর টুকটাক এন্তেজাম চলে। মাঝে মাঝে চোখ মৃত মানুষের মতো চেয়ে থাকে। চোখের আত্মা তখন বেঘোরে ঘুমায়। মাথার নিচে বালিশরূপী বই। বাংলাদেশ পুলিশের অনেক সদস্য পুলিশ হ্যান্ডবুকের প্রণেতা প্রয়াত গাজী শামছুর রহমানের কাছে তাঁর বালিশ-আকৃতির বইটির জন্য বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।

স্টাডি ক্লাস, ডিনার, আড্ডা, সব মিলিয়ে সাড়ে দশটা বেজে যায়। তারপর কক্ষে এসে পরের ভোরের প্রস্তুতি।

প্যারেডের মান বৃদ্ধির জন্য দুর্বলদের জন্য রয়েছে ‘রোদেলা বোনাস’। সেখানে দুপুরে ভরপেট খেয়ে কক্ষে না গিয়ে সরাসরি প্রখর রোদে মাঠে যেতে হয়। সময়ের উন্নতি না হলে ওভারটাইম। বেলার পরের পার্টি মাঠে প্রবেশের আগ পর্যন্ত চলে এই এক্সট্রা ড্রিল। সপ্তাহান্তে অগ্রগতি পরখ করা হয়। যাদের শনৈঃশনৈ উন্নতি ঘটে, তাদের আবার মূল দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রতি সপ্তাহে সবার জন্য আসে এক ভয়াল রাত, হর্স রাইডিংয়ের পূর্বরাত্রি। দৈত্যের মূর্ত প্রতীক অশ্ব। ওস্তাদজীরা বলেন, অশ্ব শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। আমরা পাক-পবিত্র হয়ে প্রার্থনা সেরে রাইডিং স্কুলে যাই। অশ্বভ্রাতার ভয়াল দর্শন আর উচ্চ হ্রেষাধ্বনির মাঝেও নিজেকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করি। কারণ প্রাণীটি পবিত্রতা পছন্দ করে। আর যা যা পছন্দ করে, সেই মতো চলারও চেষ্টা করি। তবে সব সময় মন পাওয়া যায় না। তাই তো কারণে-অকারণে মাঝে মাঝে আমরা ভূপাতিত হই।

যেমন বন্ধু মোজাহিদ অশ্বফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়। অশ্বভ্রাতা তাকে এমনভাবে পিঠ থেকে ফেলে দেয়, যেন ওসির, অর্থাৎ অশ্বের, সঙ্গে মোজাহিদের পিতার জমিজমা নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চলছে।

‘অবস্টাকল’-এ অনেক জটিল আইটেমের পাশাপাশি আছে নাজিমুদ্দিন রোডের জেলের দেয়ালসমান উচ্চতার সারমাউন্টিং ওয়াল। প্রশিক্ষণের শেষদিকে সাবালকত্ব প্রাপ্তির পর তা পার হওয়ার বিধান আছে। সারদার হারাম হওয়া ঘুমের অর্ধেকের কারণ হর্স রাইডিং, বাকি অর্ধেক এই নিঠুর প্রাচীর।

একবার আমার একমাত্র ভাইয়ের বিয়েতে ছুটি চাইতে আবেদন নিয়ে অধ্যক্ষের কাছে  গেলাম। জানলাম, শিক্ষানবিশরা কেবল নিকটজনের মৃত্যুজনিত কারণেই ছুটি পেতে পারে। কী সাংঘাতিক!

শারীরিক কসরতসমৃদ্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ট্রেইনি অ্যান্ড ট্রেইনার না হয়ে সম্পর্কটা যেন হয়ে যায় ট্রেইনি বনাম ট্রেইনার।

বয়সকালে আমিও সারদায় এসপি ট্রেনিং হিসেবে কিছুকাল চাকরি করেছি। সে সময়কার এক প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ শেষে আমার এক সিভিল বন্ধুর কাছে মন্তব্য করেছিল, সারদায় সে আমাকে কোনোদিন হাসতে দেখেনি। তবে কি সারদার কাঠিন্য আমার বিনয়ী মুখাবয়বও শক্ত আবরণে আচ্ছাদিত করে দিয়েছিল?

পুলিশ একাডেমিতে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ সময় বৃহস্পতির রাত। কারণ পরদিন শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটি। সে রাতে সবার বৃহস্পতি তুঙ্গে। সপ্তাহের সব ধকল যেন সেদিন বিকল। আজ এ পর্ণকুটিরে সাজাব প্রিয়ার অর্ঘ্য। কেউ যেন ভুল করে গেয়ে না ওঠে ঘুমপাড়ানির গান! মাঝে মাঝে বৃষ্টি আসে। আহা বৃষ্টি! প্রাণের বৃষ্টি! দুষ্টু বৃষ্টি! মিষ্টি বৃষ্টি! কমিক রিলিফ! সারদায় বৃষ্টি আসে ত্রাতা হয়ে। ভেসে যায় কর্ম, হায়!

“…কবি তখন কুটির থেকে
তাকিয়ে আছে অনেক দূরে,
বনের পরে, মাঠের পরে,
নদীর পরে, সেই যেখানে সারাজীবন বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে…”
কবির নাম মনে নেই।

এভাবেই ৩৬৫ কর্মদিবস সম্পন্ন করে আমরা পুলিশ হয়ে উঠি। সারমাউন্টিং ওয়ালের ওপর ছবি তোলার হিড়িক পড়ে। অশ্ব অনুচ্চ স্বরে আরোহীর অধীনতা স্বীকার করে। বোনাস চক্কর যেন ওয়ান। ওয়ান মানে কিছু না, দুধভাত। আমরা বেরিয়ে পড়ি। চিচিং… গোপনীয়। গেট খুলে যায়। ছড়িয়ে পড়ি চৌদিকে।

দুই

পঁচিশজন প্রবেশনার, অর্থাৎ প্রবি, বিষম আকৃতির ড্রেস পরে পবিত্র দেহ-মনে এক লাইনে দুলকি চালে রাইডিং স্কুলের দিকে চলছে। দু-একজন মনে মনে দোয়া-দরুদ পড়ায় সন্নিবিষ্ট। এভাবেই রাইডিং দল স্কুলে পৌঁছে।

সারদায় প্রশিক্ষণার্থীদের শ্রদ্ধা ও সমীহের প্রায় পুরোটাই রাইডিং মাস্টারদের অনুকূলে। ‘ইশারাই কাফি’ কথাটির উৎপত্তি সম্ভবত অশ্ব-ওস্তাদ থেকে। অশ্বের সুস্থির-অস্থিরতার নির্দেশনা থাকে তাঁদের চোখে-অবয়বে। অশ্ব চলে তাঁদের ইশারায়।

ওস্তাদজীরা রাইডিং স্কুলে লাগাম ধরিয়ে দিয়ে আমাদের ভীষণভাবে অভয় দেন আর ছোট্ট করে বলেন, “ভয় নেই। তবে সাবধানে রাইডিং করবেন। প্রাণী তো, কোনো গ্যারান্টি নেই।”

আমরাও অরুণ প্রাতের তরুণ দল। জিনের সঙ্গে পা রাখার স্থানটিকে বলে স্টাফ। সেখানে পা দুটি সেট করলে কিছুটা ভরসা মেলে। কথায় বলে, বিপদে পড়লে বেসিক বেরিয়ে আসে। অসহায়ত্বের প্রথম প্রকাশ ঘটে মাতৃভাষায়। রাইডিংকালে আমাদের এক বন্ধুর পা স্টাফ থেকে বেরিয়ে পড়ে। ভীতসন্ত্রস্ত হতচ্ছাড়ার সব আওলিয়ে যায়। ওস্তাদকে চিৎকার করে ডাকা শুরু করে, “ওস্তাদ, হা খুলি যায়, হা খুলি যায়!”

তিনি পরবর্তীকালে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মালিক গাজীর মতো ‘হা খুলি যায়’ উপাধি নিয়ে নামের সঙ্গে সগৌরবে তা আজও বহন করছেন। শেষ হাসিটা অবশ্য আমাদেরই। আমাদের শামসুন্নাহার ঘোড়াকে দাবড়িয়ে নাস্তানাবুদ করেই মেডেল নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

সারদার অশ্বের হাল রাজকীয় বটে। একটি ঘোড়ার জন্য দুজন সহিস ও খাদেম। খাদ্য, গোসল, দেহ শুকানো, দেহ শীতলীকরণ, সবকিছুতেই থাকে পরিপাটি আয়োজন। একেকটি ঘোড়া ১০ থেকে ১২ বছর সার্ভিস দেওয়ার পর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। রাজকীয় চলাফেরা ও খরচাপাতির কারণে এই দুর্বল রাজাকে প্রজাদের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। আবার সার্ভিসও নেই। সুতরাং চলে রাজকীয় মৃত্যুর সরকারি আয়োজন।

রাজকীয় রাইডিং স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় চোখে পড়ে রাজকীয় সারমাউন্টিং ওয়াল বা সেপারেশন ওয়াল। এ যেন প্রশিক্ষক আর প্রশিক্ষণার্থীর মাঝখানে দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছে। ইহার ওপারে প্রশিক্ষণ সমাপ্তির সার্টিফিকেট।

প্রশিক্ষণকালীন আমাদের এক প্রবি যখন দেখল ডানে-বামে অনেকেই সারমাউন্টিং ওয়ালে উঠে লম্ফঝম্প করছে, তখন তার ইজ্জতে মৃদু আঘাত লাগল। তিনি দুই দাঁতে জিহ্বা কামড়ে ধরলেন, দাঁড়া, দেখাচ্ছি।

দিলেন লাফ। বিধি নো বামে, নো ডানে। সরাসরি মুখের আঘাত দেয়ালের গায়ে। দুটি দাঁত তার, নেই মুখে আর, ঝরল ঝরে ঘাসের পরে, সবুজ ঘাসকে রক্তিম করে।

প্যারেডের পেষাঘাতে জীবন যেন জ্বরজ্বর, ঝরঝর। চলে দুরস্তি মার্চ। শব্দটির উৎপত্তি ‘দুরস্ত’ থেকে, যার অর্থ পরিপাটি, সুসংহত। পা যথাসম্ভব ওপরে তুলে দ্রুম করে ভূমিতে আঘাত। পা যত ওপরে, ওস্তাদের বাহবা তত ঊর্ধ্বমুখী। ওস্তাদ খুশি, প্রবি খুশি। কিন্তু পরিণামে অনেকের হাড়ে চিড় বা ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে।

আমাদের এক লড়াকু প্রবি ফ্র্যাকচারের সঙ্গে লড়াই করে গেছেন পুরো প্রশিক্ষণকাল। মাঠে গেলে ফ্র্যাকচার, ক্লাস করলে ফ্র্যাকচার, ডাইনিংয়ে গেলে ফ্র্যাকচার, এমনকি ডরমিটরিতে শুয়ে থাকলেও ফ্র্যাকচার। ফ্র্যাকচারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি ‘ফ্র্যাকচারি’ পদবি বাগিয়ে নেন।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গদ্যের জনক। আমাদের এক বন্ধু শুদ্ধ বাংলার জনক। সবাই বলে, তার টিবিএফএল, অর্থাৎ টিচিং বাংলা অ্যাজ আ ফরেন ল্যাংগুয়েজ, কোর্স করা। ‘ওহে মাঝি, কূলে তরণী ভেড়াও’ জাতীয় ছন্দে কথা বলেন।

উচ্চতর বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশিষ্টজনদের আলাদা করতে আজও বেগ পেতে হয় না। যেমন, কোন কানাই? হা খুলি যায়, কানাই। কোন কাহারি? ফ্র্যাকচারি কাহারি।কোন রুবেল? টোবফল রুবেল।

সারদার এত এত ঘর্ম আর বেহিসাবি কর্মের ছটা আনন্দময় হয়ে ওঠে কিছু অতি সজীব দিলওয়ালা প্রাণের স্পর্শে। জামালের শিল্পকলা, এহসানের পাগলামি, পিটারের অবিরত গান, শামসুন্নাহারের সুর, মনিরের জীবনমুখী জীবনালেখ্য, মাহবুবের রসালিপনা, নায়ক বিপ্লব খানের ঝলক, মোস্তাফিজের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, জ্ঞানী রাজ্জাকের শেষ বেলার প্রশ্ন, প্রশ্নকারী সানার বিশাল ভূমিকা, খেলোয়াড় কোটার মোজাহিদের ক্রীড়ানৈপুণ্য, মিয়া মাসুদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, আরও কত শত! এসব মিলিয়েই আমরা সাবালক হয়ে উঠি ক্রীড়াচ্ছলে!

তিন

শুক্রবারটি অনেকটা ইউনিফর্মবিহীন ডিউটির মতো। রাত জাগার পর ঘুমটা মাত্র চোখে জুড়ে বসেছে, এর মধ্যেই সকালের রোল কলে হাজিরার ডাক। পিটি পোশাকে রোল কল সেরে নরসুন্দরের সিরিয়ালে সুন্দর বেলা সমাপ্ত। নরসুন্দরের নিখুঁত ক্ষৌরকর্মে একটি বেলা স্মরণীয় ছিল। ঘটনাটি বলি।

ট্রেইনি অফিসারদের চুল ছোট, তবে ছাঁট স্বাধীন। অন্য ট্রেইনিদের চুল ছোট এবং ছাঁট নিয়ন্ত্রিত। নির্দয় ও ছন্দহীন ছাঁটটির নাম কদম বা বাটি ছাঁট, যা কনিষ্ঠ পদের সদস্যরা ধারণ করে। কদম ছাঁট বা বাটিছাঁটকে বলা হয় ফোর্স মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণে অব্যর্থ আদিম অবৈজ্ঞানিক, অর্থাৎ ৩ ‘অ’ প্রযুক্তি।

সেদিন নরসুন্দরের সিরিয়াল দেরিতে পেলাম। ঘুম ঘুম চোখে চেয়ারে বসলাম। কাঁচির কচকচানিতে সৃষ্ট অর্কেস্ট্রায় চোখ তলিয়ে গেল। যখন সংজ্ঞা ফিরে এল, ততক্ষণে সে এগিয়ে গেছে বহুদূর। কিন্তু একি! এ তো প্রায় বাটিছাঁট! এই নরসুন্দর অফিসার্স মেসে সেদিন প্রথম। আমার সাড়াশব্দ না পেয়ে আগের অভ্যাসে মুখস্থ ফর্মুলায় ছেঁটে গেছে।

অনেক চেষ্টার পরও মর্দের মাথার কারুকাজ সে পুনরুদ্ধার করতে পারল না। তবে পুনরুদ্ধার-কর্ম করতে গিয়ে একটি খিচুড়ি কাট দৃশ্যমান হলো, যাকে বলা যায় ‘অ-বা-ক’, অর্থাৎ অফিসার্স, বাটি ও কদম ছাঁটের সমন্বয়! আমার মাথাকে মাথাওয়ালা লোকের কাতারে আনতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

মসজিদে এএসপিদের, অর্থাৎ ট্রেইনিং অফিসারদের, আসন সম্মুখে নির্ধারিত। সেই আসনের দখল নিতে সময়ের বেশ খানিকটা আগেই ছুটতে হয়। কাজেই ছয় দিনের দাঁতভাঙা পরিশ্রমের পর সাপ্তাহিক ছুটির ছটা উপভোগের আগেই নামাজ প্যারেড। ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে সবার আগে মসজিদে প্রবেশ।

আমরা চরম ভাবগাম্ভীর্য আয়নের মানসে মাঝে মাঝে নয়ন মুদিত করি। মাঝে মাঝে তাল কাটে। অজু করে আবারও পবিত্র হই। এভাবেই সুন্দরী শুক্রবারের শুশ্রূষাহীন বিদায়!

সারদায় এএসপি পিটি পদটি মাঠবাসীদের সাক্ষাৎ অমিত্র। বিশালাকৃতির মাঠটির অংশে অংশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ চলে। এএসপি পিটি যেদিন আমাদের অংশে উপস্থিত থাকেন, সেদিন আমাদের রিজার্ভ ঘামে টান পড়ে। এদিকে এসপি ট্রেনিং আমাদের অসাক্ষাৎ অমিত্র। তিনি কখনো আসেন। তিনি যেদিন আসেন, সেদিন আমাদের মনের ঘামে টান পড়ে। আর যেদিন প্রিন্সিপাল আসেন, সেদিন ঘামহীন। শরীর থেকে উষ্ণ বাতাস ছুটে। এখন আমি ভাবি, আমি যখন কিছুদিন এসপি ট্রেনিংয়ে ছিলাম, তখন প্রশিক্ষণার্থীদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল? নিশ্চয়ই তথৈবচ!

একে তো আমি লম্বা নই, তার ওপরে ওজনও অনধিক। মানে তালপাতার সেপাই। প্রশিক্ষণের কঠোরতা আর খাদ্যগ্রহণে বিমুখতা আমার দেহে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আমি নড়েচড়ে দাঁড়াই। ভেবে কূল পাই না। রুচিবর্ধনের জন্য বড় ভাই আমার জন্য আয়ুর্বেদিক সিরাপ পাঠান। সুদৃশ্য বোতলে গোলাপি তরল। তিনজনের কক্ষে অতি গোপনে ও সযতনে দেয়ালের আড়ালে প্যাকটি সংরক্ষণ করি। সারদার দেয়ালের চক্ষু-কর্ণ সবই আছে। খবর প্রকাশ পেলে সকল চক্র আমার ওজন উদ্ধার করবে।

দুপুরে এক পেগ, রাতে এক পেগ সময়মতো মেরে দিই। হাতেনাতে ফল। জিহবা প্রসারিত হয়। ডানে-বামে তাকাই। খাবারে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিছুদিনের মধ্যে ফুলে-ফেঁপে উঠি। নজর কাড়ি। সবাই বলে, বিষয় কী? জানাই, ব্যায়ামের কারণে রুচি বেড়েছে। আহারে ব্যয় বাড়িয়েছি।

ভালোই চলছিল। তিন মাস পর তরল শেষ। আর চালান পেলাম না। রুচি উধাও। দ্রুত পূর্বাবস্থায় ফিরতে শুরু করি। কিছুদিনের ব্যবধানে আমি আবার সেই বেসিক আলী।

সারদার আবহাওয়ার এপিঠে সৌদিয়া, ওপিঠে সাইবেরিয়া। গ্রীষ্মের গরমের গরিমায় মাঠে মূর্ছার ঘটনা মাঝেমধ্যে ঘটে। শীতের বেলার কুয়াশার গাঢ়ত্ব ততটাই বেশি। লাইনের সামনের লোকটিকেও দেখা যায় না। সঙ্গে আছে পদ্মাপাড়ের হিমেল হাওয়া।

তবে গাঢ় কুয়াশার আশীর্বাদও আছে। আধো ভোরে পিটির ওস্তাদজীর কমান্ড শোনা যায়, কিন্তু তিনি আমাদের ঠিকমতো দেখতে পান না। ফলে ফল তথৈবচ।

কম্বাইন্ড ক্লাস বা অনুষ্ঠানাদি হয় চেমনি হলে, লম্বা সময় নিয়ে। এসব দীর্ঘকালীন ক্লাসে ঘুমের অপচেষ্টার অপরাধে অনেককেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তারপরও অপচেষ্টা থামে না। মন মানে, দেহ মানে না।

একদা চেমনি হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের সঞ্চালক আমি। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ভরদুপুরে শুরু হলো আলোচনা অনুষ্ঠান। কর্মক্লান্তির সঙ্গে যোগ হলো ঘর্মক্লান্তি। এ অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ শিরে শির স্থির রাখা দায়। এলিয়ে পড়ে।

মঞ্চে উপবিষ্ট এসপি মহোদয় আমাকে ইশারায় ডেকে গ্যালারির শেষদিকে ঘুমানোর চেষ্টারত একজনকে দেখিয়ে বললেন, “তাকে বল মঞ্চে এসে আজকের অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু নিয়ে বক্তব্য দিতে।”

অভিনব শাস্তি! আমি মাইকে তার নাম ঘোষণা করলাম। ঘোষণাটি বুঝতে সবার একটু সময় লাগল। ডানে-বামের ব্যাচমেটরা তাকে জাগিয়ে দিল। পড়িমড়ি করে বন্ধুটি মঞ্চে এল। তবে সে তালে মাতাল, জাতে ঠিক। বক্তব্যে সাবলীল। সবাই হাঁফ ছাড়ল। সেই দিন থেকে চেমনি হল থেকে ঘুম উধাও। এবার দেহ মানে, মন মানে না। এমনই স্মৃতি আরও কত শত! ভাবি হায়, আর কি ফিরে পাব সে জীবন?

লেখক
ডিআইজি (লজিস্টিকস)
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ