ওরা বলেছিল, “একদম চিন্তা করবেন না ভাবিসাব! সকালেই আমরা ওকে ছেড়ে দেব।”
ক্যান্টনমেন্টের সেনা ছাউনিতে একই আবাসিক এলাকায় আমাদের সঙ্গে ওদের বসবাস। পাকিস্তানি হলেও সবার সঙ্গেই কমবেশি পরিচয় ছিল। আচার-আচরণ রহস্যজনক মনে হলেও মা ওদের কথায় বিশ্বাস রেখেছিলেন। তবু অজানা আশঙ্কায় বুক কাঁপছিল।
একটু দেরি হতেই হায়েনার হুঙ্কারে কেঁপে উঠল সরকারি কোয়ার্টার। প্রবল বাধার পরও অস্ত্রের মুখে মা পরাস্ত হলেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো বাবাকে ওরা নিয়ে গেল অজানা অন্ধকারে। যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে সেদিন রাতে পরিবারকে একনজর দেখতে চুপিসারে এসেছিলেন বাবা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।
বীভৎস রাতের বিভীষিকায় কখন যে ভোর গড়িয়ে বেলা হলো, টেরই পাওয়া গেল না। আশায় বুক বেঁধে চলল অপেক্ষার পালা। বেলা গড়িয়ে ভরদুপুর। চারপাশ খাঁখাঁ করছে। যুদ্ধ তবে কি লেগেই গেল? দেশপ্রেমের শপথে বলীয়ান তখন পুরো জাতি। বুকের দুধ খাওয়া তিন মাসের সোনামনিটাও সেদিন মুখে দুধ নিচ্ছে না।
বাবাহীন পাঁচটি শিশুর কান্নায় প্রকম্পিত হলো তিন কক্ষের সরকারি কোয়ার্টার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতার প্রতিচ্ছবি ভাসতে থাকল হৃদয়ের আয়নায়। দিন গেল, মাস গেল, বছরও পেরোল। অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতেই কাটতে থাকল মায়ের জীবন।
স্বাধীন দেশ হলো। লাল-সবুজে শোভিত নিজস্ব পতাকা হলো। নিজস্ব মানচিত্র পেল বাঙালি জাতি। সবাই অনেক কিছু পেল। শুধু আমার বাবা আর ফিরে এলেন না। ৩৭ বছর অপেক্ষা করতে করতে মাও একদিন পাড়ি দিলেন অজানা রাজ্যের অচিনপুরে।
২৫ মার্চ এলেই অঝোরে কাঁদতে ইচ্ছে করে। বাবাকে ডাকতে ইচ্ছে করে। ভালোবাসার স্পর্শে তাঁকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে। প্রতি বছর ডিসেম্বর এলেই যুদ্ধের ময়দানে যেতে ইচ্ছে করে, যে ময়দানে হয়তো মিলন হবে বাবার সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে। আমিও মুখ লুকাব বাবা-মায়ের হৃদয়ের মণিকোঠায়।

