বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে শীতের বিদায় ও বসন্তের আগমন প্রকৃতিতে যেমন এক ধরনের নান্দনিক রূপ এনে দেয়, তেমনি আবহাওয়া ও পরিবেশে লক্ষ্য করা যায় স্পষ্ট পরিবর্তন। এ সময়ে রাতের বেলায় শীতের তীব্রতা অনুভূত হয়, অথচ দিনের কোনো কোনো সময়ে বেশ গরমও লাগে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কুয়াশা, শুষ্ক বাতাস এবং তুলনামূলক কম সময়ের দিনের আলো। সব মিলিয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল এই আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণে অনেকেই এ সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।এ সময় অঞ্চলভেদে আবহাওয়ার তারতম্যও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। দেশের সব অঞ্চলে শীতের ধরন এক রকম নয়। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশা বেশি দেখা যায়; মধ্যাঞ্চলে শুষ্ক শীতের পাশাপাশি বায়ুদূষণের প্রভাব তুলনামূলক বেশি থাকে; উপকূলীয় এলাকায় ঠান্ডার সঙ্গে আর্দ্রতা যুক্ত হয়; আর পাহাড়ি অঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যায়। ফলে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে একটি বিষয় সবার জন্যই প্রযোজ্য, এই সময়ে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে।এই প্রেক্ষাপটে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের স্বাস্থ্যপরামর্শ কেবল শীত এড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আবহাওয়া, পরিবেশ, জীবনযাত্রা এবং পেশাগত বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই তা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তাই বছরের শুরুতেই যদি সচেতন ও বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্যপরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়,তবে সুস্থতার সঙ্গে নতুন বছর শুরু করা সম্ভব।
সুস্থ থাকার জন্য দৈনন্দিন যা করবেন
খাদ্যাভ্যাস:
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে সাধারণত শরীর তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় থাকে। ফলে হজমের সমস্যা, ওজন বৃদ্ধি এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। তাই নতুন বছরের স্বাস্থ্যপরিকল্পনায় খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।শীতকালীন সবজি, গাজর, পালংশাক, শিম, মুলা, বাঁধাকপি ও ফুলকপি ইত্যাদি নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এগুলোতে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশসমৃদ্ধ উপাদান থাকে, যা হজমশক্তি উন্নত করে এবং শরীরকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত তেল-ঝাল ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে আনা জরুরি, যাতে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং পরিপাকতন্ত্র সুস্থ থাকে।
পর্যাপ্ত পানি পান:
জানুয়ারি মাসে যে সমস্যাটি প্রায়ই আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, তা হলো পানিশূন্যতা। ঠান্ডা আবহাওয়ায় তৃষ্ণা কম অনুভূত হয়, ফলে অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করেন। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ত্বক, হজমপ্রক্রিয়া এবং কিডনির ওপর।শরীর শুষ্ক হয়ে যেতে পারে, কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনির জটিলতাও তৈরি হতে পারে। তাই নতুন বছরের সংকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।
নিয়মিত শরীরচর্চা:
শীতকালে শরীরচর্চা কমে যাওয়া একটি স্বাভাবিক প্রবণতা। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে অনেকেই অলসতা অনুভব করেন এবং বাইরে বের হতে অনীহা দেখান। কিন্তু এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।তাই প্রতিদিন নিয়মিত কিছু না কিছু শরীরচর্চা করা প্রয়োজন। হালকা হাঁটা, সকালের রোদে কিছুক্ষণ সময় কাটানো কিংবা ঘরের ভেতর সহজ ব্যায়ামও শরীরকে সক্রিয় রাখতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। নিয়মিত নড়াচড়া রক্তসঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে, মন ভালো রাখে এবং সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
মানসিক স্বাস্থ্য:
আমাদের সবচেয়ে অবহেলিত স্বাস্থ্যসমস্যাগুলোর একটি হলো মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব না দেওয়া। নতুন বছরের শুরুতে অনেক সময় বিগত বছরের না-পাওয়া ও ব্যর্থতার অনুভূতি থেকে এক ধরনের হতাশা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বছরের নানা পরিকল্পনা ও প্রত্যাশা আমাদের মনে অতিরিক্ত চাপও সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে জানুয়ারি মাসে দিনের আলো কমে যাওয়া এবং শারীরিক গতিশীলতা হ্রাস পাওয়ায় মন ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও ভারী হয়ে উঠতে পারে।এই সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রথম প্রয়োজন হলো নিয়মিত ও গভীর ঘুম নিশ্চিত করা। অনিয়মিত ঘুম মনোযোগ কমিয়ে দেয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল করে এবং অকারণ বিরক্তি সৃষ্টি করে। কাজের ফাঁকে স্বল্প সময়ের সচেতন বিরতি নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। টানা কাজ করার চেয়ে পরিকল্পিত বিশ্রাম মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বেশি কার্যকর। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, খোলামেলা কথা বলা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট আনন্দে অংশ নেওয়া মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক। মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হলে তবেই শারীরিক সুস্থতাও পরিপূর্ণতা পায়।
লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
সিআইডি, ঢাকা
