শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬
34 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধগবেষণা আলাপনপিবিআই গবেষণা:ময়নাতদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি ও সুপারিশমালা

পিবিআই গবেষণা:ময়নাতদন্তে প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি ও সুপারিশমালা

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

আত্মহত্যার খবর আমরা প্রায় প্রতিদিনই শুনি—কোথাও পুলিশ ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে, কেউ বিষ পান করেছেন, আবার কেউ উঁচু ভবন থেকে লাফ দিয়ে নিজের জীবন শেষ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিটি ঘটনাই কি সত্যিই আত্মহত্যা? এমনকি হতে পারে না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হচ্ছে, আর তদন্ত প্রক্রিয়ায় সেই ভুল ধরা পড়ছে না?
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই) চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছে। শুরুর দিকের মামলার ময়নাতদন্ত এবং বাদীর অভিযোগের ভিত্তিতে চার্জশিটে আত্মহত্যা বলা হয়। কিন্তু পিবিআই যখন মামলার তদন্ত করে, বেরিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। অনেক ক্ষেত্রেই শুরুর দিকের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের সঙ্গে পরবর্তীতে উঠে আসা তথ্যের মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য খুঁজে পায় পিবিআই।

এটি এক-দুইটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; পিবিআইয়ের সাম্প্রতিক মামলা-পর্যালোচনামূলক গবেষণায় এমন অসংখ্য ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। ডিটেকটিভে ইতঃপূর্বে প্রকাশিত পিবিআই-এর গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণের ধারাবাহিকতায় এবারের সংখ্যায় থাকছে পিবিআইয়ের “ময়নাতদন্তে আত্মহত্যা, পিবিআই-এর তদন্তে হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত” শিরোনামের রিপোর্টের বিশ্লেষণ। যেকোনো মামলা নথিভুক্তকরণ এবং চার্জশিট প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুলিশের একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ময়নাতদন্ত। মূলত ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই, পাশাপাশি বাদীর অভিযোগ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান বিবেচনায় নিয়ে মামলার চার্জশিট প্রস্তুত করা হয়।

একটি চার্জশিট এতগুলো ধাপ অতিক্রম করার পরও যদি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড তা সঠিকভাবে নির্ধারিত না হয়, এবং পরবর্তীতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই)-এর তদন্তে উঠে আসে যে কথিত আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আসলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—প্রাথমিক চার্জশিট প্রণয়নের আগের ধাপগুলোতে কি গুরুতর ত্রুটি রয়েছে? এক্ষেত্রে প্রথমেই সামনে আসে ময়নাতদন্তের বিষয়টি। পিবিআই কর্তৃক তদন্তকৃত একাধিক মামলায় দেখা গেছে, পূর্ববর্তী ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত মৃত্যুর কারণ পিবিআইয়ের অনুসন্ধানী ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব মামলায় প্রস্তুত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিচারিক মানদণ্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

পিবিআইয়ের গবেষণা অনুযায়ী, সাধারণভাবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল বা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত ও প্রক্রিয়াগত কারণ চিহ্নিত করা যায়।
প্রথমত, বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জন্য ফরেনসিক মেডিসিনে বিশেষায়িত, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় সমস্যা। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া ময়নাতদন্ত পরিচালনা করলে প্রতিবেদন অনেক জটিল বিষয়বস্তুর বিশ্লেষণে ত্রুটি দেখা দেয়।
দ্বিতীয়ত, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সংখ্যা কম থাকায় বিদ্যমান চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। স্বল্প সময়ে একাধিক ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে অনেক সময় বিশ্লেষণী ত্রুটি হয় এবং বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কম থাকে। এর ফলে প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যায়।
তৃতীয়ত, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কার্যকর মর্চুয়ারি কুলার সিস্টেম না থাকায় ময়নাতদন্তের জন্য আনা মৃতদেহ দ্রুত পচনপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করে। ফলে আঘাতের প্রকৃতি, মৃত্যুর সময় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক তথ্য সঠিকভাবে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায় এবং প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।
চতুর্থত, জটিল ও রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বোর্ড গঠন করা প্রায়ই সম্ভব হয় না। ফলে একাধিক জটিল প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেক সময় এক ব্যক্তির মতামতের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

ভিসেরা হলো মৃত মানুষের শরীরের ভেতরের কিছু অংশ, যেমন পাকস্থলী, যকৃত, কিডনি বা অন্ত্র—যেগুলো পরীক্ষা করে ডাক্তাররা মৃত্যুর কারণ বোঝার চেষ্টা করেন।

এছাড়াও, ভিসেরা পরীক্ষার জন্য সংগৃহীত আলামত যথাযথভাবে সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় সুবিধা ও মানসম্মত প্রক্রিয়ার অভাব রয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার ফলাফল বিলম্বিত বা অস্পষ্ট হয়ে যায় এবং তদন্তের ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।
সবশেষে, আদালতে সাক্ষ্য প্রদান এবং সম্ভাব্য জটিলতা বিবেচনায় রেখে অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ায়
সরাসরি অংশগ্রহণে আগ্রহী হন না। এই অনীহা একদিকে ময়নাতদন্তে দক্ষ জনবলের ঘাটতি সৃষ্টি করছে, আর জটিল মামলায় প্রয়োজনীয় এক বা একাধিক বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা না পাওয়ার কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ময়নাতদন্তে মূল কাঠামোগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা হলো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অবস্থিত মর্গের বেহাল অবস্থা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, দক্ষ কর্মকর্তা বা কর্মচারী নেই, এবং যে জনবল আছে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই) গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মর্গসমূহের প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাগুলো নিম্নরূপ তুলে ধরা হয়েছে—

প্রথমত, মৌলিক অবকাঠামোর অভাব রয়েছে, যেমন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, পর্যাপ্ত আলো, বিশুদ্ধ পানি, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, পরিচ্ছন্ন কর্মপরিবেশ, মৃতদেহ সংরক্ষণের উপযুক্ত কোল্ড স্টোরেজ এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই সীমাবদ্ধতাগুলো শুধু পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকরই করেনি, বরং সেখানে কাজ করাটাই সংশ্লিষ্টদের জন্য চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির অভাব ময়নাতদন্তের নির্ভুলতাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। অধিকাংশ মর্গে মৃত্যুর সময় নির্ধারণ, সূক্ষ্ম আঘাত বিশ্লেষণ, বিষক্রিয়া শনাক্তকরণ বা টিস্যু সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক ল্যাবের স্বল্পতা বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। জেলা পর্যায়ে ফরেনসিক ল্যাব না থাকায় নমুনা সংগ্রহের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই মৃতদেহে ডিকম্পোজিশন শুরু হয়। এতে ফরেনসিক গুরুত্বপূর্ণ আলামত এবং নমুনা নষ্ট হয়, রিপোর্ট ত্রুটিপূর্ণ ও বিলম্বিত হয়। এবং তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়।

চতুর্থত, অতিরিক্ত কর্মচাপ ও সময়স্বল্পতা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। একজন চিকিৎসককে স্বল্প সময়ে একাধিক ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করতে হয়। এই চাপের কারণে বিস্তারিত ফরেনসিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে প্রতিবেদন সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে অনেক সময় যথাযথ বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও থাকে না।

ময়নাতদন্তের সংশ্লিষ্ট বিভাগসমূহে অতিরিক্ত কর্মচাপের মূল কারণ হলো চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত লোকবল না থাকা, যা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মর্গগুলোতে ময়নাতদন্ত পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত ডাক্তারও নেই। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ডাক্তারদের জন্য ফরেনসিক বিভাগের পেশাগত এবং দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য বিভাগের তুলনায় কম। এর ফলে অনেক ডাক্তার ফরেনসিক বিষয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহী হন না, যা স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার্থী ও পরবর্তীতে ডাক্তার কম থাকার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই সঙ্গে ফরেনসিক চিকিৎসকদের অনেক সময় আদালতে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য প্রদান করতে হয়। এই বিষয়টি অনেক ডাক্তারই ঝামেলাপূর্ণ মনে করেন, যার কারণে তারা ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। এছাড়াও আছে ফরেনসিক বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি। অধিকাংশ জেলায় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা ফরেনসিক মেডিসিনে বিশেষায়িত নন। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আপডেটেড জ্ঞান ছাড়া তারা বাধ্য হয়েই রুটিনভিত্তিক, বর্ণনামূলক এবং বিচারিকভাবে দুর্বল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন, যা আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সবশেষে চিকিৎসকের পাশাপাশি মর্গে পর্যাপ্ত মর্গ অ্যাসিস্ট্যান্ট ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাব একটি 

গুরুতর বা বাস্তব সমস‍্যা হিসেবে রয়ে গেছে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মর্গ অ্যাসিস্ট্যান্ট না থাকায় মৃতদেহ হ্যান্ডলিং, আলামত সংরক্ষণ, নমুনা সংগ্রহ এবং নথিভুক্তকরণে প্রয়োজনীয় সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে নিশ্চিত করা যায় না। একইভাবে নিয়মিত ও মানসম্মত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকায় মর্গের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। এটি একদিকে ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়ার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি করে। এসব পরিবেশগত, ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ জনবল-সংক্রান্ত ঘাটতি ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও যান্ত্রিক ও ত্রুটিপূর্ণ করে এবং বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা অর্জনের পথে একটি মৌলিক অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।

পিবিআই কর্তৃক ময়নাতদন্ত সম্পর্কিত সুপারিশমালা

উপর্যুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পিবিআই ময়নাতদন্ত ব্যবস্থার মানোন্নয়নের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেছে। এসব সুপারিশের মূল লক্ষ্য হলো ময়নাতদন্ত প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল, বিচারিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে টেকসই করে তোলা।

ফরেনসিক মেডিসিনে বিশেষায়িত জনবল বৃদ্ধি ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা: ময়নাতদন্তে নিয়োজিত চিকিৎসকদের জন্য আধুনিক, হালনাগাদ ও মানসম্মত ফরেনসিক প্রশিক্ষণ ছাড়া বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্য এবং বিচারিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রতিবেদন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফরেনসিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদায়ন ও জনবল সংকট নিরসন: জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞের অভাব অতিরিক্ত কর্মচাপ সৃষ্টি করে এবং ময়নাতদন্তের মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; তাই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের জন্য পৃথক পদ সৃষ্টি ও কার্যকর পদায়ন জরুরি।
মর্গ অবকাঠামো ও আধুনিক যন্ত্রপাতির উন্নয়ন: কার্যকর মরচুয়ারি কুলার সিস্টেম, পর্যাপ্ত আলো, পানি, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তা সুবিধা ছাড়া সঠিক ফরেনসিক বিশ্লেষণ সম্ভব নয়; এ অবকাঠামোগত দুর্বলতা সরাসরি প্রতিবেদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জটিল মামলায় বিশেষজ্ঞ বোর্ডের মাধ্যমে ময়নাতদন্ত: একক মতামতের পরিবর্তে বোর্ডভিত্তিক ময়নাতদন্ত জটিল ফরেনসিক প্রশ্নে নিরপেক্ষতা ও বিচারিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
ভিসেরা ও ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণের মানসম্মত ব্যবস্থা এবং ফরেনসিক ল্যাব সক্ষমতা বৃদ্ধি: নমুনা সংরক্ষণে ত্রুটি বা রিপোর্টে দীর্ঘসূত্রতা তদন্তের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত করে এবং অপরাধ প্রমাণ করার ক্ষমতা দুর্বল করে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের আদালতে সাক্ষ্য প্রদান সংক্রান্ত কাঠামোগত ও নীতিগত জটিলতা নিরসন: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাক্ষ্য ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তার পূর্ণ প্রমাণযোগ্যতা হারায়, যা অভিযোগ প্রমাণের ভিত্তিকে কিছুটা দুর্বল করে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এর গবেষণা প্রতিবেদন হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান কিছু মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে এনেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বহু হত্যা মামলায় অভিযোগ প্রমাণে ব্যর্থতার পেছনে প্রধানত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার সদিচ্ছার অভাব নয়; বরং তদন্তের বিভিন্ন ধাপে সমন্বয়হীনতা, সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং সহায়ক প্রতিবেদন প্রস্তুতির মান সরাসরি বিচারিক ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলে।

এই প্রেক্ষাপটে পিবিআই-এর সুপারিশগুলো বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। একটি বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থা হিসেবে পিবিআই মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসব সুপারিশ প্রণয়ন করেছে, যা বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি তদন্ত ব্যবস্থার প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলোই প্রতিফলিত করে। তাই এসব সুপারিশকে কেবল গবেষণামূলক মতামত হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এগুলোকে রাষ্টধীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। প্রশিক্ষণ, জনবল, অবকাঠামো ও নীতিগত স্পষ্টতার ঘাটতি দূর করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এর প্রস্তাবিত দিকনির্দেশনাগুলো সরকারি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত ও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হলে, ফৌজদারি তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক মানোন্নয়ন আরও সুদৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ