২০২৫ সালটি ছিল বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি পুনরুজ্জীবনের বছর। এই বছরটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার কালিমা ছাপিয়ে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনের বছর। বিগত এই বছরে পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বাহিনীটি কেবল প্রথাগত দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নিজেদের আমূল সংস্কারের দিকে ধাবিত হয়েছে এবং জোর দিয়েছে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার প্রতি।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তন এবং লোগোর আধুনিকায়ন ছিল কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের প্রতীক, কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির ব্যবহারে (যেমন অনলাইন জিডি এবং জিনিয়া অ্যাপ) এবং মানবিকতায়। নতুন বছরে এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুলিশের পরিবর্তন ও তাদের গৃহীত পদক্ষেপ, যা জনগণের সাথে দূরত্ব কমাতে এবং জন-আস্থা ফেরাতে সাহায্য করেছে—এমন ১০টি পদক্ষেপকে আমরা ফিচার করছি আমাদের এবারের সংখ্যায়।
১| পুলিশ কমিশন গঠন (২০২৫)

২০২৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে পুলিশ কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘদিনের জনদাবি এবং পুলিশের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়। এর মাধ্যমে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের পথ তৈরি হয়, যার নেতৃত্বে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি থাকার বিধান রাখা হয়। এই কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পুলিশকে আরও জনবান্ধব ও প্রভাবমুক্ত করার লক্ষ্যে নীতিগত সুপারিশ প্রদান, পুলিশের কার্যক্রমে জবাবদিহি জোরদার করা এবং নাগরিক অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির কাঠামো তৈরি করা। সাম্প্রতিক সময়ের আস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগকে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা হিসেবে দেখা হয়।
২| অনলাইন জিডি সেবার দেশব্যাপী বাস্তবায়ন

২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক যুক্ত হয়। এদিন থেকে দেশের সকল থানায় এবং ২৪টি রেলওয়ে পুলিশ স্টেশনেও অনলাইন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) সেবা চালু করা হয়। এর ফলে নাগরিকরা ঘরে বসেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপের মাধ্যমে হারানো সংক্রান্ত তথ্য কিংবা অভিযোগ নথিভুক্ত করার সুযোগ পান। এই সেবার মাধ্যমে থানায় সরাসরি উপস্থিত হয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়ে হয়রানির আশঙ্কা অনেকাংশে কমে আসে। অতীতে দেখা গেছে, অনেক ভুক্তভোগী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সামাজিক চাপের কারণে থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে অনীহা প্রকাশ করতেন। অনলাইন জিডি চালুর ফলে নাগরিকদের জন্য তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত ও সহজ একটি অভিযোগ দাখিলের পথ তৈরি হয়, যা পুলিশের কাছে অভিযোগ পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকেও আরও সহজ করে তোলে। অনলাইনে জিডি করার পর তাৎক্ষণিক ডিজিটাল কপি প্রাপ্তি এবং সার্বক্ষণিক সহায়তা ব্যবস্থার কারণে নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার একটি ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয়। প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব পুলিশিংয়ের একটি কার্যকর উদাহরণ হিসেবে এই উদ্যোগটি বিবেচিত হয়।
৩| ‘ডেভিল হান্ট’ অপারেশন
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ পুলিশ দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট’ অপারেশন চালু করে। চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ সহিংস অপরাধ মোকাবিলায় শুরু হওয়া এই অভিযানে গোয়েন্দানির্ভর লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করা হয়। গণগ্রেপ্তারের বদলে অপরাধে সরাসরি জড়িত ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়, যেখানে অবৈধ অস্ত্র ও অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস বিচ্ছিন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই অপারেশন আইনানুগ ও মানবাধিকারসম্মত পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে অপরাধ দমনের সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪| দুর্গাপূজায় অভূতপূর্ব নিরাপত্তা

২০২৫ সালের দুর্গাপূজায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা ছিল বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও সহিংসতার আশঙ্কা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানামুখী চাপের মুখে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে সারাদেশে ৩৩,৩৫০টি মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৭১,০৬৬ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পূজার আগে, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন পরবর্তী এই তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ৪,৬৭০টি মণ্ডপে র্যাবের কঠোর নজরদারি এবং ড্রোনের মাধ্যমে তদারকির বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি সৃষ্টি করে। কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দুর্গাপূজা উদযাপন সম্পন্ন হওয়ায় পুলিশের সক্ষমতা দেশি–বিদেশি পরিসরে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
৫| পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫: মাঠপর্যায়ের স্বীকৃতি

২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ‘পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫’ উদযাপিত হয়। এবারের পুলিশ সপ্তাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পদক প্রদানের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের অবদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া। কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের পেশাগত সাহসিকতা ও দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে ৬২ জন পুলিশ সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) প্রদান করা হয়। পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় এমন অনেক সদস্য ছিলেন, যারা ৫ আগস্ট–পরবর্তী অস্থির সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই উদ্যোগ মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৬| জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদক: নারী কন্টিনজেন্ট

২০২৫ সালের আগস্টে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর রাজধানী কিনশাসায় BANFPU-1 –এর সদস্যরা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদকে ভূষিত হন। MONUSCO–এর অধীনে দায়িত্ব পালনরত এই কন্টিনজেন্টের ১৭৮ জন সদস্যের মধ্যে ৬৮ জন নারী পুলিশ সদস্য পদক গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি বিন্তু কেইতা বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করেন এবং নারী শান্তিরক্ষীদের ভূমিকাকে লৈঙ্গিক সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন–এর বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ২০২৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ সফলতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
৭| সিলেটে স্মার্ট পুলিশিং: ‘জিনিয়া’ অ্যাপ

২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) ‘জিনিয়া’ নামের একটি আধুনিক স্মার্ট অ্যাপ চালু করে। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা এক ক্লিকেই পুলিশের জরুরি সহায়তা পেতে পারেন। এতে লোকেশন শেয়ারিং, নোটিফিকেশন এবং অভিযোগ ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা যুক্ত করা হয়। সিলেট শহরকে একটি নিরাপদ ও আধুনিক স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তোলার এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ড্রোন সার্ভেইল্যান্স এবং প্রবাসীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা সহায়তার ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়। প্রযুক্তির এই উদ্ভাবনী ব্যবহার পুলিশকে একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক বাহিনী হিসেবে উপস্থাপন করে, যা জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
৮| পুলিশের মাসভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ

২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশ পুলিশ নিয়মিত মাসভিত্তিক ও ইউনিটভিত্তিক অপরাধ পরিসংখ্যান প্রকাশ শুরু করে। এসব প্রতিবেদিত তথ্য দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এতে মেট্রোপলিটন ও রেঞ্জভিত্তিক মামলার ধরন ও সংখ্যা, পাশাপাশি সমাধানকৃত মামলা এবং উদ্ধারকৃত অবৈধ মালামালের তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে| এর মাধ্যমে পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় এবং জনগণ সরাসরি পুলিশের কার্যপরিধি ও পেশাগত সক্ষমতা সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক ধারণা পায়।
৯| অহিংস পুলিশিংয়ের দৃষ্টান্ত
ঢাকা মহানগর পুলিশের কনস্টেবল রিয়াদ হোসেন বলপ্রয়োগ ছাড়াই বুদ্ধিমত্তা ও সংযমের মাধ্যমে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম) লাভ করেন। সচিবালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভে তিনি সহিংসতা এড়িয়ে পরিস্থিতি শান্তভাবে সামাল দেন, যা জনমনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পায়। ২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। নাগরিকদের প্রতি সম্মান বজায় রেখে উদ্ভাবনী ও মানবিক পুলিশি কৌশলের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদত্ত এই পদক পুলিশের ভেতরে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় আধুনিক পুলিশিংয়ে বলপ্রয়োগ নয়, বরং সংযম ও বুদ্ধিমত্তাই মূল পথ।
১০| পোশাক ও প্রতীকের পরিবর্তন

২০২৫ সালের ১৮ ও ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের নতুন পোশাক ও লোগো আনুষ্ঠানিকভাবে দৃশ্যমান হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ‘টার্কিশ ব্লু’ পোশাকের পরিবর্তে ‘আয়রন গ্রে’ শার্ট এবং ‘চকলেট ব্রাউন’ প্যান্ট প্রবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক রূপান্তর নয়; বরং পুলিশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করার একটি প্রতীকী বার্তা বহন করে। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পোশাক পুলিশ সদস্যদের মানসিকভাবে একটি নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে এবং জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিবর্তন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং অনেকেই এটিকে সংস্কারের সদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে দেখেন। হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের পথে এই রঙ ও প্রতীকের পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়।
