সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ ও জনমনে পুলিশের পরিবর্তিত পোশাকের রঙ নিয়ে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে এবং পুলিশেরপ্রতি জন-আস্থা পুনর্গঠনের একটি উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত। তবে এই পরিবর্তন নিয়ে বাহিনীর ভেতরেও মতভেদ রয়েছে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, শতকরা প্রায় ৯০ ভাগের বেশি পুলিশ সদস্য তাদের পূর্বের ইউনিফর্মে ফিরে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু একটি বাহিনীর পোশাক বা পোশাকের রঙ পরিবর্তন আসলে শুধুই বাহ্যিক পরিবর্তন বা নান্দনিকতার প্রশ্ন নয়, কারণ পুলিশ বাহিনীর কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত এবং প্রতিবন্ধকতায় পরিপূর্ণ।তাদের রোজকার দায়িত্ব সামলাতে হয় কঠোর পরিস্থিতি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে। এমতাবস্থায় এই বাহিনীর পোশাক যেমন টেকসই হওয়া চাই, একই সঙ্গে প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের উপযোগিতা। একই সঙ্গে পুলিশের ইউনিফর্মের রঙের প্রশ্নটিও নান্দনিক পছন্দের চেয়ে বেশি-এটি কার্যকারিতা, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত। একজন পুলিশ সদস্য সাধারণত তিনটি প্রধান দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করেন: অপরাধ প্রতিরোধ, নাগরিক আস্থা অর্জন এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কৌশলগত সক্ষমতা বজায় রাখা। ইউনিফর্মের রঙ এই তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অপরাধ প্রতিরোধ ও দৃশ্যমান কর্তৃত্ব
পুলিশের উপস্থিতিই একটি প্রতিরোধমূলক উপাদান। গাঢ় রঙ সাধারণত বেশি কর্তৃত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়।নেভি ব্লু, কালো বা গাঢ় ধূসর রঙের ইউনিফর্ম দৃশ্যত একটি পেশাদার বাহিনীর প্রতিচ্ছবি দেয়। এর ফলে আইন-শৃঙ্খলার প্রতীক হিসেবে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট হয়। তবে গবেষণায় এটিও দেখা গেছে যে, অত্যন্ত গাঢ় বা সামরিক ধাঁচের চেহারা কখনো কখনো নাগরিকদের কাছে পুলিশের ভাবমূর্তিকে কঠোর হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।অর্থাৎ, কর্তৃত্বের বার্তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য কাজ করে।
নাগরিক আস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া
রঙ মানুষের আবেগ ও আচরণে প্রভাব ফেলে।মনস্তাত্ত্বিকগবেষণায় দেখা গেছে, নীল রঙ সাধারণত নিরাপত্তা, স্থিরতা ও আস্থার অনুভূতি সৃষ্টি করে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত একটি গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয় যে, নীল রঙ অবচেতনভাবে মানুষের মধ্যে স্থিরতা ও নিরাপত্তাবোধ জাগ্রত করে, যা কর্তৃত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে সহায়ক। কালো শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক হলেও তা আধিপত্য বা ভীতির অনুভূতি তৈরি করতে পারে; ধূসর নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের ধারণা দেয়; খাকি বা হালকা রঙ তুলনামূলকভাবে সহজগম্য ও কম আনুষ্ঠানিক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে।কমিউনিটি-ভিত্তিক পুলিশিং ব্যবস্থায় যেখানে নাগরিকের সহযোগিতা অপরিহার্য, সেখানে ইউনিফর্মের রঙ পুলিশ সদস্যের প্রতি প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। রঙের মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রথম ধারণা পরবর্তী যোগাযোগের ধরনকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রাখে।
নিরাপত্তা ও কৌশলগত বাস্তবতা
রঙের একটি সরাসরি ব্যবহারিক দিকও রয়েছে। গাঢ় রঙ রাতের পরিবেশে কম দৃশ্যমান হতে পারে, যা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতেকৌশলগত সুবিধা দেয়। একই সঙ্গে গাঢ় কাপড়ে ময়লা বা দাগ কম চোখে পড়ে, যাদীর্ঘ সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বাস্তব সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, উষ্ণ আবহাওয়ায় হালকা রঙ তাপ শোষণ কম করতে পারে, যদিও এটি আলাদা পরিবেশগত বিবেচনার বিষয়। বিশেষ দায়িত্ব বা পরিবেশভিত্তিক ইউনিটে রঙ ভিন্ন হতে পারে, যেমন বনাঞ্চলে সবুজ বা উষ্ণ অঞ্চলে খাকি।পুলিশের ইউনিফর্মের রঙ তিনটি মাত্রায় কাজ করে—প্রতীকী কর্তৃত্ব, মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া এবং কৌশলগত বাস্তবতা। রঙের নির্বাচন তাই সরাসরি পুলিশের কাজের ধরন,পরিবেশ এবং জনসম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের ইউনিফর্মের পরিবর্তনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বাস্তবতা, পুলিশিংয়ের ধারণাগত পরিবর্তনএবং জনমনে পুলিশের ভাবমূর্তির রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ইউনিফর্মের রঙ ও নকশায় একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে।সেই ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য বাংলাদেশের পুলিশ ইউনিফর্মের পরিবর্তনের ইতিহাস সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পুলিশের পোশাকপরিবর্তনের ইতিহাস
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে পুলিশের ভূমিকা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং পুলিশিংয়ের ধারণাগত পরিবর্তনের ছাপ পড়ে পুলিশের পোশাকেও। ইতিহাসে বহুবার এই পোশাক পরিবর্তিত হয়েছে, আর সেই ধারাবাহিকতায় যুগে যুগে পুলিশের ইউনিফর্ম নতুন রূপ ধারণ করেছে। আবার ইতিহাসের পরিক্রমায় যখন কোনো বাহিনী নতুনভাবে, নতুন ভূমিকায় ও মতাদর্শে আত্মপ্রকাশ করতে চায় এবং পুরোনো ব্যর্থতা ও ভ্রান্তি ভুলতে চায়, তখনও পোশাক পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত আসে। বাংলাদেশ পুলিশের খুব সাম্প্রতিক সময়েও পোশাক পরিবর্তন হয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে এই সংখ্যায় পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের ইতিহাস নিয়ে থাকছে বিশেষ নিবন্ধ।
১৯৭১–২০০৪: খাকি যুগ
স্বাধীনতার পর প্রথম কয়েক দশক পুলিশের পোশাক ছিল পুরোপুরি খাকি রঙের। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যে রঙ ব্যবহার করা হতো, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তা পরিবর্তন করা হয়নি। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে নতুন ডিজাইন বা রঙ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি নানাবিধ প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা এবং একই সঙ্গে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে। দীর্ঘ সময় ধরে খাকিই বাংলাদেশ পুলিশের পরিচয়ের মূল প্রতীক হিসেবে বজায় থাকে।
১৯৭৬: ডিএমপি গঠন ও প্রথম রঙ পরিবর্তন
১৯৭৬ সালে পুলিশের পোশাকে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) গঠিত হয়। এই সময় অন্যান্য পুলিশ থেকে ডিএমপির জন্য আলাদা রঙের পোশাক নির্ধারণ করা হয়—নীল শার্ট ও খাকি প্যান্ট। রাজধানীতে পুলিশের আলাদা দৃশ্যমানতা তৈরি করা, মহানগর পুলিশকে দ্রুত শনাক্তযোগ্য করা এবং নগরভিত্তিক আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার ভিন্ন চরিত্র তুলে ধরা ছিল এই পরিবর্তনের মূল উদ্দেশ্য। তবে দেশব্যাপী বাকি পুলিশ সদস্যরা আগের মতোই সম্পূর্ণ খাকি ইউনিফর্ম পরতে থাকেন। ফলে এই পরিবর্তন মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক বাহিনীর জন্যই প্রযোজ্য ছিল।
২০০৪: নীল ও অলিভ যুগ
২০০৪ সালে পুলিশ ইউনিফর্মে উল্লেখযোগ্য পুনর্বিন্যাস করা হয়। খাকি রঙ তখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ পড়ে। মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিটগুলোর জন্য নির্ধারিত হয় হালকা অলিভ রঙের ইউনিফর্ম এবং জেলা পুলিশের জন্য গাঢ় নীল রঙের ইউনিফর্ম। এই পরিবর্তনের সময় ইউনিফর্ম থেকে নৌকা প্রতীকও অপসারণ করা হয়। ফলে রঙ ও প্রতীক উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আসে।
২০২৫: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী
পুলিশের পোশাকে সবশেষ পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালে। এই পরিবর্তনের পটভূমি ছিল ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। গণ-অভ্যুত্থানে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেফতার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জনমনে পুলিশের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বহু মানুষের কাছে পুলিশ হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠোর ও ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। এই পরিস্থিতিতেই ২০২৫ সালে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে।নতুন রঙ, চিহ্ন ও নকশার মাধ্যমে এমন একটি পরিচয় দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়, যাতে নাগরিকদের সামনে পুলিশ প্রথমেই ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জনসুরক্ষার বাহিনী হিসেবে দৃশ্যমান হয়। মূল চিন্তা ছিল মাঠে পুলিশকে দেখে যেন মানুষের মনে ২০২৪ সালের দমনমূলক স্মৃতি মুহূর্তেই ফিরে না আসে এবং পুরোনো পোশাক যেন সেই কঠোর, ভীতিপ্রদ ইমেজকে অব্যাহত না রাখে।নতুন পোশাকের নকশা অনুযায়ী পুলিশের শার্ট হয় আইরন-গ্রে রঙের এবং প্যান্ট হয় কফি-ব্রাউন। ইউনিফর্মে নতুন লোগো হিসেবে যুক্ত হয় শাপলা, ধান ও পাটের মোটিফ। এ সময় রঙ ও প্রতীক উভয় ক্ষেত্রেই নতুন নকশা প্রবর্তিত হয়।পুলিশের ইউনিফর্মের রঙ কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়; এর ভেতরে থাকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভাষা, জন-আস্থার মনস্তত্ত্ব এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োজন। তাই রঙ নির্বাচনকে শুধু ফ্যাশনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। এটি বাহিনীর আচরণগত সংস্কৃতি, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পুলিশের ভাবমূর্তি মূলত গড়ে ওঠে তাদের আচরণ ও জবাবদিহিতার ধারাবাহিকতার ওপর। তবু ইউনিফর্মের বাহ্যিক পরিচয়ের গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটিই মানুষের মনে প্রথম প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।এই বাস্তবতায় ইউনিফর্মের রঙ নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে—বলপ্রয়োগ ও জনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট এসওপি ও কার্যকর প্রশিক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তে নিরপেক্ষতা, এবং পুলিশ সদস্যদের কর্মপরিবেশ ও কল্যাণের উন্নয়ন। এই শর্তগুলো নিশ্চিত হলে ইউনিফর্মের পরিবর্তন কেবল পোশাকের রূপান্তরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি পুলিশকে সত্যিকারের জনতার পুলিশ হিসেবে গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পরিণত হতে পারে।
লেখক
চেয়ারম্যান
ক্রিমিনোলজি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
