বুধবার, জুন ৩, ২০২৬
37 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপুলিশ সপ্তাহ ২০২৬বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) এর কার্যক্রম 

বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন) এর কার্যক্রম 

বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অগ্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৭৪ সালে। সে বছর স্পেশাল ব্রাঞ্চে ৭ জন নারী কনস্টেবল ও ৭ জন নারী এসআই যোগদানের মধ্য দিয়ে পুলিশের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীদের আনুষ্ঠানিক পদচারণা শুরু হয়।

পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে ক্যাডার সার্ভিসে প্রথম নারী পুলিশ অফিসার হিসেবে জনাব ফাতেমা বেগম এএসপি পদে যোগদান করেন।

“পেশাদারিত্ব ও সক্ষমতার সমন্বয়ে নেতৃত্বগুণের বিকাশ” এই উপলব্ধিকে ধারণ করে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। ২০০৮ সালের ২১ নভেম্বর পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের উদ্যোগে “বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)” আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

দক্ষিণ এশিয়ায় নারী পুলিশের সংগঠন হিসেবে বিপিডব্লিউএন সর্বপ্রথম কার্যক্রম শুরু করে। বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত সকল পর্যায়ের নারী কর্মকর্তা ও সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এ নেটওয়ার্ক সৃষ্টিলগ্ন থেকেই বাংলাদেশ পুলিশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী পুলিশের পেশাদারিত্বের সঙ্গে সফলভাবে অবদান রাখার প্রয়াসে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে নারী পুলিশের সংখ্যা ১৭,৯৮৮ জন, যা বাংলাদেশ পুলিশের মোট সদস্য সংখ্যার প্রায় ৯.০৬ শতাংশ। বাংলাদেশের মতো দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শহরমুখী হওয়া ক্রমেই বাড়ছে।

একই সঙ্গে জীবিকার সীমিত সুযোগ, সামাজিক অনিশ্চয়তা ও নানা বাস্তবতার কারণে অপরাধের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অপরাধ জগতে নারীদের সম্পৃক্ততা যেমন বাড়ছে, তেমনি নারী ভিকটিমের সংখ্যাও নানা ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী নারী অপরাধী সংশ্লিষ্ট মামলায় তদন্ত, তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষেত্রে নারী পুলিশের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও নারী ভিকটিম, নারী আসামি কিংবা নারী-সংক্রান্ত সংবেদনশীল মামলায় পেশাদার, মানবিক ও আইনসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে নারী পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ পুলিশে নারী সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি যেমন সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়, তেমনি তাঁদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে নারী ভিকটিম, নারী আসামি বা নারী-সংক্রান্ত সংবেদনশীল মামলায় তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ ও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কীভাবে আরও দক্ষ মানবিক ও আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করা যায়, সে বিষয়ে নিয়মিত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে ভিকটিমের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও সংবেদনশীল ও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জেন্ডার সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা সমুন্নত থাকবে, যা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আস্থাযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হবে।

নারী পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন মনুস্কোতে দায়িত্ব পালনরত বাংলাদেশ পুলিশের নারী কন্টিনজেন্ট ব্যানএফপিইউ-১-এর ৬৮ জন নারী শান্তিরক্ষীর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা পদকপ্রাপ্তি নারী পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এ ধরনের অর্জন বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং তাঁদের নেতৃত্ব বিকাশের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত নারী সদস্যদের সামর্থ্য, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও নেতৃত্বগুণ বৃদ্ধি করা। এর মাধ্যমে তাঁরা যেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারী উন্নয়ন, জননিরাপত্তা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জেন্ডার সংবেদনশীল পুলিশিংয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সে উদ্দেশ্যেই এ নেটওয়ার্ক কাজ করে যাচ্ছে।

সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিপিডব্লিউএন বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় করা, তাঁদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় নারী পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রতিফলিত করার লক্ষ্যে কাজ করে।

পুলিশ বাহিনীতে নারীর অংশগ্রহণকে শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ না রেখে নেতৃত্বের বিকাশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তদন্ত,মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে তাঁদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাও এ নেটওয়ার্কের অন্যতম উদ্দেশ্য। বিপিডব্লিউএন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পেশাগত নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে।

নারী পুলিশিং, ভিকটিম সাপোর্ট, জেন্ডার সংবেদনশীল আইন প্রয়োগ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং পেশাগত নিরাপত্তা বিষয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ পুলিশের প্রেক্ষাপটে কাজে লাগানো এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যের অংশ।

বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)-এর হেল্পলাইন নম্বর: ০১৩২০০০২৪১।

নারী পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য, আবাসন, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক বিষয়ে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাও এ নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিশেষ করে নারী ভিকটিম, নারী আসামি বা নারী-সংক্রান্ত সংবেদনশীল মামলায় তদন্ত, তল্লাশি, গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষ্যগ্রহণ ও সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কীভাবে আরও দক্ষ, মানবিক ও আইনসম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করা যায়, সে বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা বিপিডব্লিউএন-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। বিভিন্ন পদমর্যাদা, ইউনিট ও কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকারী নারী পুলিশ সদস্যদের মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক, পরামর্শ ও সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তা ব্যক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকেও বাড়ায়।

অবসরপ্রাপ্ত নারী পুলিশ সদস্যদের অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ এবং তাঁদের নেটওয়ার্কের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করাও এই ধারাবাহিকতার একটি মূল্যবান দিক।

জনাব শামীমা পারভীন, পুলিশ সুপার, ঢাকা জেলা, আন্তর্জাতিক অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশ, আইএডব্লিউপি-এর রিজিওনাল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ থেকে রিজিওন-২২-এর দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আন্তর্জাতিক অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশ, আইএডব্লিউপি-এর সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ এশিয়ার কো-অর্ডিনেটর নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে ১৫টি দেশের নারী পুলিশদের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, তিব্বত, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। জনাব শামীমা পারভীন এই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক, বিপিডব্লিউএন তথা বাংলাদেশ পুলিশকে গৌরবান্বিত করছেন।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক নারী পুলিশ সদস্যদের জন্য এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সহায়ক কাঠামো তৈরি করতে কাজ করছে, যেখানে তাঁরা দক্ষতা, মর্যাদা, নেতৃত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা ও পেশাগত নিরাপত্তার সঙ্গে নিজেদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ আরও অর্থবহ হবে এবং জনমুখী, মানবিক ও জেন্ডার সংবেদনশীল পুলিশিংয়ের ধারণা আরও সুদৃঢ় হবে।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ