সময়টা রাত। গাজীপুরের জয়দেবপুর থানার একটি কক্ষে বসে আছেন পুলিশের উপপরিদর্শক আরিফ। কিছুক্ষণ আগে ঝড় বয়ে গেছে। থানার আশপাশে এখন থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। শর্ট সার্কিটে কাছের ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে আছে। বাইরে ঠান্ডা হাওয়া, অথচ আরিফ সাহেবের কপালে ঘাম। কারণ, তাঁর সামনে পড়ে আছে তিন বছর আগের এক রহস্যজনক অপহরণ মামলা। অপহৃত ব্যক্তির নাম ছিল সালিম মিয়া। তিনি একদিকে যেমন শহরের নামকরা ব্যবসায়ী, একই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গেও তাঁর সখ্য আছে। সালিম মিয়ার অপহরণের ঘটনাটি প্রায় তিন বছর আগের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিপুল সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে এবং ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে আবার বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে। আরিফ সাহেব তাঁর সামনে থাকা ফাইলটি নেড়ে-চেড়ে দেখছেন। ফাইলটির পাতাগুলো পুরোনো হয়ে হলদেটে হয়ে গেছে। তিনি এ নিয়ে মামলার এজাহার অনেকবার পড়েছেন। আবারও পড়ছেন, কিন্তু কেন যেন রহস্যের কোনো কূল-কিনারা করতে পারছিলেন না। ঘটনাটি ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিল। সময়টা মধ্যরাত, প্রায় ২টা। সেদিন সালিম সাহেব হাঁটছিলেন জয়দেবপুর-টঙ্গী মহাসড়কের পাশ দিয়ে। জয়দেবপুর পৌরসভাতেই তাঁর বাসা। ব্যবসায়িক কারণে তাঁকে প্রায়ই ঢাকায় যেতে হয়। এমনকি ঢাকাতেও তাঁর কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে। সেদিনও তিনি ঢাকা থেকে ফিরছিলেন।
আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে তিনি তাঁর বাসা থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েকজন ব্যক্তি এসে মুহূর্তের মধ্যেই সালিম সাহেবকে ধরে একটি সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। এরপর থেকে তাঁর আর কোনো খোঁজ নেই। তাঁকে উদ্ধারে সর্বত্র ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়। শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিল, মুক্তিপণের জন্য হয়তো তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছে, মুক্তিপণ পেলেই ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু না, কোনো মুক্তিপণও চাওয়া হয়নি। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে ধারণা করা হয়, ব্যবসায়িক শত্রুতার কারণে কেউ এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর সমর্থিত রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, রাজনৈতিক শত্রুতার জেরেও তাঁকে অপহরণ করা হয়ে থাকতে পারে। মামলার এজাহারের বিবরণ এতটুকু পড়ার পর আরিফ সাহেব ভাবতে লাগলেন, এমন একজন জলজ্যান্ত মানুষ রাস্তা থেকে গায়েব হয়ে গেলেন। তাঁর কোনো খোঁজ নেই, কোনো চিহ্নও নেই। একই সঙ্গে যারা এর সঙ্গে জড়িত, তারাও পেশাদার। তা না হলে কোনো হদিস অবশ্যই এতদিনে পাওয়া যেত। কেননা, এই মামলার তদন্ত আরিফ সাহেবের আগে কতজনের হাতে যে গিয়েছিল, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
হঠাৎ আরিফ সাহেবের ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। না, কোনো খুদে বার্তা নয়, একটি কল। মোবাইল সাইলেন্ট থাকায় কয়েকটি মিসড কলও জমে আছে। আরিফ সাহেব নম্বর দেখে ফোনটি ধরলেন। এই অসময়েও তিনি জানেন, ওপাশ থেকে কে কথা বলবেন- সালিম সাহেবের স্ত্রী। বিগত কয়েক মাস, যখন থেকে আরিফ সাহেব এই তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছেন, প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফোন করে সালিম সাহেবের বিষয়ে জানতে চাওয়া অনেকটা রুটিনে পরিণত হয়েছে। আরিফ সাহেব খবর পেয়েছেন, এটা শুধু গত তিন মাসের ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ তিন বছর ধরেই এমন চলছে। আরিফ সাহেব ভাবতে লাগলেন, এই মহিলা কী আশ্চর্য রকম মায়ায় জড়িয়ে আছেন! এখনো বছরের পর বছর ধরে তিনি হাল ছাড়েননি। অথচ একই জায়গায় কতজন পুলিশ কর্মকর্তা যে এর আগে হাল ছেড়ে দিয়েছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
আজও প্রতিদিনের মতো একই প্রশ্ন- “আরিফ সাহেব, কোনো খবর পেলেন? ও কি বেঁচে আছে?” আরিফ সাহেবের কাছে কোনো উত্তর নেই। তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলটা আবার নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। এত বছর আগের সেই রহস্য এখন আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু ব্যবসায়িক বিরোধ এবং সালিম সাহেবের ব্যবসায়িক অংশীদারদের পুরো ব্যবসার মালিকানা দাবি করার বিষয়টি। অথচ সালিম সাহেবের স্ত্রী এবং মোটামুটি সবাই জানেন, ব্যবসায় অধিকাংশ শেয়ারই সালিম সাহেবের; বরং অংশীদারদের শেয়ার যৎসামান্য। কিন্তু তাঁরাই এখন পূর্ণ অংশ দাবি করছেন।
আর সালিম সাহেবের কাগজপত্র ও দলিল-দস্তাবেজ কোথায় আছে, সে বিষয়ে তাঁর স্ত্রীও অবগত নন। আরিফ সাহেব ভাবতে লাগলেন, অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন। আর এই ব্যর্থতার রেকর্ড মূলত অনেক কর্মকর্তার হাল ছেড়ে দেওয়ার মূল কারণও এটাই। কেননা, এখন এই মামলা নিয়ে কেউই খুব একটা আগ্রহ দেখান না। আরিফ সাহেবের অনুসন্ধান এবং রহস্য উদঘাটনের চেষ্টাকে অনেকেই তাঁর পেছনে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে উড়িয়ে দেন। আরিফ সাহেবের এসব বিষয় অজানা নয়। কিন্তু তিনি সালিম সাহেবের স্ত্রীকে প্রতিদিন আশার বাণী শোনাচ্ছেন এবং কথা দিয়েছেন, এই রহস্য তিনিই উদঘাটন করবেন। তাই তো তিনি হাল ছাড়ার পাত্র নন।
তিনি ল্যাবের অন্ধকার ঘরে বসে আবার সেই পুরোনো ফুটেজগুলো দেখতে শুরু করলেন। সেই রাতের জয়দেবপুর বাসস্ট্যান্ডের ২ নম্বর গেটের সামনে একটি শপিংমলের সিসিটিভি ফুটেজই দেখছেন। একই সঙ্গে আশপাশের অন্যান্য শপিংমল ও বাসাবাড়ির সিসিটিভি ফুটেজও সব মিলিয়ে দেখছেন। সম্পূর্ণ ফুটেজগুলো একত্র করে একটি ডকুমেন্ট তৈরি করেছেন। সেটি তিনি কম হলেও অন্তত হাজারবার দেখেছেন। প্রতিদিনই দেখছেন, যাতে কিছু একটা পাওয়া যায়, কোনো ক্লু পাওয়া যায়। ভিডিওর প্রতিটি সেকেন্ড এখন তিনি বিভিন্নভাবে আবারও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন।
কখনো ব্যবসায়িক শত্রুতার দৃষ্টিভঙ্গি মাথায় নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। আবার কখনো রাজনৈতিক বিরোধের বিষয়টি মাথায় রেখে অনুসন্ধান করছেন। কোনোদিন আরিফ সাহেব সালিম সাহেবের সব ব্যবসায়িক পার্টনার ও অংশীদারের ছবি এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবিও একে একে খুঁটিয়ে দেখছেন। ভিডিওতে দেখা প্রতিটি মানুষের পরিচয়, তারা এখন কোথায়, কী করছেন- সবকিছু মিলিয়ে দেখছেন। এ ছাড়া ভিডিওতে থাকা যতজনের সম্ভব, সবারই জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। মিলিয়ে দেখছেন, প্রতিটি মানুষ কোনোভাবে সালিম সাহেবের সঙ্গে জড়িত কি না। এভাবেই প্রতিদিন বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে আরিফ সাহেব ঘটনাটি বিশ্লেষণ করছেন। ভিডিও রেকর্ডে তখন চলছিল ঠিক যে স্পটে সালিম সাহেব অপহৃত হন, সেখানকার একটা বাড়ির সামনের সিসিটিভি ক্যামেরা। রাত ১টা ৩০ মিনিট থেকে ৩টা পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ আছে তাঁর কাছে। রাত ২টা ১৪ মিনিট। একটি সাদা মাইক্রোবাস ফ্রেমের এক কোণ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আরিফ সাহেবের অনুসন্ধিৎসু মন হঠাৎ যেন কেমন খচ করে উঠল। ভিডিওটি পজ করলেন। জুম করলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতায়।
ঝাপসা পিক্সেলের ভিড়ে জানালার পাশে বসে থাকা একটি মুখ আবছাভাবে ফুটে উঠল। মাথায় ক্যাপ, মুখে কয়েক দিনের না-কামানো দাড়ি। মুখটি পরিচিত মনে হলেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না। বহু বছর আগের কোনো মুখের সঙ্গে যেন মিলে যাচ্ছে, কিন্তু আরিফ ঠিক ধরতে পারলেন না। আরিফ সাহেবের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। এই চিবুক, চোখের এই তীক্ষ্ণ চাউনি-তিনি কোথাও দেখেছেন। খুব পরিচিত কেউ। কোনো অপরাধী? না। কোনো রাজনৈতিক নেতা? তা-ও নয়।
আরিফ সাহেবের স্মৃতিতে আবছাভাবে পরিচিত বলে মনে হতে থাকে এই মুখাবয়ব। “আমি এই মুখটা চিনি… খুব চেনা কেউ… কিন্তু কোথায় দেখেছি?” ছায়ার ভেতরের এই মানুষটি যেন কোনো এক… পুরোনো স্মৃতির অতল থেকে হাসছে। আরিফ মনে করতে পারলেন না। হাল ছেড়ে দিলেন সেদিনের মতো। ক্লান্ত শরীরে আরিফ সাহেব যখন বাসায় ফিরলেন, তখন ঘড়িতে রাত ২টা। ড্রয়িংরুমে তাঁর স্ত্রী লিনা তখনো জেগে। টেবিলে খাবার ঢাকা দেওয়া। “এত রাত করলে শরীর টিকবে?”- লিনা ভাতের প্লেটটা এগিয়ে দিতে দিতে মুখ ভার করে কথাগুলো বলল। কারণ, আরিফ গত কয়েক সপ্তাহ খুব অগোছালোভাবে চলছেন। কখন আসেন, কখন যান – তার কোনো ঠিক নেই। সারাক্ষণ কী যেন ভাবেন। জিজ্ঞেস করলেও আরিফ কিছু বলেন না লিনাকে। আরিফ চুপচাপ খাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁর মাথায় তখনো সেই সিসিটিভির ঝাপসা মুখটা ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ লিনা বলল, “ও ভালো কথা, তোমার কলেজের এক বন্ধু ফোন করেছিল। বলল, তোমাদের একটা গেট-টুগেদার আছে। কালকের মধ্যে কনফার্ম করতে হবে। নামটা যেন কী বলল… অতনু না কি যেন। একটু কথা বলে নিও তো ওর সঙ্গে।” আরিফের হাতের লোকমাটা মাঝপথে থেমে গেল। ‘লালমোহন কলেজ ব্যাচ-১৫’। তাঁর কলেজ ব্যাচ। তাঁর সেই বন্ধুদের মুখগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল।
হঠাৎ বজ্রপাতের মতো মাথায় আরিফের সেই সিসিটিভির ঝাপসা মুখটা জোড়া লেগে গেল। সেই ক্যাপ পরা লোকটা, সেই চিবুকের ভাঁজ… ওটা কি তবে তাঁরই কোনো কলেজের বন্ধু? যে আজ কোনো অন্ধকার গলির হর্তাকর্তা? আরিফ সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। রহস্যের জটটা কি তবে তাঁর নিজের অতীতেই লুকিয়ে আছে?
লেখকদ্বয়:
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
