শিক্ষাঙ্গন মূলত কবি নজরুলের চক্ষুমাঝে জ্বলা জ্ঞানের আলোভরা একদল তরুণকেই গড়ে তোলে ভবিষ্যতের জন্য। শিক্ষাঙ্গন এমন এক সামাজিক ও বৌদ্ধিক পরিসর, যেখানে জ্ঞানচর্চা হয়, স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি হয়। এই পরিবেশে একজন তরুণ-তরুণী নিজেকে চিনতে শেখে, ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে, মত তৈরি করে, ভিন্নমত শুনতে শেখে এবং সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নিজের উপলব্ধি গড়ে তোলে। কিন্তু একই শিক্ষাঙ্গন যখন ভয়, আধিপত্য, অনিয়ম, সহিংসতা বা অপরাধচক্রের প্রভাবে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, তখন সর্বপ্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ শিক্ষার্থী, আর এর সঙ্গে পুরো জাতি। যে শিক্ষার্থী পড়তে এসেছে, নিজেকে গড়তে এসেছে, সে তখন পড়াশোনার পাশাপাশি নিরাপত্তা, মানসিক চাপ, দলীয় গোষ্ঠীভিত্তিক প্রভাব ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে চলতে বাধ্য হয়। বিগত সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি, হানাহানি ও রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দলের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুপক্ষের সংঘর্ষে আবুবকর সিদ্দিক নামে একজন সাধারণ শিক্ষার্থী মারা যান। এছাড়াও বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড এই অপরাধপ্রবণ ও অনিরাপদ ক্যাম্পাসের স্পষ্ট উদাহরণ।
“মোদের চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল,
বক্ষে ভরা বাক,
কণ্ঠে মোদের কুণ্ঠাবিহীন নিত্য
কালের ডাক।”
—কবি কাজী নজরুল ইসলাম
প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষাঙ্গনে এমন কী পরিবেশ বিরাজ করছে, যেখানে দেশের সেরা শিক্ষার্থীরা মেধার তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে এসে নিজের সহপাঠী হননের মতো বিধ্বংসী কাজে জড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ তৈরি করে?
যদিও বলতে হয়, এখনো এই সংখ্যাটা ব্যাপক নয়, তবুও দিন দিন শিক্ষাঙ্গনে নিরাপত্তাহীনতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জীবন, পরিবার ও সমাজের স্বপ্ন এবং দেশের সামগ্রিক লক্ষ্যকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ধরনের অপরাধ দেখা যায়, সেগুলো হলো-রাজনৈতিক সংঘাত, হলকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তার, সিট দখল, অছাত্রদের দ্বারা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস, কোথাও মাদক, র্যাগিং, চাঁদাবাজি, ভীতি প্রদর্শন, যৌন হয়রানি, সাইবার বুলিং, পরীক্ষাকেন্দ্রিক অনিয়ম, ভর্তি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ।
শুরুর দিকে এসব অপরাধ যদিও অনেকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে শুরু হয়, ধীরে ধীরে কোনো এক দৈববলে এগুলো বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অদৃশ্য সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে, বিশেষ করে গত দেড় দশকে তা ভয়াবহ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে এ ধরনের কিছু অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার মতো গর্হিত কাজেও লিপ্ত হচ্ছেন।
তবে একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুপাত হিসেবে খুবই স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে বলা যায় না, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক বেশি অপরাধপ্রবণ। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অগণিত সৃষ্টিশীল সংগঠন সক্রিয় আছে বিভিন্ন নামে-বেনামে। যেখানে একাডেমিক অধ্যয়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিতর্কচর্চা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা, দুর্যোগে সহায়তা, অধিকার সচেতনতা এবং সামাজিক নানা উদ্যোগে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অসংখ্য উদ্যোগ আছে।
ক্ষমতা ও শিক্ষাঙ্গনের অপরাধ
শিক্ষাঙ্গনে অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে ক্ষমতার আচরণের সম্পর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা এখানে শুধু আনুষ্ঠানিক পদ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষমতা হতে পারে হলে সিট নিয়ন্ত্রণ বা নতুন শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা, শিক্ষক বা প্রশাসনের কাছে প্রবেশাধিকারের ক্ষমতা, কোনো দলীয় গোষ্ঠীর ছায়ায় থাকা নিরাপত্তা, সামাজিক পরিচিতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, এমনকি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাউকে বিব্রত করার সক্ষমতাও। ক্ষমতার আচরণ বলতে বোঝায়, একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের প্রভাব ব্যবহার করে অন্যের আচরণ, সিদ্ধান্ত বা অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। শিক্ষাঙ্গনে এটি কখনো সরাসরি দৃশ্যমান হয়, কখনো খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে।
যেমন, একজন নতুন শিক্ষার্থী হলে সিট পেতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে চলতে বাধ্য হচ্ছে, মিছিলে-মিটিংয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে কেউ ভিন্নমত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে, কেউ কোনো অনিয়ম দেখেও অভিযোগ করছে না, কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ভয়ে নীরব থাকছে। এগুলো সবসময় আইনি ভাষায় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত নাও হতে পারে, কিন্তু এগুলো অপরাধপ্রবণ পরিবেশ তৈরির পূর্বশর্ত হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার এমন আচরণ অনেক সময় সুবিধা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত। কেউ ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বের কাছাকাছি থাকলে আবাসন, প্রভাব, পরিচিতি, নিরাপত্তা বা সামাজিক মর্যাদা পেতে পারে-এমন ধারণা তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নৈতিক বিবেচনার বদলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার দিকে ঝুঁকতে পারে। আবার যারা এই কাঠামোর বাইরে থাকে, তারা নিজেকে অনিরাপদ বা অপ্রাসঙ্গিক ভাবতে শুরু করে। এই পরিস্থিতি শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে দুর্বল করে তোলে।
ছাত্ররাজনীতি: সম্ভাবনা ও ঝুঁকির দুই দিক
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকটে সামাজিক অংশগ্রহণ-এসব ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগঠিত ভূমিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। সম্প্রতি হওয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল সামনের সারিতে।
ছাত্ররাজনীতি একজন তরুণকে নেতৃত্ব, মতপ্রকাশ, সংগঠন পরিচালনা, সামাজিক দায়িত্ব এবং অধিকারবোধ শেখাতে পারে। একই সঙ্গে এটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলন হতে পারে; যেখানে ভিন্নমত, বিতর্ক, যুক্তি ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নাগরিক জীবনের প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এই সম্ভাবনা তখনই অর্থবহ, যখন ছাত্ররাজনীতি শিক্ষার্থীর অধিকার, শিক্ষার পরিবেশ ও সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যখন ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতার সিঁড়ি, ভয় দেখানোর মাধ্যম, দখলদারিত্বের উপকরণ বা ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের পথে পরিণত হয়, তখন তার ক্ষতি বহুমাত্রিক। সাধারণ শিক্ষার্থী রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়, ভিন্নমত সংকুচিত হয়, শিক্ষকের স্বাধীন ভূমিকা চাপের মুখে পড়ে এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়। ছাত্ররাজনীতির কুফল নিয়ে আলোচনা করতে গেলেও একটি ভারসাম্য জরুরি। ছাত্ররাজনীতিকে এককভাবে সমস্যার উৎস বলা যেমন সঠিক নয়, তেমনি ছাত্ররাজনীতির নামে সংঘটিত অনিয়মকে ইতিহাসের অবদান দিয়ে ঢেকে দেওয়াও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। সমস্যা ছাত্ররাজনীতির ধারণার চেয়ে বরং তার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতাচর্চা, জবাবদিহিহীন কাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং সহিংস সংস্কৃতিতে।
শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ ছাত্ররাজনীতি থাকতে হলে তাকে শিক্ষার্থীর অধিকার, নৈতিক নেতৃত্ব, যুক্তিভিত্তিক বিতর্ক, স্বচ্ছতা এবং সহিংসতাবিরোধী অবস্থানের ওপর দাঁড়াতে হবে। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির আরও কিছু নেতিবাচক দিক রয়েছে। একজন নবীন শিক্ষার্থী যখন ক্যাম্পাসে আসে, তার পথচলা শুরু হয় অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। যেহেতু চারদিকে র্যাগিং বা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকে, এমন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় না থাকলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনিরাপদ ভাবতে শুরু করে। আবার একইভাবে শিক্ষক রাজনীতির কারণে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন আবাসন বরাদ্দে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। প্রথমদিকে শিক্ষার্থীরা টিকে থাকার জন্য ক্ষমতার কাছাকাছি গেলেও পরবর্তীতে ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে যায়। শুরু হয় ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতা এবং একসময় ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়। এর সূত্র ধরেই প্রতিপক্ষ গোষ্ঠীর সঙ্গে যেমন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তেমনি আবার নিজ দলের অন্তঃকোন্দলেও জড়িয়ে পড়ে। ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক ছত্রছায়া পেরিয়ে একসময় এই ক্ষমতা লাভের প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়ে মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুদৃষ্টি পাওয়ার লোভে। আর মূলধারার অপরাধপ্রবণ রাজনীতির বিষবাষ্প একসময় শিক্ষাঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রনেতৃত্বকে মূলধারার নেতারা মাসলম্যান বা ক্যাডার বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। শুরু হয় ছাত্ররাজনীতির নামে অপরাধপ্রবণতা। অনেকেই জড়িয়ে পড়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মে। এ ছাড়া ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির আরও একটি সমস্যা খুবই প্রকটভাবে দেখা যেত, তা হলো রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে লোক সরবরাহ করার সংস্কৃতি। এতে করে শিক্ষার্থীদের একপ্রকার জোর করেই রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যোগ দিতে হতো। এখান থেকেও ক্ষমতার রাজনীতির অপরাধপ্রবণ চক্রে জড়িয়ে পড়ত অনেক শিক্ষার্থী।
অপরাধপ্রবণতা বন্ধ না হওয়ার কারণ
শিক্ষাঙ্গনে অপরাধপ্রবণতা হ্রাস কিংবা বন্ধের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ বিভিন্ন সময়ে গ্রহণ করা হলেও এর পুরোপুরি লাগাম টানা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে আসলে বহুমুখী কারণ জড়িত। বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি তার একটি বড় কারণ। অনেক সময়ই অপরাধগুলো সংঘটিত হয় কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায়। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে প্রশাসনের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আবার কিছু সময় শিক্ষার্থীরা যখন দেখে, যেকোনো অভিযোগের খুব একটা গুরুত্ব থাকে না কিংবা ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। আবার কোনো প্রভাবশালীর জন্য প্রশাসনের আলাদা আচরণ দেখা গেলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসের জায়গায় জন্ম নেয় অনানুষ্ঠানিক শাস্তি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, প্রতিশোধ, গোষ্ঠীনির্ভর নিরাপত্তা এবং আইনের বদলে প্রভাবের সংস্কৃতি।
আবাসন সংকটও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের সিট শিক্ষার্থীর মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। আবাসন যদি স্বচ্ছ নীতিতে পরিচালিত না হয়, তাহলে সিট পাওয়া বা ধরে রাখা প্রভাবের সঙ্গে জড়াতে পারে। এর সঙ্গে র্যাগিং বা তথাকথিত সিনিয়রিটি সংস্কৃতি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। র্যাগিংকে অনেক সময় মজা, পরিচিতি বা ঐতিহ্য বলে দেখানো হয়, কিন্তু তা যখন অপমান, মানসিক চাপ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লঙ্ঘন বা শারীরিক ঝুঁকিতে রূপ নেয়, তখন সেটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মাদকপ্রবণতা শিক্ষাঙ্গনের আরেকটি উদ্বেগজনক দিক। মাদক শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না, এটি অর্থের প্রয়োজন, অপরাধচক্রের সংযোগ, সহিংসতা, ব্ল্যাকমেইল, শিক্ষাজীবন নষ্ট হওয়া এবং পারিবারিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে শুধু শাস্তির ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, কাউন্সেলিং, সহপাঠীদের সহায়তা, পরিবারকে যুক্ত করা এবং সরবরাহ চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা। যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং শিক্ষাঙ্গনের অপরাধ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। অনেক শিক্ষার্থী সহপাঠী কিংবা শিক্ষক কর্তৃক হয়রানির শিকার হলেও সামাজিক লজ্জা, প্রতিশোধের ভয়, পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার ভয়, প্রমাণের জটিলতা বা অভিযোগ ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতার কারণে সামনে আসতে চায় না। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুজব ছড়ানো, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য নিয়ে হুমকি, অপমানজনক মন্তব্য-এসব আচরণ শিক্ষার্থীর মানসিক নিরাপত্তা ও শিক্ষাজীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এ ছাড়া অর্থনৈতিক চাপ, পরিবার থেকে দূরে থাকা, শহুরে জীবনের নতুন অভিজ্ঞতা, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, একাকিত্ব, সম্পর্কের জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও অনেক শিক্ষার্থীর আচরণে প্রভাব ফেলে। অপরাধপ্রবণতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে এগুলো বোঝা জরুরি। কারণ প্রতিরোধ করতে হলে শুধু ঘটনার পর শাস্তি নয়, ঘটনার আগে ঝুঁকি কমানোর পথ তৈরি করতে হয়।
বহুমুখী প্রতিরোধ
শিক্ষাঙ্গনে অপরাধ প্রতিরোধে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সংস্কৃতি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, অভিযোগের নিরাপদ পথ, সহপাঠীদের নেতৃত্ব এবং পরিবার-সমাজের সমর্থন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
গুরুতর অপরাধ, সহিংসতা, মাদকচক্র, যৌন অপরাধ, চাঁদাবাজি বা আইনগত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু প্রতিটি সমস্যাকে প্রথমেই পুলিশি দৃষ্টিতে দেখলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দায়িত্ব আড়ালে চলে যেতে পারে। প্রথম দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। প্রতিটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে স্পষ্ট আচরণবিধি থাকা দরকার, যা শুধু কাগজে না থেকে বাস্তবে সকলের ওপর কার্যকর হবে।
শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আবাসিক হল কর্তৃপক্ষ-সবাইকে জানতে হবে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য, কোন আচরণ শাস্তিযোগ্য, অভিযোগ কোথায় করা যাবে অভিযোগকারীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং তদন্তের প্রক্রিয়া কী-এসব বিষয় স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা বিশেষভাবে জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী সরাসরি অভিযোগ করতে ভয় পায়। তাই গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত প্রাথমিক যাচাই, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, কাউন্সেলিং সহায়তা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা থাকা দরকার। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ সেল, অ্যান্টি-র্যাগিং কমিটি, হলভিত্তিক মেন্টরিং ব্যবস্থা, সাইবার সহায়তা ডেস্ক-এসব কাঠামো তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষক ও মেন্টরের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর আচরণ, সংকট, মানসিক চাপ এবং সামাজিক পরিবর্তন বোঝার একজন কাছের মানুষ হতে পারেন।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষকের অপ্রতুলতা, প্রশাসনিক চাপ ও সীমিত সময়ের কারণে অনেক জায়গায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনের ঝুঁকি কমাতে এই সম্পর্ক পুনর্গঠন করা দরকার। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য ওরিয়েন্টেশন, সিনিয়র-জুনিয়র মেন্টরশিপ, নিয়মিত পরামর্শ সেশন এবং সংকটে দ্রুত সহায়তার সংস্কৃতি গড়ে তুললে অনেক সমস্যা বড় হওয়ার আগে শনাক্ত করা যায়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা দূর করার জন্য তাদের একদিকে সৃষ্টিশীল কাজে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
শিক্ষাঙ্গনে আইন মানার সংস্কৃতি
শিক্ষার্থীদের আইন মানতে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে ভয় দেখানো দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর পদ্ধতি নয়। ভয় হয়তো সাময়িকভাবে আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু দায়িত্ববোধ তৈরি করে না। আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি হয় যখন শিক্ষার্থী বোঝে, আইন তার স্বাধীনতার শত্রু নয়; বরং সবার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার কাঠামো। একজন শিক্ষার্থী যদি বুঝতে পারে যে র্যাগিং বন্ধ করা মানে জুনিয়রের মর্যাদা রক্ষা করা, যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানে সহপাঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মাদক থেকে দূরে থাকা মানে নিজের ভবিষ্যৎ বাঁচানো, সাইবার অপব্যবহার এড়িয়ে চলা মানে অন্যের ব্যক্তিগত অধিকারকে সম্মান করা-তাহলে আইন তার কাছে নিজের নৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে ওঠে।
এর জন্য আইনকে সহজ ভাষায় শিক্ষার্থীর জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করতে হবে। শুধু আইনের ধারার নাম বললেই হবে না। কী করলে অপরাধ হতে পারে, কী করলে অন্যের ক্ষতি হয়, অভিযোগ করলে কী প্রক্রিয়া, ভুক্তভোগীর অধিকার কী, অভিযুক্তের ন্যায়বিচারের অধিকার কী-এসব বিষয় শিক্ষাঙ্গনে নিয়মিত আলোচনা হওয়া দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, হল প্রশাসন, বিভাগীয় প্রশাসন এবং প্রক্টরিয়াল বডি সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। পুলিশ এখানে সহযোগী ভূমিকা রাখতে পারে। কমিউনিটি পুলিশিং, ক্যাম্পাস সচেতনতা কর্মসূচি, সাইবার নিরাপত্তা সেশন, মাদকবিরোধী আলোচনা, নারী শিক্ষার্থীদের সহায়তা বিষয়ে দিকনির্দেশনা, জরুরি সহায়তা নম্বর সম্পর্কে জানানো-এসব কাজে পুলিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদার হতে পারে। তবে এই অংশীদারিত্ব যেন ভয়ভিত্তিক না হয়ে আস্থাভিত্তিক হয়। শিক্ষার্থী যেন পুলিশকে আইনগত সহায়তা ও নিরাপত্তার একটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিনতে শেখে। নীতিগতভাবে শিক্ষাঙ্গনে অপরাধ প্রতিরোধের জন্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনাও দরকার। কোন ধরনের অভিযোগ বেশি আসছে, কোন সময়ে ঝুঁকি বাড়ে, কোন জায়গা অনিরাপদ মনে হয়, নতুন শিক্ষার্থীরা কোথায় বেশি চাপে পড়ে, অনলাইন হয়রানির ধরন কী-এসব বুঝতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
তবে এই তথ্য ব্যবহারে গোপনীয়তা ও নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি। উদ্দেশ্য হবে নিয়ন্ত্রণ নয়, নিরাপত্তা ও উন্নতি। পরিবারের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেই সন্তানের জীবন থেকে পরিবার পুরোপুরি সরে যাবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আবার অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণও সমাধান নয়। পরিবারকে জানতে হবে শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ, নতুন সম্পর্ক, আবাসিক জীবন, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, অনলাইন আচরণ এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা সম্পর্কে, যা তার আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সহজ যোগাযোগ থাকলে শিক্ষার্থী বিপদে বা ভুল পথে পড়লে পরিবারের কাছে আসতে পারে। একটি নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। কিন্তু এটি ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা, সুস্থ নেতৃত্ব, সামাজিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকতা কোনোটিই মজবুত ভিত্তি পায় না। শিক্ষাঙ্গনে অপরাধ প্রতিরোধ মূলত শিক্ষার পরিবেশকে মানুষের উপযোগী করে তোলার কাজ। এই কাজে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবার, প্রশাসন, পুলিশ এবং নীতিনির্ধারক-সবার ভূমিকা আছে। যে শিক্ষাঙ্গন আইন মানা শেখায়, ভিন্নমত শুনতে শেখায়, দুর্বলকে রক্ষা করতে শেখায়, মানবাধিকারকে সম্মান করতে শেখায় এবং ক্ষমতাকে দায়িত্বের মধ্যে রাখতে শেখায়, সেই শিক্ষাঙ্গনই শেষ পর্যন্ত সমাজের নিরাপত্তা ও মানবিকতার বড় ভিত্তি হয়ে ওঠে।
লেখক
প্রভাষক,
বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

“মোদের চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল,