হোমবাহিনীর কথাট্রাফিকনিয়মভঙ্গের সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার প্রভাব

নিয়মভঙ্গের সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার প্রভাব

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

যানজট বা ট্রাফিক জ্যাম রাজধানী ঢাকার একটি অতি পরিচিত শব্দ। অনেকেই ট্রাফিক জ্যামকে ঢাকার দুঃখ বলেও অভিহিত করে থাকেন। শুধুমাত্র ট্রাফিক জ্যামের কারণেই ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য হিসেব করলে দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও ট্রাফিক জ্যামের কারণে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, যেখানে একজন সাধারণ মানুষের হাঁটার গতিই ঘণ্টায় গড়ে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ২০৩৫ সাল নাগাদ যানবাহনের এই গড় গতি ৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি ও সময়ের অপচয় রোধ করার উপায় কী?

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ যানজট নিরসনে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় ট্রাফিক ডাইভারশন। এই পদ্ধতির ফলে রাস্তায় যানবাহনের চলাচলে কিছুটা গতি ফিরেছে। কিন্তু তবুও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চিরচেনা যানজটের চিত্রের পরিবর্তন হয়েছে খুব সামান্যই। এর একটি অন্যতম বড় কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঢাকায় যানবাহনের উচ্চচাপের কথা। ঢাকার রাস্তায় চলাচল করে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি যানবাহন, যা ঢাকার রাস্তাগুলোর প্রায় ২ লাখ ধারণক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৬ গুণ। যানবাহনের এই উচ্চচাপের সঙ্গে যুক্ত হয় রাস্তাগুলোতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে আধুনিকতার অভাব, ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার অভাব। ফলে শুধু প্রচলিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা দিয়ে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহনসমৃদ্ধ নগরের সড়ক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে বিগত বিভিন্ন সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হলেও সেই সিগন্যাল মেনে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে মানুষের অনাগ্রহ দেখা যায়। আর সীমিত লোকবলের কারণে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সদস্যগণও সকল আইনভঙ্গকারীকে শাস্তির আওতায় আনতে পারেন না। ডিটেকটিভের পরিচালিত এক অনলাইন মতামত গ্রহণ কার্যক্রমে প্রায় অর্ধশত সাধারণ মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করে ঢাকা শহরের আইনভঙ্গের একটি প্রধান কারণ হিসেবে দেখা যায় জবাবদিহিতার অভাবকে। সাধারণ মানুষের মধ্যে অধিকাংশই মনে করেন এমন ছোট ছোট আইনভঙ্গের ঘটনাগুলোতে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। আবার অনেকেই আইনভঙ্গের কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন, অন্যের আইনভঙ্গের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সময় বাঁচানোর অজুহাতও। অর্থাৎ, সড়কে আইনভঙ্গের একটি বড় অংশ শুধু নিয়ম না জানার কারণে নয়; বরং নিয়ম ভাঙলেও ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম-এই মনোভাব থেকেই তৈরি হয়। এমন বাস্তবতায় ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধু মানবনির্ভর প্রচলিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কতখানি কার্যকর হতে পারে, সে প্রশ্ন এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। সীমিত লোকবল, যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ এবং প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অসংখ্য ছোট-বড় আইনভঙ্গের ঘটনাকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা কোনো সহজ কাজ নয়।

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন এমন একটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা, যা আইনভঙ্গের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করবে, প্রমাণ সংরক্ষণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সহায়তা করবে। এই চিন্তাকে সামনে রেখেই ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল ও সড়কপথে এআই-ভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এই এআই ক্যামেরাগুলো মূলত সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের নির্দিষ্ট ধরনগুলো শনাক্ত করে।

বর্তমানে এই ক্যামেরার মাধ্যমে মোট পাঁচ ধরনের বিষয় শনাক্ত করা যাচ্ছে-গাড়ির অবস্থান, সিগন্যাল লঙ্ঘন, স্টপলাইন অতিক্রম, লেন পরিবর্তন এবং রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। কোনো যানবাহন নিয়ম ভঙ্গ করলে ক্যামেরা সেই মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ করে এবং সংশ্লিষ্ট গাড়ির তথ্যের ভিত্তিতে মামলা বা নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির সহায়তায় অনিয়মকে প্রমাণসহ নথিভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ক্যামেরার সফটওয়্যারের সঙ্গে বিআরটিএর সার্ভারের তথ্য যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে শুধু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনই নয়, সংশ্লিষ্ট যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। যেমন গাড়ির লাইসেন্স, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যথাসময়ে নবায়ন করা হয়েছে কি না, সেটিও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা যায়। ফলে এক জায়গা থেকেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ এ বিষয়ে বলেন, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের ক্ষেত্রেও মামলা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বর্তমানে নিয়ম লঙ্ঘনের ভিডিওগুলো ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করে মামলা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এআই সিস্টেমকেও প্রশিক্ষণ পর্যায়ে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এআই-এর মাধ্যমে নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব হবে এবং অভিযুক্ত গাড়ির মালিকের ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএমএস নোটিশ চলে যাবে।

এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, এটি আইন প্রয়োগকে আরও প্রমাণনির্ভর ও তথ্যভিত্তিক করতে পারে। আগে কোনো চালক সিগন্যাল অমান্য করলে, স্টপলাইন অতিক্রম করলে বা লেন পরিবর্তনের নিয়ম ভাঙলে সেটি ট্রাফিক সদস্যের চোখ এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু এআই ক্যামেরার মাধ্যমে একই সঙ্গে একাধিক পয়েন্টে নজরদারি রাখা সম্ভব হচ্ছে। ফলে আইনভঙ্গকারীর মনে “ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম”-এই ধারণা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, নতুন সিস্টেম চালুর প্রথম সপ্তাহেই ৩০০টির বেশি ট্রাফিক মামলা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঢাকাজুড়ে এই প্রযুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও দৃশ্যমান হবে।

তবে এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা শুধু ক্যামেরা বসানোর ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে সঠিক ডেটা ব্যবস্থাপনা, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণের নির্ভুলতা, দ্রুত মামলা বা জরিমানা প্রক্রিয়া, নাগরিকদের কাছে পরিষ্কার বার্তা পৌঁছানো এবং প্রয়োগের ধারাবাহিকতা। প্রযুক্তি এখানে ট্রাফিক পুলিশের বিকল্প নয়; বরং মাঠপর্যায়ের কাজকে আরও তথ্যভিত্তিক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার একটি সহায়ক হাতিয়ার। যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে এই ব্যবস্থা ঢাকার সড়কে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর এখানেই উঠে আসে ঢাকার যানবাহন ব্যবস্থার অন্যতম একটি দুর্বলতা-রাস্তায় চলাচলকারী অনিবন্ধিত গাড়ি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যেগুলো নিবন্ধনের আওতাভুক্ত নয়। এসব যানবাহন ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও নিবন্ধন ও মালিকানা-তথ্যের ঘাটতির কারণে তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নোটিশ পাঠানো বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জটিল হয়ে পড়ে। আর এই কারণে তাদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতাও কিছুটা কম দেখা যায়। যদিও প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবুও অনেক সময়ই দেখা যায়, এসব যানবাহন নিয়মবহির্ভূতভাবে সড়কে চলাচল করছে। আর এই যানবাহনগুলো যেহেতু এসব যানবাহন নিবন্ধিত নয়, ফলে এগুলোর বিরুদ্ধে ক্যামেরাভিত্তিক শনাক্তকরণকে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

“ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসংক্রান্ত অনিয়মের ক্ষেত্রেও মামলা দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে নিয়ম লঙ্ঘনের ভিডিওগুলো ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করে মামলা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে।”
—সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ

এআই ক্যামেরা নিয়ে রাজধানীর সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও সাধারণ পথচারীদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই নতুন এই ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মধ্যে আরিফুল ইসলাম নামে একজন প্রাইভেটকার চালক ডিটেকটিভকে জানিয়েছেন ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি চালুর পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল ও মোড়ে আগের তুলনায় যানবাহনের চলাচলে শৃঙ্খলা বেড়েছে। বিশেষ করে লাল বাতিতে থামা, জেব্রা ক্রসিং খালি রাখা এবং সিগন্যাল মেনে চলার প্রবণতা কিছুটা হলেও দৃশ্যমান হয়েছে।

জামাল নামে অপর একজন মোটরবাইক চালক জানিয়েছেন, আগে যেখানে দীর্ঘ সময় একই সিগন্যালে আটকে থাকতে হতো, সেখানে এখন কিছু জায়গায় অপেক্ষার সময় তুলনামূলকভাবে কমেছে এবং চলাচলে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে এই নতুন ব্যবস্থা নিয়ে হতাশা ও সংশয়ের কথাও জানিয়েছেন অনেকে। তাদের মতে, এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার জন্য শুধু ক্যামেরা স্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে সড়কের অবকাঠামো, ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহনের শৃঙ্খলা এবং অনিবন্ধিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও সমানভাবে জরুরি। অনেকের অভিযোগ একদিকে নিবন্ধিত গাড়ি ও মোটরসাইকেল ক্যামেরার আওতায় এসে দ্রুত মামলা বা নোটিশের মুখোমুখি হচ্ছে, অন্যদিকে অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা অন্যান্য যানবাহনের বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের অসমতার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।

সড়ক ব্যবহারকারীদের একটি অংশ মনে করেন, ফুটপাত দখল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং কিছু গণপরিবহনের বিশৃঙ্খল আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এআই ক্যামেরার পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তবুও অধিকাংশ মতামতদাতা এআই ক্যামেরার মাধ্যমে জবাবদিহিতা তৈরির বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তাদের প্রত্যাশা, অনিবন্ধিত যান নিয়ন্ত্রণ ও সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই প্রযুক্তি ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সরেজমিনে বিভিন্ন সিগন্যাল পরিদর্শনে দেখা যায়, এআই ক্যামেরার কারণে অনেক যানবাহনের চালক আগের তুলনায় ট্রাফিক আইন মেনে চললেও পথচারীদের একটি অংশ এখনো নিয়ম মানার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতন নয়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজার সিগন্যালে দেখা গেছে, লাল বাতির সময় পথচারীদের রাস্তা পারাপারের সুযোগ থাকলেও অনেকেই সবুজ বাতি জ্বলে যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ার সময়ও রাস্তা পার হচ্ছেন। এর ফলে চলন্ত যানবাহনকে গতি কমাতে হচ্ছে এবং একই সিগন্যালে গাড়িগুলোকে তুলনামূলক বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় বলা যায়, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব শুধু চালক বা ট্রাফিক পুলিশের ওপর নয়; পথচারীদেরও আইন মানার সংস্কৃতির অংশ হতে হবে।

এআই ক্যামেরাভিত্তিক ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে চালকদের পাশাপাশি পথচারীদেরও সিগন্যাল, জেব্রা ক্রসিং ও রাস্তা পারাপারের নিয়ম মেনে চলতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি থাকলেও সড়কে পূর্ণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে পড়বে। ডিএমপির ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার জনাব মোঃ আসফিকুজ্জামান আকতার, বিপিএম এই নতুন ব্যবস্থা নিয়ে ডিটেকটিভের সাক্ষাৎকারের সময় অটোরিকশা বা অন্যান্য অনিবন্ধিত যানবাহনের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে চলাচলকারী অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এসব অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত গতি, ট্রাফিক নিয়ম না মানার প্রবণতা এবং অনিবন্ধিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা সড়কে জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। অটোরিকশা চলাচল বন্ধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিনে এত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমরা ধাপে ধাপে অটোরিকশা চলাচলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেব, যাতে সড়কে জনগণের ভোগান্তি কমে যায় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়। এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত ৭ মে থেকে ১৬ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন নিয়মভঙ্গের জন্য প্রায় ৭৬৮টি মামলা করা হয়েছে।

তবে এই ব্যবস্থার সফলতা বা ব্যর্থতা শুধু মামলার সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো চালকদের আচরণে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন তৈরি করা। আগে অনেকেই মনে করতেন, নিয়ম ভাঙলেও সহজে পার পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যামেরাভিত্তিক নজরদারি ও ভিডিও প্রমাণের কারণে এখন চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বাড়ছে। মামলার ভয়ে হলেও তারা সিগন্যাল, লেন এবং অন্যান্য ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হচ্ছেন। সেদিক থেকে এই ব্যবস্থা কিছুটা হলেও সফল। তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে সড়কের সামগ্রিক বিশৃঙ্খল অবস্থাও নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বিশেষ করে অনিবন্ধিত অটোরিকশা, ফিটনেসবিহীন বা অপ্রতুলভাবে নিয়ন্ত্রিত গণপরিবহন এবং মিশ্র যানবাহনের চাপ অনেক ক্ষেত্রে সিগন্যাল ও ক্যামেরাভিত্তিক ব্যবস্থার পূর্ণ কার্যকারিতাকে সীমিত করে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এআই ক্যামেরা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এটি একদিকে আইনভঙ্গ শনাক্ত ও প্রমাণ সংরক্ষণে সহায়তা করছে, অন্যদিকে চালক ও সড়ক ব্যবহারকারীদের আচরণেও ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে হলে অনিবন্ধিত যান নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, হালনাগাদ ডেটাবেইস, পথচারীর সচেতনতা এবং মাঠপর্যায়ের ধারাবাহিক প্রয়োগ-সবকিছুকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। প্রযুক্তি সহায়ক হলেও সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা আনতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে প্রয়োজন সমানভাবে আইন প্রয়োগ ও নাগরিক আচরণের পরিবর্তন।

“ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রধান সড়কগুলোতে চলাচলকারী অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এসব অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত গতি, ট্রাফিক নিয়ম না মানার প্রবণতা এবং অনিবন্ধিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সীমাবদ্ধতা সড়কে জনদুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।অটোরিকশা চলাচল বন্ধের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একদিনে এত বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমরা ধাপে ধাপে অটোরিকশা চলাচলের বিষয়ে পদক্ষেপ নেব, যাতে সড়কে জনগণের ভোগান্তি কমে যায় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়।”
—ডিএমপির ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার জনাব মোঃ আসফিকুজ্জামান আকতার, বিপিএম

সর্বাধিক পঠিত

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ