অপরাধস্থলে পৌঁছে তদন্তকারীর প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো, আলামত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা।
কারণ অনেক ক্ষেত্রেই আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে; অপরাধী
থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর বিচারপ্রার্থী বঞ্চিত হন ন্যায়বিচার থেকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো,
সবসময় আধুনিক যন্ত্রপাতি বা প্রয়োজনীয় ডিভাইস হাতে থাকে না এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আলামত
বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এই লেখায় থাকছে এমন একটি ব্যবহারিক নির্দেশনা, ঘটনাস্থলে
পৌঁছেই কীভাবে একজন পুলিশ সদস্য কেবল পেন্সিল, কাগজ ও স্কেলের সাহায্যে অপরাধস্থলের
একটি নিখুঁত নকশা অঙ্কন করতে পারেন।
ক্রাইম সিন বা অপরাধস্থল স্কেচিং
ক্রাইম সিন বা অপরাধস্থল স্কেচিং হলো ফরেনসিক তদন্তের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ঘটনাস্থলের প্রতিটি উপাদান, যেমন-প্রমাণ, স্থান, দূরত্ব ও দিক, সুনির্দিষ্টভাবে চিত্রায়িত করে। পিআরবি রেগুলেশন, ১৯৪৩-এর ধারা ২৭৩ অনুযায়ী, তদন্তকারীকে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর যতদ্রুত সম্ভব একটি খসড়া মানচিত্র অঙ্কন করতে হয়, যাতে ঘটনার প্রকৃত অবস্থা ও প্রাথমিক আলামতগুলো নথিভুক্ত থাকে। এই স্কেচ মূলত হাতে আঁকা একটি নকশা, যেখানে ঘটনাস্থলের সামগ্রিক বিন্যাস ও স্থানিক সম্পর্ক যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। নির্দিষ্ট স্কেলে অঙ্কনের চেষ্টা করতে হয়; তবে স্কেলে আঁকা সম্ভব না হলেও এমনভাবে অঙ্কন করা আবশ্যক, যাতে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই খসড়া মানচিত্র পুরো ঘটনাস্থলের একটি সচিত্র দলিল, যা পরবর্তীতে তদন্তের ধারাবাহিকতাকে সংরক্ষণ করে। ফটোগ্রাফ যেমন একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে ধরে রাখে, স্কেচ সেখানে পুরো দৃশ্যের যৌক্তিক কাঠামো, প্রমাণের অবস্থান এবং দিকনির্দেশনা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। ফলে এটি তদন্ত, বিশ্লেষণ এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে কাজ করে।
অপরাধস্থল স্কেচিংয়ের উদ্দেশ্য
অপরাধস্থলে পৌঁছে তদন্তকারীর প্রথম কাজ হলো স্থানটি ডকুমেন্টেড করা। স্কেচের মাধ্যমে সেই স্থানটি যেমন ছিল, তেমনভাবেই চিত্রায়িত করা হয়। এটি ভিকটিম, প্রমাণ, আসবাব এবং অন্যান্য বস্তুর স্থানিক সম্পর্ক বোঝাতে সাহায্য করে। যেমন, ঘরে মৃতদেহটি কোথায় ছিল, অস্ত্রটি কত দূরে ছিল, রক্তের দাগ কোন দেয়ালে ছিল-এই তথ্যগুলো ভবিষ্যতের তদন্ত ও বিশ্লেষণে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে। প্রতিটি প্রমাণ নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করতে স্কেচে একটি স্থায়ী রেফারেন্স পয়েন্ট ব্যবহার করা হয়। একটি রেফারেন্স পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট স্থায়ী বিন্দু হলো এমন একটি জায়গা বা চিহ্ন, যা পরিবর্তন হয় না এবং যাকে ধরে অন্য সব প্রমাণ বা বস্তুর অবস্থান মাপা হয়। যেমন, ঘরের দেয়ালের কোণ, দরজার প্রান্ত কিংবা বাইরের কোনো গাছ। এর ফলে ঘটনাস্থল পরবর্তী সময়ে সহজে চিত্রায়ণ করা যায় এবং তদন্তের নির্ভুলতা অক্ষুণ্ন থাকে। আদালতে এই স্কেলযুক্ত স্কেচ বিচারক ও আইনজীবীদের কাছে সহজবোধ্য ভিজ্যুয়াল প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য হয়।
স্কেচের দুটি ধাপ: খসড়া ও চূড়ান্ত চিত্র
অপরাধস্থলে প্রথমে তৈরি হয় একটি খসড়া বা রাফ স্কেচ, যা হাতে আঁকা একটি প্রাথমিক চিত্র। এতে ঘটনাস্থলের মৌলিক গঠন, প্রমাণের আনুমানিক অবস্থান ও প্রাসঙ্গিক পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। পরে সংগৃহীত সুনির্দিষ্ট মাপের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় চূড়ান্ত স্কেলযুক্ত স্কেচ। এতে দিকনির্দেশনা (কম্পাস), স্কেল, ব্যাখ্যামূলক কী এবং প্রতিটি বস্তুর নির্ভুল মাপ যুক্ত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১/৪ ইঞ্চি = ১ ফুট-এই ধরনের স্কেল ঘটনাস্থলের দূরত্বকে সঠিক অনুপাতে উপস্থাপন করে।
অপরিহার্য উপাদানসমূহ
একটি আদর্শ অপরাধস্থল স্কেচে অন্তর্ভুক্ত থাকে—
- দিকনির্দেশ/কম্পাস: উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম নির্দেশক চিহ্ন।
- কী বা লেজেন্ড: ব্যবহৃত প্রতীক বা নম্বরের ব্যাখ্যা।
- স্থায়ী রেফারেন্স পয়েন্ট: যেমন ঘরের কোণ বা গাছের মতো অপরিবর্তনীয় বিন্দু।
- স্কেল ও মাপ: বাস্তব ঘটনাস্থলের দূরত্ব ও কাগজের দূরত্বের অনুপাত বজায় রাখা।
- লেবেল ও শিরোনাম: ঘটনাস্থলের নাম, মামলার নম্বর, তারিখ এবং স্কেচকারীর নাম।
পরিমাপের পদ্ধতি
অপরাধস্থলের বস্তু বা প্রমাণের অবস্থান নির্ধারণে স্কেচিংয়ের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। নিচে ঘটনাস্থলের প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য কয়েকটি পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।
ত্রিকোণমিতিক পদ্ধতি
দুটি নির্দিষ্ট স্থায়ী বিন্দু থেকে কোনো প্রমাণের দিকে দুটি দূরত্ব মাপা হয়। যেখানে এই দুটি রেখা ছেদ করে, সেটিই বস্তুর সঠিক অবস্থান। এই পদ্ধতি ঘরের বাইরের ঘটনাস্থলের ক্ষেত্রে বিশেষ কার্যকর।
আয়তাকার স্থানাঙ্ক পদ্ধতি
ঘরের ভেতরের ঘটনার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে উপযুক্ত। ঘরের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বরাবর দুটি সমকোণী রেখা স্থাপন করা হয় এবং সেখান থেকে প্রতিটি প্রমাণের দূরত্ব পরিমাপ করা হয়।
বেসলাইন পদ্ধতি
দুটি ফিক্সড পয়েন্টের সংযুক্ত সরলরেখাকে বেস বা ভিত্তি ধরে, উক্ত রেখাটি প্রতিটি আলামতের সঙ্গে যে লম্ব তৈরি করে, তার পরিমাপ নিয়ে চিত্র অঙ্কন করা হয়। কোনো কক্ষে কিংবা কক্ষের বাইরে এ পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। আলামতের সঙ্গে সমকোণে ভিত্তিরেখা বরাবর বাম দিক থেকে ডানদিকে প্রাপ্ত বস্তুর পরিমাপসমূহ গ্রহণ করা হয়।
আজিমুথ পদ্ধতি
খোলা মাঠ বা যেখানে কোনো ফিক্সড পয়েন্ট পাওয়া যায় না, যেমন নদীর মাঝে—সেখানে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়। একটি স্থিরবিন্দু থেকে সোজা উত্তরে একটি রেখা টেনে প্রতিটি আলামতের দূরত্ব এবং কম্পাসের সাহায্যে উত্তরমুখী রেখাটির সঙ্গে কত ডিগ্রি কোণ তৈরি করে, তা উল্লেখ করতে হবে।
আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন
বর্তমান যুগে অপরাধস্থল স্কেচিংয়ে প্রযুক্তির প্রভাব বিস্তৃত। এখন পোর্টেবল ৩৬০ ডিগ্রি স্ক্যানার ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে মাত্র ২০ মিনিটেই পুরো অপরাধস্থল স্ক্যান করা সম্ভব। এই ডিভাইসটি লাখ লাখ মাপজোক সংগ্রহ করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডজনখানেক উচ্চ-রেজল্যুশনের ছবি তোলে। ডিভাইসটির আকার একটি সাধারণ ফটোগ্রাফারের ট্রাইপডের সমান। সংগৃহীত ডেটা ব্যবহার করে অপরাধস্থলের যেকোনো দুটি বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব নির্ণয় করা যায়, যেকোনো দিক থেকে-এমনকি ওপর থেকেও-দৃশ্য দেখা সম্ভব হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ রঙিন ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা যায়, যা তদন্ত ও আদালত উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া ক্যাড সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল স্কেচ তৈরি করা যায়, যা মাপজোক ও প্রমাণের অবস্থানকে আরও নির্ভুলভাবে উপস্থাপন করে। এই প্রযুক্তিগুলোর ফলে অপরাধস্থল স্কেচিং আজ আর কেবল হাতে আঁকা নকশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে এক উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত প্রক্রিয়া, যা তদন্তকারীদের দ্রুত, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সত্যের কাছে পৌঁছাতে সহায়তা করছে।
লেখক
এএসপি
সিআইডি

