আমার পুলিশ, আমার দেশ-বৈষম্যহীন বাংলাদেশ
পুলিশ আইনশৃঙ্খলার রক্ষক। জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা দেওয়া তার কাজ। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক অঙ্গ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা তাই সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিক কাল থেকে তারা এই ভূমিকা পালন করে এলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদল তাতে বৈপ্লবিক রূপান্তরের সূচনা করেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পুলিশ বাহিনী কাঠামোগত সংস্কারে প্রবেশ করেছে, যার মূল লক্ষ্য একটি জনবান্ধব, পেশাদার এবং আধুনিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গঠন।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫ শুধুমাত্র একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান নয়; বরং একটি সাংগঠনিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের অঙ্গীকার। পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫-এর প্রাক্কালে ২৮ এপ্রিল রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) বাহারুল আলম, বিপিএম সেই বার্তাই দেন।
গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরে তিনি বলেন, এবারের পুলিশ সপ্তাহ পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জনগণ পুলিশের কাছে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। পুলিশ বাহিনীকে এই আস্থার মর্যাদা রাখতে হবে এবং তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।
সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি বাহিনী পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন, যার মধ্যে রয়েছে টেকসই প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা।
২৯ এপ্রিল সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে পুলিশ বাহিনীর নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নের জন্য সদস্যদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য এখনই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। পুলিশকে জনগণের বন্ধু উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পুলিশ বাহিনীকে সেই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ভাষণের পর তিনি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে কৃতী পুলিশ সদস্যদের হাতে পদক তুলে দেন, যা বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি এবং দেশের বিভিন্ন জেলার পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
পদক প্রদান শেষে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার পর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উত্তর পাশের প্যান্ডেলে বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির স্টল উদ্বোধন করা হয়।
“বাংলাদেশে একটি দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য এখনই সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে হবে। পুলিশ জনগণের বন্ধু। পুলিশ বাহিনীকে এই ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”— ড. মুহাম্মদ ইউনূস,মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা
এ দিনের কর্মসূচি হিসেবে মধ্যাহ্নভোজ শেষে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনার আলোকে প্রণীত কর্মপরিকল্পনার ওপর কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন। কর্মশালায় আধুনিক অপরাধ দমন কৌশল, জনসম্পৃক্ততা এবং দলগত কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। এটি ছিল বাহিনীর মধ্যে পেশাগত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। প্রথম দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব রূপে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, জনসাধারণের সঙ্গে আচরণে মানবিকতা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সেবা প্রদানের মানসিকতা থাকতে হবে, যাতে মানুষ পুলিশকে ভয় না পেয়ে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে যেন অনিয়ম, হয়রানি বা দুর্নীতির অভিযোগ না আসে, তা নিশ্চিত করতে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা জরুরি। পুলিশ সদস্যদের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার জন্য আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, পুলিশে ঘুষ বা সুবিধাভোগের সংস্কৃতি চলতে পারে না।
জনসাধারণের সঙ্গে আচরণে মানবিকতা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সেবা প্রদানের মানসিকতা থাকতে হবে, যাতে মানুষ পুলিশকে ভয় না পেয়ে আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখে।”
— লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ভাষায়, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি বিভিন্ন পুলিশ ইউনিট পরিদর্শন করেছেন এবং অধস্তন ফোর্সের খাদ্য ও আবাসনের সমস্যা, যানবাহনের সংকট এবং যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার মতো সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে সরকার ইতিমধ্যেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, থানার যানবাহন সংকট কাটাতে ২০০টি পিকআপ ভ্যান ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
এ ছাড়া, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের জন্য ঝুঁকি ভাতা পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর ফলে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তারা বর্তমানের তুলনায় বাড়তি আর্থিক সুবিধা পাবেন।
উপদেষ্টা জানান, প্রথম দফায় এসআই ও এএসআইদের মোটরসাইকেল ক্রয়ের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর সুদ সরকার পরিশোধ করতে পারে কি না-সে বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী আলোচনাও চলছে। পাশাপাশি, পুলিশ সদস্যদের একই জেলায় পদায়নের নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে, বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই পুলিশ সদস্য হলে।
জনবল সংকট মোকাবিলায় টিওঅ্যান্ডই কাঠামোতে জনবল বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন ও দক্ষ প্রশিক্ষকদের পদায়ন নিশ্চিত করার বিষয়েও নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট তাদের পরিচিতি ও বিভিন্ন কার্যক্রমের তথ্য প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে তুলে ধরে। প্রথমেই পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) তাদের প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করে। পরদিন ৩০ এপ্রিল সিআইডি, র্যাব, ট্যুরিস্ট পুলিশ, পিবিআই, অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট, হাইওয়ে পুলিশ, এপিবিএন, রেলওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ তাদের প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করে।
পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিন রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অনুষ্ঠিত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা, যেখানে সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা ও সচিবের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, গৃহায়ন উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিনিধি ফয়েজ আহমদ তৈয়বসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সভায় বক্তব্য রাখেন। পুলিশ বাহিনীর কাঠামোগত সংস্কার, নতুন প্রশিক্ষণ কৌশল, প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনব্যবস্থা এবং জনমুখী সেবাপদ্ধতি প্রবর্তনের মতো নানা বিষয় সভায় উঠে আসে। এ ছাড়া বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় সভায়।
১৯৭১ সালে পুলিশের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাসকে সামনে রেখে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন আইন উপদেষ্টা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা বলেন, নতুন বাংলাদেশে পুলিশ হবে ‘জনগণের পুলিশ’, যারা ফ্যাসিবাদী আচরণ থেকে মুক্ত থাকবে। তিনি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এ নতুন রূপান্তরকে ‘একটি ঐতিহাসিক সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিনিধি বলেন, পুলিশ কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে আইসিটি বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হবে। তিনি পুলিশ বাহিনীর জন্য একটি আধুনিক ‘সাইবার রেসপন্স ইউনিট’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। এই আয়োজনের তৃতীয় দিনে, ১ মে ২০২৫, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্মেলন করেন আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম। সম্মেলনে আইজিপি পুলিশ কর্মকর্তাদের কথা শোনেন এবং তাঁদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫-এ পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সাংস্কৃতিক ও কল্যাণমূলক আয়োজন ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক) এক বর্ণাঢ্য আনন্দমেলার আয়োজন করে, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সহধর্মিণী মিসেস লায়লা আরজু। তিনি বলেন, পুলিশ পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রশান্তি ও সাংস্কৃতিক জাগরণই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে সহায়ক।
মেলার বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক পুনাক সভানেত্রী মিসেস ফয়জুন নেছা বেগম এবং বর্তমান সভানেত্রী মিসেস আফরোজা হেলেন। তাঁরা পুনাকের মাধ্যমে পুলিশ পরিবারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরেন।
পুনাকের স্টল পরিদর্শন করেন মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং আইজিপি। এ সময় তাঁরা বলেন, পুনাক শুধু একটি সামাজিক সংগঠন নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ, যা পুলিশ বাহিনীর জনবান্ধব ও সাংস্কৃতিক দিককে প্রতিফলিত করে।
পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫-এর তৃতীয় দিনে রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে ‘নাগরিক ভাবনায় জনতার পুলিশ: নিরাপত্তা ও আস্থার বন্ধন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
“১৯৭১ সালে পুলিশের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাসকে সামনে রেখে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে।”
— ড. আসিফ নজরুল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা
আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন ড. সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, পৃথিবীতে যত রাষ্ট্র আছে, সেখানে পুলিশ আছে। পুলিশ সমাজেরই অংশ। আমাদের দেশে পুলিশের জনপ্রিয়তায় যে ভাটা পড়েছে, তা উদারচিত্তে আলোচনা হওয়া উচিত। পুলিশের সঙ্গে জনগণের দূরত্বের গোড়ায় যেতে হবে। জনগণের বিপক্ষে পুলিশকে দাঁড় করানো যাবে না।
আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম বলেন, পুলিশের প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি তখনই ইতিবাচক হয়, যখন তারা দেখে এই বাহিনীটি কেবল আইন প্রয়োগ করছে না; বরং জনগণের অধিকার রক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ বজায় রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করছে। ‘জনতার পুলিশ’ শুধু একটি পরিচয় নয়-এটি একটি দর্শন, যা নিরাপত্তার সঙ্গে সঙ্গে জনমনে আস্থা, শ্রদ্ধা ও সম্মান গড়ে তোলে।
তিনি বলেন, ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে-অস্ত্র নয়, জনগণের আস্থা অর্জনই পুলিশের প্রকৃত শক্তি। পুলিশ যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের পাশে থাকে, তবে তারা ‘ভয়ের প্রতীক’ নয়; বরং হয়ে ওঠে ‘ভরসার আশ্রয়’। তাই পুলিশ হতে হবে এমন, যারা থাকবে জনগণের পাশে, জনগণের হয়ে, জনগণের জন্য।
নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, রাষ্ট্র যখন নিপীড়ক হয়ে ওঠে, তখন পুলিশকে জনতার পুলিশ হতে দেয় না। পুলিশকে জনতার পুলিশ হতে হলে কতগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হবে। ন্যায় বা অন্যায় দেখার মতো বুদ্ধিমত্তা থাকতে হবে।
বিশিষ্ট শিল্পপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পুলিশের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পুলিশ যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে পুলিশের ভাবমূর্তি উন্নত হবে।
বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, পুলিশ যদি সত্যের পথে থাকে, তাহলে ‘নতুন বাংলাদেশে’ তারা আস্থার জায়গা হবে। পুলিশকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
“এবারের পুলিশ সপ্তাহ পূর্ববর্তী যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জনগণ পুলিশের কাছে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। পুলিশ বাহিনীকে এই আস্থার মর্যাদা রাখতে হবে এবং তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।”
— বাহারুল আলম, বিপিএম
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি )
নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলের অন্যায় আদেশ পালন থেকে বিরত থাকার জন্য পুলিশ সদস্যদের লড়াই করতে হবে।
সাবেক আইজিপি আবদুল কাইয়ুম বলেন, আমরা সবাই স্বাধীন হতে চাই। কিন্তু স্বাধীনতা ভালো লাগে না। অনেকে গোলামি করতে চায়। এ দ্বিচারিতার অবসান হওয়া উচিত। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
নুরুল হুদা বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। পুলিশের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক ‘ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া’-এ সংস্কৃতি বদলাতে হবে। সমাপনী বক্তব্য রাখেন মতবিনিময় সভাসংক্রান্ত উপকমিটির সভাপতি ও স্পেশাল ব্রাঞ্চের অতিরিক্ত আইজি গোলাম রসুল। তিনি বলেন, আমরা জনতার মুখোমুখি থাকব না, পাশাপাশি থাকব। আমরা সাধারণ মানুষের কাছে যেতে চাই; জনগণের পুলিশ, সাধারণ মানুষের পুলিশ হতে চাই। মতবিনিময় সভায় শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, লেখক, খেলোয়াড়, সংগীতশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা, অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক, শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মোঃ খোদা বখস চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তারা, সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপাররা। অফিসার্স মেসে এদিন বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির স্টলের পুরস্কার বিতরণী ও সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
১ মে বিকেলে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খান সভাপতি এবং ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সর্বসম্মতিক্রমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পাশাপাশি এদিন পুলিশ অফিসার্স মেসের বার্ষিক সাধারণ সভাও অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন আইজিপি বাহারুল আলম, বিপিএম। সভাপতিত্ব করেন অ্যাডিশনাল আইজি (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) ও বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স মেসের চেয়ারম্যান জনাব মোঃ মতিউর রহমান শেখ। পুলিশ সপ্তাহ ২০২৫ উপলক্ষে সবশেষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত পুলিশ অফিসারদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মিলনমেলা। এই বছর পুলিশ সপ্তাহের মধ্য দিয়ে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ এখন আর শুধুই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়; বরং জনগণের অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ একটি জনবান্ধব, আধুনিক এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান-এমন একটি বার্তা জাতির কাছে পৌঁছে গেছে। আগামী দিনগুলোতে এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মধ্যেই নিহিত থাকবে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং সুরক্ষিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।





