পুলিশ সদস্যদের সাফল্য, অর্জন, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর পালিত হয় পুলিশ সপ্তাহ। এ বছরও এই ধারার ব্যতিক্রম হয়নি। ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’-এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে গত ১০ থেকে ১৩ মে চার দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬। ১০ মে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ আয়োজন উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ ছাড়া এদিন প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রকাশিত ডিটেকটিভ ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন। অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী ডাঃ জুবাইদা রহমান পুনাক স্টল পরিদর্শন করেন এবং পুনাক স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করেন।
বেলা ১১টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ কল্যাণ প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির। প্রধান অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে যে মানবিক, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিংয়ের দিকনির্দেশনা উঠে আসে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যেও তার ধারাবাহিকতা দেখা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুলিশকে সচেষ্ট হওয়ার পরামর্শ দেন। গুম, খুনসহ সকল অমানবিক কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে পুলিশের বিশেষ ভূমিকার কথাও বলেন তিনি।
পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ইতোমধ্যেই বডি-ওর্ন ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুলিশকে আরও কার্যকর বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে অধিক সংখ্যক বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তব্যে মাদক ও মব কালচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা বলেন। পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আধুনিক, জনবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশকে এগিয়ে নেওয়া প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনাদের ভূমিকা হতে হবে আপসহীন।”
পুলিশকে আরও দক্ষ বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে এবং পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ সদস্যদের কিছু দাবি-দাওয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে সুপারিশ আকারে উপস্থাপন করেন।
“আধুনিক, জনবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশকে এগিয়ে নেওয়া প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনাদের ভূমিকা হতে হবে আপসহীন।”
—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সেগুলো হলো:
১। চাকরিজীবনের শেষ কর্মদিবসে কনস্টেবল থেকে পুলিশ পরিদর্শক পর্যন্ত যোগ্য সদস্যদের সম্মানসূচক পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি যৌক্তিকভাবে পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
২। মাঠপর্যায়ে তদন্তের দায়িত্ব পালনকারী এসআই ও এএসআইদের চলাচল এবং তদন্তকাজে গতিশীলতা আনার লক্ষ্যে সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে মোটরসাইকেল কেনার সুযোগ সৃষ্টি করা।
৩। নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত সময় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য ওভারটাইম ভাতার ব্যবস্থা করা।
৪। পুলিশের ব্যারাক, থানা ও ফাঁড়িসহ বিভিন্ন অপারেশনাল স্থাপনার উন্নয়ন এবং নতুন ভবন নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি রাজস্ব খাত থেকেও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা। পুলিশের দায়িত্বের ধরন, ঝুঁকি ও কর্মপরিধি বিবেচনায় পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবির বিষয়টির আশু সমাধান করা।
৫। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার অপব্যবহার, অপপ্রচার এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা।
৬। সরকারি খাস-জমির প্রাপ্যতা বিবেচনায় পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়াচর্চার জন্য একটি আধুনিক ক্রীড়া কমপ্লেক্স স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া।
৭। পুলিশ হাসপাতালগুলোকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ করা। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা।
৮। প্রাসঙ্গিক প্রশাসনিক ও নীতিগত বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগের প্রস্তাব বিবেচনা করা।
৯। সিলেট ও বরিশাল বিভাগে দুটি নতুন পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন এবং বগুড়া, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহে চারটি নতুন মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রস্তাব সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা।
১০। উদ্ধার অভিযান, জরুরি সাড়া প্রদান, দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনা এবং বিশেষ নিরাপত্তা কার্যক্রমে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে পুলিশ বাহিনী প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারলে ভবিষ্যতে একটি এভিয়েশন সার্ভিস গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা।
এবারের আয়োজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে আইজি’স ব্যাজ, শিল্ড প্যারেড এবং অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান।
১২ মে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক মোঃ আলী হোসেন ফকির বলেন, “যুবসমাজ ও জাতির ভবিষ্যতের জন্য মাদক একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।”
আইজিপি আরও বলেন, “বাংলাদেশ পুলিশ একটি ঐতিহ্যবাহী ও পেশাদার বাহিনী। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের প্রত্যেক সদস্য নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।”
অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৩৪১ জন পুলিশ সদস্যকে “পুলিশ ফোর্স এক্সেমপ্লারি গুড সার্ভিস ব্যাজ-২০২৫” প্রদান করা হয়।
এ ছাড়া অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার অভিযানে সাফল্য অর্জনকারী বিভিন্ন ইউনিটকে পুরস্কৃত করা হয়। শিল্ড প্যারেড প্রতিযোগিতায় যৌথ মেট্রোপলিটন দল প্রথম, এপিবিএন দল দ্বিতীয় এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ দল তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
আইজিপি পুরস্কারপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের সাহস, নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের প্রশংসা করেন এবং দেশের কল্যাণে সবাইকে আরও নিষ্ঠা, সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
চার দিনব্যাপী এ আয়োজনে পরবর্তী সময়ে আইজিপির সঙ্গে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্মেলন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতবিনিময়, সিআইডি ও পিবিআইয়ের কার্যক্রম উপস্থাপন, বিভিন্ন ইউনিটের অপরাধবিষয়ক সম্মেলন, পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সাধারণ সভা এবং অবসরপ্রাপ্ত ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তাদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়।
এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বাহিনীর অর্জন, সীমাবদ্ধতা, ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি ও জনবান্ধব পুলিশিংয়ের প্রয়োজনীয়তাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে।
প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির বক্তব্যে যেমন পুলিশের আধুনিকায়ন, মানবিকতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনি মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি দক্ষ, মানবিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনগণের আস্থাভাজন পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার উপলক্ষ।

“আধুনিক, জনবান্ধব ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশকে এগিয়ে নেওয়া প্রতিটি পুলিশ সদস্যের দায়িত্ব। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনাদের ভূমিকা হতে হবে আপসহীন।”
“বাংলাদেশ পুলিশ একটি ঐতিহ্যবাহী ও পেশাদার বাহিনী। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের প্রত্যেক সদস্য নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।”