বুধবার, জুন ৩, ২০২৬
37.7 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপুলিশ সপ্তাহ ২০২৬যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ ও নারী সুরক্ষা

যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০ ও নারী সুরক্ষা

মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন বিপিএম
,

বাংলাদেশে প্রায় সব সামাজিক কাঠামো এবং সংস্কৃতিতে যৌতুকপ্রথা নতুন আঙ্গিকে পরিলক্ষিত হয়। নারী নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে যৌতুকপ্রথাকে চিহ্নিত করা যায়।

যৌতুকপ্রথার মাধ্যমে বৈবাহিক লেনদেন না থাকলে বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধন প্রায় অকার্যকর বলে পরিগণিত হয়। যৌতুকের মাধ্যমে পণ্যের আদান-প্রদান যেন একটি স্থায়ী পদ্ধতি, যার অনুপস্থিতিতে নারী-পুরুষের আইনি আবেগীয়, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন সমাজ-সংসারে অসম্ভব ও অবাস্তব। যৌতুকপ্রথাবিহীন রীতি সম্পর্কের বন্ধনকে দুর্বল করে, এই মিথ আবহমানকাল থেকে সমাজ-সংসারে শক্তভাবে প্রোথিত।

যৌতুকের দাবিকে কেন্দ্র করে মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন চালানোর ফলে নারীদের আত্মহত্যা এবং হত্যার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নারী ও কন্যাশিশুর জীবনকে নিষ্পেষিত করছে। বিয়েতে যৌতুক দেওয়া-নেওয়া বন্ধ করা ও পারিবারিক জীবনে নারীর নিরাপত্তার জন্য ১৯৮০ সালে প্রণীত হয় ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০’। আইনটি ২৬ ডিসেম্বর ১৯৮০-তে পাস হয়।

বিয়েতে কোনো পক্ষ বা পিতা-মাতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে, বিয়ের সময় বা আগে অথবা পরবর্তী সময়ে কোনো সম্পত্তি বা মূল্যবান সামগ্রী প্রদান করলে তা যৌতুক বলে গণ্য হবে। যৌতুক সমাজজীবনে একটি প্রচলিত প্রথা, যা সামাজিক সমস্যা বা সামাজিক কুপ্রথা হিসেবে বিবেচিত। এর কারণে অগণিত পরিবারে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও ভাঙন সৃষ্টি হচ্ছে এবং হাজার হাজার নারীকে স্বামীগৃহে অমানুষিক নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সইতে হচ্ছে। গৃহ থেকে বিতাড়িত হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে হচ্ছে; এমনকি প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হচ্ছে। এভাবে সমাজজীবনে নারীদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে এবং তাদের নিরাপত্তাহীনতার মাধ্যমে সমাজে এক চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

যৌতুকপ্রথার পটভূমি আলোচনা করলে দেখা যায়, হিন্দু সমাজ থেকে এর উৎপত্তি। হিন্দু আইনে পৈতৃক সম্পত্তিতে কন্যার উত্তরাধিকার স্বীকৃত না হওয়ায় কন্যা পাত্রস্থ করার সময় থেকে যৌতুকপ্রথা চলে আসছে। অতীতে বর-কনের নতুন সংসার সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিয়ের উপহার হিসেবে দেওয়া হতো। সময়ের পরিবর্তনে তা সর্বনাশা যৌতুকপ্রথায় রূপ লাভ করে।

আমাদের সমাজে উপঢৌকন দেওয়া-নেওয়ার রীতি চলে আসছে। কালক্রমে এই উপঢৌকন জোর করে ও দরকষাকষির মাধ্যমে নেওয়ার প্রবণতা সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে এই প্রবণতা সামাজিক ব্যাধির মতো সমাজজীবনে জেঁকে বসেছে।

যৌতুকপ্রথার জন্য বিভিন্ন বিষয় দায়ী। যেমন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, দারিদ্র্য, আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদা, কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতার মানসিকতা, নারীদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, যৌতুক প্রদানের ক্ষেত্রে অর্থহীন অহমিকাবোধ ও অসম প্রতিযোগিতা, নারীদের পরনির্ভরশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা, অনুকরণপ্রিয়তা, শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা, পরিবারে কন্যার স্থান, প্রতিষ্ঠা লাভের মনোভাব, সমাজে দুর্নীতি ও অনুপার্জিত আয়ের প্রভাব, ধর্মীয় প্রভাব, সামাজিকভাবে সচেতনতার অভাব, যৌতুকবিরোধী সামাজিক আইনের অপর্যাপ্ততা ও বাস্তবায়নের ব্যর্থতা, নারী ও পুরুষের বৈষম্য ইত্যাদি।

এমনও দেখা গেছে, বিবাহের সময় কনের বয়স কত তার ওপর যৌতুকের পরিমাণ ও ধরন নির্ধারণ করা হয়। বয়স কম হলে যৌতুকের পরিমাণ কম; আর বয়স বেশি বা গায়ের রং কালো হলে যৌতুকের পরিমাণ বেশি। এখানে কনের নিজের শিক্ষা, মেধা, কর্মদক্ষতা, অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় আসে না। এমনকি বিবাহের সময় কোনো কোনো চাকরিজীবী কনের চাকরি পেশাটাই যৌতুক হিসেবে পরিগণিত হয়।

যৌতুকপ্রথার ফলাফল ভয়াবহ। যুগ যুগ ধরে এই প্রথা ব্যক্তি, পরিবার, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পারিপার্শ্বিকতাকে কলুষিত করছে। এই প্রথা একটি জগদ্দল পাথরের মতো। এই কুপ্রথার জন্য কত নারীর চাপা কান্না ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়ে গুমরে মরছে। ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীরাই যৌতুকের শিকার হয় বেশি। যদিও স্থান, কাল, পাত্র, শিক্ষা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাভেদে যৌতুকের বিষয়টি নির্ভর করে।

যৌতুকপ্রথার কারণে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়; যেমন দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ বৃদ্ধি, দাম্পত্য কলহ, সামাজিক ও পারিবারিক মর্যাদাহানি, দুর্নীতি, হত্যা, আত্মহত্যা, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি।

যৌতুকপ্রথার দুষ্টচক্র ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যা সৃষ্টি করেছে। সেজন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অমানবিক ও নির্যাতনমূলক এ প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ১৯৮০ সালে এ লক্ষ্যেই যৌতুকবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এটিকে মূল ধরে আরও অনেক আইন পরবর্তীতে প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই আইনের কতগুলো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিলক্ষিত হয়:

  • যৌতুক নিরোধ বা নিষিদ্ধকরণ আইন পারিবারিক সংহতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে অবদান রাখে। এটি পরিবারের সদস্যদের সম্পর্ক ও বন্ধন গভীর করে।
  • সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ আইন সহায়তা করে।
  • যৌতুকের বলিতে শত-সহস্র জীবনের অকাল পরিণতি সমাজে প্রত্যক্ষ করা যায়। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধ বা নিষিদ্ধকরণ আইন এ অবস্থা রোধকল্পে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
  • সমাজে যৌতুকের বিরুদ্ধে প্রচারণা, নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি প্রভৃতি এ আইনের বাস্তবতা প্রমাণ করে।

এই আইন প্রয়োগে কিছু সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। ব্যক্তি-পরিবার ও দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে সুসম্পর্ক ও ভারসাম্য রক্ষার্থে যৌতুকপ্রথা নিরোধের জন্য এই আইন প্রণয়ন করা হয়। তবে এই আইন নারী সুরক্ষায় কতটুকু ভূমিকা রেখেছে, পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে কতটুকু কার্যকর হয়েছে; কিংবা নারী ও শিশু নিপীড়ন, আত্মহত্যা, ডিভোর্স, অবহেলা, সেপারেশন, শিশুর প্রতি অবজ্ঞা, নারী অধিকার আদায়, সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যকর পদক্ষেপ এবং এই নিয়ে গবেষণা সম্পর্কিত কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায় না।

তাই এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ কিংবা যৌতুকপ্রথা বন্ধে তথা নারী অধিকার সুরক্ষায় ফলপ্রসূ কোনো ভূমিকা তেমন একটা পরিলক্ষিত হয়নি।

যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০-এর আওতায় আইনের আশ্রয়লাভকারীর সংখ্যা খুবই নগণ্য। কেননা কোনো নারী আইনের আশ্রয় নিলে বৈবাহিক সম্পর্কে ভাঙন দেখা দেয় এবং এর পরিণতি সন্তানসহ পরবর্তী জীবনে ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন থাকা সত্ত্বেও যৌতুকের দাবি ও যৌতুকের জন্য নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় ১৯৮০ সালে প্রণীত হয় যৌতুক নিরোধ আইন। তবে এই আইন উদ্দেশ্য পূরণে কতখানি সক্ষম হয়েছে, এর মাধ্যমে নারী ও শিশুরাই বা কতটুকু প্রতিকার পেয়েছে, নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগে প্রতিবন্ধকতা এবং এর উত্তরণের সম্ভাব্য উপায় কী হতে পারে, তা নিয়ে নতুন আলোচনার দাবি রাখে। যদিও নারীদের সুরক্ষার জন্য আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, কিন্তু নারীর সার্বিক সুরক্ষায় উক্ত আইন তেমন ফলপ্রসূ হতে পারেনি।

আইনের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি:

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এ আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। দায়িত্ব, জবাবদিহিতা, কৌশল ইত্যাদি আইনে সঠিকভাবে উল্লেখ নেই; এ ছাড়া আরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা:

নারীর প্রতি বৈষম্য নিরোধ করার জন্য প্রণীত যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মধ্যে তেমন ধারণা না থাকা কিংবা এই আইন সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি না করায় অনেকেই উক্ত আইনের আশ্রয় লাভ করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে যৌতুকের লেনদেন হ্রাস না পেয়ে বরং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আইনের অপব্যবহার:

এই আইনের আগে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ছিল না। নারী নির্যাতনের যেকোনো মামলাকেই যৌতুকের মামলা হিসেবে নেওয়া হতো। ভিকটিম এসেই বলেন, বিচার চাই। কেউ বলেন না, ন্যায়বিচার চাই। এটা হলো একটা প্রতিশোধের মানসিকতা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিরোধটা তৈরি হয় অন্য কোনো কারণে, কিন্তু মামলা করার সময় যৌতুকের অজুহাতে মামলা করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী আপস করে ফেলেন। দেখা যায়, আপসের কিছুদিনের মধ্যে আবার সেই নারীকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। তখন আর ওই নারীর কোথাও যাওয়ার জায়গা থাকে না। বিভিন্ন কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন চলে। ঘটনা ঘটে দুজনের মধ্যে আর মামলা হয় যৌতুক-সংক্রান্ত বিষয়ে, যা প্রমাণ করা দুঃসাধ্য।

আইন প্রয়োগে জটিলতা:

বিচার চাইতে এসেও ভুক্তভোগীরা প্রতি পদে দুর্ভোগের শিকার হন। এই আইনে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সরকারের প্রতি স্তরে কমিটি আছে। কিন্তু এ কমিটিগুলো কাজ করে না। সবকিছুর মধ্যে একটা সমন্বয় আনতে পারলে দ্রুত সমস্যার সমাধান সম্ভব।

আরেকটি বিষয় দেখা যায়, বাদী-বিবাদী প্রায় সময়ই অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে মামলাকে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত করেন। ঘটনা যা, সেটা দিয়েই মামলা দায়ের করা উচিত। মামলার ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন-এর ১১(গ) ধারায় যৌতুকের মামলা প্রমাণ করা খুব কঠিন। দেখা যায়, তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ, রেকর্ডপত্রাদি সব ঠিক করার পরও বাদী ঠিকমতো যোগাযোগ করেন না, কারণ বাদী-বিবাদী আপস করে ফেলেন। মাঝখানে অনেক সময় নষ্ট হয়।

যেকোনো একটি মামলা দায়ের থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত কয়েকটি ধাপ রয়েছে। যেমন মামলা দায়ের, তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, রায় ঘোষণা। যেকোনো মামলার প্রতিটি ধাপে পুলিশ, আইনজীবী ও আদালতের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। ফলে আইনি সুরক্ষার জন্য মামলা করে বাদী বা ভিকটিম বিপদে পড়ে; মাঝপথে সবকিছু থমকে যায়।

আইন প্রয়োগে নির্লিপ্ততা:

আইন বিষয়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নারী নির্যাতনের অধিকাংশ মামলাই মিথ্যা। ফলে একের পর এক নারীদের পক্ষে কোনো আইন প্রণীত হলে সেখানে মিথ্যা মামলা দায়েরের জন্য বিভিন্ন ধারাও সংযুক্ত করা হচ্ছে। নারী অধিকারের ক্ষেত্রে আইনি প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক পর্যায়ে উদাসীনতা, অবজ্ঞা ও শৈথিল্য লক্ষ করা যায়। সম্পদের অপ্রতুলতা এবং জনবলের ঘাটতি জাতীয় পর্যায়ে নারীর সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করছে।

অপরাধীর শাস্তি না হওয়া:

১৯৮০ সালে যৌতুক নিরোধ আইন হলেও প্রকৃতপক্ষে তা যৌতুকের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করে। কেননা এ আইন অনুযায়ী যৌতুক গ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়ের জন্যই শাস্তির বিধান রয়েছে। বিচারব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতার বাধাসমূহ মূলত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা।

নারী অধিকারে বাধা:

নারী অধিকার বলতে মানুষ হিসেবে স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা এবং আত্মবিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তাকে বোঝানো হয়। নারীর মানবাধিকার পরিস্থিতি একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থায় অসংগতি দেখা যায়।

রাষ্ট্র কিংবা সমাজের মূল ধারার কিছু ক্ষেত্রে পূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে আইনগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা পারিবারিকভাবে নারীর মানবাধিকার বাস্তবে স্বীকৃত হচ্ছে না। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব চর্চা প্রয়োজন, তা পদে পদে বাধার সম্মুখীন হয়। মৌলবাদী চিন্তা-চেতনা এবং পিতৃতান্ত্রিকতার খড়্গহস্ত নারী অধিকার চরমভাবে ভূলুণ্ঠিত করছে।

পারিবারিক ঝামেলা:

বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা সবচেয়ে বেশি যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়। যৌতুকের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া ভুক্তভোগীকে পদে পদে নানা সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হয়। প্রমাণের জন্য তেমন কোনো সাক্ষ্য না থাকা, বিবাহের পূর্বেই যৌতুক, দাম্পত্য কলহ, নারী নিপীড়ন ইত্যাদি সম্পর্কে পারিবারিক অবহেলা আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।

তা ছাড়া আদালত প্রাঙ্গণগুলো নারীদের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। তাদের বসার জায়গা নেই, আলাদা কোনো টয়লেট নেই। এসব অব্যবস্থাপনার জন্য সঙ্গে থাকা পরিবারের লোকজন বিচার প্রাঙ্গণে অস্বস্তি বোধ করেন। ফলে তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত বিচার না নিয়ে ফিরে যান। এসব আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনার একটা দুর্বলতা।

বিচারপ্রার্থী নারী আদালতের দ্বারস্থ হলে প্রতিপক্ষের আইনজীবী এমন ভাষায় প্রশ্ন করেন, যাতে বিচারপ্রার্থী নারী লজ্জিত ও আতঙ্কিত হন। তখন তারা বিচার চাওয়ার পরিবর্তে সবকিছু ছেড়ে নীরবে প্রস্থান করেন।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা:

বিচারব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতার বাধাসমূহ মূলত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। আইন প্রণয়ন করলেও সচেতনতার অভাব, রাষ্ট্রীয় আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং প্রতিকার চেয়ে বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে নারীর অনীহার মতো বিষয়গুলো বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিদ্যমান। আক্রান্ত নারী ও পরিবারের প্রতি হুমকি এবং প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রমাণের অভাবে অনেক সময় অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যায় না।

মামলা চালানোর জন্য আর্থিক অসংগতি:

সংক্ষুব্ধ বা সাহায্যপ্রার্থীকে সরকারি আইনজীবী বা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সাপোর্ট দেওয়ার ব্যবস্থা অপ্রতুল। আইনজীবীরা তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য মামলা দীর্ঘায়িত করেন; ফলে বিচারপ্রার্থী আশাহত হয়ে পড়েন। যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০ বাংলাদেশে নারীর অধিকার রক্ষা, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও ক্ষমতায়নের জন্য ৪৫ বছর আগে প্রণীত হলেও এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায়নি। বরং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যৌতুক আদান-প্রদান হচ্ছে।

সরকার ২০১৮ সালে যৌতুক আদান-প্রদান প্রতিরোধে ১৯৮০ সালের আইনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। মন্ত্রিসভা যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। নতুন আইনে শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ, দুটোই বাড়ানো হয়েছে।

নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কেউ যৌতুক দাবি করলে তিনি পাঁচ বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আইনের ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য কেউ যদি যৌতুক-সংক্রান্ত মিথ্যা মামলা করেন, তিনিও সর্বোচ্চ পাঁচ বছর থেকে সর্বনিম্ন এক বছরের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই আইনের অধীনে সংঘটিত অপরাধ আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য হবে। তবে আপসযোগ্য হবে।

যৌতুকের তালিকায় কী নেই! নগদ অর্থ, জমি, বাড়ি, গাড়ি, মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, ওয়ার্ডরোব, স্বর্ণালংকারসহ আরও অনেক কিছু থাকে। মেয়ে সুখে থাকবে, এই আশায় মা-বাবাসহ অভিভাবকেরা এসব যৌতুক দেন।

দেখা যাচ্ছে, বিয়ে করাটা ছেলের জন্য বিশাল লাভজনক একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে তারা যে নিজেদেরই অসম্মানিত করছেন, তা কি তারা বুঝতে পারেন? তারা কি কখনো অনুধাবন করেন না যে, যৌতুক চেয়ে বা নিয়ে নিজেদেরই ছোট করছেন? যৌতুকের নামে কোনো ব্যক্তি যদি ফ্ল্যাট বা খাট-পালঙ্ক গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে তাতে শান্তিমতো ঘুমান কীভাবে?

অনেকে যৌতুককে ভবিষ্যৎ রক্ষাকবচ হিসেবে দেখে থাকেন। অনেক সময় দেখা গেছে যে, বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে যা পাবেন, তা দিয়েই নিজের কর্মসংস্থানের একটা ব্যবস্থা করে ফেলবেন। সুতরাং কষ্ট করে চাকরি খোঁজার তার কোনো প্রয়োজন নেই অথবা নিজের আয়-রোজগারের আর কোনো দরকার নেই। অনেককে মেয়ের বাবার সম্পদ দেখে বিয়েশাদি করতে ছেলেদের পরামর্শ দিতে দেখেছি। আর মেয়ের অভিভাবকরাও অনেক সময় আগে থেকেই মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন।

এসব থেকে বোঝা যায়, যৌতুকের বিষয়টি আমাদের সমাজের কত গভীরে শিকড় গেড়ে আছে। শুধু আইনের মাধ্যমে সমাজ থেকে যৌতুকপ্রথা দূর করা যাবে না। এজন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে, যৌতুক নেওয়া কোনো সম্মানজনক বিষয় নয়; বরং এটা খুবই লজ্জার। অপরাধও বটে।

মেয়েদের এবং তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশে বলা যায়, যেসব পুরুষ বিয়েতে যৌতুক চান, তারা আর যা-ই হোক, কখনোই ভালো মানুষ নন; তাদের প্রত্যাখ্যান করুন। সবাই মিলে যদি একযোগে রুখে দাঁড়ানো যায়, দেশ থেকে ঠিকই একদিন যৌতুকপ্রথা দূর হয়ে যাবে।

আসুন সবাই শপথ নিই, যৌতুক নেব না, দেবও না।

লেখক
যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার, হেডকোয়ার্টার্স
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ