বুধবার, জুন ৩, ২০২৬
37.7 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপুলিশ সপ্তাহ ২০২৬শিখা অনির্বাণ: বুদ্ধির মুক্তির দিশারী

শিখা অনির্বাণ: বুদ্ধির মুক্তির দিশারী

আনোয়ারুল হক
,

কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪-১৯৭০), মুসলিম সাহিত্য সমাজ এবং ‘শিখা’ পত্রিকার (১৯২৭-৩১) উত্থান এক সূত্রে গ্রথিত। পত্রিকাটি স্বল্পায়ু হলেও দশকজুড়ে তাদের উত্থান ও তৎপরতা সমকালে তাৎপর্যমণ্ডিত ছিল। গোষ্ঠীর মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তচিন্তা ও মুক্তমনের সৎসাহস। ব্যতিক্রমী এ সংগঠন ও পত্রিকার দুজন সংগঠকের একজন ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। অপরজন ছিলেন প্রধান সারথি আবুল হুসেন (১৮৯৬-১৯৩৮), যিনি ‘শিখা’ পত্রিকার প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা (চৈত্র ১৩৩৩, ১৯২৭) সম্পাদনা করেছিলেন।

বিশ শতকের বিশের দশকে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং তার মুখপত্র ‘শিখা’ পত্রিকার প্রকাশ ও প্রভাবে পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে মুক্তচেতনার প্রাণে সাড়া জেগেছিল, যার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন এরা। সৌভাগ্যের বিষয়, তারা নির্বান্ধব ছিলেন না। তাদের সঙ্গে আরও যারা আয়োজক, সক্রিয় সহযোগী, লেখক এবং প্রকাশক হয়ে যোগ দিয়েছিলেন, তাদের অন্যতম কাজী মোতাহার হোসেন (১৮৯৭-১৯৮১)। তিনি ‘শিখা’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা (১৯২৮) এবং তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা (১৯২৯) সম্পাদনা করেছিলেন। মোহাম্মদ আবদুর রশীদ (বিএ, বিটি) সম্পাদনা করেছিলেন চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা (১৯৩০)। আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩) সম্পাদনা করেছিলেন পঞ্চম বর্ষ, পঞ্চম সংখ্যা (১৯৩১)।

এদের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত ছিলেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী (১৯০৩-১৯৫৬), আবদুল কাদির (১৯০৬-১৯৮৪), সৈয়দ আবদুল ওয়াহেদ (১৯০১-১৯৮১), সাদত আলী আখন্দ (১৮৯৯-১৯৭১) এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯)। জ্ঞানতাপস মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তৃতীয় বর্ষে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি হিসেবে অভিভাষণ দিয়েছিলেন।

বলা আবশ্যক, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠন এবং এর উদ্দেশ্য শুধু মুসলমান সমাজকে ঘিরে ছিল না। উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য ছিল উভয় সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদ, ধর্মান্ধ ও গোঁড়া মানসিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। সুসম ও অসাম্প্রদায়িক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ নির্মাণের জন্যই এ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তৎকালীন বঙ্গদেশে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির প্রভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হওয়ায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সন্দেহ ও দ্বিধার গুরুতর সংকট চলছিল।

এ সময়ের বিদ্যমান সামাজিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় সংস্কার সম্পর্কে তারা সচেতনচিত্তে অবগত ছিলেন বলেই মেলবন্ধন সৃষ্টিতে ‘শিখা’ পত্রিকার সঙ্গে হিন্দু সম্প্রদায়ের লেখকদেরও সম্পৃক্ত করার উদারতা দেখিয়েছেন। গোষ্ঠী একদিকে যেমন প্রকৃত মুসলিমদের ধর্মচেতনাকে সশ্রদ্ধ অবস্থানে রেখে তাদের বক্তব্য পেশ করেছে, তেমনি প্রতিবেশী সমাজকেও সহাবস্থানে রেখেছে।

তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যায় এই উদারতার পরিচয় দিয়ে ‘দারার ধর্মমত’ নামে রচনা লিখেছেন অধ্যাপক কালিকারঞ্জন কানুনগো। একই সংখ্যায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে প্রবন্ধ লিখেছেন সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮-১৯৫২)। চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যায় অধ্যাপক শ্রী উমেশচন্দ্র ভট্টাচার্যের রচনার নাম ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনে জগৎ ও জীবন’। একই সংখ্যায় করুণাকণা গুপ্তার রচনা ‘বর্তমান বাংলার মহিলা ঔপন্যাসিক’ এবং ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রিন্সিপাল শ্রী সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র লিখেছেন ‘সাহিত্যে শুচিতা’।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এরা সবাই ছিলেন তৎকালের সমাজ-মানসের চেয়ে এগিয়ে। যে কারণে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিয়েছিলেন। যার ফলে সমাজপ্রভুদের সামনে তাদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিন্তু সৎচিন্তায় খামতি ছিল না বলে উতরে গেছেন। তাদের মন-মনন, তীক্ষ্ণবুদ্ধি, বিশ্লেষণী সমাজচর্চার উদার অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মহাগ্রন্থ কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক। যার বিকাশে অহিতকর, অকল্যাণকর কিছু ছিল না।

সেকালে কাজী আবদুল ওদুদদের মুক্তবুদ্ধিবৃত্তিক আত্ম-অন্বেষণ তরুণদের মধ্যে অভাবনীয় উদ্দীপনা সঞ্চার করেছিল। সেই ‘শিখা’ আজও অনির্বাণ। একুশ শতকের বর্তমান প্রজন্মও যখন মুক্তচিন্তকদের আলো জ্বালানোর উদ্যোগ শতবর্ষ পরে গ্রহণ করে, তার মূল কারণ এই যে, মহৎপ্রাণ কাজী আবদুল ওদুদ এবং তার সারথিদের যৌক্তিক মৌলচেতনা ছিল সৎসাহস থেকে উৎসারিত। যেটা কখনো থেমে যায় না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রাণপ্রবাহে সঞ্চারিত হয়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, কাজী নজরুল ইসলামকে (১৮৯৯-১৯৭৬) সেদিন ‘বিদ্রোহী’র (১৯২২) তিলক পরিয়ে দিয়ে সারস্বত সমাজে যারা তাকে বরণ করে নিয়েছিল, অধ্যক্ষ ইব্রাহীম খাঁর (১৮৯৪-১৯৭৮) কাছে লেখা পত্রের উত্তরে (পত্র নং: পনের, ন র, বা এ, নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮২) নজরুল তরুণদের নেতা হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করেছেন, তারা ছিলেন ইব্রাহীম খাঁ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল কালাম শামছুদ্দীন, আবুল মনসুর, ওয়াজেদ আলী ও আবুল হুসেন। বলেছেন, এ তরুণদের কোনো জাত নেই, এরা সব জাতির। তিনি নিজেও যেমন ছিলেন সব দেশের, সব জাতির। এ তরুণেরা সবাই উপমহাদেশের বিশ শতকের প্রথম দুই-তিন দশকের রাজনীতি, সমাজ-বাস্তবতাকে প্রত্যক্ষ করেছেন। নজরুলের ভাষায়, ‘ধনের চেয়ে মনের দিক থেকে যারা বেশি কাঙাল’, বিকাশ-উন্মুখ মধ্যবিত্ত মুসলমান এ সমাজের ভেতর থেকে কাজী আবদুল ওদুদ উঠে এসেছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করে শিক্ষাজীবন শেষ করেন ১৯১৯ সালে। ১৯২০ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে বাংলার অধ্যাপক পদে যোগ দেন। এর ছয় বছর পর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ গঠনে যখন উদ্যোগী হয়েছেন, ততদিনে উনিশ শতকীয় হিন্দু-মুসলমান অসাম্প্রদায়িক সমাজ স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি যে সময় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, দেখা যাচ্ছে সে বছরই ধর্মীয় রাজনীতির বিষময় ফল, ২ এপ্রিল কলকাতায় রক্তক্ষয়ী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে।

সমকালের প্রধান এই সমস্যা, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের সংকট এবং এর মূল কারণ বিষয়ে কাজী ওদুদ ও সারথিরা অনবহিত ছিলেন না। তারা মুক্তবুদ্ধির আলোকে প্রতিবেশীকে দোষারোপের মধ্যে না গিয়ে নিজেদের অজ্ঞানতা, অসম্পূর্ণতাকে চিহ্নিত করার প্রয়াসী হয়েছেন। আশা করেছেন, সাহিত্য রচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মিলন সম্ভব। যদিও এই আশাবাদ বিগত শত বছরেও ফলপ্রসূ হয়নি।

না হওয়ার ক্ষেত্র যে ততদিনে প্রস্তুত হয়ে গেছে, কাজী আবদুল ওদুদ তার ‘বাংলার জাগরণ’ রচনায় তা উল্লেখ করেছেন। শিখা গোষ্ঠী যখন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অভেদ মিলন আশা করে, তার অনেক আগেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) মতো প্রভাবশালী লেখকের রচনায় জাতীয়তার অন্তরালে ধর্মীয় ভাব আড়াল থাকেনি। এতে হিন্দু-মুসলিম দুই পক্ষের মধ্যে মিলনের অন্তরায় বৈরী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) বঙ্কিমের এ সংকীর্ণতা ভেঙে তাকে বৃহত্তর করার প্রয়াসী হয়েছিলেন। কিন্তু তার আদর্শের অনুপ্রেরণা এ পর্যন্ত বাংলার জাতীয় জীবনে কমই অনুভূত হয়েছে; এখন পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়ত্বের আদর্শই উপমহাদেশের জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে।
শিখা সমগ্র, বা এ, পৃষ্ঠা: ১৭৮

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রকাশনা ‘শিখা’র শীর্ষ-বাণীতে ‘মুক্তি’ কথাটা আছে সার্বিক অর্থে। তারা বিশ্বাস করেছেন, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ পত্রিকার শীর্ষের এই বাণী আমাদের বঞ্চনার ইতিহাস স্পষ্ট করে দেয়।

একে নাগালের মধ্যে পাওয়ার জন্য বাঙালি মুসলমানের ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা, সংগীত, নাটক, শিল্পকলা, সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীতি, ইতিহাস ইত্যাদির মূলে কাজী আবদুল ওদুদের মতো অনুসন্ধানীরা উৎসুক ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সৎ মানুষের কল্যাণ সাধনে অন্ধ শাস্ত্রবিধির কারাগার থেকে ‘বুদ্ধির মুক্তি’কে যে কারণে বলা হয়েছে ‘ইম্যানসিপেশন অব ইন্টেলেক্ট’। আলোক-তীর্থে উত্তরণ। বলা বাহুল্য, এই পথ তাদের জন্য কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না।

১৯২৬ সালে ঢাকা কলেজের অধ্যাপক, বত্রিশ বছরের যুবক কাজী আবদুল ওদুদকে বলা হয়েছে, ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম চিন্তক, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ভাবযোগী’। তার সহযোগী ছিলেন অধ্যাপক আবুল হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। যৌথ প্রচেষ্টায় তারা গড়ে তোলেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’।

কিন্তু বিদ্যমান মুসলমান সমাজের পূর্ববঙ্গের পরিবেশ তখন মোটেই তাদের মুক্তচিন্তা-চেতনার অনুকূলে ছিল না। অন্ধত্ব, গোঁড়ামির শিকড় উপড়ে মুসলমান সমাজের অজ্ঞানতা দূর করে যৌক্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সমাজপতিরা সুনজরে দেখেননি। তাদের রেনেসাঁসীয় চিন্তাভাবনা ধারণ করতে সমাজ আগ্রহী ছিল না।

খুব দ্রুতই বিরোধীদের লক্ষ্য-ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন কাজী আবদুল ওদুদ। ঢাকার নওয়াব পরিবার এবং তাদের সাঙ্গোপাঙ্গদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে নিরাপদ বাস অসম্ভব হয়ে পড়লে কাজী ওদুদ স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস করার উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন।

ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ছেড়ে ‘কর্মযোগী’ আবুল হোসেনও তার অনুগামী হয়েছিলেন। আগে-পরে এ দুজনের ঢাকা ত্যাগের নেপথ্যে ঢাকার মুসলিম গোঁড়াপন্থিদের সামাজিক নিপীড়ন অন্যতম কারণ বলে অনেকে মনে করেন।

কাজী আবদুল ওদুদ এক লেখায় সারথি আবুল হুসেনসহ অন্যদের নাম উল্লেখ করে সমকালের সমাজ-পরিবেশ বর্ণনা করেছেন, যাতে সমকালে ‘শিখা গোষ্ঠী’র প্রতি স্বসমাজের মানসিক নিপীড়নের মাত্রা উপলব্ধি করা যায়। বলা হয়েছে, কিছুদিন আগে মোহাম্মদীতে একটি লেখা বের হয়। তাতে অধ্যাপক আবুল হুসেনকে ও তরুণ কবি আবদুল কাদিরকে কুরআন ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্বন্ধে কয়েকটি অসংগত কথার জন্য জবাবদিহি করা হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বের করে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বলাই বাহুল্য, আবদুল কাদির তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সেদিন মোহাম্মদী পত্রিকার সঙ্গে ছোলতানও কণ্ঠ মিলিয়েছিল এবং দুটি পত্রিকা মিলে ঢাকার এই তরুণ দলটিকে ‘শিখা সম্প্রদায়’ নামে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র জেহাদ’ ঘোষণা করেছিল।

তথ্য: ড. তুহিন ওয়াদুদ, শিলালিপি, ১৬.১.২০২৬.

আবদুর রহমান খাঁ তার আত্মজীবনী আমার জীবন (ঢাকা, ১৯৬৪) গ্রন্থে কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ঢাকার সমাজ-বাস্তবতার পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, ‘তাহারা বলিতেন, মুসলিম সমাজে অনেক গলদ ঢুকিয়া গিয়াছে…’ এতে ঢাকার মুসলিম সমাজ নেতারা তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হন। মনে করলেন, তারা কাফির হয়েছেন। যার ফলে বলিয়াদির জমিদার বাড়িতে মৌলানা মুহম্মদ ইসহাক সাহেবের সামনে ধর্মজ্ঞানের পরীক্ষা দিতে হলো।

‘আবুল হুসাইন আরবি ভাষায় লিখিয়া দিলেন, আমানতু বিল্লাহি…। আবদুল ওদুদ তাহার স্বরচিত হজরত মুহাম্মদ (দ.) সম্বন্ধে একটি কবিতা শুনাইলেন। স্বপক্ষে মাওলানার রায়ে ইহারা বাঁচিয়া গেলেন।’
শিখা সমগ্র, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, বা এ, ২০১৯

তাৎক্ষণিক তারা বেঁচে গিয়েছিলেন বটে। তবে আত্মসচেতন ব্যক্তির মানসম্মান রক্ষা করে বাঁচার জন্য কাজী আবদুল ওদুদের স্থান ত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না, তা বোঝা যায়।

১৯২৭ থেকে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘শিখা’ পত্রিকায় পাঁচ বছরে পাঁচটি সংখ্যায় ৬৩টি রচনা প্রকাশ পেয়েছে। তার মধ্যে কাজী আবদুল ওদুদের রচনা আছে চারটি।

প্রথম বর্ষ, ১৯২৭, প্রথম সংখ্যায় আছে ‘বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সমস্যা’ সম্পর্কিত ভাবনা। দ্বিতীয় বর্ষ, ১৯২৮, দ্বিতীয় সংখ্যায় লিখেছেন তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘বাংলার জাগরণ’। তৃতীয় বর্ষ, ১৯২৯, তৃতীয় সংখ্যায় রচনা ‘বাংলা সাহিত্যের চর্চা’ এবং চতুর্থ বর্ষ, ১৯৩০, চতুর্থ সংখ্যায় ইউরোপীয় রেনেসাঁর অন্যতম দার্শনিক, জার্মান লেখক সম্পর্কিত রচনা ‘গ্যেটে’।

ভাবজগতে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১), গ্যেটে, এদের দার্শনিক সত্তা কাজী আবদুল ওদুদের চিন্তার জগৎকে ঋদ্ধ করেছে। তার মুক্তচিন্তার জমিনে জলসিঞ্চন করেছে। যার ফলে তিনি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ছিলেন স্পষ্টবাদী, স্বচ্ছ ও মানবতাবাদী।

কাজী ওদুদের গদ্য রচনা ‘রবীন্দ্রকাব্য পাঠ’ (১৩৩৪), ‘হিন্দু-মুসলমান বিরোধ’ (১৯৩৬), ‘কবিগুরু গ্যেটে’ (দুই খণ্ডে সম্পূর্ণ প্রকাশিত, ১৩৫৩), ‘সমাজ ও সাহিত্য’ (১৯৩৪), ‘শাশ্বত বঙ্গ’ (১৯৫১) ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। আছে ১৯৫৬ সালে বিশ্বভারতীতে দেওয়া বক্তৃতাবলি ‘বাঙলার জাগরণ’ নামে একত্রে একটি গ্রন্থ, যেটি ওই বছরই প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শরৎচন্দ্র ও তারপর’ নামে দেওয়া বক্তৃতা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়েছে ১৯৬১ সালে। তার জীবনের শেষদিকে প্রকাশিত হয় ইসলামবিষয়ক সার্বজনীন মূল্যায়ন গ্রন্থ ‘হযরত মোহাম্মদ ও ইসলাম’ (১৩৭৩) এবং পবিত্র কুরআনের সহজবোধ্য, সুললিত বঙ্গানুবাদ।

এতদ্‌সঙ্গে যে গ্রন্থটি বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য সম্পদ এবং পাঠক-আদৃত হয়ে আছে, সেটি হলো তার সম্পাদিত বাংলা অভিধান ‘ব্যবহারিক শব্দকোষ’।

কাজী আবদুল ওদুদ বাংলার মুসলিম সমাজে জীবনবৃক্ষের ফুল ফোটাতে চেয়েছেন। প্রত্যাশা করেছেন, তার সমাজে সাহিত্যের নন্দন-কানন বিকশিত হোক, যার মর্মে থাকবে সার্বজনীন মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা। কাজী নজরুলের এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন ছিল, ‘এর মানে কি মুসলমানের সৃষ্ট সাহিত্য, না মুসলিম ভাবাপন্ন সাহিত্য?’ উত্তরও তিনি দিয়েছেন, ‘যদি সত্যিকারের সাহিত্য হয়, তবে তা সকল জাতিরই হবে।’
পত্রাবলি, নবম খণ্ড, ন র, বা এ, পৃ. ১৮৭

প্রসঙ্গক্রমে, ‘বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য সমস্যা’ বিষয়ক আলোচনায় অগ্রজ কাজী, বয়সের পার্থক্যে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের বয়োজ্যেষ্ঠ, মুসলমান সমাজের দুর্গতির বিষয়টি বিবেচনায় এনেছেন। ওদুদও মনে করেন, শাস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ‘চিত্তের স্বাভাবিক স্ফূর্তির’ পথ বন্ধ করে রাখার ফলে মুসলমান সমাজে ‘অর্ধবিকশিত মানুষ’ তৈরি হচ্ছে।

সাহিত্য যেখানে জ্ঞানের সুরভি, জ্ঞানচর্চা অব্যাহত থাকলে তখন সাহিত্যের.

ফুল আপনিতেই ফোটে। জ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজন মুক্তবুদ্ধির, প্রয়োজন সমাজজীবনের বৈচিত্র্যের, মুক্তবুদ্ধি যার সন্তুতি। কিন্তু অবোধ ও নিরক্ষরতার চাপে মুসলমান সমাজের অর্ধেক শক্তি ব্যক্তিত্বহীন এবং একই সঙ্গে অকর্মণ্য। যার অভিঘাতে চিত্ত-বৈচিত্র্য জেগে ওঠে, সেই অবকাশ মুসলমান সমাজে নেই। যে সমাজব্যবস্থার কথা তিনি ভেবেছেন, সুব্যবস্থিত সমাজজীবন, জীবনমুখী চিন্তাভাবনাকে যথেষ্ট যত্ন ও শ্রদ্ধা নিয়ে লালন করার ব্যবস্থা মুসলমান সমাজে নেই।
শিখা সমগ্র, মু. নূ. ইসলাম, বা এ, পৃ. ৪০

ব্যক্তিজীবনে সুসংস্কৃত স্বভাবের পরিচ্ছন্ন মানুষ ছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। চেয়েছেন, বাঙালির সমাজজীবন, তাদের সাহিত্য-চিন্তার ক্ষেত্র ও পরিসর পরিচ্ছন্ন হোক। প্রয়োগে-ব্যবহারে স্বচ্ছ দৃষ্টি, উন্নত মানসিক চিন্তার প্রয়োগ ছিল তার অভিপ্রায়। কিন্তু অতীতের মোহ, রক্ষণশীল মনোভাব, ‘পিছনের দিকে মুখ ফিরিয়ে সামনে চলার বিড়ম্বনা’ থেকে মুক্ত নয় চলমান সমাজ।

বিশ্বাস করেছেন, জিজ্ঞাসা ব্যতিরেকে কোনো মানবসমাজ গভীর চিন্তাভাবনার জন্ম দেয় না। কবি ও দার্শনিক গ্যেটের অনুরক্ত ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর ধ্রুপদ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতীক গ্যেটে ছিলেন পরম সৌন্দর্যপ্রেমিক, সত্যান্বেষী। ওদুদও ছিলেন গত শতকের মুসলমান সমাজের জাগরণের অন্যতম প্রতীক। সৌন্দর্যপ্রেমিক, সত্যান্বেষী, আলোকতীর্থের প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব।

গ্যেটে যেমন ‘সমুদ্রের হাওয়া মানস-স্বাস্থ্যের জন্য অমূল্য’, কাজী আবদুল ওদুদও তেমনি ভাবুক, বিশ্লেষণী মানস-স্বাস্থ্যের জন্য পরম আধেয়। আমাদের চক্ষু, কর্ণ, সুস্বাস্থ্যের উদাহরণ।

লেখক
শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ