মঙ্গলবার, জুন ৯, ২০২৬
28.6 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমদক্ষতা উন্নয়নসেভেন “S”অব এ ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন

সেভেন “S”অব এ ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন বা অপরাধস্থল তদন্ত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ঘটনাস্থল থেকে যতটা সম্ভব প্রমাণ সুরক্ষিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রমাণ সংরক্ষণের পদ্ধতি ভিন্ন হলেও বহুল ব্যবহৃত ‘সেভেন “S” পদ্ধতি-যা অ্যান্থনি জে. বার্টিনো এবং প্যাট্রিসিয়া নোলান-বার্টিনোর লেখা বিখ্যাত বই ,“ফরেনসিক সায়েন্স: ফান্ডামেন্টালস অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশনস’’ থেকে এসেছে । সুসংগঠিত ও সঠিকভাবে তদন্ত সম্পন্ন করতে এই পদ্ধতির ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে ও দ্রুততার সঙ্গে অনুসরণ করা হয়, যাতে ঘটনাস্থলের কোনো প্রমাণ নষ্ট বা বিকৃত না হয়। নিচে এই সাতটি ধাপের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।  

১. সাক্ষীদের আলাদা করা:

ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাক্ষীদের দ্রুত আলাদা করে দেওয়া জরুরি। এর প্রধান কারণ হলো-তারা যেন একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে না পারে। সাক্ষীরা যদি নিজেদের মধ্যে আলাপ করে, তাহলে তাদের বক্তব্যে ভুল তথ্য যুক্ত হতে পারে কিংবা কোনো মনগড়া গল্প তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সাক্ষীদের আলাদা রাখার মাধ্যমে তাদের দেওয়া সাক্ষ্য আরও নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়।
এ ছাড়া ভিকটিম জীবিত থাকলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করাও অত্যন্ত জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ:ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করার পাশাপাশি, একজন ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেটরের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়ায় সুরক্ষার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে ঘটনার জীবিত ভিকটিম, যার দ্রুত সুরক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ নজর দিতে হবে।

২. ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করা (সিকিউর দ্য সিন):

দ্রুততম সময়ে সাড়া দিতে আসা পুলিশ সদস্যদের (ফার্স্ট রেসপন্ডার) প্রথম পদক্ষেপ হবে অপরাধ সংঘটনের স্থানটিকে সুরক্ষাবলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা, যেন অবাঞ্ছিত কেউ ওই স্থানে প্রবেশ না করতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশ রোধ করা, যাতে কোনো প্রমাণ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।না হয়। একই সঙ্গে, দৃশ্যমান বা লুকানো কোনো প্রমাণ যেন নষ্ট না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হয়। প্রতিটি কর্মকর্তার প্রবেশ ও প্রস্থানের সময়, তাদের নামসহ একটি বিস্তারিত লগ সংরক্ষণ করতে হবে, যা পরবর্তীতে তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। 

বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে একটি ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশনের সবচেয়ে বড় বাধা হলো ঘটনাস্থলে প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাওয়া। প্রায় ৮০% ক্ষেত্রে এই প্রমাণ নষ্টের কারণ উৎসুক জনতার ভিড় এবং আশেপাশের যানবাহনের অননুমোদিতভাবে ঘটনাস্থলে প্রবেশ। খারাপ আবহাওয়ার কারণেও ঘরের বাইরের ক্রাইম সিনের আলামত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়াও অনেক সময় তদন্তকারী কর্মকর্তার গাফিলতির কারণেও আলামতের ক্ষতি হতে পারে।এমন আলামতের ক্ষতির কারণে অনেক সময় অপরাধের সুরাহা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

৩. ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করা (স্ক্যান দ্য সিন):

এই ধাপে তদন্তকারী কর্মকর্তা পুরো অপরাধের স্থানটি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারণা নেন। তারা ঘটনাস্থলের একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করেন এবং সম্ভাব্য প্রমাণ বা কোনো সূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। অনেক ক্ষেত্রে, মূল ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা এলাকাকেও সেকেন্ডারি ক্রাইম সিন হিসেবে বিবেচনা করে তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়। এই পর্যবেক্ষণ পরবর্তীতে প্রমাণ খোঁজার কাজে সাহায্য করে।

৪. ঘটনাস্থলের চিত্র গ্রহণ করা (সি দ্য সিন):

এই ধাপে পুলিশের ফটোগ্রাফি ইউনিট ঘটনাস্থলের ছবি তোলে এবং প্রয়োজন অনুসারে ভিডিও ধারণ করে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, প্রমাণ এবং বস্তুগত আলামতের ছবি তোলা হয়। যদি কোনো মৃতদেহ বা অন্য কোনো প্রমাণ থাকে, তবে তার পাশে একটি রুলার বা মাপক বস্তু রেখে ছবি তোলা হয়। এর এই ছবি এবং ভিডিওগুলো পরবর্তীতে তদন্তের একটি ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন হিসেবে কাজ করে।এই ছবি এবং ভিডিওগুলো পরবর্তীতে তদন্তের একটি ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন হিসেবে কাজ করে।

৫. ঘটনাস্থলের স্কেচ করা (স্কেচ দ্য সিন):

ফটোগ্রাফির পাশাপাশি, ঘটনাস্থলের একটি বিশদ হাতের আঁকা স্কেচ তৈরি করা হয়। এই স্কেচে সমস্ত প্রমাণ, গুরুত্বপূর্ণ বস্তু এবং ঘটনাস্থলের বিভিন্ন বস্তুর আপেক্ষিক অবস্থান উল্লেখ করা হয়। স্কেচ এমনভাবে তৈরি করতে হয় যেন পরবর্তীতে এই স্কেচ দেখে যেকোনো জায়গায় অপরাধের দৃশ্যটি পুনর্নির্মাণ করা যায়।

৬. প্রমাণ খোঁজা (সার্চ ফর এভিডেন্স):

এই ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পুরো ঘটনাস্থল এবং তার আশেপাশের এলাকা পুনরায় পরীক্ষা করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো আগের ধাপে যেসব প্রমাণ হয়তো চোখ এড়িয়ে গেছে, সেগুলো খুঁজে বের করা। এছাড়াও প্রমাণ খোঁজার সময় তদন্তকারী কর্মকর্তার একটি ফিল্ড নোট প্রস্তুত করতে হবে, যেখানে সমস্ত সাক্ষীদের বয়ানের সারাংশ, আলামত প্রাপ্তির স্থান এবং কেসের বিষয়ে খুঁটিনাটি সকল তথ্য লিপিবদ্ধ থাকবে।

৭. প্রমাণ সংরক্ষণ ও সংগ্রহ করা (সিকিউর অ্যান্ড কালেক্ট এভিডেন্স):

খুঁজে পাওয়া সকল প্রমাণ একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি প্রমাণকে আলাদা এভিডেন্স ব্যাগে ভরে তার ওপর তারিখ, সময়, স্থান এবং সংগ্রাহকের নাম লিখে রাখা হয়। একই সঙ্গে, সকল প্রমাণ একটি এভিডেন্স লগে লিপিবদ্ধ করা হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, চেইন অব কাস্টডি বজায় রাখা, যার অর্থ হলো যেসব ব্যক্তি কোনো প্রমাণের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের একটি ধারাবাহিক তালিকা তৈরি করা, যা আদালতের কাছে প্রমাণের বৈধতা নিশ্চিত করে।

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ