নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের একটি দিন নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যেখানে প্রার্থী, প্রশাসন এবং মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রত্যেকের আচরণই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে| নির্বাচনী সময় ঘনিয়ে এলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যেমন তীব্র হয়, তেমনি ভুল বক্তব্য, অনিয়ন্ত্রিত প্রচারণা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।এই সংবেদনশীল বাস্তবতায় নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো নির্বাচনী আচরণবিধি| বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রণীত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ২০২৫ এই সময়কালে প্রার্থী ও মাঠপর্যায়ের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা নির্ধারণ করেছে—কী করা যাবে, কী করা যাবে না, এবং কোন আচরণ নির্বাচনী পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।এই বিধিমালা কেবল আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়; এটি গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও জন-আস্থার ভিত্তি।এই লেখায় নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার আলোকে প্রার্থীদের করণীয় ও বর্জনীয় এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও সীমারেখা সহজ ও ব্যবহারযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন ও প্রচারণা—উভয় ক্ষেত্রেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা যায়।
মাঠপর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের জন্য আচরণবিধি
ক. নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব
- সকল কর্মকর্তা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন; কোনো প্রার্থী বা দলের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যাবে না|
- ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ বা ইঙ্গিত দেওয়া নিষিদ্ধ।
- দায়িত্ব পালনের সময় শালীন আচরণ, ভদ্র ভাষা ও আইনানুগ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করতে হবে|
খ. প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার
- ক্ষমতার অপব্যবহার, পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত বা অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ করা যাবে না।
- আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে কোনো প্রার্থী বা সমর্থকের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিষিদ্ধ।
- সব সিদ্ধান্ত লিখিত আইন ও বিধির আলোকে নিতে হবে।
গ.প্রচারণা তদারকি ও ব্যবস্থা
- আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
- পোস্টার অপসারণ, সভা বন্ধ বা জরিমানা আরোপের ক্ষেত্রে সমতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
- গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা বাধ্যতামূলক।
ঘ. ভোটগ্রহণের দিন দায়িত্ব
- ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ শান্ত, নিরাপদ ও ভয়মুক্ত রাখতে হবে।
- ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা কর্মকর্তাদের মূল দায়িত্ব।
- কোনো প্রার্থী, এজেন্ট বা বহিরাগত কর্তৃক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের জন্য আচরণবিধিমালা
১।মাঠপর্যায়ে সকল দায়িত্বে নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে।
২।প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে; খেয়াল রাখতে হবে কোনো সিদ্ধান্ত বা আচরণ যেন কোনো প্রার্থীর প্রতি বৈষম্যমূলক না হয়ে যায়।
৩। দল-মত নির্বিশেষে যেকোনো নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায়তাৎক্ষণিক বিধি মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৪।ভোটাররা যেন স্বাধীন, নিরাপদ ও অবাধে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে—এমন ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী আচরণবিধি
ক. প্রচারণা-সংক্রান্ত সাধারণ বিধি
- মনোনয়নপত্র দাখিলের পর থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত আচরণবিধি কার্যকর থাকবে।
- কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, সাম্প্রদায়িক বিভাজন বা ঘৃণামূলক ভাষা ব্যবহার নিষিদ্ধ।
- রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা সামাজিক সম্প্রীতি বিঘ্নিত হতে পারে, এমন বক্তব্য বা কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
খ. পোস্টার, ব্যানার ও প্রচারসামগ্রী
- নির্ধারিত আকার ও স্থানের বাইরে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে না।
- সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, সড়কের সিগন্যাল পোস্ট বা গাছের ওপর প্রচারসামগ্রী লাগানো নিষিদ্ধ।
- দেয়াল লিখন, গ্রাফিতি বা স্থায়ী চিহ্ন অঙ্কন করা যাবে না।
গ. মিছিল, সভা ও শোডাউন
- অনুমতি ছাড়া কোনো মিছিল, শোডাউন বা জনসমাবেশ করা যাবে না।
- আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র, লাঠি, বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- মোটরসাইকেল বা যানবাহনের বহর দিয়ে শক্তি প্রদর্শন নিষিদ্ধ।
ঘ. অর্থ ও সুবিধা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ
- ভোটারকে অর্থ, উপহার, খাবার, চাকরির প্রতিশ্রুতি বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়া নিষিদ্ধ।
- সরকারি অনুদান, প্রকল্প, ত্রাণ বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে না।
- নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করা যাবে না এবং ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
ঙ. ভোটের দিন-সংক্রান্ত বিধি
- ভোটকেন্দ্রের নির্ধারিত পরিসীমার মধ্যে প্রচারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ভোটারকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে অবস্থান, স্লোগান বা চিহ্ন প্রদর্শন করা যাবে না।
- ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়া বা প্রভাবিত করা গুরুতর অপরাধ।
