বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬
27 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রচ্ছদগণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পুলিশ সংস্কার :জন-আস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ও সংকট

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পুলিশ সংস্কার :জন-আস্থা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা ও সংকট

মোঃ তালহা
,

যেকোনো আন্দোলন-অভ্যুত্থানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়ে। একদিকে বিশৃঙ্খলা ও অপতৎপরতা প্রতিরোধে কঠোর পেশাদারি আচরণের দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে অগণিত তাজা প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার মানবিক তাড়না। পুলিশ রাষ্ট্রের কল্যাণে নিয়োজিত একটি বাহিনী। সুতরাং সরকারের নির্দেশে কখনো কখনো পুলিশকে কঠোর অবস্থানে যেতে হয়। এটিই রাষ্ট্রের প্রতি বাহিনীটির দায়বদ্ধতা, যা রক্ষা করতে গিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশকে তীব্র জনরোষ ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। এটি তিক্ত বাস্তবতা—কেবল বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেও।

বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, বিশেষ করে পুলিশের ভূমিকা ছিল সমালোচনার কেন্দ্রে। এই সময়ে সৃষ্ট অস্থিরতা দমনে এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ জনগণের মধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে থাকা ক্ষোভ ও অবিশ্বাসকে আরও তীব্র করেছে। জন্মলগ্ন থেকেই উপমহাদেশের পুলিশ বাহিনী জননিরাপত্তার রক্ষকের চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। ব্রিটিশ শাসকরা সরাসরি আইরিশ কনস্ট্যাবুলারি ব্যবস্থা অনুকরণ না করলেও ভারতে অনেকটা সেটির অনুরূপ একটি কাঠামো তৈরি করেছিল, যা ছিল আধা-সামরিক, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং জনগণ নয়, বরং সরকারের কাছে জবাবদিহিমূলক। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এই ব্যবস্থাকে আইনি কাঠামো দেয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসন রক্ষা ও বিদ্রোহ দমন।

এই কাঠামো জনসম্পৃক্ততার বদলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে পুলিশের ভেতরে গড়ে ওঠে কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি এবং সমাজের সঙ্গে এক গভীর দূরত্ব। এছাড়া বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের মতো গুরুতর অভিযোগও ক্রমাগতভাবে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে। মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিবর্তে পুলিশ প্রায়ই একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক এজেন্ডা রক্ষা করছে বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে।

গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সহিংস জনরোষে পড়ে পুলিশ সদস্যদের প্রাণহানির ঘটনা একদিকে যেমন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান গভীর দূরত্বের ইঙ্গিত বহন করে, তেমনি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি হিসেবে সামনে চলে আসে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই সহিংসতা ও আস্থাহীনতার একটি জটিল চক্রে আটকা পড়েন। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় তাদের অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যা পুলিশ সদস্যদের উচ্চ-চাপের পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করে এবং সামগ্রিকভাবে তাদের কর্মদক্ষতা ও মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতা ইঙ্গিত করে যে, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ নিরসন এখন অতীব জরুরি। কেবল অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও মানবিক পুনর্গঠনের মাধ্যমেই পুলিশ তাদের পেশাদারিত্ব, মর্যাদা ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

আস্থা ও বিশ্বাস: পুলিশিংয়ে ভূমিকা ও সম্পর্ক
পুলিশি সহিংসতার প্রভাব কখনোই সাময়িক সীমায় আটকে থাকে না। বরং এটি জনগণের মনস্তত্ত্বে গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষত সৃষ্টি করে। জ্যাকসন ও ব্র্যাডফোর্ড (২০১০) দেখিয়েছেন, ‘আস্থা’ ও ‘বিশ্বাস’ একই ধারণা নয়। বিশ্বাস হলো প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশের প্রতি জনগণের সাধারণ সমর্থন। আর আস্থা গড়ে ওঠে পুলিশের নৈতিকতা, ন্যায়বোধ ও নাগরিকদের সঙ্গে তাদের আচরণের মানের ওপর ভিত্তি করে।

সমাজবিজ্ঞানী কাও (২০১৫) এটিকে বর্ণনা করেছেন জনমতের একটি সামগ্রিক মাপকাঠি হিসেবে, যা শুধু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নয়, বরং পুরো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। অন্যদিকে আলব্রেখট (২০১৯) বলেছেন যে, আস্থা নির্ভর করে পুলিশের সততা ও নৈতিক মানদণ্ড রক্ষার ওপর। যখন জনগণ নিশ্চিত হয় যে, পুলিশ তাদের সঙ্গে প্রক্রিয়াগত ন্যায়বিচার বজায় রাখবে এবং অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তখনই এই আস্থা গড়ে ওঠে।

কিন্তু একবার যদি পুলিশি সহিংসতা ঘটে বা জনগণ মনে করে যে আইন প্রয়োগে বৈষম্য হচ্ছে, তখনই আস্থার শৃঙ্খল ভেঙে যায়। ফলে নাগরিকরা আর পুলিশের প্রতি আগের মতো সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখায় না। অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশকে জানানো থেকে শুরু করে তদন্তে সহায়তাও কমে যায়, ফলে গোটা আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ডেরেক চৌভিনের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও মিনিয়াপলিসের নাগরিকরা আগের মতো অপরাধ রিপোর্টিংয়ে ফিরে আসেনি, যা স্কোগানের (২০০৯) পর্যবেক্ষণকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে, ভঙ্গুর আস্থা পুনর্গঠন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটেও এই পর্যবেক্ষণের বাস্তব প্রতিফলন স্পষ্ট। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ছয় মাসে পুলিশ সদস্যদের ওপর ২২৫টিরও বেশি সংগঠিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা পুলিশের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যেও পুলিশের প্রতি আস্থা গভীরভাবে নষ্ট হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা বাহিনী নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আর সাধারণ নাগরিকের মধ্যেও আইন মানার অনুপ্রেরণা ও কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমগুলো প্রধানত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও সক্ষমতা উন্নয়নে কেন্দ্রীভূত। সামাজিক ও মানসিক দিক থেকে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

পামেলা হ্যানওয়ে ও অলিভিয়া হ্যাম্বলি (২০২৩) যথার্থই বলেছেন, জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো পুলিশ সংস্কারই টেকসই নয়। কারণ জনগণের বিশ্বাসই একটি দক্ষ, বৈধ ও মানবিক পুলিশ ব্যবস্থার ভিত্তি।

সুতরাং এখন পুলিশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ক্ষমতার বাহিনী’ থেকে ‘জনসেবক বাহিনী’ হিসেবে রূপান্তর। যখন জনগণ দেখবে যে পুলিশ তাদের সঙ্গে ন্যায়, শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার সঙ্গে আচরণ করছে, তখনই তারা পুলিশের সহযোগী হিসেবে ফিরে আসবে। সেই পুনর্গঠিত আস্থাই হবে কার্যকর ও মানবিক পুলিশিংয়ের আসল ভিত্তি।

আস্থা পুনর্গঠনে বৈশ্বিক মডেলসমূহ

বাংলাদেশের এই প্রেক্ষাপটকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের তাকাতে হবে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার দিকে, যেখানে বিভিন্ন দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, পালাবদল, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের পর সফলভাবে আস্থা পুনর্গঠনের পথ খুঁজে পেয়েছে।

জবাবদিহিতা ও কাঠামোগত পরিবর্তন উত্তর আয়ারল্যান্ড মডেল: উত্তর আয়ারল্যান্ডের পুলিশ সংস্কার একটি সফল মডেল, যা গভীর জাতিগত ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ দেখিয়েছে। গুড ফ্রাইডে চুক্তি (GFA) ১৯৯৮ সালের এপ্রিলে স্বাক্ষরিত হয়।স্বাক্ষরিত হয়, যা দেশটিতে কয়েক দশক ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটায়। এই চুক্তির কেন্দ্রে ছিল পুলিশি সংস্কার। কারণ পূর্ববর্তী রয়্যাল আলস্টার কনস্ট্যাবুলারি (RUC) বহু বছর ধরে ক্যাথলিক জাতীয়তাবাদী সম্প্রদায়ের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট ও অবিশ্বস্ত হিসেবে বিবেচিত ছিল।

গুড ফ্রাইডে চুক্তির ভিত্তিতে প্যাটন কমিশন (Independent Commission on Policing in Northern Ireland) গঠন করা হয়, যা ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে ১৭৫টি সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্যাটন কমিশনের মূলনীতিগুলোতে ছিল—
প্রস্তাবিত ব্যবস্থা কি দক্ষ ও কার্যকর পুলিশিংয়ের কথা বলে? এটি কি দলীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হয়ে ন্যায্য ও নিরপেক্ষ পুলিশিং সেবা নিশ্চিত করবে? এটি কি আইন ও সমাজের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে? এটি কি সমাজের প্রতিনিধিত্বমূলক হবে? এবং এটি কি সবার মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করবে?

এই সংস্কারের মাধ্যমে রয়্যাল আলস্টার কনস্ট্যাবুলারি (RUC) থেকে পুলিশ সার্ভিস অব নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড (PSNI)-এ রূপান্তর ঘটে। এই রূপান্তরের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল—

নাম ও প্রতীক পরিবর্তন: বাহিনীর নাম পরিবর্তন করা হয় এবং রাজকীয় প্রতীক (Royal symbolism) অপসারণ করা হয়। এই রাজকীয় প্রতীক ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রায়ই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হতো।

স্বাধীন জবাবদিহিতা: পুলিশকে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা বা ‘ব্লু কোড অব সাইলেন্স’ দ্বারা সুরক্ষিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে একজন স্বাধীন ওমবাডসম্যান নিয়োগ (Ombudsman) এবং অভিযোগ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

মানবাধিকারের অঙ্গীকার: মানবাধিকারের ওপর জোর দিয়ে একটি নতুন অঙ্গীকার (Pledge) গ্রহণ করা হয়।

বেসামরিকীকরণ: সামরিক ধাঁচের সব দায়িত্ব ও কর্তব্য সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রম ও কাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক চরিত্রে পুনর্গঠিত করা হয়। ফলে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ও দায়িত্বের মধ্যে একটি স্পষ্ট ও কার্যকর বিভাজন নিশ্চিত হয়।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের এই মডেল থেকে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য সংস্কারমূলক শিক্ষা হতে পারে যে, কেবল আইন পরিবর্তন বা প্রশিক্ষণের উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। যদি পুলিশ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামোগত নিরপেক্ষতা, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা এবং পুলিশ বাহিনীর প্রতীক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিচয়ের পরিবর্তন আবশ্যক।

ইথিওপিয়ায় পুলিশ-জনগণ আস্থা গঠনের মডেল—সংঘাত থেকে সহযোগিতার পথে

একটি সমাজ কল্পনা করুন, যেখানে নাগরিকরা নিজেরাই পুলিশের সঙ্গে মিলে তাদের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। অথচ সেই সমাজেই দীর্ঘদিন ধরে চলেছে সহিংসতা, জাতিগত সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। এমনই প্রেক্ষাপটে ইথিওপিয়ায় যাত্রা করে নতুন ‘জনগণের আস্থাভিত্তিক পুলিশিং’ ব্যবস্থা।

২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার পর ইথিওপিয়া ব্যাপক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথে হাঁটে।

রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথে হাঁটে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে দেশটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ঐক্য হারাচ্ছিল, অন্যদিকে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ছিল। সরকার বুঝতে পারে, শুধু বাহিনীকে আধুনিক করে তোলা যথেষ্ট নয়; বরং প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য দরকার জনগণের বিশ্বাস ও অংশগ্রহণ।

২০২০ সালের শেষ দিকে দেশটির মিনিস্ট্রি অব পিস একটি নতুন পুলিশ নীতিমালা ঘোষণা করে, যেখানে পুলিশের ওপর জনগণের তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে ইন্টারপিস ও ইথিওপিয়া পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং অ্যাক্টিভিটিজ’ বা আস্থা নির্মাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সংলাপ ও যৌথ উদ্যোগের একটি স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তোলা।

প্রথম ধাপে ২০২১ সালে চারটি জেলায় মোট ১ হাজার ৭৮৬ জন নাগরিকের অংশগ্রহণে একটি বেসলাইন সার্ভে পরিচালিত হয়। জরিপের ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, পুলিশের প্রতি জনআস্থার ঘাটতিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে পুলিশের প্রতি সন্দেহ, নারী ও প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তায় পুলিশের উদ্যোগের ঘাটতি এবং কমিউনিটি নিরাপত্তা উদ্যোগে 

রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পথে হাঁটে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে দেশটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ঐক্য হারাচ্ছিল, অন্যদিকে পুলিশের ওপর জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ছিল। সরকার বুঝতে পারে, শুধু বাহিনীকে আধুনিক করে তোলা যথেষ্ট নয়; বরং প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য দরকার জনগণের বিশ্বাস ও অংশগ্রহণ।

২০২০ সালের শেষ দিকে দেশটির মিনিস্ট্রি অব পিস একটি নতুন পুলিশ নীতিমালা ঘোষণা করে, যেখানে পুলিশের ওপর জনগণের তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে ইন্টারপিস ও ইথিওপিয়া পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে কাজ শুরু করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ‘ট্রাস্ট বিল্ডিং অ্যাক্টিভিটিজ’ বা আস্থা নির্মাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সংলাপ ও যৌথ উদ্যোগের একটি স্থায়ী ভিত্তি গড়ে তোলা।

প্রথম ধাপে ২০২১ সালে চারটি জেলায় মোট ১ হাজার ৭৮৬ জন নাগরিকের অংশগ্রহণে একটি বেসলাইন সার্ভে পরিচালিত হয়। জরিপের ফলাফলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, পুলিশের প্রতি জনআস্থার ঘাটতিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে পুলিশের প্রতি সন্দেহ, নারী ও প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তায় পুলিশের উদ্যোগের ঘাটতি এবং কমিউনিটি নিরাপত্তা উদ্যোগে 

পুলিশের সীমিত সম্পৃক্ততা—এগুলোই জনগণের আস্থা কমে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে।

এই সংকট নিরসনে প্রকল্পটি পাঁচটি ধাপে আস্থা গঠনের প্রক্রিয়া চালু করে—

সমস্যা শনাক্তকরণ: পুলিশ ও জনগণ একত্রে বসে স্থানীয় নিরাপত্তা সমস্যা নির্ধারণ করে।

অগ্রাধিকার নির্ধারণ: জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বেছে নেওয়া হয়।

প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের মানচিত্র তৈরি: জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম (GIS) সফটওয়্যার ব্যবহার করে অপরাধ বা নিরাপত্তার ঘাটতিযুক্ত এলাকার মানচিত্র তৈরি করা হয়। এতে সমস্যা ভৌগোলিকভাবে দৃশ্যমান হয় এবং সবাই তথ্যভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে পারে।

যৌথ বিশ্লেষণ ও সমাধান পরিকল্পনা: পুলিশ ও জনগণ একত্রে কারণ বিশ্লেষণ করে প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা তৈরি করে।

ফলোআপ ও আস্থা মূল্যায়ন: প্রতিটি উদ্যোগের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং জনগণের মতামত অনুযায়ী পুলিশিং কৌশল সমন্বয় করা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় জনগণ বুঝতে শেখে যে, পুলিশ কেবল আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং তাদের নিরাপত্তার অংশীদার। অন্যদিকে পুলিশও উপলব্ধি করে, জনগণের অভ্যন্তরীণ জ্ঞান—যেমন অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতি, মানসিকতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট—সমস্যা সমাধানে অমূল্য সম্পদ।

ইথিওপিয়ার এই মডেল প্রমাণ করেছে, প্রতিরোধমূলক ও অংশগ্রহণমূলক পুলিশিংই হলো ভবিষ্যতের পথ। এটি দেখিয়েছে, জনআস্থা, সংলাপ ও প্রযুক্তি যদি একযোগে কাজ করে, তবে সহিংস সমাজও ধীরে ধীরে সহযোগিতা ও বিশ্বাসের সমাজে পরিণত হতে পারে।

সংঘাত-পরবর্তী দুর্বলতা—শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা

শ্রীলংকার আরগালায়া গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও রাজাপাকসে পরিবারের দুর্নীতি ও স্বৈরাচারের প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়, যা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।

আরগালায়া জনগণের সুশাসন ও অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার দাবিকে সামনে আনে। বিক্ষোভ চলাকালীন শ্রীলংকা পুলিশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড লঙ্ঘন করে বেআইনি বলপ্রয়োগ করে এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়।

শ্রীলংকার দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে নাগরিক ও পুলিশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিশেষ করে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে। যদিও সংঘাত-পরবর্তী স্থিতিশীলতার জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক পুলিশিং জরুরি বলে স্বীকৃত, তবুও অনেক পুলিশ কর্মকর্তা এখনো কমিউনিটির মানুষকে সেবাগ্রাহক হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখেন। একই সঙ্গে পুলিশের সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে আচরণগত ইতিবাচক মনোভাব ও সৃজনশীল দক্ষতার অভাব এই আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ভাষাগত সংবেদনশীলতাও একটি চ্যালেঞ্জ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, তামিল ভাষা প্রশিক্ষণের অভাব পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।

শ্রীলংকার এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে, কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুলিশ বাহিনীর সংস্কৃতি বা কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে না। যদি অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ কাঠামোগত জবাবদিহিতা—বিশেষত হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনার তদন্ত—নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে জননিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত আগের বেহাল দশায়, এমনকি তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় ফিরে যেতে পারে এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হয় না।

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট: বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং সংস্কারের আবশ্যকতা

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ট্রানজিশনাল সময়ে বাংলাদেশ পুলিশের ওপর যে তীব্র সামাজিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। ছয় মাসে পুলিশের ওপর ২২৫টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশ সদস্যদের শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়েছে, তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।

সামাজিক অস্থিরতা ও জন-অবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা থানা আক্রমণ করে অভিযুক্তদের মুক্ত করেছে, যা আইনের শাসনের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে পুলিশ সদস্যরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা অথবা জনতার হামলার ভয়ে ভুগছেন, যার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ ফাটল আরও প্রকট হয়েছে।

যখন পুলিশ সদস্যরা নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন কার্যকরভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।অপরাধ দমন করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, কেবল জানুয়ারি মাসেই ঢাকায় ২৯৪টি খুন, ১ হাজার ৪৪০টি নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ১০৫টি অপহরণের ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছিল।

রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তবে এই সক্ষমতা বৃদ্ধির অর্থ যদি জবাবদিহিহীনভাবে ক্ষমতা বাড়ানো বা কমানো হয়, তবে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে এবং জনগণের আস্থা আরও হ্রাস পাবে। অতএব সমাধানের জন্য কার্যকর পুলিশিংয়ের পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য।

পূর্ববর্তী সংস্কার কর্মসূচির শিক্ষা: রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও কাঠামোগত দুর্বলতা

বাংলাদেশ পুলিশে টেকসই সংস্কার আনার প্রচেষ্টা নতুন নয়। ২০০৬-২০১৬ সালের পুলিশ সংস্কার কর্মসূচি (PRP) প্রশিক্ষণ ও পেশাদারিত্বের কিছু উন্নতি সাধন করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক তদন্ত পদ্ধতি গ্রহণ ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে মূল কাঠামোগত ও সাংগঠনিক দুর্বলতা—বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাব—এবং উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কাঠামোগত স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণের অভাবে এটি কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।

জনগণের আস্থার সংকটের যে সমস্যা, সেটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক গভীর। ২০১৭ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স প্রোগ্রামের এক জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ জনগণের মধ্যে পুলিশের প্রতি আস্থা মাত্র ৫২ শতাংশ। বিপরীতে অন্যান্য বাহিনী—অর্থাৎ আনসার/ভিডিপির প্রতি আস্থা ছিল ৭৪ শতাংশ, সামরিক বাহিনীর প্রতি ৯৫ শতাংশ এবং র‌্যাবের প্রতি ৯৮ শতাংশ।

এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পুলিশ-সংক্রান্ত দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সার্বক্ষণিক নির্ভরযোগ্য সেবা প্রদানের কাঠামোগত ঘাটতি।

কেন পুরোনো সংস্কার টেকেনি? এখন কীভাবে টিকবে?

বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাগুলো, বিশেষ করে ২০০৬-২০১৬ সালের PRP, আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। আর তা হলো—প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন থাকলেও জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো সংস্কারই স্থায়ী হয় না। PRP চলাকালে পরিচালিত জরিপগুলো দেখিয়েছিল যে, প্রায় ৪৫ শতাংশ নাগরিক পুলিশের প্রতি ‘কিছুটা আস্থা’ প্রকাশ করেছিলেন, যা প্রমাণ করে আস্থার ঘাটতি ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেও উল্লেখ ছিল, বাংলাদেশে পুলিশকে অনেক নাগরিক ভয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ঘুষ, রাজনৈতিক প্রভাব ও পক্ষপাতমূলক আচরণ পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। যদিও PRP কিছুটা এই অবস্থার পরিবর্তন আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল—যেমন আধুনিক তদন্ত প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ের অন্তর্ভুক্তি—তবু উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কাঠামোগত স্বচ্ছতা ও জনগণের অংশগ্রহণের অভাবে তা গভীরে পৌঁছায়নি।

পরবর্তীতে পুলিশের তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ২০১৫ সালে চালু হওয়া দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্যদানের ব্যবস্থাও একই কারণে কার্যকর হতে পারেনি। অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা এসব উদ্যোগকে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ করে রেখেছিল।

অন্যদিকে শ্রীলংকার ‘আরগালায়া’ আন্দোলনের পরও দেখা গেছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও যখন পুলিশি সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতা ও মানবাধিকার রক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তখন জনগণের আস্থাও ফিরে আসেনি।

এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি স্পষ্ট সত্য তুলে ধরে—সংস্কার কোনো প্রকল্প নয়; বরং মানসিকতা, আচরণ ও দায়বদ্ধতার রূপান্তর। তাই নতুন প্রজন্মের পুলিশ সংস্কারের সূচনা হতে হবে একটি বেসলাইন ট্রাস্ট সার্ভে দিয়ে, যা জনগণের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ, শ্রেণি ও অঞ্চলের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে আস্থার বাস্তব মানচিত্র তৈরি করবে।

এই সার্ভের ফলাফল থেকেই গড়ে উঠবে আস্থা পুনর্গঠন কর্মসূচি, যার মূল লক্ষ্য হবে জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি মানবিক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। অতীতের ব্যর্থতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যখন সংস্কার পরিকল্পনার কেন্দ্রে জনগণের আস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা হয় না, তখন তা অবশেষে প্রশাসনিক রুটিন হিসেবেই হারিয়ে যায়। অথচ আস্থা থেকেই শুরু হয় প্রকৃত পরিবর্তন, যা সমাজে নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাসের নতুন ভিত্তি গড়ে তোলে।

বাংলাদেশ পুলিশের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ ও সুপারিশমালা

বাংলাদেশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক সফল মডেল (যেমন উত্তর আয়ারল্যান্ডের PSNI) থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা বিবেচনা করে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলোকে আস্থা পুনর্গঠন ও সামাজিক সংহতি জোরদারের জন্য অপরিহার্য বিবেচনা করা যায়—

বাংলাদেশ পুলিশ-জনগণ আস্থা পুনর্গঠন কর্মসূচি

বাংলাদেশে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন আর কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতি ও ন্যায়বিচারের টেকসই ভিত্তি। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, আইন-শৃঙ্খলার যে শূন্যতা তৈরি হয়, তার মূল কারণ কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, বরং জনগণ ও পুলিশের মধ্যকার পারস্পরিক বিশ্বাসের ঘাটতি।

প্রথম ধাপ: পুলিশের প্রতি জন-আস্থা বিষয়ক বেসলাইন সার্ভে
এই ধাপের মূল উদ্দেশ্য হবে একটি সামগ্রিক ‘Trust Landscape of Bangladesh Police’ তৈরি করা, যা ভবিষ্যতের সব নীতি, সংস্কার ও কমিউনিটি প্রোগ্রামের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এই জরিপের মাধ্যমে বোঝা যাবে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থার বর্তমান মাত্রা, আস্থা কমে যাওয়ার কারণ এবং এটি ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে—সেসব বিষয়।

জরিপটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে একটি সমন্বিত স্বাধীন গবেষণা দলকে, যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং তরুণদের প্রতিনিধি। সার্বিকভাবে এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ও পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় সম্পন্ন হবে।

জরিপটি তিনটি স্তরে পরিচালিত হবে—
প্রথমত, সিটিজেন পার্টিসিপেশন সার্ভে, যেখানে সাধারণ জনগণ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও গ্রামীণ নাগরিকদের মতামত নেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, ইন্টারনাল পুলিশ সার্ভে, যেখানে থানাভিত্তিক সদস্যদের আস্থা, মনোবল, চাপ ও জনসম্পৃক্ততার মাত্রা মূল্যায়ন করা হবে।
তৃতীয় স্তরটি হবে মিডিয়া ও কেস রিভিউ, যেখানে সংবাদ প্রতিবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নথিভুক্ত অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জনমতের প্রবণতা নির্ধারণ করা হবে।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশা, বার্ষিক আয়, অঞ্চল এবং ধর্মীয় বা জাতিগত পটভূমি অনুযায়ী বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর লক্ষ্য হলো কোন শ্রেণি বা অঞ্চলে পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস বেশি, তার কারণ ও প্রভাব নির্ণয় করা। উদাহরণস্বরূপ, তরুণদের মধ্যে পুলিশের প্রতি ভয় বা অবিশ্বাসের কারণ কি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ? নারীরা কেন থানায় অভিযোগ করতে দ্বিধা বোধ করেন? অথবা গ্রামীণ ও শহুরে জনগণের আস্থা কি ভিন্ন প্রকৃতির?

এই ডেমোগ্রাফিক ইনসাইটগুলোই ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি প্রোগ্রাম ও নীতি পরিকল্পনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, যা পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের একটি বাস্তবভিত্তিক পথ দেবে।

দ্বিতীয় ধাপ: ইথিওপিয়ান মডেল অনুসরণে ডেটাভিত্তিক আস্থা পুনর্গঠন
অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ তথ্যনির্ভর হতে হবে, যেখানে জনগণের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশাই হবে নীতি নির্ধারণের ভিত্তি। এই ধাপের সব কার্যক্রম বেসলাইন সার্ভের ফলাফলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে—অর্থাৎ জনগণের প্রকৃত অভিযোগ, প্রত্যাশা ও আস্থা-সংকট যেভাবে চিহ্নিত হবে, বাস্তবায়ন পদ্ধতিও সেভাবেই গড়ে উঠবে।

যেমন, যদি তরুণদের মধ্যে পুলিশ-ভীতির হার বেশি দেখা যায়, তাহলে যুব কমিউনিটি এনগেজমেন্ট প্রোগ্রাম অগ্রাধিকার পাবে। যদি নারীদের অভিযোগ করার প্রবণতা কম হয়, তাহলে নারী-সহায়তা ডেস্ক ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ জোরদার করা হবে।

বাস্তবায়ন ধাপসমূহ:

সমস্যা শনাক্তকরণ: জরিপে চিহ্নিত স্থানীয় নিরাপত্তা ও আস্থার ঘাটতি পুলিশ ও নাগরিক মিলে যাচাই করবে।

অগ্রাধিকার নির্ধারণ: নাগরিক মতামত ও ডেটা-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো বেছে নেওয়া হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার: GIS ম্যাপিং, ৯৯৯ কল অ্যানালিটিকস এবং অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্মে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।

যৌথ সমাধান পরিকল্পনা: জনগণ ও পুলিশ যৌথভাবে কারণ বিশ্লেষণ ও সমাধান পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে।ফলো-আপ ও মূল্যায়ন:
প্রতিটি উদ্যোগের প্রভাব নাগরিক ফিডব্যাক ও ডেটা রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে মূল্যায়িত হবে।

প্রাতিষ্ঠানিক সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ:
আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রথম স্তম্ভ হলো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। পুলিশের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, দুর্নীতি বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া অবশ্যই পুলিশের প্রভাবমুক্ত হতে হবে।

স্বাধীন পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা:
সম্প্রতি পুলিশ সংস্কার কমিশন পুলিশি তদন্তে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন তদন্ত পরিষেবা এবং অভ্যন্তরীণ অভিযোগ পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে দীর্ঘ আলোচনাপর্যালোচনার মধ্য দিয়ে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনেও ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

তবে কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য এই কমিশনকে অবশ্যই সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হতে হবে। এর সদস্যদের মধ্যে যেমন পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা থাকবেন, তেমনি সরকারি ও বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতারাও থাকবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধি, যেমন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য প্রতিনিধিও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

এই সদস্যদের মনোনয়ন প্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছ এবং কমিশন কার্যত তাদের কর্মপরিকল্পনা ও কার্যক্রমে স্বাধীনতা বজায় রাখবে। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে বা কার্যক্রমে জবাবদিহিতা, পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগের মতো বিষয়ে এই কমিশনের সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও মনিটরিংয়ের এখতিয়ার থাকবে।

এমন একটি কাঠামো তৈরি করা গেলে তা ‘ব্লু কোড অব সাইলেন্স’ ভাঙতে এবং পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে উত্তর আয়ারল্যান্ড মডেলের মতো কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

অভ্যন্তরীণ তদারকি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি:
দুর্নীতি ও অসদাচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা শ্রমবাজারের প্রেক্ষিতে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন ও সমন্বয় করা জরুরি। কারণ কম বেতন ও সীমিত সুবিধা প্রায়ই পুলিশ সদস্যদের দুর্নীতি বা আর্থিক প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে সততা, পেশাদারিত্ব ও অপরাধ দমনে উদ্ভাবনী সফলতাকে স্বীকৃতি দেওয়া ও পুরস্কৃত করা প্রয়োজন। পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো মেধা ও কর্মদক্ষতাভিত্তিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হবে। এক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, ঘুষ বা দুর্নীতি সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করতে হবে। এসব অপরাধে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার:
উচ্চ অপরাধপ্রবণ এলাকায় দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পোশাক ও যানবাহনে বডি ক্যামেরা ও ড্যাশ ক্যামেরার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া কর্মকর্তা ও বিভাগগুলোর শৃঙ্খলাভঙ্গের রেকর্ড ট্র্যাক করার জন্য একটি জাতীয় ডেটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে।

কমিউনিটি-ভিত্তিক পুলিশিং:
কমিউনিটি ও বিট পুলিশিং জনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। এতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং তাদের মধ্যে সচেতনতা, অংশীদারিত্ব ও দায়বদ্ধতার অনুভূতি তৈরি হয়। এটি পুলিশ ও সমাজের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা গড়ে তোলে, যা সক্রিয়ভাবে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

  • কমিউনিটি পুলিশিং জোরদারকরণ:
    পুলিশকে অবশ্যই কমিউনিটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান যেমন ইউনিয়ন পরিষদ, ওয়ার্ড কমিশনার ও কমিউনিটি ভিত্তিক এনজিওগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে এলাকার জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও বর্তমানে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালু রয়েছে, এটিকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূভাবে জোরদার করা প্রয়োজন। 
  • আস্থা নির্মাণ কার্যক্রম:
    পুলিশের উচিত এমন কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করা, যাদের জনগণের মধ্যে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। তাদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করলে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ও আস্থার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে। 
  • তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্তকরণ:
    যেভাবে তরুণরা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছে, তেমনি পুলিশের ঝুঁকিমুক্ত কার্যক্রমগুলোতেও স্থানীয় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি কমিউনিটি লিডার, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করাও জরুরি। এতে কার্যক্রমে যেমন গতি ও প্রাণ আসবে, তেমনি জনগণের অংশীদারিত্ব ও আস্থাও বৃদ্ধি পাবে। 

আস্থা পুনর্গঠনে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততার কৌশল:
পুলিশ-জনগণ সম্পর্কের মূলে রয়েছে যোগাযোগ ও দৃশ্যমান উপস্থিতি। আস্থা পুনর্গঠনের জন্য পুলিশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা, যেখানে তথ্য, আচরণ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া একসাথে কাজ করবে।

প্রথমেই দরকার মিডিয়া ট্রেনিং, যাতে করে পুলিশ সদস্যরা সাংবাদিক ও জনগণের সঙ্গে পেশাদারভাবে যোগাযোগ করতে শিখতে পারেন। ভুল তথ্য প্রদান বা অপ্রয়োজনীয় গোপনীয়তা প্রায়ই জন-আস্থার ক্ষতি করে এবং সন্দেহের জন্ম দেয়। বিপরীতে স্বচ্ছতা, সঠিক ও দ্রুত তথ্যপ্রবাহ জনগণের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে।

এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে একটি সুস্পষ্ট কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজি, যেখানে সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সব বার্তা হবে তথ্যনির্ভর, স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী।

একই সঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি থাকতে হবে। এটি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার একটি কার্যকর মাধ্যম। এই উপস্থিতি হতে হবে পরিমিত ও দায়িত্বশীল, যেখানে প্রতিটি বক্তব্য হবে তথ্যভিত্তিক, সুবিবেচিত, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

একজন ডিআইজি বা এসপি যদি কোনো সফল উদ্ধার অভিযান, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উদাহরণ ও কমিউনিটি সংযোগ:
উদাহরণ কিংবা কোনো ভালো কাজ করা কনস্টেবলের গল্প নিজে তুলে ধরলে তা জনগণের কাছে পুলিশের এক মানবিক ও ইতিবাচক রূপ প্রকাশ করবে এবং একই সঙ্গে সেই পুলিশ সদস্যদেরও ভালো কাজের জন্য অনুপ্রাণিত করবে।

একই সঙ্গে সাপ্তাহিক কমিউনিটি ভিজিট আস্থার সেতু তৈরি করতে পারে। থানার কর্মকর্তারা স্কুল, বাজার বা স্থানীয় সংগঠনে গিয়ে মানুষের কথা শুনবেন, তাদের সমস্যা জানবেন এবং পুলিশের মানবিক দিকটি তুলে ধরবেন। এতে জনগণ বুঝতে পারবে, পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং তাদের পাশে থাকা একজন সেবাদাতা।

উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো থানার ওসি প্রতি বৃহস্পতিবার স্থানীয় বিদ্যালয়ে যান এবং কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ নিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলেন, পরে সেই আলোচনার খবর স্থানীয় পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়, তাহলে তা পুলিশের সম্পর্কে একটি ইতিবাচক ধারণা গড়ে তোলে। মানুষ দেখতে পায়, পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়, একই সঙ্গে সমাজের সঙ্গী, পরামর্শদাতা ও রক্ষকও।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নিরপেক্ষতা:
পুলিশ বাহিনীতে অবশ্যই পেশাদারিত্ব, সততা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন তারা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, লিঙ্গ, জাতি বা সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে সকল মানুষকে সেবা দিতে পারে।

  • নিরপেক্ষ নিয়োগ: নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাহিনীতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হবে এবং জনগণের মধ্যে পুলিশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। 
  • বিশেষ প্রশিক্ষণ: ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং বিক্ষোভ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা আবশ্যক। এটি নিশ্চিত করবে যে, বাংলাদেশ পুলিশ বৈশ্বিক মানদণ্ডে পুলিশি সেবা প্রদান করতে সক্ষম হয়েছে। 
  • নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষা: পুলিশকে অবশ্যই মানবাধিকার রক্ষক হিসেবে নিজেদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, বিশেষ করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য পুলিশকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে, যেন তারা পুলিশের প্রতি আস্থা ফিরে পায় এবং পুলিশ সুরক্ষার পাশাপাশি সমাজের অন্যান্যদের সঙ্গে একত্রে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। 

দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য সহায়ক পদক্ষেপ:
যেকোনো আস্থা পুনর্গঠন কর্মসূচি টেকসই করতে হলে সেটিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ন্যায়বিচার ও আইনগত সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ন্যায়সঙ্গত সমাধান যেমন পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ, সত্য উদঘাটন এবং ‘আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে না’-এমন নিশ্চয়তা ট্রানজিশনাল জাস্টিস কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে ঔপনিবেশিক যুগের পুরনো পুলিশ আইন ১৮৬১-এর পরিবর্তে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও জনগণকেন্দ্রিক আইনি কাঠামো গঠন করতে হবে, যা পুলিশের জবাবদিহিতা, মানবাধিকার রক্ষা এবং জনসম্পৃক্ততার নীতিকে সংরক্ষণ করবে। কেবল তখনই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন হবে স্থায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অর্থবহ।

উপসংহার:
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর জন্য আস্থা পুনর্গঠন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামাজিক সংহতি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি পুনর্গঠনের অপরিহার্য শর্ত। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও জনসম্পৃক্ততার ঘাটতি পুলিশের প্রতি জনগণের বিশ্বাসকে কমিয়ে দিয়েছে।

টেকসই সংস্কার শুরু করতে হবে জনগণের আস্থা থেকেই। এজন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন বেসলাইন ট্রাস্ট সার্ভে, যা বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে আস্থার মানচিত্র তৈরি করবে। সেই তথ্যের ওপর নির্ভর করে গঠন করতে হবে অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ আস্থা-পুনর্গঠন কর্মসূচি।

পাশাপাশি দরকার স্বাধীন অভিযোগ ও তদন্ত কমিশন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের বিস্তার, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং যোগাযোগ-কেন্দ্রিক আস্থা-নির্মাণ কৌশল।

সবশেষে, পুলিশের প্রকৃত রূপান্তর তখনই সম্ভব হবে, যখন এই বাহিনী ‘ক্ষমতার প্রতীক’ থেকে ‘জনসেবার অংশীদার’ হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করবে। এই রূপান্তর শুধু পুলিশকেই নয়, বরং গোটা সমাজকেও নিরাপত্তা, ন্যায় ও বিশ্বাসের নতুন ভিত্তির দিকে এগিয়ে নেবে।

লেখক:
এমফিল গবেষক,
ইউনিভার্সিটি অব বার্গেন, নরওয়ে

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ