সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২৬
25 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রচ্ছদকৈশোরে অপরাধের কলঙ্ক নয়: চাই সংশোধনের সুযোগ

কৈশোরে অপরাধের কলঙ্ক নয়: চাই সংশোধনের সুযোগ

মুহাম্মাদ তানবীরুল ইসলাম
,

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস। ঢাকার উত্তরা। আদনান, সদ্য জেএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়ে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি, উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছুই ছিল সামনে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেল এক নির্মম ঘটনার মধ্য দিয়ে।

প্রতিদিনের মতোই বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে তার এক সহপাঠীর সঙ্গে সামান্য ঝগড়া হয়। ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। প্রতিপক্ষ কিশোরটি স্থানীয় একটি গ্যাং—‘ডিসকো গ্রুপ’-এর সদস্য। পরে সে তার দলবল নিয়ে আদনানের ওপর হামলা চালায়।

বেপরোয়া আঘাতে আদনানের মাথা ফেটে যায়, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি তার দুই হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়। এভাবেই নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারায় আদনান কবির।

এই মর্মান্তিক ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। সমাজবিজ্ঞানী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করেন—এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কিশোর অপরাধের এক গভীর ও ভয়াবহ সংকটের প্রতিফলন। বর্তমানে কিশোর গ্যাংগুলো চুরি, ছিনতাই বা মাদক সেবনের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই; তারা খুন, চাঁদাবাজি এবং নানা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এই কারণে কিশোর অপরাধ এখন সমাজের এক গভীর ক্ষত, যা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও নৈতিকতার জন্য বড় হুমকি। এই কিশোররা যদি সংশোধিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা বড় অপরাধীতে পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে, সময়মতো সঠিক সংশোধনের মাধ্যমে এই কিশোর-কিশোরীরাই একদিন দেশের সম্পদে পরিণত হতে পারে।

কিশোর অপরাধের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

কিশোর অপরাধকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সাধারণ ও প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কিশোর অপরাধ বলতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের দ্বারা সংঘটিত সেইসব কার্যকলাপকে বোঝানো হয়, যা প্রচলিত আইন, সামাজিক রীতিনীতি বা মূল্যবোধের পরিপন্থী। অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রা স্থান বা সমাজভেদে ভিন্ন হতে পারে। যেমন—চুরি, জুয়া খেলা, স্কুল পালানো, মেয়েদের উত্যক্ত করা, মাদক সেবন থেকে শুরু করে মাদক চোরাচালান, এসিড নিক্ষেপ ও খুন পর্যন্ত কিশোর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর অপরাধীর বয়সসীমা নির্ধারণে ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং কিছু মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের সংজ্ঞা ও ধরন বিভিন্ন আইনে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী, নয় বছরের কম বয়সী শিশুদের কোনো অপরাধমূলক কাজ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না। একই আইনের ধারা ৮৩ অনুসারে, ১২ বছর বয়সী কোনো শিশু যদি তার কাজের প্রকৃতি ও ফলাফল বোঝার মতো যথেষ্ট পরিণত না হয়, তবে তাকেও অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হয় না।

অন্যদিকে, শিশু আইন, ১৯৭৪–এ কিশোর অপরাধীর বয়সসীমা ছিল ১৬ বছর পর্যন্ত। এই আইনে ‘যুবক অপরাধী’ এবং ‘কিশোর আদালত’ শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো। তবে পরবর্তীকালে জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC) অনুসারে শিশু আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যক  বয়সী প্রত্যেক ব্যক্তিকেই শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সমাজবিজ্ঞানী বেদারের মতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু ও তরুণদের যেসব কাজ আইন দ্বারা নিষিদ্ধ অথবা যার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, সেগুলোই কিশোর অপরাধ। এই সংজ্ঞাটি কিশোর অপরাধের সামাজিক ও আইনি উভয় দিকই তুলে ধরে।

এই সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করে সমাজবিজ্ঞানী এ. বি. জন উল্লেখ করেছেন, কিশোর অপরাধ হলো নির্দিষ্ট বয়সসীমার মধ্যে দেশের প্রচলিত আইন লঙ্ঘনকারী আচরণ, যার চরিত্র সংশোধন বা পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, কিশোর অপরাধ একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা, যা অপ্রাপ্তবয়স্কদের দ্বারা সংঘটিত সমাজবিরোধী বা আইন লঙ্ঘনকারী কাজকে নির্দেশ করে।

অপরাধবিজ্ঞানী টেরি ই. মফিট তাঁর বিখ্যাত “ডেভেলপমেন্টাল ট্যাক্সোনমি”  তত্ত্বে কিশোর অপরাধের দুটি প্রধান ধরন তুলে ধরেছেন—
জীবনব্যাপী স্থায়ী অপরাধী (Life-course persistent) এবং কৈশোরকালীন সীমাবদ্ধ অপরাধী (Adolescence-limited)।

জীবনব্যাপী স্থায়ী অপরাধীরা সংখ্যায় তুলনামূলকভাবে কম হলেও এদের আচরণ অত্যন্ত গুরুতর ও ধারাবাহিক। এরা সাধারণত শৈশব থেকেই আক্রমণাত্মক বা সমাজবিরোধী আচরণ প্রদর্শন করে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আচরণ অপরাধমূলক রূপ নেয়।

মফিটের মতে, এর প্রধান কারণ হলো স্নায়বিক দুর্বলতা—যেমন অতিরিক্ত চঞ্চলতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণে অক্ষমতা—যা পারিবারিক অবহেলা, দারিদ্র্য, নির্যাতন বা অপরাধপ্রবণ অভিভাবকদের প্রভাবে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এসব শিশুরা শিক্ষা বা সামাজিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ে এবং সমাজের মূলধারায় নিজেদের জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা অপরাধকেই জীবনযাত্রার একটি অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।

অন্যদিকে, কৈশোরকালীন সীমাবদ্ধ অপরাধীরা সংখ্যায় অনেক বেশি এবং এদের অপরাধ আচরণ সাধারণত কৈশোরকাল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। এরা শৈশবে স্বাভাবিক আচরণ করে, কিন্তু কৈশোরে হঠাৎ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। মফিটের ব্যাখ্যায় এর কারণ হলো ‘পরিপক্বতার ব্যবধান’ (maturity gap)।

অর্থাৎ, কিশোররা শারীরিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও সমাজ তাদের সেই অনুযায়ী অধিকার বা স্বাধীনতা দেয় না। এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে তারা এমন আচরণ করে, যা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো দেখায়—যেমন ধূমপান, মাদক গ্রহণ, ছোটখাটো চুরি বা সহিংসতা। এটি মূলত সহপাঠীদের প্রভাব এবং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা।

তবে এই অপরাধপ্রবণতা সাধারণত সাময়িক হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ কৈশোরকালীন সীমাবদ্ধ অপরাধী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। মফিটের এই তত্ত্ব কিশোর অপরাধকে কেবল আচরণগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং জৈবিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের আলোকে বিশ্লেষণ করতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের চিত্র 

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের সঠিক চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রামাণিক পরিসংখ্যানের ঘাটতি দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও ১৯৯৬ সালে ইউনিসেফ-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল যে বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ মোট অপরাধের মাত্র ২ শতাংশ, তবে সেই গবেষণাতেই স্বীকার করা হয়েছিল যে সংঘটিত সব কিশোর অপরাধ দাপ্তরিক প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয় না। অর্থাৎ, প্রকৃত সংখ্যাটি সবসময়ই অনুমিত সংখ্যার চেয়ে বেশি ছিল।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দেশে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের দ্রুত গতির ফলে কিশোর অপরাধের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে শুরু করে, যা বর্তমানে এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ এখন একটি গুরুতর সামাজিক বাস্তবতা হিসেবে দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ কিশোর-কিশোরী রয়েছে। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ নানা কারণে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যার মূল কারণ হিসেবে গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য, পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক অস্থিরতাকে দায়ী করে আসছেন।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১২ সাল থেকে দেশে কিশোর অপরাধের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়। সে বছর ৪৮৪টি মামলায় মোট ৭৫১ জন শিশু ও কিশোর অভিযুক্ত হয়। অথচ শুধু ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসেই ৮২১টি মামলায় গ্রেপ্তার হয় ১,১৯১ জন কিশোর অপরাধী।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এসব কিশোরদের অধিকাংশই মাদক, হত্যা ও ধর্ষণ–সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

বস্তুত, কিশোর অপরাধ শুধুমাত্র একটি আইনি ইস্যু নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সমস্যা, 

২০১৬ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক তথ্যে দেখা যায়, দেশের পথশিশুদের মধ্যে প্রায় ৪৪% মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত, ৩৫% চুরি বা পকেটমারিতে, ১২% ছিনতাইয়ে, ১১% মানব পাচারে এবং ২১% অন্যান্য অপরাধে অংশ নেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু–কিশোরের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ শিশু বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত। উদ্বেগজনকভাবে দেখা গেছে, এই শিশুদের প্রায় ৭০% কোনো না কোনোভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, যার প্রধান কারণ দারিদ্র্য। শত বছরের সমাজবিজ্ঞান গবেষণাতেও এই সত্য প্রমাণিত হয়েছে যে, কিশোর অপরাধে দারিদ্র্য একটি বড় চালিকাশক্তি।

যার শিকড় গেঁথে আছে দারিদ্র্য, অবহেলা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতিতে। এই বাস্তবতা মোকাবিলায় কিশোরদের জন্য সমন্বিত সামাজিক ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।

কিশোর অপরাধের সামাজিক ও তাত্ত্বিক কারণসমূহের বিশ্লেষণ

কিশোর অপরাধের উত্থানের পেছনে আর্থ-সামাজিক, পারিবারিক, মনস্তাত্ত্বিক এবং কাঠামোগত রাজনৈতিক কারণগুলোর একটি জটিল আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে।

দারিদ্র্য বনাম সচ্ছলতা

কিশোর অপরাধের কারণ বিশ্লেষণ করলে দুটি প্রধান ধারা স্পষ্ট হয়। প্রথমত, প্রথাগত ব্যাখ্যা অনুযায়ী দারিদ্র্য কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ। চরম দারিদ্র্যে পীড়িত পরিবারের কিশোররা মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়, যা থেকে তাদের মধ্যে হতাশা জন্মায়। এই হতাশা জীবিকার তাগিদে চুরি, জুয়া, মাদক বা ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কাজে তাদের প্ররোচিত করে। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রভাবে সৃষ্ট বস্তি এলাকার নিম্নমানের পরিবেশে বসবাসকারী শিশু-কিশোররা খারাপ সঙ্গ এবং অপরাধের সংস্পর্শে এসে অপরাধী হয়ে ওঠে।

দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে সমাজের উচ্চবিত্ত বা ক্ষমতাবান পরিবারের কিশোররাও মাদকাসক্তি, প্রযুক্তিগত অপরাধ এবং গ্যাং সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এ থেকেই স্পষ্ট হয় যে এই নতুন ধরনের কিশোর অপরাধ প্রথাগত দারিদ্র্য-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না। বরং সচ্ছল পরিবারের কিশোরদের অপরাধে জড়িত থাকার কারণগুলোকে আরও গভীরভাবে মনস্তাত্ত্বিক ও নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পারিবারিক কাঠামোর ত্রুটি ও নিয়ন্ত্রণহীনতা

কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান সামাজিক কারণ হলো পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। ভগ্ন পরিবার,পিতামাতার দাম্পত্য কলহ, অব্যাহত পারিবারিক সহিংসতা এবং স্নেহ–মমতার অভাব শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ধরনের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা নিরাপত্তাহীনতা ও মানসিক শূন্যতায় ভোগে, যা অনেক সময় তাদের অপরাধপ্রবণতার দিকে ঠেলে দেয়।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির ম্যাটারনাল ডেপ্রিভেশন থিওরি অনুযায়ী, শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থ বিকাশের জন্য মায়ের অথবা মায়ের মতো কোনো ঘনিষ্ঠ স্নেহময় ব্যক্তির প্রতিনিয়ত উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি। বোলবি দেখিয়েছেন, যদি শিশুর জীবনের প্রাথমিক বছরে এই আবেগীয় বন্ধন বিচ্ছিন্ন বা দুর্বল হয়, তাহলে তার মধ্যে সহানুভূতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক আচরণ গঠনের ক্ষমতা ব্যাহত হয়। এর ফলস্বরূপ সে পরবর্তীতে আগ্রাসী, আত্মকেন্দ্রিক ও অপরাধপ্রবণ আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারে।

বোলবির এই ব্যাখ্যা বর্তমান সমাজের সচ্ছল পরিবারের কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণও স্পষ্ট করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন পরিবারে বাবা–মা উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় সন্তানদের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এর ফলে কিশোরদের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের অভাব দেখা দেয়। এই বাস্তবতাই আবার ট্র্যাভিস হিরশির সামাজিক নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, যেখানে বলা হয়েছে—কিশোররা যখন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত থাকে না, তখন তাদের সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় না এবং তারা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়।

সঙ্গীর প্রভাব

কিশোর অপরাধের পেছনে সঙ্গী বা বন্ধুবান্ধবের প্রভাব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সাদারল্যান্ডের ডিফারেনশিয়াল এসোসিয়েশন থিওরি আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে অপরাধ একটি শেখা আচরণ। মানুষ জন্মগতভাবে অপরাধী নয়; বরং অপরাধপ্রবণ পরিবেশ ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধ শেখে। কিশোর বয়সে আত্মপরিচয়ের সন্ধানে থাকা একজন তরুণ যখন অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সান্নিধ্যে আসে, তখন সে অপরাধকে একটি স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য আচরণ হিসেবে দেখতে শেখে।

এই ধরনের মিথস্ক্রিয়ায় অপরাধ সম্পর্কে তার নৈতিক উপলব্ধি বিকৃত হয়ে পড়ে। তারা বন্ধুদের কাছ থেকে শুধু অপরাধের কৌশলই নয়, বরং সেই অপরাধকে ন্যায্যতা দেওয়ার যুক্তিও শিখে নেয়। যেমন “সবাই করে” বা “আমরা অন্যায়ের প্রতিশোধ নিচ্ছি” এ ধরনের বক্তব্য তাদের মানসিকভাবে অপরাধের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।

বিশেষত, যেসব কিশোরের পরিবারে নজরদারি, আবেগীয় সহায়তা বা ইতিবাচক দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে, তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচয়ের ঘাটতি পূরণ করতে বন্ধুমহলে আশ্রয় খোঁজে। তখন নেতিবাচক বন্ধু-বলয়ের প্রভাব তাদের আচরণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইন গ্যাং সংশ্লিষ্টতাও এখন কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। ভার্চুয়াল সঙ্গীরাও বাস্তব জীবনে অপরাধে প্ররোচনা দিতে পারে, যা আগের তুলনায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অতএব, কিশোরদের সুস্থ সামাজিকীকরণ, ইতিবাচক রোল মডেলের উপস্থিতি এবং সচেতন পারিবারিক ও শিক্ষাগত সহায়তা অপরিহার্য, যাতে তারা নেতিবাচক সঙ্গীর প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অপব্যবহার

রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য প্রায়ই কিশোরদের সহজ শিকার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই কিশোররা সাধারণত আর্থিকভাবে দুর্বল, শিক্ষাবঞ্চিত বা বেকারত্বে ভুগতে থাকে। ফলে সামান্য অর্থ, প্রভাব বা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তারা রাজনৈতিক নেতাদের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরা তাদেরকে প্রথমে ছোটখাটো কাজে—যেমন মিছিল-সমাবেশে উপস্থিতি, পোস্টার ছেঁড়া, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো ইত্যাদির মাধ্যমে জড়িয়ে ফেলে। পরবর্তীতে তারা ধীরে ধীরে আরও বিপজ্জনক কাজে জড়িয়ে যায়—যেমন ছিনতাই, হত্যা, বোমাবাজি, পিকেটিং, ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ।

এই ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কিশোরদের মানসিকভাবে অপরাধে অভ্যস্ত করে তোলে। রাজনৈতিক আশ্রয় ও সুরক্ষার কারণে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় না পেয়ে ক্রমে ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং ভাড়াটে খুনের মতো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা তাদের অপরাধমূলক কার্যকলাপ আড়াল করে বা আইনি জটিলতা থেকে রক্ষা করে, যা কিশোরদের কাছে অপরাধকে বৈধতা প্রদান করে। ফলস্বরূপ, তারা মনে করে করে অপরাধ করা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অংশ বা ক্ষমতা অর্জনের বৈধ উপায়। এই পথ অনুসরণ করেই কিশোর অপরাধীরা পরিণত বয়সে পৌঁছেও অপরাধের জগৎ থেকে বের হতে পারে না। আর এভাবেই একজন কিশোর অপরাধী ধীরে ধীরে পূর্বে বর্ণিত জীবনব্যাপী স্থায়ী অপরাধীতে পরিণত হয়।

এই প্রবণতা শুধু কিশোরদের নৈতিক অবক্ষয়ই ঘটায় না, বরং সমাজে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও সহিংসতার বীজ বপন করে। ভবিষ্যতে এই কিশোররা অপরাধী চক্রের নিয়মিত সদস্যে পরিণত হয় এবং রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই রাজনৈতিক স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার একটি জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

অপরাধবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের কারণ বিশ্লেষণে রবার্ট মেরটনের স্ট্রেইন থিওরি এবং সামাজিক কলঙ্ক (স্টিগমা) তত্ত্ব—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্বকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্ট্রেইন থিওরি

রবার্ট মেরটনের স্ট্রেইন থিওরি অনুযায়ী, সমাজের দরিদ্র বা নিম্নবিত্ত কিশোররা যখন সফল হওয়ার মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে, কিন্তু দারিদ্র্য বা মানসম্মত শিক্ষার অভাবে তা অর্জনের বৈধ সুযোগ পায় না, তখন তারা গভীর হতাশায় ভোগে। এই হতাশা বা চাপ মোকাবিলায় তারা অবৈধ পথ বেছে নেয়। এই তত্ত্বে পাঁচটি অভিযোজন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে—কনফরমিটি, ইনোভেশন, রিচুয়ালিজম, রিট্রিটিজম এবং রেবেলিয়ন। বাংলাদেশের কিশোর অপরাধীদের মধ্যে প্রধানত ইনোভেশন প্রবণতা দেখা যায়, যেখানে তারা সামাজিক লক্ষ্য(যেমন দ্রুত অর্থ বা ক্ষমতা অর্জন) অটুট রেখে বৈধ উপায়ের অভাবে চুরি, ছিনতাই বা মাদক ব্যবসার মতো অবৈধ পথে অগ্রসর হয়। কিছু কিশোর রিচুয়ালিজম অনুসরণ করে, যারা নিয়ম মেনে চললেও লক্ষ্য অর্জন হবে না জেনে তারা হতাশায় ভোগে। লক্ষ্য ও উপায়—দুটোই বর্জন করে মাদকাসক্তি বা ভবঘুরে জীবন বেছে নিলে তাকে বলা হয় রিট্রিটিজম। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো রেবেলিয়ন, যেখানে তারা বিদ্যমান সামাজিক কাঠামো অস্বীকার করে নতুন আদর্শ বা গ্যাং–সংশ্লিষ্টতাকে গ্রহণ করে।

বিগত দশকে বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে কিশোর অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বস্তি এলাকার অপরাধপ্রবণ পরিবেশ, যা শিশুদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার একটি অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করে। একই সঙ্গে, বস্তি এলাকার পাশেই দ্রুত নগরায়ণ (শহরায়ন) এবং বিলাসবহুল জীবনযাত্রার প্রকট বৈষম্য (যেমন—গুলশান–বনানীর ঠিক পাশেই কড়াইল বস্তি) বস্তিবাসী কিশোরদের মধ্যে আপেক্ষিক বঞ্চনা (relative deprivation) বোধ সৃষ্টি করে। জীবনযাত্রার মানের এই বিশাল ব্যবধান তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা জন্ম দেয়, যা শেষ পর্যন্ত অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে তোলে।

সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব (Social Disorganization Theory)

শিকাগো স্কুল অব ক্রিমিনোলজির সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব অনুযায়ী, অপরাধ মূলত সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা, দারিদ্র্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের অভাবের ফল। যখন পারিবারিক, ধর্মীয় বা শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সমাজ স্থিতিশীলতা হারায়, তখন অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরে, দ্রুত নগরায়ণ ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ফলে বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকাগুলোতে বিচ্ছিন্ন ও সমাজ–সংযুক্তিহীন জনসমষ্টি গড়ে উঠছে। সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার অভাবে এসব এলাকায় কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে ওঠে না, যা অপরাধ সৃষ্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সান্নিধ্যে কিশোররা সহজেই অপরাধমূলক আচরণ শিখে ফেলে।

এই বিশৃঙ্খল পরিবেশেই কিশোর গ্যাং–সংস্কৃতি দানা বাঁধে। পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় কিশোররা গ্যাংকে পরিচিতি, ক্ষমতা ও সুরক্ষার বিকল্প আশ্রয়স্থল হিসেবে গ্রহণ করে। ঢাকা মহানগরে কিশোর গ্যাংগুলোর সহিংসতা, এলাকা দখল ও চাঁদাবাজির মতো ঘটনা সামাজিক বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের বাস্তব প্রতিফলন—যা প্রমাণ করে যে অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং সমাজ কাঠামোর ভাঙনের একটি পরিণতি।

লেবেলিং তত্ত্ব (Labeling Theory)

এরপর, একবার অপরাধে জড়ালে সমাজ ও পরিবার তাদের “বখাটে” বা “খারাপ ছেলে” হিসেবে চিহ্নিত করে। এই নেতিবাচক পরিচয় বা সামাজিক লেবেলিং তাদের মানসিকতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এর ফলে তারা সমাজ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং নিজেদের মতোই অন্য লেবেলপ্রাপ্ত বা কলঙ্কিত কিশোরদের সঙ্গে মিশে গ্যাং গড়ে তোলে। এসব গ্যাং তাদের কাছে এক ধরনের আশ্রয় বা বিকল্প পরিবারে পরিণত হয়।

এই চক্রে আটকে পড়ার পর তারা আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, কারণ তারা মনে করে সমাজের চোখে তাদের সম্মান আর কখনোই ফিরে আসবে না। এভাবেই হতাশা ও সামাজিক প্রত্যাখ্যানের এই চক্র বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির একটি স্থায়ী কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের ‘শিশু আইন, ২০১৩’ এবং সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার বাস্তবতা

২০১৩ সালের শিশু আইন, ১৯৭৪ সালের পুরোনো আইনকে বাতিল করে প্রণীত হয়েছে এবং এটি জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (CRC) অনুযায়ী এই আইন প্রণীত হয়েছে। এটি অন্যান্য বিদ্যমান আইনের ওপর প্রাধান্য লাভ করে এবং শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারিক ও সংশোধনমূলক বিভিন্ন দিক সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে।

জাতীয় শিশু আইন, ২০১৩:
শিশুর সুরক্ষা ও সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থা
জাতীয় শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় শিশুদের আর “অভিযুক্ত” বা “আসামি” বলা হয় না; বরং বলা হয় “আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু”। আবার আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে “আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশু” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো—শিশুকে অপরাধী হিসেবে কলঙ্কিত না করে তার সংশোধন, সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। শাস্তির পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শিশুর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং আচরণ সংশোধনের সুযোগে। ফলে কোনো শিশুকে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয় না; বরং শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রেখে তার মানসিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করা হয়।

এই আইনের আওতায় শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা শিশুর সম্মতি সাপেক্ষে তাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে তার অভিভাবক ও প্রবেশন কর্মকর্তার উপস্থিতি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।

আইন অনুযায়ী কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সাধারণ কারাদণ্ড দেওয়া যাবে না। তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত চাইলে শিশুকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পৃথকভাবে আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারে।আইনে ‘বিকল্পপন্থা’ (ডাইভারশন) এবং জামিনের সুযোগও রাখা হয়েছে, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে না পড়েই শিশুকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া যায়। একই সঙ্গে প্রবেশন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে প্রথমবার অপরাধে জড়ানো শিশুদের কারাগারে না পাঠিয়ে সমাজে থেকেই সংশোধনের সুযোগ মেলে। প্রবেশন কর্মকর্তারা শিশুর মনস্তত্ত্ব, কাউন্সেলিং এবং মোটিভেশন প্রদান করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা দুর্বল। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই কিশোর অপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আটকে রাখা—যেটি সর্বশেষ উপায় হওয়ার কথা ছিল—সেটিকেই যেন “প্রথম উপায়”-এ পরিণত করা হয়েছে।

 

                        বাংলাদেশের কিশোর অপরাধ

কারণ 

সামাজিক ও পারিবারিক:
১. ভাঙা পরিবার
২. সঠিক অভিভাবকের অভাব
৩. পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা সহিংসতা
৪. শিশুর প্রতি উদাসীনতা বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি
৫. খারাপ সঙ্গ
৬. মাদকাসক্তি
৭. শিক্ষার অভাব বা ঝরে পড়া
৮. সামাজিক বৈষম্য ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব
৯. অপরাধপ্রবণ এলাকার প্রভাব

অর্থনৈতিক:
১. দারিদ্র্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা
২. পরিবারের আর্থিক চাপ মেটাতে অবৈধ পথে উপার্জন
৩. বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক বৈষম্য
৪. দ্রুত ধনী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা

মনস্তাত্ত্বিক:
১. আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা
২. মানসিক অসুস্থতা বা ট্রমা
৩. সহিংসতা দেখে বড় হওয়া (অনুকরণ)
৪. হতাশা, ক্ষোভ ও হীনম্মন্যতা বোধ

প্রভাব 

ব্যক্তিগত জীবনে:
১. অন্ধকার ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থানহীনতা
২. অপরাধী হিসেবে পরিচিতি ও সামাজিক বয়কট
৩. মানসিক চাপ ও আত্মবিশ্বাসের অভাব
৪. কারাগারে থাকা বা বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া

পরিবারের ওপর:
১. সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়
২. কর্মক্ষম হওয়ার পরিবর্তে পরিবারের বোঝা হয়ে যায়
৩. এবং প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাতে হয়

সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর:
১. সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি
২. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
৩. রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় (অপরাধ দমন ও বিচার খাতে)
৪. জাতীয় উন্নয়নে বাধা ও মানবসম্পদের ক্ষতি

কিশোর অপরাধ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ তাদের নিজ নিজ আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। এসব মডেল থেকে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে। জার্মানিতে অপরাধ কমার প্রধান কারণ হিসেবে যুব বেকারত্ব হ্রাস এবং পারিবারিক সহিংসতা কমে আসাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পদ্ধতি প্রমাণ করে যে, কিশোর অপরাধ মোকাবিলা কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতির সাফল্য। জার্মানিতে কিশোর অপরাধীদের কারিগরি শিক্ষা প্রদান করা হয় এবং সামাজিক কর্মীদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের সংশোধন, পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য প্রশিক্ষিত প্রবেশন কর্মকর্তার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার্য। তবে প্রবেশন কর্মকর্তার ঘাটতি থাকায় প্রায়শই সমাজসেবা কর্মকর্তাদের এই বিশেষায়িত দায়িত্ব পালন করতে হয়, যার ফলে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়ন ও নিবিড় ফলো-আপসহ সামগ্রিক সেবার মানে কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয় এবং শিশু আইন, ২০১৩-এর উদ্দেশ্য পূরণে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়।

অন্যদিকে, নরওয়েতে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের অপরাধের জন্য কোনো শাস্তি নেই। তাদের ‘বার্নেভার্ন’ নামক শিশু সুরক্ষা পরিষেবার কাছে পাঠানো হয়, যা সামাজিক কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থাটি প্রগতিশীল হলেও এতে আইনি সুরক্ষা ও যথাযথ প্রক্রিয়ার অভাবের জন্য সমালোচিত।

 এছাড়াও, আরও কিছু বিকল্প মডেলের কথা উল্লেখ করা যায়।

বলা হয়েছে। যেমন—ডাইভারশন এবং রিস্টোরেটিভ জাস্টিস। ডাইভারশন হলো আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার না করে বিকল্প পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান করা, যা পুনরায় অপরাধ করার সম্ভাবনা কমায়। রিস্টোরেটিভ জাস্টিস হলো অপরাধী ও ভুক্তভোগীর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ক্ষতির উপশম করা, যা অপরাধীর মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি করে। সান ফ্রান্সিসকো এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো স্থানে কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে কিশোরদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ভূমিকা ও সংকট

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধীদের জন্য বিদ্যমান সংশোধনমূলক ব্যবস্থাগুলো শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র নামে পরিচিত। কাগজে-কলমে এই কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশ্য হলো কিশোরদের শাস্তি না দিয়ে তাদের সংশোধন ও পুনর্বাসন করা। কিন্তু বাস্তবে এসব কেন্দ্র নানা সমালোচনার শিকার, যা সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড়

বাংলাদেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ভিড় একটি মানবিক সংকট তৈরি করেছে। টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক)-এ অনুমোদিত আসনসংখ্যা ৩০০ জন হলেও, সেখানে নিবাসীর সংখ্যা ৬৯৩ জন (অনুমোদিত আসনের দ্বিগুণেরও বেশি)। একইভাবে, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক)-এ ১৫০ আসনের বিপরীতে ২৫৮ জন নিবাসী রয়েছে। এই অতিরিক্ত ভিড় কেন্দ্রের অভ্যন্তরে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত যত্ন, চিকিৎসা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অসম্ভব করে তুলেছে।

কর্মী স্বল্পতা ও তদারকির অভাব

ধারণক্ষমতার এই অতিরিক্ত ভিড়ের সঙ্গে কর্মীদের চরম অপ্রতুলতা যুক্ত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, টঙ্গী সিডিসি-তে ৬৯৩ জন শিশুকে দেখভালের জন্য লিখিতভাবে ৬৪ জন কর্মী বরাদ্দ থাকলেও, কর্মরত আছে মাত্র ২৫ জন। যশোর কেন্দ্রে ৪৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৭ জন। কর্মীদের এই চরম ঘাটতির কারণে শিশুদের ওপর নজরদারি কমে যায় এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম (যেমন কাউন্সেলিং, কেস ওয়ার্ক) কেবল নামেমাত্র পরিচালিত হয়।

কিশোর অপরাধ সংশোধন এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর কৌশল


বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের ক্রমবর্ধমান মাত্রা মোকাবিলা করার জন্য একটি সুচিন্তিত, মানবিক এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক (Community-based) কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। এই কৌশলটি দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং তথ্যভিত্তিক উপাদানের ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। এটি মূলত কঠোর শাস্তির পরিবর্তে মানবিক সংশোধন ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের ওপর জোর দেয়।

প্রাথমিক হস্তক্ষেপ (Early Intervention) ও ডাইভারশন (Diversion) নীতি প্রয়োগ করা জরুরি। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করে আইনি প্রক্রিয়ায় জড়ানোর আগেই প্রবেশন কর্মকর্তা ও সমাজকর্মীর সহায়তায় সরাসরি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে তাদের ওপর অপরাধীর তকমা না লাগে।

কিশোরদের মানসিক চাপ, ট্রমা এবং আগ্রাসী আচরণের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও কাউন্সেলিং নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র এবং স্থানীয় প্রবেশন অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সেলর নিয়োগ করে পারিবারিক সহিংসতা বা বস্তিজীবনের ট্রমা মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কাউন্সেলিং নিশ্চিত করতে হবে।সংশোধন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দক্ষতা উন্নয়ন ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ। কিশোরদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী আইটি, ইলেকট্রনিক্স, আউটসোর্সিং-এর মতো আধুনিক প্রশিক্ষণ চালু করে প্রশিক্ষণের পর ক্ষুদ্রঋণ বা কর্মসংস্থান সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি, গঠনমূলক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিতর্ক বা স্বেচ্ছাসেবী কাজে তাদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে, যা তাদের মধ্যে সামাজিক বন্ধন (Social Bonds) শক্তিশালী করবে এবং অপকর্মে জড়ানোর সুযোগ কমাবে।

এছাড়াও, পুলিশ ও প্রবেশন কর্মকর্তাদের ভূমিকা কঠোর নিয়ন্ত্রকের পরিবর্তে বন্ধু ও পরামর্শদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংবেদনশীল পুলিশিং ও প্রবেশন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মীদের শিশু মনোবিজ্ঞান, শিশু আইন ও অপরাধ মনস্তত্ত্বের ওপর বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ দেওয়া আবশ্যক। অপরাধের পথ থেকে বেরিয়ে আসার পর কিশোরদের যেন পরিবার ও সমাজ সহজে গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য তাদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণ (Reintegration) প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরি। মুক্তির আগে অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাউন্সেলিং সেশন আয়োজন করা উচিত। পুনর্বাসনের পর স্থানীয় কমিউনিটি পুলিশিং বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে কমপক্ষে এক বছর তাদের নিয়মিত ফলো-আপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, সমাজের মানুষের মনে কিশোরদের প্রতি থাকা নেতিবাচক ধারণা দূর করতে সচেতনতামূলক প্রচার বা ক্যাম্পেইন চালানো অপরিহার্য।

পরিশেষে, প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের উন্নয়ন ঘটিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোকে সংশোধনাগার না রেখে উন্নয়নমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো করে গড়ে তোলা এবং সেখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত শিশু রাখা বন্ধ করা, পর্যাপ্ত সুবিধা ও আধুনিক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সদ্ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক
হেড অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন
ইন্টেলিস সলিউশন লিমিটেড

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ