একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা কেবল অপরাধ দমন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জনগণের জানমাল ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার এক অপরিহার্য স্তম্ভ। একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার জন্য তাদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমবর্ধমান সামাজিক জটিলতা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং অপরাধের বিচিত্র রূপ মোকাবিলায় প্রথাগত প্রশিক্ষণের বাইরে একটি সুশিক্ষিত ও মননশীল পুলিশ বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য । বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর জন্য এই পেশাদারিত্ব অর্জন একটি ঐতিহাসিক ও চলমান চ্যালেঞ্জ।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে একাধিক সংস্কার ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। জনবল বৃদ্ধি পেয়েছে, গঠন করা হয়েছে নৌপুলিশ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ, পিবিআই, সিটিটিসি, এটিইউ-এর মতো বিশেষায়িত নতুন ইউনিট। এসব পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে পুলিশের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তবে, এই ক্রমবর্ধমান জনবল ও দায়িত্বের তুলনায় তাদের জন্য সীমিত উচ্চশিক্ষা ও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ একটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। একটি সুসংহত ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার পথে এটি একটি বড় অন্তরায়।
পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে উচ্চশিক্ষার অপরিহার্যতা
আধুনিক পুলিশিং-এর জন্য উচ্চশিক্ষা কেবল একটি অতিরিক্ত যোগ্যতা নয়, বরং এটি পেশাদারিত্বের ভিত্তি। প্রথাগত প্রশিক্ষণ যেখানে একজন পুলিশ সদস্যকে কৌশলগত ও শারীরিক দক্ষতা দেয়, সেখানে উচ্চশিক্ষা আইন, সমাজতত্ত্ব, অপরাধবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান এবং মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলোর ওপর গভীর জ্ঞান দিয়ে তাদের একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। এর ফলে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও যৌক্তিক, মানবিক এবং সংবেদনশীল হয়। এই ধরনের শিক্ষা জনমুখী পুলিশিং এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় সহায়ক, কারণ এটি পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি করে। এছাড়াও, সাইবার অপরাধ, অর্থনৈতিক জালিয়াতি এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মতো জটিল ও আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত ফরেনসিক সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং ক্রিমিনাল সাইকোলজির মতো বিশেষায়িত জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি, উচ্চশিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা পেশাদার সততা ও নিরপেক্ষতা অর্জনে ভূমিকা রাখে এবং জনগণের কাছে বাহিনীর ভাবমূর্তি উন্নত করে। সামগ্রিকভাবে, উচ্চশিক্ষা একজন ব্যক্তির দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি সামগ্রিক পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য অপরিহার্য। পুলিশিং পেশার মানোন্নয়নে উচ্চশিক্ষার ভূমিকা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা চলছে। যদিও সব গবেষণায় একই ধরনের ফলাফল পাওয়া যায়নি, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত পুলিশ সদস্যরা তাদের কর্মক্ষেত্রে ইতিবাচক ও কার্যকরী পরিবর্তন নিয়ে আসছেন।
এই পরিবর্তনগুলো শুধু তাত্ত্বিক ধারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বাস্তব প্রয়োগ চোখে পড়ার মতো:
- সহিংসতা ও বলপ্রয়োগ হ্রাস: রাইবারগ ও টেরিল এর গবেষণাপত্র The Effect Of Higher Education on Police Behavior থেকে জানা যায়, উচ্চশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তারা সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের ঘটনায় কম জড়িয়ে পড়েন। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, কলেজ ডিগ্রিধারী কর্মকর্তারা তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা ৩০% এবং বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা প্রায় ৪০% কমিয়ে আনেন।
- নাগরিক অসন্তোষ হ্রাস: গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের অভিযোগের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। যাদের দুই বছরের কলেজ ডিগ্রি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের হার প্রায় অর্ধেক কমে যায়। এটি পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করে।
- উন্নত বিচারিক ও বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা: উচ্চশিক্ষা পুলিশ সদস্যদের ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমস্যা সমাধান এবং জটিল পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ায়। এটি তাদের প্রচলিত আইন প্রয়োগের বাইরে গিয়ে Community Policing এবং Problem Oriented Policing-এর মতো আধুনিক কৌশলগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে সহায়তা করে।
- লিখিত প্রতিবেদন ও যোগাযোগে দক্ষতা বৃদ্ধি: উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তারা সাধারণত উন্নত মানের প্রতিবেদন লিখতে এবং নিজেদের ভাবনা আরও কার্যকরভাবে প্রকাশ করতে পারেন। এটি তাদের পেশাদারিত্ব বাড়ায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।
- আন্তঃবিভাগীয় সহযোগিতা: নিউ ইয়র্ক সিটি ও উটাহ-এর মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে পুলিশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই প্রমাণগুলো থেকে বোঝা যায়, উচ্চশিক্ষা কেবল একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়, বরং এটি পুলিশিং-এর মতো বাস্তব কর্মক্ষেত্রে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি কর্মকর্তাদের শুধুমাত্র আইন প্রয়োগকারী হিসেবে নয়, বরং সমাজের সমস্যা সমাধানকারী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। উচ্চশিক্ষা পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্বের ভিত্তি মজবুত করে এবং আধুনিক সমাজের চাহিদা পূরণে তাদের আরও সক্ষম করে তোলে।
উচ্চশিক্ষার বর্তমান সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা একাধিক স্তরে বিভক্ত, যা মৌলিক থেকে শুরু করে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌলিক প্রশিক্ষণ সাধারণত পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) এবং বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদা-তে প্রদান করা হয় । টাঙ্গাইল, রংপুর, খুলনা ও নোয়াখালীর মতো স্থানে অবস্থিত পিটিসিগুলো শিক্ষানবিশ কনস্টেবলদের পাশাপাশি নাবিক ও বনরক্ষীদের মতো অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেয় । অন্যদিকে, রাজশাহীর সারদায় অবস্থিত বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, যা ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল , সকল পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের জন্য মৌলিক, রিফ্রেশার ও বিশেষ কোর্স পরিচালনা করে । এই কোর্সগুলো মূলত শারীরিক সক্ষমতা, প্রাথমিক আইন এবং প্রথাগত পুলিশিংয়ের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে থাকে ।
প্রচলিত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি, বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যরা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা বর্তমানে উচ্চশিক্ষার কিছু সীমিত সুযোগ পেয়ে থাকেন। এই প্রোগ্রামগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- মাস্টার অফ অ্যাপ্লাইড ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ ম্যানেজমেন্ট (MACPM): এটি পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ (PSC) কর্তৃক পরিচালিত একটি পেশাদার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত এই প্রোগ্রামটির মূল লক্ষ্য হলো পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা, বিশেষ করে সমসাময়িক অপরাধবিদ্যা ও পুলিশ ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিয়ে । কোর্সটি ১২ মাস মেয়াদী এবং সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (শুক্রবার ও শনিবার) ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়, যাতে কর্মরত কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করতে পারেন ।
- পোস্টগ্র্যাজুয়েড ডিপ্লোমা ইন সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট (PGDSM): এটিও পুলিশ স্টাফ কলেজ কর্তৃক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি প্রোগ্রাম। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এর প্রথম ব্যাচ চালু হয়েছে এবং স্নাতক ডিগ্রিধারী যেকোনো ব্যক্তি এতে আবেদন করতে পারেন ।
- প্রফেশনাল মাস্টার্স ইন ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস (PMCCJ): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগ এই পেশাদার স্নাতকোত্তর প্রোগ্রামটি অফার করে । এই কোর্সের পাঠ্যক্রমে আধুনিক অপরাধবিদ্যা ও অপরাধ বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেমন- সাইবার ক্রাইম ও সিকিউরিটি, কালচারাল ক্রিমিনোলজি, জেনোসাইড ও সোশ্যাল জাস্টিস, এবং ইয়ুথ ক্রাইম ও জাস্টিস । এটি পুলিশ সদস্যদের পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
- মাস্টার্স ইন পুলিশ সাইন্স (MPS): ২০০৮ সালে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে এই ডিগ্রি চালু করা হয়, যা মূলত এএসপিদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সময় প্রদান করা হয় । এটি কমিউনিটি পুলিশিংয়ের তাত্ত্বিক দিক এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সমস্যা সমাধানের কৌশল নিয়ে আলোচনা করে ।
- অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস স্কলারশিপের সুযোগ: অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশ সরকারের কর্মীদের জন্য, যার মধ্যে পুলিশ সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত , অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ডস স্কলারশিপ প্রদান করে। এই বৃত্তিগুলো মূলত মাস্টার্স কোর্সের জন্য দেওয়া হয় । এই স্কলারশিপের আওতায় পুলিশিং, কাউন্টার-টেররিজম এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো বিষয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে । স্কলারশিপের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো:
- সম্পূর্ণ টিউশন ফি
- যাতায়াতের জন্য রিটার্ন বিমান ভাড়া
- জীবনধারণের খরচ বাবদ প্রতি দুই সপ্তাহে আর্থিক সহায়তা, যা বছরে প্রায় ২০,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার
- অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর এককালীন সেটেলমেন্ট ভাতা
- স্বাস্থ্য বীমা, যা শিক্ষার্থীদের মৌলিক স্বাস্থ্য খরচ কভার করে
- প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে প্রাক-কোর্স ইংরেজি প্রশিক্ষণ
এই বৃত্তির জন্য যোগ্য হতে হলে আবেদনকারীকে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো কমপক্ষে দুই বছরের পূর্ণকালীন কাজের অভিজ্ঞতা এবং আইইএলটিএস-এ কমপক্ষে ৬.৫ স্কোর, যেখানে কোনো ব্যান্ডে ৬.০ এর নিচে স্কোর থাকা যাবে না । সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) বা সরকারি অনুমোদন আবশ্যক ।
এছাড়াও বিভিন্ন ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অফার করে থাকে, অনেক ক্ষেত্রেই এসব কোর্স পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষায়িতভাবে ডিজাইন করা থাকে এবং সেখানের ভর্তি প্রক্রিয়াতেও পুলিশের কাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দরকার হয়, এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন তাদের প্রফেশনাল অভিজ্ঞতার কারনে। এমন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় যারা পুলিশ প্রফেশনালসদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয় তাদের মধ্যে অন্যতম কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ও প্রয়োজনীয় তথ্য নিচে দেয়া হলোঃ
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় (University of Cambridge)
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের MSt in Applied Criminology and Police Management প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে হলে সাধারণত নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো থাকা প্রয়োজন:
-
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাধারণত, একটি স্নাতক ডিগ্রি (প্রথম বা দ্বিতীয় শ্রেণীর) প্রয়োজন।
- পেশাগত অভিজ্ঞতা: এই প্রোগ্রামটি মূলত পুলিশ বাহিনীর সিনিয়র সদস্যদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। তাই, আবেদনকারীর সাধারণত ৫ বছরের বেশি প্রাসঙ্গিক পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা প্রয়োজন।
- ইংরেজি ভাষার দক্ষতা: IELTS পরীক্ষায় ন্যূনতম ৭.৫ স্কোর প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি অংশে সর্বনিম্ন ৭.০ থাকতে হবে। TOEFL-iBT-তে ন্যূনতম স্কোর ১১৩ প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি অংশে সর্বনিম্ন ২৫ থাকতে হবে।
- আবেদন প্রক্রিয়া: আবেদন অনলাইনে জমা দিতে হয়। আবেদনের সাথে আপনার একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, একটি ব্যক্তিগত বিবৃতি (Statement of Purpose), সিভি এবং রেফারেন্স লেটার জমা দিতে হবে।
- সময়সীমা: আবেদন সাধারণত বছরের শুরুর দিকে অর্থাৎ জানুযথাত্র দিকে জমা দিতে হয়। সঠিক সময়সীমার জন্য আপনাকে প্রোগ্রামের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখতে হবে।
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইটঃ https://www.crim.cam.ac.uk/mst-applied-criminology-and-police-management-police-executive-programme
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)
UCL-এর MSc in Policing প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করতে হলে সাধারণত নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো প্রয়োজন:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: ক্রিমিনোলজি, সাইকোলজি, সমাজবিজ্ঞান, আইন বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক বিষয়ে একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর স্নাতক ডিগ্রি (Second-class) প্রয়োজন।
- পেশাগত অভিজ্ঞতা: যাদের পাঁচ বছরের বা তার বেশি প্রাসঙ্গিক পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারাও এই প্রোগ্রামের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতে পারেন।
- ইংরেজি ভাষার দক্ষতা: IELTS পরীক্ষায় ন্যূনতম ৭.০ স্কোর প্রয়োজন, যেখানে প্রতিটি অংশে সর্বনিম্ন ৬.৫ থাকতে হবে।
- আবেদন প্রক্রিয়া: আবেদন অনলাইনে করতে হয়। আবেদনের সাথে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, ব্যক্তিগত বিবৃতি (Statement of Purpose) এবং রেফারেন্স লেটার জমা দিতে হয়।
- সময়সীমা: সাধারণত, যারা ভিসা প্রয়োজন তাদের জন্য আবেদন জমা দেওয়ার সময়সীমা জুন মাসের শেষ দিকে এবং যাদের ভিসা প্রয়োজন নেই তাদের জন্য আগস্ট মাসের শেষ দিকে থাকে।
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইটঃ https://www.ucl.ac.uk/prospective-students/graduate/taught-degrees/policing-msc
রুহর ইউনিভার্সিটি বোখুম (Ruhr-Universität Bochum)
রুহর ইউনিভার্সিটি বোখুম-এর MA in Criminology, Criminalistics, and Police Science প্রোগ্রামের জন্য নিম্নলিখিত যোগ্যতাগুলো প্রয়োজন:
- শিক্ষাগত যোগ্যতা: আইন, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কমপক্ষে ২৪০ ECTS ক্রেডিটসহ একটি একাডেমিক ডিগ্রি প্রয়োজন।
- পেশাগত অভিজ্ঞতা: এই প্রোগ্রামের জন্য এক বছরের প্রাসঙ্গিক পেশাগত অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
- ইংরেজি ভাষার দক্ষতা: প্রোগ্রামের ভাষা জার্মান, তাই আবেদনকারীকে জার্মান ভাষার দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে।
- আবেদন প্রক্রিয়া: আবেদন সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অনলাইন পোর্টাল বা Uni-assist-এর মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
- সময়সীমা: আবেদন সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে জমা দিতে হয়। তবে, সুনির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখতে হবে।
- অফিসিয়াল ওয়েবসাইটঃ https://makrim.de/
এছাড়াও, পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের সুযোগও তৈরি হয়েছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) নিজস্ব ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে হস্তরেখা, ব্যালিস্টিক, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ক্রাইমসিন ম্যানেজমেন্টসহ মোট ১১টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় । একইসাথে, পুলিশ স্টাফ কলেজ সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে ১০ মাসের একটি স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্স (PGD in Cyber Security) অফার করে , যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলায় সহায়তা করে।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথে অন্তরায় ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ একটি বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মূলে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক, আর্থিক এবং সামাজিক বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা।
প্রথমত, কাজের চাপ ও সময়স্বল্পতা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয় । একজন পুলিশ সদস্যের কর্মজীবন ২৪/৭ প্রকৃতির, যা নিয়মিত ক্লাস বা গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করাকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কনস্টেবল ও নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য এটি আরও কঠিন। একইসঙ্গে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের জন্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতিমালা, ২০২৩’ প্রণীত হলেও , এই নীতিমালার আওতায় পুলিশ সদস্যদের জন্য অধ্যয়ন ছুটি বা আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর নির্দেশনা এখনো অপ্রতুল ।
দ্বিতীয়ত, আর্থিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা প্রশিক্ষণের মানকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারগুলোর মতো বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোতে অপর্যাপ্ত ক্লাসরুম, আবাসন এবং আইটি সুবিধা একটি বড় সমস্যা । উপরন্তু, প্রশিক্ষকদের জন্য অপ্রতুল সম্মানী অভিজ্ঞ রিসোর্স পার্সনদের আকর্ষণ করতে বাধা দেয়, যা প্রশিক্ষণের গুণগত মান কমিয়ে দেয় ।অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে প্রফেশনাল মাস্টার্স করার মতো আর্থিক সক্ষমতা সাধারণত তাদের থাকে না। ফলস্বরূপ, অনেক যোগ্য ও আগ্রহী পুলিশ সদস্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হন।
আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, পুলিশিং-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশার জন্য উচ্চশিক্ষা একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের জন্য এই পথচলার সূচনা হয়েছে, কিন্তু একটি সামগ্রিক ও সুসংহত পদ্ধতির মাধ্যমে এই সুযোগগুলোকে আরও বিস্তৃত করতে হবে। উচ্চশিক্ষার জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, এবং সর্বোপরি প্রভাবমুক্ত একটি যোগ্যতাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এই সকল পদক্ষেপ একটি শিক্ষিত ও পেশাদার পুলিশ বাহিনী গঠনে সহায়তা করবে, যা কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়ই নয়, বরং জনগণের আস্থা ও সম্মান অর্জনেও সক্ষম হবে। এতে করে পুলিশ বাহিনী সত্যিকার অর্থেই ‘জনতার পুলিশ’ হয়ে উঠবে এবং দেশ গঠনে অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
