রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল ভিত্তি পুলিশ বাহিনী। কিন্তু এই বাহিনী তখনই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, যখন তারা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, পুলিশ মানেই ভয়, পুলিশ মানেই দূরত্ব। অথচ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুলিশ হওয়ার কথা মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী বন্ধু।
কিন্তু ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন আমাদের সামনে এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে যে, আমরা কি পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে সে ধরনের আচরণ পেয়েছি?
উত্তর একেবারেই সোজা, ‘না’। এই ‘না’-এর কারণ ছিল বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রাণান্ত বাসনা। পুলিশকে ব্যবহার করা হয়েছিল ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে; জনগণের বন্ধু হিসেবে নয়। এজন্য এককভাবে পুলিশকে দায়ী করা অন্যায় হবে। কারণ জুলাই আন্দোলনের সময় তাদের চরম মূল্য চুকাতে হয়েছে বহু প্রাণের বিনিময়ে, যা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। পুলিশ বাহিনী বুঝে ওঠার আগেই ঘটনা এত দ্রুত তাদের ঘাড়ে এসে পড়ল, যা কিনা বাঘা বাঘা রাজনীতি বিশেষজ্ঞদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
জুলাই আন্দোলন ছিল জনগণের অধিকার, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক জাগরণ। এই আন্দোলনে যেমন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কোথাও সংযম, কোথাও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, এই দ্বৈত চিত্র আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ফলে একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও জনগণমুখী পুলিশ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট।
প্রথমত, আমরা এমন একটি পুলিশ বাহিনী চাই, যারা হবে জনগণের বন্ধু। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।” এই বিশ্বাস বা আস্থা একবার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। এখন এই বিশ্বাসের জায়গাটি পুনর্গঠন করাই পুলিশের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত। যখন মানুষ পুলিশের কাছে সাহায্য চাইতে ভয় পায়, তখন সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, পুলিশকে হতে হবে সম্পূর্ণ পেশাদার ও নিরপেক্ষ। কোনো রাজনৈতিক বা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জুলাই আন্দোলনে আমরা দেখেছি, নিরপেক্ষতার অভাব কীভাবে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। একটি আদর্শ পুলিশ বাহিনী কখনো পক্ষপাতদুষ্ট হয় না; তারা কেবল আইন ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেয়।
তৃতীয়ত, মানবাধিকার ও সহনশীলতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলন, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সভা-সমাবেশ, এগুলো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অধিকার। এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিত সহনশীল ও সংযত। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয়তাবাদী মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা মনে করেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের সেবা করতে হবে, তাদের দমন করার জন্য নয়। যদি পুলিশ বাহিনী নিরপেক্ষ, সৎ ও মানবিকভাবে কাজ করে, তাহলে সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তার দৃষ্টিতে পুলিশের আসল শক্তি অস্ত্র নয়, বরং জনগণের বিশ্বাস ও সহযোগিতা।’
চতুর্থত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। পুলিশের যে কোনো কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং অন্যায়ের জন্য তাদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। এতে একদিকে যেমন পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে বাহিনীর ভেতরেও শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে।
জুলাই আন্দোলন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে, জনগণ আর ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে চায় না; তারা একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ চায়। এই সমাজ গঠনে পুলিশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই আমাদের এমন একটি পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে, যারা হবে জনগণের আস্থার প্রতীক, ন্যায়বিচারের রক্ষক এবং মানবিকতার ধারক।
এক কথায় আমরা এমন পুলিশ চাই, যারা ক্ষমতার পাশে নয়, মানুষের পাশে দাঁড়াবে। জেন-জিদের স্লোগান ছিল, ‘ক্ষমতার পুলিশ নয়, জনতার পুলিশ চাই।’ তাদের সেই চাওয়াকে সম্মান জানাতে পুলিশের পোশাকে আনা হলো পরিবর্তন। কিন্তু পোশাকে পরিবর্তন আনলে কি স্বভাবে পরিবর্তন আসে?
ভয়ের দেয়াল ভেঙে আস্থার সেতুবন্ধ
রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো পুলিশ বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন, নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশ সরাসরি মানুষের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। তাই বলা হয়, রাষ্ট্রের মুখ সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা যায় পুলিশের মধ্যেই।
কিন্তু আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে, “বাঘে ছুঁলে ১৮ ঘা, আর পুলিশ ছুঁলে ৩৬ ঘা”, যা পুলিশ সম্পর্কে জনমনে গভীর ভয়, শঙ্কা ও অবিশ্বাসের প্রতিফলন। এই মানসিক দূরত্ব দূর করা এখন সময়ের দাবি। নেলসন ম্যান্ডেলা মনে করেন, “মানুষকে ভয় দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে জয় করতে হয়।” এই দর্শনই হওয়া উচিত আমাদের পুলিশ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
জনগণ এবং পুলিশের মধ্যকার ভয়ের এই সম্পর্ক কমিয়ে আনা খুব কঠিন কাজ বলে মনে হয় না। পুলিশের যেমন তার অবস্থান থেকে, প্রচলিত ধারণা থেকে সরে এসে জনগণের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া দরকার, তেমনি জনগণকেও সাহায্য গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশকে বোঝাতে হবে, একজন অসহায় মানুষের বিপদে-আপদে বিশ্বস্ত বন্ধু একমাত্র পুলিশ। তাহলেই কেবল প্রচলিত ভয়ের দেয়াল ভেঙে উঠতে পারে মৈত্রীর সেতুবন্ধ।
শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে পুলিশ
সিনেমা, নাটক, সাহিত্য এবং প্রবন্ধে পুলিশকে চিত্রিত করা হয় আতঙ্কিত বাহিনী হিসেবে। ইয়া বড় গোঁফ, উঁচু ভুঁড়ি, খাকি পোশাক পরা কিম্ভূতকিমাকার মানুষ মানে পুলিশ। সভা-সমাবেশ কিংবা বিক্ষোভ থামানোর জন্য বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে আসা মানুষটাকেই কেবল দেখানো হয় দমনকারী হিসেবে। এর আগে তাদের ওপর যে হামলা হয়, সেটা কোথাও দেখা যায় না।
সরকারি চাকরিতে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঘুষ লেনদেন একটি প্রচলিত ঘটনা থাকলেও দোষ পুরোটা যায় পুলিশের বিরুদ্ধে। জনমনে বদ্ধমূল ধারণা, পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গেলে টাকা লাগে, জিডি করতে গেলে টাকা লাগে আর এজাহার করতে গেলে তো কোনো কথাই নেই। থানার চৌহদ্দিতে ঢুকলেন তো আপনার বারোটা বাজল, এসব কথা আপনি হরহামেশা পাবেন প্রবন্ধে, নাটকে, যাত্রা এবং সিনেমায়। শিশুর ঘুমপাড়ানি গানেও আছে পুলিশের ভয়। দুষ্টুমি করলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। ফলে একটি শিশুও বেড়ে উঠছে পুলিশের ভীতিকর উপস্থিতিতে।
বিবর্তনের ধারায় পুলিশ
প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও রোমে শাসকগোষ্ঠী আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিশেষ বাহিনী নিয়োগ করত। তাদের পুলিশ না বলা হলেও দায়িত্ব ছিল সরকারকে পাহারা দেওয়া। প্রথম সুসংগঠিত পুলিশ বাহিনী প্যারিসে তৈরি হয় ১৬৬৭ সালে, যা আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে দেয়।
আরেকটি মত হলো, আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে। ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ রবার্ট পিল লন্ডনে মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ভারতে ব্রিটিশ বেনিয়ারা পুলিশ বাহিনী গঠন করেছিল একেবারে ৩৬০ ডিগ্রি কোণে। তাদের ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় পুলিশ ছিল মূলত শাসকের হাতিয়ার। জনগণের সেবা নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ ও দমনই ছিল প্রধান লক্ষ্য। এই মানসিকতা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে প্রভাব ফেলেছে।
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার মনে করেছিল, ভারতবর্ষ করতলগত রাখতে হলে তার একটি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দরকার, যাদের ভয়ে জনগণ যাতে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠে নামতে না পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে লর্ড ক্যানিং ১৮৬১ সালে পুলিশ কমিশন অ্যাক্ট করে পুলিশ বাহিনী গঠন করেন।
কেবল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমন করার জন্য পরবর্তীতে ১৯২৩ সালে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট করে পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই ক্ষমতাবলে ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা পুলিশের পোশাক পরে ব্রিটিশ সরকারকে রক্ষার জন্য সাধারণ মানুষের মাঝে একটা আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাখত।
তবে ব্যতিক্রম যে নেই, এ কথা বলা যাবে না। ব্রিটিশ শাসনামলের একজন পুলিশ অফিসার ধীরাজ মালাকারের কথা না বললেই নয়। তিনি একজন ভালো লেখক। তার লেখা ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ খুবই আলোচিত গ্রন্থ। সেই গ্রন্থে পুলিশ জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা শুধু নিয়ম প্রয়োগের বিষয় নয়; বরং এটি মানবিকতা, সাহস এবং নৈতিকতার এক কঠিন পরীক্ষা।
তিনি বলতে চেয়েছেন, বাইরে থেকে পুলিশি কাজ যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি চাপপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ এবং মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। অনেক সময় আইনের কঠোর প্রয়োগ ও মানুষের প্রতি সহানুভূতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্বই পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলতে চেয়েছেন, অপরাধ কেবল ব্যক্তিগত নয়; এর পেছনে দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো কারণও কাজ করে। পুলিশ ব্যবস্থার ভেতরে কিছু দুর্বলতা, চাপ ও অনিয়ম রয়েছে, যা সৎভাবে কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করে। তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও একজন সৎ পুলিশ সদস্যের প্রধান শক্তি হলো তার নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ।
যা-ই হোক, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে গেল। ভারত স্বাধীন হয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু পুলিশের আচরণের কোনো পরিবর্তন হলো না। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় প্রকাশ্যে গুলি করে ছাত্রদের হত্যা করা হলো। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, সবই দমন করার জন্য মাঠে ছিল পুলিশ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। পুলিশির ক্ষমতা কিছুটা কমল আধা সামরিক বাহিনী হিসেবে রক্ষী বাহিনী সামনে আসার কারণে। সেই রক্ষী বাহিনীও ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। ১৯৭৫ সালের মধ্য আগস্টে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই আধা সামরিক বাহিনী দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিল। আবার সামনে চলে আসে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশ। তারা কিন্তু জনগণের আত্মীয় হয়ে উঠতে পারল না। এই না পারার জন্য দায়ী অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসৌজন্যমূলক আচরণ। এগুলো মানুষের মনে ভয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে পুলিশকে এড়িয়ে চলতে চায়, যা একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান টেকে না
বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা।” আর পুলিশ সেই রাষ্ট্রেরই একটি কার্যকর বাহিনী। সুতরাং তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের সেবা করা।
মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, “জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান টিকতে পারে না।” পুলিশ বাহিনীর ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। জনগণের আস্থা অর্জন করতে না পারলে আইন প্রয়োগ কার্যকর হয় না।
যদিও খুবই পুরোনো, তারপরও প্রাসঙ্গিক, আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত উক্তি, “Government of the people, by the people, for the people.” এই দর্শনের আলোকে পুলিশকে জনগণের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে, শাসক হিসেবে নয়।
কমিউনিটি পুলিশিং উন্নত বিশ্বের মডেল
উন্নত বিশ্বে পুলিশ-জনগণের সম্পর্ক উন্নয়নে সবচেয়ে সফল ধারণাগুলোর একটি হলো কমিউনিটি পুলিশিং। এই মডেলে পুলিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী নয়, বরং সমাজের অংশীদার হিসেবে কাজ করে।
যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডাসহ অনেক দেশে পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাদের সমস্যা শোনেন এবং সমাধানে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে জাপানের “কোবান” পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য। সেখানে ছোট ছোট পুলিশ পোস্টে পুলিশ সদস্যরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ফলে অপরাধ কমে এবং জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশে প্রয়োগের সম্ভাবনা
বাংলাদেশেও কমিউনিটি পুলিশিং ধারণা চালু হয়েছে, তবে এটি আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করতে হবে। এজন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা তুলে ধরতে চাই:
মানসিকতার পরিবর্তন: পুলিশকে বুঝতে হবে, তারা জনগণের প্রভু নয়, বন্ধু। আচরণে সৌজন্য ও সহমর্মিতা থাকতে হবে।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন: মানবাধিকার, যোগাযোগ দক্ষতা, মনোবিজ্ঞান, এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এতে জনগণের আস্থা বাড়বে।
প্রযুক্তির ব্যবহার: ডিজিটাল সেবা, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদির মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব।
জনগণের অংশগ্রহণ: স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক কমিটি গঠন করে পুলিশ-জনগণের যৌথ উদ্যোগে সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে।
আস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা: বিশ্বাস ছাড়া কোনো সম্পর্ক টেকে না। পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কও এর ব্যতিক্রম নয়। যখন জনগণ পুলিশকে বন্ধু হিসেবে দেখবে, তখন অপরাধ প্রতিরোধ সহজ হবে।
উপসংহার
পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ের দেয়াল ভেঙে আস্থার সেতু গড়ে তুলতে হলে উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে একটি মানবিক, দায়িত্বশীল ও জনগণমুখী পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। পুলিশ যদি জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তবে জনগণও পুলিশের পাশে থাকবে। তখন আর “৩৬ ঘা”-এর ভয় থাকবে না, বরং গড়ে উঠবে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজব্যবস্থা।
লেখক
প্রাবন্ধিক

