বৃহস্পতিবার, মে ১৪, ২০২৬
28.2 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধপুলিশ সপ্তাহ ২০২৬অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ শনাক্তকরণে রাষ্ট্রের দায়, সংকট ও উত্তরণের পথ

অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ শনাক্তকরণে রাষ্ট্রের দায়, সংকট ও উত্তরণের পথ

মো. মোস্তফা কামাল
,

টাঙ্গাইলে আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে এক অটোচালককে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। খুনি সব আলামত মুছে ফেলে। তদন্ত চলতে থাকে,কিন্তু কোনো ক্লু পাওয়া যায় না। এভাবেই চলে যায় এক বছর। দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। আজ যদি ক্লু পাওয়া যায় পূর্বশত্রুতার, কাল দেখা যায় সেটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, আবার কোনো সময় জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ ধরেও পুলিশ এগোতে চায়, সেটাও একসময় কোনো প্রমাণের অভাবে হারিয়ে যায়। একপর্যায়ে আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্ত আসে পুলিশের বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন(পিবিআই)-এর কাছে।পিবিআইয়ের কয়েকজন চৌকস অফিসার এবার শুরু করেন তদন্তের নতুন অধ্যায়।চতুর্দিকে আসামি ধরার জন্য জাল ফাঁদে।কখনো পিবিআই অফিসার অটোচালকের ছদ্মবেশে, কখনো অটোছিনতাইকারী চক্রের ছদ্মবেশে, দেওয়ালের কান লাগানোর মতো গোয়েন্দা আড়ি পাতে। তার সাথে যুক্ত হয় পিবিআই-এর হাতে থাকা কিছু বিশেষায়িত প্রযুক্তির ব্যবহার।খুব দ্রুতই বেরিয়ে আসতে থাকে একটার পর একটা ক্লু।সেই ক্লু ধরে আবার এগোতে থাকে তদন্ত।একসময় সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চতুর্দিক থেকে আসা সকল ক্লু মিলিয়ে উদঘাটন করা হয় হত্যা রহস্য।ধরা হয় আসামিদের,যারা অটোছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রীবেশে অটোতে উঠে ছিনতাইয়ের সময় ভিকটিমকে জবাই করে হত্যা করে।পিবিআই কর্তৃক ক্লুলেস হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের ঘটনা এমন একটি-দুটি নয়, অসংখ্য। থানা পুলিশের গতানুগতিক অসংখ্য কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, অন্যদিকে এই জটিল লোমহর্ষক মামলাগুলোর ঘটনা উদঘাটনে প্রয়োজন নিবিড়ভাবে, খুবই সূক্ষ্ম জিনিসের প্রতি নজর দেওয়া এবং উন্নত ফরেনসিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তদন্ত।আর মূলত এই লক্ষ্য সাধনের জন্যই তদন্তের অধিকতর আধুনিক এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নিয়েই পিবিআই-এর জন্ম ২০১২ সালের শুরুর দিকে।শুরু থেকে পিবিআই বহু জটিল, গুরুতর ও ক্লুলেস মামলার তদন্তে নিজেদেরকে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সমমর্যাদায় নিজেদের তদন্ত সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।বিশেষত এমন অনেক অপরাধ, যেখানে প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গভীর অনুসন্ধানী সক্ষমতার প্রয়োজন হয়, সেখানে পিবিআই একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত পিবিআই মোট ২,৫৭,৩৫৩টি মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।এর মধ্যে ২,৪৮,০২০টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বর্তমানে ৯,৩৩৩টি তদন্তাধীন।এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে পিবিআই-এর কাজের ব্যাপকতা।তবে সাফল্যের পারদে যেমন পিবিআই অনন্য, কিন্তু বিশ্বমানের তদন্ত প্রতিষ্ঠান হতে গেলে দৃশ্যত এবং অভ্যন্তরীণভাবেও এখনো বহু সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতা পিবিআই-এর রয়েছে।এক্ষেত্রে বলতে হয়, যেকোনো অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তকরণের প্রশ্নটি তেমনই একটি ক্ষেত্র।যেকোনো অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ অর্থাৎ দৃশ্যত লাশটি দেখে চেনা যাচ্ছে না কী তার পরিচয়।এক্ষেত্রে কখনো লাশ বিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, কখনো মাথাবিহীন লাশ পাওয়া যায়, বা কখনো শরীরের বিভিন্ন অংশ পাওয়া যায়।এরকম ক্ষেত্রে লাশ শনাক্তকরণের একটি উদ্দেশ্য থাকে,যেমন লাশটি আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা এবং দাফন সম্পন্ন করা।একই সাথে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হয়ে যায় এই হত্যাকাণ্ডের বিচারকার্য সম্পন্ন করা।অর্থাৎ লাশটির পরিচয় উদ্ধার করা শুধুই মানবিক নয়, একই সাথে এটা বিচারকার্যেরও অংশ।রাষ্ট্রে যথাযথ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সভ্য সমাজের অন্যতম অনুষঙ্গ।অজ্ঞাতনামা লাশ শনাক্তে পিবিআইতে ২০১৯ সালে নিজস্ব AFIS (ফিঙ্গারপ্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন ও ভেরিফিকেশন সিস্টেম) ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়| এর মাধ্যমে পিবিআই মাত্র ৫ বছরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১,৫৭৭ জন পুরুষ এবং ৫৮৪ জন অজ্ঞাতনামা নারীর মৃতদেহ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এর সুফল শুধু তদন্ত কর্মকর্তা পাচ্ছেন, এমন নয়; বরং আগে যেখানে অজ্ঞাতনামা হিসেবে লাশ দাফন হতো, সেখানে এখন বহু পরিবার তাদের স্বজনদের লাশ খুঁজে পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিহতদের পরিচয় জানা যাওয়ার পর নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি মেনে দাফন করা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় উদ্ধারে এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে।

অজ্ঞাতনামা লাশ শনাক্তে পিবিআইতে ২০১৯ সালে নিজস্ব FIVeS (Fingerprint Identification and Verification System) ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে পিবিআই মাত্র ৫ বছরে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, প্রায় ১,৫৭৭ জন পুরুষ এবং ৫৮৪ জন অজ্ঞাতনামা নারীর মৃতদেহ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

কিন্তু এটাও সত্য, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের বিচারে বাংলাদেশ এখনো উন্নত বিশ্বের তুলনায় বহুগুণ পিছিয়ে। এ দেশের স্বল্পসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তার জন্য বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা লাশের পরিচয় উদ্ধার, শনাক্তকরণ এবং সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তদন্ত পরিচালনা করা এক প্রকার দুরূহই বলা চলে। আর রাষ্ট্রের দায়িত্বও শুধু সাফল্যের হিসাব তুলে ধরা নয়; সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি, যেখানে বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ, সাফল্যের আলো যত উজ্জ্বলই হোক, তার নিচের অন্ধকারকে উপেক্ষা করলে সমস্যার সমাধান হয় না।এই বাস্তবতায় সেই একই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, একই সময় প্রায় ৫,৭৭৫টি অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ যে প্রযুক্তি বহু পরিবারকে তাদের স্বজনের পরিচয় ফিরিয়ে দিতে পেরেছে, সেই প্রযুক্তিই বিপুলসংখ্যক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত হয়ে ওঠেনি। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো আসলে কোথায় এবং সেগুলো অতিক্রম করার দায়িত্ব কার?

ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক পরিচয় শনাক্তকরণ পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত, পরীক্ষিত এবং কার্যকর একটি পদ্ধতি। এর ভিত্তি বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। একজন মানুষের আঙুলের ছাপ স্বতন্ত্র, দীর্ঘস্থায়ী এবং বিশ্লেষণযোগ্য। এই কারণেই পরিচয় নির্ধারণে এর ব্যবহার বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

তবে বাস্তবে এর কিছু অনতিক্রম্য সীমা আছে। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির বয়স যদি ১৮ বছরের কম হয়, অর্থাৎ তিনি যদি বাংলাদেশের এনআইডি ডেটাবেজভুক্ত নিবন্ধিত ভোটার না হন, তাহলে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, কামার, কুমার, ধোপা, বাবুর্চি, ইটভাটার কর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ভিক্ষুক ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের আঙুলের রিজ ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় অনেক সময় ডেটাবেজের তথ্যের সঙ্গে ম্যাচ করে না।

তৃতীয়ত, অধিক বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের আঙুলের ত্বক পাতলা হয়ে যায় এবং এর ফলে কন্ট্রাস্ট কমে যায়, তাদের ছাপও অনেক সময় শনাক্ত করা যায় না।

চতুর্থত, আঘাত, পোড়া, কাটাছেঁড়া বা দুর্ঘটনার কারণে আঙুলের রিজ প্যাটার্ন আংশিক বা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেলে অথবা আগুনে পোড়া, পচা ও গলিত লাশের ক্ষেত্রেও মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

আর এই সীমাবদ্ধতাগুলোর কারণেই পিবিআইয়ের তদন্তকৃত অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের প্রায় ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। অর্থাৎ শুধু একটি মাত্র প্রযুক্তি বা পদ্ধতি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এই পরিসংখ্যান থেকে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে চলে আসে।কোনো মৃতদেহ পরিচয়হীন থেকে গেলে তা যে শুধু সেই ব্যক্তি ও তার কোনো মৃতদেহ পরিচয়হীন থেকে গেলে তা যে শুধু সেই ব্যক্তি ও তার পরিবারকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করে তা-ই নয়; বরং সংশ্লিষ্ট পরিবারকেও একটি দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। অনেক ক্ষেত্রে স্বজনেরা শেষ পর্যন্ত জানতেও পারেন না, তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনের কী পরিণতি হয়েছিল কিংবা তাঁকে ধর্মীয় ও সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগও পান না।

ফলে বিষয়টি আর শুধুই নিছক একটি পুলিশি প্রক্রিয়ার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না; একই সঙ্গে এটি হয়ে ওঠে মানবিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের বৃহত্তর প্রশ্ন। তাই অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ শনাক্তকরণের প্রশ্নে কয়েক ধরনের প্রযুক্তির সংযুক্তি ঘটাতে হবে, যাতে এক পদ্ধতিতে ব্যর্থ হলেও বিকল্প পদ্ধতিতে লাশ শনাক্তকরণের সুযোগ থাকে কিংবা ক্রসম্যাচ করার সুযোগ থাকে। আর এই প্রযুক্তির সমন্বয় করতে হবে এমনভাবে, যেন তা বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সম্পদের দেশের প্রেক্ষাপটে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে ডিএনএভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে আরও বৃহৎসংখ্যক মানুষের জন্য সহজলভ্য, কাঠামোবদ্ধ ও নাগরিক সেবাবান্ধব করা। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, সিআইডি, অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের ডিএনএ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে থাকে। এটি একটি সক্ষমতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

তার সঙ্গে যদি নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের ডিএনএ স্যাম্পল নিয়ে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল ডেটাবেজের সঙ্গে ক্রসম্যাচ করানো যায় এবং শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তের হার বৃদ্ধি পাবে। ফলে স্বজনদের ভোগান্তি কমবে এবং অজ্ঞাতনামা লাশ তার স্বজনদের কাছে দ্রুত হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।

যেহেতু এই ব্যবস্থাপনা কিছুটা ব্যয়বহুল, সে ক্ষেত্রে ভিকটিম পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট ফি রাখা যেতে পারে, যাতে নিখোঁজ জিডি করার পর পরিবারের স্বজনদের মধ্যে যে কেউ তার ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য সিআইডির কাছে আবেদন করে সংরক্ষিত অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারে।এর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তি এবং অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ-সংক্রান্ত তথ্যকে একটি সমন্বিত, সহজপ্রাপ্য এবং নিয়মিত হালনাগাদযোগ্য ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথম প্রয়োজন নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা লাশের তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা।

ছবি-সংবলিত নির্দিষ্ট তথ্যফরমের মাধ্যমে থানা, রেলওয়ে, হাইওয়ে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ইউনিট থেকে একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রেরণের ব্যবস্থা করা গেলে তথ্যের গুণগত মান বাড়বে। এরপর পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিআইডি, র‌্যাব ও পিবিআইয়ের তথ্যকে একটি সমন্বিত ডেটাবেজের আওতায় আনতে হবে, যাতে ছবি, শারীরিক বর্ণনা, উদ্ধারস্থল, সম্ভাব্য বয়স, পোশাক, আলামত এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য দ্রুত মিলিয়ে দেখা যায়।

কোনো অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি শনাক্ত হলে বা নিখোঁজ ব্যক্তি জীবিত ফিরে এলে সেই তথ্যও দ্রুত হালনাগাদ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেন তথ্যভাণ্ডারে অতিরিক্ত তথ্য না থাকে এবং তথ্যগুলো সব সময় প্রাসঙ্গিক থাকে।

অর্থাৎ সকল নিখোঁজ জিডির একটি কেন্দ্রীয় তালিকা থাকবে, যেখানে নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী তথ্য পূরণ করা হবে। এক ক্লিকের মাধ্যমে সকল নিখোঁজ জিডির তালিকা পাওয়া যাবে এবং অপশন অনুযায়ী তা দেখা যাবে, যেমন কোন জেলা, নারী না পুরুষ কিংবা বয়সভিত্তিক তথ্য। সে ক্ষেত্রে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সহজেই মৃতদেহের দৃশ্যমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে তথ্য মিলিয়ে দেখতে পারবেন।

একইভাবে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন তথ্যসমেত একটি কেন্দ্রীয় তালিকা থাকবে, যেখানে নিখোঁজ জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা সকল অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের প্রোফাইল দেখতে পারবেন। সর্বোপরি সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় উভয় তালিকার মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ম্যাচিং কিংবা সিনক্রোনাইজ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে উভয় তালিকার ব্যক্তিদের সম্ভাব্য বা কাছাকাছি মিল দেখানো যায়। ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তার কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।

মনে রাখতে হবে, তথ্য সংরক্ষণের প্রক্রিয়া প্রতিনিয়ত হালনাগাদযোগ্য। মৃত মৃত ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন:

মৃত ব্যক্তির তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তা নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অনুসরণ করতে পারেন:

  • ছবি, একাধিক
  • মামলার নম্বর, তারিখ ও ধারা
  •  বাদীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর
  • তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর
  • সুরতহাল তৈরির সময় উপস্থিত সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর
  • মৃত ব্যক্তির ডিএনএ প্রেরণ ও রিপোর্ট-সংক্রান্ত রেফারেন্স
  • ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রেরণের রেফারেন্স
  • মৃত ব্যক্তির সম্ভাব্য পরিচয়: পুরুষ/মহিলা
  • বয়স আনুমানিক
  • পুরুষ ব্যক্তির ক্ষেত্রে খতনার বিবরণ
  • দৈহিক গঠনের বিবরণ
  • উচ্চতা
  • শরীরে বিশেষ কোনো শনাক্তকরণ চিহ্নের বিবরণ, যেমন ট্যাটু, উল্কি, জন্মগত দাগ, দৃশ্যমান তিল বা আঁচিল, ঠোঁটকাটা, শরীরের কোনো পুরোনো কাটা বা অপারেশনের দাগ, মুখমণ্ডলে দৃশ্যমান দাগ, হাতের বা পায়ের আঙুল কম-বেশি বা জোড়া লাগানো ইত্যাদি
  • চুলের বিস্তারিত বর্ণনা: চুল বড়, ছোট, পাকা, সাদা-কালো, রঙিন বা বিশেষ হেয়ারকাট, টাকমাথা ইত্যাদি
  • দাড়ি-গোঁফের বর্ণনা
  • মৃতদেহের সঙ্গে প্রাপ্ত কাপড়চোপড়ের বর্ণনা
  • কপালে সিঁদুর বা অন্যান্য কোনো উল্লেখযোগ্য সাজসজ্জা
  • পরিহিত পোশাকের বিবরণ, যেমন শাড়ি, সালোয়ার, জিন্স প্যান্ট, কোট, টাই ইত্যাদি
  • বিশেষ মন্তব্য: মৃতদেহের সঙ্গে অন্যান্য বস্তুসামগ্রী পাওয়া গেলে, যেমন স্বর্ণালংকার, আংটি, তাবিজ, চেইন, লকেট, শাঁখা, চুড়ি, চশমা, কলম বা মোবাইল সেট থাকলে তার বর্ণনা,মানিব্যাগ বা অন্যান্য কাগজপত্র, রশিদ, আইডি কার্ড, কাপড়ের সঙ্গে লাগানো টেইলার্সের স্টিকার ইত্যাদি পাওয়া গেলে তার বর্ণনা অথবা অন্য কোনো বিশেষ কোনো কিছু যদি থাকে।
  • মৃতদেহ সৎকারের প্রক্রিয়া ও স্থান
  • যোগাযোগের ঠিকানা:
    যে ইউনিট কর্তৃক সর্বশেষ তদন্ত করা হয়েছে, সেই ইউনিটের নাম, ঠিকানা ও কন্টাক্ট নম্বর
    বার্তা প্রেরণ এবং প্রাপ্ত উত্তরগুলো সংরক্ষণ করবেন। থানা ও জেলার ফেসবুক পেজে এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। এছাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিম্নলিখিত তথ্য সংগ্রহ করবেন:

এ ছাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিম্নলিখিত তথ্য সংগ্রহ করবেন।এ ছাড়া গণমাধ্যমকে এ ক্ষেত্রে অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্তমানে অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ বা নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পত্রিকায় প্রকাশের যে ধারণা রয়েছে, তা ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় নিয়মিতভাবে.

  • তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর
  • পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স/সিআইডির বিশেষ কেন্দ্রীয় সেলের হেল্প ডেস্কের ঠিকানা ও নম্বর

কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। নিখোঁজ ব্যক্তির তথ্য পাওয়ামাত্র, কেউ জিডি করতে থানায় না এলেও, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে বিষয়টি ডায়েরি এন্ট্রি করবেন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য কার্যকর যোগাযোগ ও পত্রালাপ করবেন।আশপাশের থানা ও জেলার পাশাপাশি প্রয়োজনে পুরো বাংলাদেশে বার্তা পাঠাবেন। বার্তা প্রেরণ কার্যকর করা কঠিন। অথচ দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র এবং মিডিয়া হাউসগুলো যদি তাদের করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটির, সিএসআর, অংশ হিসেবে এ ধরনের তথ্য নির্দিষ্ট বিন্যাসে, নির্ধারিত স্থানে, নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে, তাহলে তা বহু পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা হতে পারে।

এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমকে আরও সংগঠিতভাবে এবং একটি নীতিমালার ভিত্তিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। এখন তথ্য মানুষের কাছে সবচেয়ে দ্রুত পৌঁছায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাতনামা মৃতদেহের তথ্য নিয়ে যদি যাচাইকৃত, দায়িত্বশীল এবং নিয়মিতভাবে পরিচালিত একটি সরকারি বা আন্তঃসংস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়, তাহলে অনুসন্ধানের ক্ষেত্র বহুগুণে প্রসারিত হবে। আর এই দায়িত্বটি পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা সিআইডিকে নিতে হবে। তবে এই ব্যবস্থায় গোপনীয়তা, তথ্যের সত্যতা এবং অপব্যবহারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সুস্পষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর থাকা আবশ্যক। কারণ তথ্য প্রচার দরকার, কিন্তু সেই প্রচার কখনোই মর্যাদাহানিকর বা বিশৃঙ্খল হতে পারে না।

পরিশেষে, অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ শনাক্তকরণের প্রশ্নকে আর কেবল প্রচলিত অবৈজ্ঞানিক সফলতা বা সীমাবদ্ধতার আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন একটি সমন্বিত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ, ডিজিটাল ডেটা অবকাঠামো, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরস্পর সংযুক্তভাবে কাজ করবে।

কারণ, একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ শুধু অপরাধ উদঘাটন নয়, পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়াও। আর একটি মানবিক ও আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার সাফল্য শুধু মামলার নিষ্পত্তিতে নয়, বরং এই নিশ্চয়তায়ও নিহিত যে, জীবিত বা মৃত, কোনো নাগরিকই রাষ্ট্রের সেবা এবং মর্যাদার পরিসীমার বাইরে পড়ে থাকবে না।

লেখক
অ্যাডিশনাল আইজিপি
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ