বুধবার, এপ্রিল ২২, ২০২৬
25 C
Dhaka

ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমআরওমানবিক পুলিশিংয়ের অঙ্গীকার:নতুন আইজিপির ভাবনা

মানবিক পুলিশিংয়ের অঙ্গীকার:নতুন আইজিপির ভাবনা

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

“সব ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে নেতৃত্ব, সহমর্মিতা
ও মানবিকতা বিবেচনায় রেখে সেবা দিতে হবে। তাহলেই পুলিশ হয়ে উঠবে
সত্যিকারের সেবাবান্ধব ও জনবান্ধব এক বাহিনী। গড়ে উঠবে দায়িত্বশীল ও
কল্যাণমূলক পুলিশ প্রশাসন।”
আইজিপি মোঃ আলী হোসেন ফকির

বাংলাদেশ পুলিশে মোঃ আলী হোসেন ফকিরের পেশাজীবন শুরু ১৯৯৫ সালে, ১৫তম বিসিএস ক‍্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার পদে যোগদানের মাধ্যমে। বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কাজ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে (এপিবিএন)। এছাড়াও দায়িত্ব পালন করেছেন কসোভো ও আইভরি কোস্টে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও।

উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) থেকে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতির পর সম্প্রতি তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি)। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার, আশু কর্তব্য, আধুনিক পুলিশের ভাবনা এবং জনগণ ও গণমাধ্যমের কাছে তাঁর প্রত্যাশা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন ডিটেকটিভের সাথে।

নতুন দায়িত্বকে কীভাবে দেখছেন?

আলী হোসেন ফকির: সরকার আমার ওপর আস্থা রেখে আমাকে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) দায়িত্ব দেওয়ায় আমি সম্মানিত বোধ করছি। এটা বিরাট দায়িত্ব; অঙ্গীকারও বলতে পারেন। এই অঙ্গীকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটিয়ে প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার। এই দায়িত্বকে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব বলে মনে করি। সরকার যে প্রত্যাশা থেকে আমার ওপর এই দায়িত্বভার অর্পণ করেছে— তা সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।

সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে সেবাবান্ধব ও জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে পুলিশকে গড়ে তোলা। কীভাবে এটা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?

আলী হোসেন ফকির: অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধ তদন্ত ও অপরাধ দমন পুলিশের প্রধানতম কাজ। পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পুলিশ কতটা দক্ষতার সাথে ও সঠিকভাবে করতে পারছে তার ওপর নির্ভর করছে পুলিশের সেবাবান্ধব হওয়ার বিষয়টি। পুলিশকে এই দায়িত্ব পালনের দক্ষতা ও সামর্থ্য অর্জন করতে হবে নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথাই যদি ধরুন, সেটা হতে হবে স্বচ্ছ ও দক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে, যাতে করে মানবিক, সৎ ও সেবার মানসিকতাসম্পন্ন কাউকে বেছে নেওয়া যায়। অর্থাৎ তার মধ্যে আদর্শ পুলিশ হওয়ার সহজাত কিছু গুণ যাতে থাকে। নিয়োগের পাশাপাশি বদলি-পদোন্নতিতেও স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। এ ছাড়া ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং মন্দকাজের জন্য শাস্তির যে বিধান সেটি নিয়মিত চর্চায় থাকা প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নিয়মিত পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। এতে করে একদিকে তারা দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে পুলিশিংয়ের বৈশ্বিক উত্তম চর্চা সম্পর্কে ধারণা পাবেন। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নৈতিক উন্নয়নেও যথাযথ কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরি সব ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সহমর্মিতা ও মানবিকতা বিবেচনায় রেখে সেবা দিতে হবে। তাহলেই পুলিশ হয়ে উঠবে সত্যিকারের সেবাবান্ধব ও জনবান্ধব এক বাহিনী। গড়ে উঠবে দায়িত্বশীল ও কল্যাণমূলক পুলিশ প্রশাসন।

বর্তমানে পুলিশের মনোবল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যেমন জরুরি, একইভাবে পুলিশের প্রতি জন-আস্থা ফিরিয়ে আনাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।কতটা চ্যালেঞ্জিং হিসেবে দেখছেন কাজ দুটিকে?

আলী হোসেন ফকির: পুলিশের মনোবলে যে ফাটল দেখা দিয়েছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পুলিশকে একটি কার্যকর বাহিনী হিসেবে দেখতে চাইলে এই ফাটল দূর করতে হবে। হ্যাঁ, কাজটা চ্যালেঞ্জিং, তবে অসম্ভব নয়। এরই মধ্যে পুলিশ সদস্যদের মনোবল ফেরানোর কাজ শুরু হয়েছে। মোটিভেশনাল কথাবার্তা বলা হয়েছে। আমি যখন এপিবিএনে ছিলাম তখন পুলিশ সদস্যরা ডিউটি করতে ভয় পেতেন। কিন্তু আমি তাদের বলেছিলাম আমরা আইন মেনে চলা নাগরিকদের পাশে থাকব। আর অপরাধীদের ব্যাপারে শতভাগ কঠোর হব। এখনো সে কথাই বলছি।
আপনারা দেখেছেন, ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তদারক করতে আমি নিজে মোহাম্মদপুর এলাকায় গিয়েছি। সেখানকার দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সাথে কথা বলেছি। আমার মনে হয়েছে, আমি নিজে যদি রাস্তায় থাকি তাহলে সহকর্মীরা আরও সক্রিয় হবেন এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা বাড়বে। এর মাধ্যমে একটা বার্তাও দিয়েছি—সাধারণ মানুষ পুলিশের পাশে রয়েছে এবং অপরাধী যে-ই হোক, কঠোরভাবে দমন করা হবে। এর মাধ্যমে একদিকে পুলিশের মনোবল বাড়বে, অন্যদিকে পুলিশের প্রতি নাগরিকদের আস্থাও ফিরে আসবে।

অবৈধ মাদকের ব্যবহার এবং পাচার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জননিরাপত্তায় অন্যতম বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। মাদক সমস্যা সমাধানকে কীভাবে দেখছেন?

আলী হোসেন ফকির: জননিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্য উভয় বিবেচনাতেই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন সমাজে কোনো মাদক থাকবে না। আমরাও মাদক নির্মূলকে প্রধানতম অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছি। কারণ মাদক আমাদের পুরো একটি প্রজন্মকে নষ্ট করে দিচ্ছে।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানকে আমরা আরও জোরালো করেছি। এ ছাড়া উপায়ও নেই, কারণ মাদক পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত পাচারের ধরন বদলাচ্ছে। অনেক সময় তারা মাদক পাচারে বৈধ যানবাহনের সাহায্য নেয় এবং অরক্ষিত রুটগুলো ব্যবহার করে। এটা প্রতিরোধে ফ্রন্টলাইন এজেন্সিগুলোর তীক্ষ্ণ দক্ষতা যেমন প্রয়োজন, একই সাথে প্রয়োজন শক্তিশালী সমন্বয়। এজন্য প্রশিক্ষণ দরকার এবং সেগুলো আমরা দিচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের পুলিশ বাহিনীও মাদক প্রতিরোধে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর। অভিভাবকদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে মাদক প্রতিরোধে আপনারা সবাই সহযোগিতা করবেন। আপনাদের সন্তানরা কে কোথায় কার সাথে মিশছে একটু খেয়াল রাখবেন।

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন নিয়ে কথা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

আলী হোসেন ফকির: পুলিশের সবাই চাচ্ছেন একটি দৃশ্যমান পোশাক। কারণ আমরা যখন বাইরে ডিউটি করতে যাই, বর্তমানে যে পোশাকটা আমরা পরছি তা সেভাবে মানুষের চোখে পড়ে না। তাই আমরা চাচ্ছি দৃশ্যমান পোশাক, সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে একটা ভাবনা আছে।তবে শুধু পোশাক বদলালেই হবে না, পুলিশে মনের পরিবর্তন করতে হবে। পুলিশে যারা আছেন তাদের হৃদয় যদি প্রকৃত সেবক হিসেবে কাজ করতে না চায়, তাহলে যত ভালো পোশাকই দেওয়া হোক না কেন, যা-ই করা হোক না কেন কাজ হবে না। আগে আপনার মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব থাকতে হবে।

ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো রাজধানীর দীর্ঘদিনের সমস্যা। এতে পথচারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ফুটপাতগুলো দখলমুক্ত করতে পুলিশ কী উদ্যোগ নিচ্ছে?

আলী হোসেন ফকির: ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ বিভিন্ন সময় নেওয়া হলেও তা খুব যে ফলপ্রসূ হয়েছে বলব না। ফুটপাতে দোকানপাট বসানোর ক্ষেত্রে এলাকার প্রভাবশালী লোকদের বিরুদ্ধে চাঁদা তোলার অভিযোগ আছে। এর কিছু সত্যতাও রয়েছে। এ ছাড়া আমাদের প্রশাসনের লোকদের বিরুদ্ধেও দুর্নামের অভিযোগ রয়েছে। তবে এবার আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করার ব্যাপারে খুবই কঠোর।
প্রথমে দোকানপাটের মালিকদের নিরুৎসাহিত করব। ফুটপাত থেকে চলে যাওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেব। তবে সরিয়ে দিলেই তো হবে না। তাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এজন্য আমরা সরকারের বিভিন্ন অংশীজন যারা আছেন, তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করব, যাতে এলাকায় এলাকায় হলিডে মার্কেট করে দেওয়া যায়।

পুলিশ অনলাইনে জিডি করার সুবিধা চালু করেছে। একে আরও সম্প্রসারণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

আলী হোসেন ফকির: শুধু সাধারণ ডায়েরি বা জিডি নয়, দেশব্যাপী থানাগুলোতে অনলাইন পদ্ধতিতে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ সৃষ্টি করাও বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, ফৌজদারি বিচার প্রার্থীদের প্রকৃত অর্থে আইনের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। বিশ্বের বহু সমস্যারই সমাধান এনে দিয়েছে প্রযুক্তি। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাই বা এই সুবিধা গ্রহণ করবে না? এফআইআর রেজিস্ট্রেশনের যে জটিল ও কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়া, তার সমাধান হিসেবে এ-এফআইআর-এর ধারণাটি সামনে এসেছে। কোনো ভুক্তভোগী তার অভিযোগ আপলোড করার সাথে সাথে কার্যকরী ব্যবস্থা কোনো ধরনের দুর্নীতি, অপেশাদার আচরণ কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডকে প্রশয় দেওয়া হবে না। বাহিনীর ভেতরে কেউ যদি এ ধরনের অপরাধে জড়ায়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

“কোনো ধরনের দুর্নীতি, অপেশাদার আচরণ কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডকেই প্রশয় দেওয়া হবে না। বাহিনীর ভেতরে কেউ যদি এ ধরনের অপরাধে জড়ায়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের পেশাদারিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”

অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে আসছেন এবং একই অপরাধে তারা আবারও জড়িয়ে পড়ছেন। এই অপরাধীদের, বিশেষ করে কিশোর অপরাধীদের নিবৃত্ত করার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আপনার আছে কি না?

আলী হোসেন ফকির: এটা ঠিক যে, চাঁদাবাজ-ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি বা কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার অল্প দিনের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে এসে একই অপরাধে আবার জড়িয়ে পড়ছে। জামিনে বেরিয়ে আবারও যাতে তারা অপরাধে না জড়ায় সেজন্য একটি উদ্যোগ আমরা নিয়েছি। এলাকাভিত্তিক এসব অপরাধীর একটি তালিকা আমাদের কাছে থাকবে। সেই তালিকা অনুযায়ী, জামিনে বেরিয়ে আসার পর প্রতি সপ্তাহে তারা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছে হাজিরা দেবে এবং বলবে যে, আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছি এবং সেভাবেই জীবনযাপন করছি। পুলিশ তাদের ওপর বিশেষ নজর রাখবে। এই প্রক্রিয়াটা আমরা শুরু করেছি।

এটা তো প্রতিরোধ এবং সমস্যা-পরবর্তী সমাধানভিত্তিক পদ্ধতি। কিন্তু কিশোর অপরাধের একেবারে মূলে গিয়ে সমস্যাটি সমাধানের কোনো উপায় আছে?

আলী হোসেন ফকির: লঘু অপরাধে জড়িত কিশোরদের সংশোধনে বিশ্বব্যাপী পদ্ধতিগত পরিবর্তন হচ্ছে। এক্ষেত্রে কঠোর দণ্ডমূলক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে প্রতিকারমূলক বিচার (রেস্টোরেটিভ জাস্টিস) ও পুনর্বাসনমূলক পদ্ধতি গ্রহণ করা হচ্ছে। টোকিও রুলস, ১৯৯০ নামে পরিচিত জাতিসংঘের স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর নন-কাস্টোডিয়াল মেজারসে কিশোর অপরাধীদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে পরামর্শ প্রদান, শর্তাধীন মুক্তি এবং বিকল্প সংশোধনমূলক কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে। নরওয়ে এবং সুইডেনের মতো দেশগুলো বিকল্প সংশোধনমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে শুরুতেই প্রতিকারের ওপর জোর দিয়ে থাকে।

বিকল্প সংশোধনমূলক কর্মসূচির মধ্যে বিভিন্ন বিষয় থাকতে পারে। প্রতিকারমূলক বিচার সভা, ভুক্তভোগী ও অপরাধীদের মধ্যে সমঝোতা এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের কথা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে নরওয়েতে কিশোর অপরাধীদের আনুষ্ঠানিক বিচারের পরিবর্তে সমাজসেবায় সম্পৃক্ত করা হয়। তাতে কিশোর অপরাধীদের মধ্যে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর হার কমে যেতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যে কিশোর অপরাধের মূল কারণগুলো সমাধানের লক্ষ্যে ইয়ুথ জাস্টিস সিস্টেমে কিশোর সংশোধন পর্ষদ এবং সামাজিক পুনর্বাসন আদেশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো মূলত কিশোরদের জেল-জুলুমের বদলে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে আনার প্রাতিষ্ঠানিক উপায়। একইভাবে নিউজিল্যান্ডে চিলড্রেন, ইয়াং পারসন্স অ্যান্ড দেয়ার ফ্যামিলিজ অ্যাক্ট, ১৯৮৯-এর আওতায় ফ্যামিলি গ্রুপ কনফারেন্স মডেল পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো লঘু কিশোর অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে।

ফ্যামিলি গ্রুপ কনফারেন্স মূলত নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে আসা একটি বিচারিক ধারণা, যা এখন সারা বিশ্বে জনপ্রিয়। এই পদ্ধতিতে যখন কোনো কিশোর অপরাধ করে তখন কেবল পুলিশ বা আদালত নয়, বরং ওই কিশোরের পুরো পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং ভুক্তভোগী পক্ষকে এক জায়গায় বসানো হয়। এরপর পরিবার নিজেই আলোচনা করে তাদের সন্তানকে কীভাবে শোধরানো যায় এবং ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায় সেই সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের দেশেও গ্রামীণ সালিশের মতো এক ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে। পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অন্তর্ভুক্ত করে একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

কিশোর অপরাধ প্রতিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং। এই পদ্ধতিতে কিশোর অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধান করা হয় পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। বাংলাদেশ পুলিশ এই কাজটি করে যাচ্ছে।

বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে প্রবেশ করছে। কীভাবে একে পুলিশিংয়ে ব্যবহার করা যায়? এ ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী?

আলী হোসেন ফকির: এমন অনেক কাজ আছে যেগুলো এআই-এর মাধ্যমে করা যায়। এর ফলে কাজের চাপ কমে যায় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মানবসম্পদ আরও দক্ষভাবে কাজে লাগাতে পারে। পুলিশেরও এমন অনেক কাজ আছে, যেগুলো এআই-এর সাহায্যে করা যায়। যেমন স্বয়ংক্রিয় ক্রিমিনাল প্রোফাইলিং, সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ফেসিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ, বিশাল তথ্যভাণ্ডার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুততম সময়ে বের করে আনা, ভিডিও ও কল রেকর্ডিং বিশ্লেষণে ভয়েসকে টেক্সটে রূপান্তরকরণ, কোথাও কোনো প্রতারণার সম্ভাবনা আছে কি না তা চিহ্নিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েব ট্রাফিক মনিটরিং, এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ শনাক্তকরণ।

এ ছাড়া উৎসবের সময় ট্রাফিক ঘনত্ব ও দুর্ঘটনার স্পট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া, যানবাহনের গতি শনাক্তকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান প্রবণতা জানতেও এআই-এর সাহায্য নেওয়া যায়। পাশাপাশি এআইভিত্তিক ই-এফআইআর ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘটনার ধরন অনুযায়ী অভিযোগগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রেণীকরণ করা যায়। এআইচালিত পুলিশ চ্যাটবট প্রায়ই আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রদান, অভিযোগ নিবন্ধন ও হালনাগাদ তথ্য দিতে পারে।

এর বাইরেও পুলিশিংয়ের আরও নানা ক্ষেত্র আছে, যেগুলোতে এআই-এর ব্যবহার করা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ পুলিশ এআই-এর ব্যবহার করছে। বাকি ক্ষেত্রগুলোতেও পর্যায়ক্রমে এআই-এর ব্যবহারের দিকে আমরা যাব।

এজন্য তো প্রস্তুতি দরকার। কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

আলী হোসেন ফকির: বর্তমান যুগে এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। একে পুলিশ সংস্থার অংশ করে তুলতে হবে। এটা শুরু করতে হবে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে এআই লিটারেসি সম্পর্কে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল থেকে শুরু করে সাইবার উইংয়ের পরিদর্শক পর্যন্ত সবাইকে জানতে হবে এআই কী, এটা কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে তার কাজে আসতে পারে।

এই প্রশিক্ষণ সবার জন্য একই রকম হবে এমন নয়। ভিন্ন ভিন্ন পুলিশ সদস্য বা ইউনিটের জন্য প্রশিক্ষণের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। বিট পুলিশের প্রশিক্ষণ হবে এআই ব্যবহার করে কীভাবে বিট রিপোর্টিং ও নথিকরণ করা যায় তার ওপর। তদন্ত কর্মকর্তার প্রশিক্ষণ হবে কীভাবে এআই ব্যবহার করে অভিযোগপত্র তৈরি করা যায় তার ওপর। এসব প্রশিক্ষণ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; বাস্তব অনুশীলন থাকতে হবে। প্রযুক্তিদক্ষ, সেবাবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারকদের নিশ্চয় এদিকে মনোযোগ থাকবে বলে আমি আশা করি। একটা কথা মনে রাখতে হবে—এআই কোনো ম্যাজিক নয়; এটি একটি শক্তিশালী টুল, যা পুলিশের কাজকে আরও নিখুঁত ও সহজ করে দেবে।

সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্বজুড়েই যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে এবং উত্তরোত্তর এর ব্যবহার বাড়ছে। এই বিবেচনায় পুলিশিংয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পুলিশিংয়ে কীভাবে মাধ্যমটির সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব?

আলী হোসেন ফকির: সোশ্যাল মিডিয়া বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফেসবুক, এক্স (টুইটার), হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, লিঙ্কডইন, টিকটকের মতো অ্যাপগুলো এখন ব্যক্তি ও দলগত যোগাযোগের এভিনিউ হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে; গণতান্ত্রিক চর্চাসহ জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যা বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। একই সাথে পুলিশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে এসব সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ। নেতিবাচক বয়ানের মাধ্যমে অনেক সময় পুলিশের নামে কুৎসা ছড়ানো হয়, যা সংস্থাটির ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সত্যতা যা-ই থাকুক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এ ধরনের পোস্ট মানুষের মনে দাগ কাটে এবং পুলিশের ওপর তাদের আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরায়। এ ধরনের প্রবণতা কমিউনিটি পুলিশিংকে বিশেষভাবে বাধাগ্রস্ত করে, কারণ এই পুলিশিংয়ের উদ্দেশ্যই হচ্ছে কোনো অপরাধ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধের উদ্বেগকে দূর করতে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে অংশীদারিত্ব ও যৌথতা গড়ে তোলা।
পুলিশের সামান্য বিচ্যুতি বা ছোটখাটো ঘটনাও অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় করে দেখানো হয়। ভিজ্যুয়াল ও ডিজিটাল মিডিয়াও এর সাথে কণ্ঠ মেলায় এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ এমনকি মাসের পর মাস পুলিশকে আক্রমণ চলতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য অনেক সময় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং সমগ্র সংস্থাকে এর ভুক্তভোগী হতে হয়। আবার কোনো পুলিশ সদস্য বা তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রশ্নবোধক পোস্টও দেওয়া হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু কোড অব কন্ডাক্টের কারণে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকে সীমিত।

বলতে গেলে পুলিশিংয়ের সব ক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। পুলিশিংয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চ্যালেঞ্জ যেহেতু জটিল এবং বহুমুখী, তাই এ থেকে পরিত্রাণে পুলিশের অন্যতম প্রধান কাজ হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানো। এই দক্ষতা অর্জনের প্রধানতম উপায় হচ্ছে প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সংক্রান্ত যে নীতিমালা আছে তার ওপরও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। পাশাপাশি পুলিশ কর্মকর্তাদের সাইবার জগতের নতুন প্রযুক্তিগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। তবে নতুন উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ওপর ভর করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। তাই এককালীন প্রশিক্ষণ এখানে যথেষ্ট নয়। এই জায়গাটাতে আমাদের কাজ করতে হবে।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে পুলিশকে কাজ করতে হয়। এসব সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

আলী হোসেন ফকির: ঠিকই বলেছেন। আমাদের মতো জনবহুল দেশে পুলিশকে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়, কারণ আমাদের সম্পদ সীমিত। ঐতিহাসিকভাবেই পুলিশিং একটি অত্যধিক মানসিক চাপের পেশা। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় পুলিশকে সহিংসতা, ট্রমা ও ব্যক্তিগত ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব পড়ে। অনেক থানা আছে যেগুলোকে স্বল্প জনবল নিয়ে কাজ করতে হয়। এই ঘাটতি কেবল পুলিশ সদস্যদের কর্মঘণ্টাই বাড়িয়ে দেয় না, জননিরাপত্তাকেও হুমকির মধ্যে ফেলে এবং পুলিশের শারীরিক ও মানসিক অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রভাব পড়ে তাদের মনোবলের ওপর। জনবল স্বল্পতা মামলার তদন্তকেও বাধাগ্রস্ত করে এবং তদন্তাধীন মামলার স্তূপ জমে যায়। অপ্রতুল বেতন-ভাতাদি অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও চাকরি নিয়ে অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বলা হয়ে থাকে যে, উন্নত পুলিশিং নির্ভর করে উন্নত বেতন-ভাতাদির ওপর। স্বল্প বেতন-ভাতাদি পুলিশ-কমিউনিটি সম্পর্ককে খারাপ করে। তাছাড়া বেতন-ভাতাদি অপর্যাপ্ত হলে আয় বাড়াতে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কাজের ক্ষেত্রে বাহ্যিক চাপ একটা বড় প্রতিবন্ধকতা। থানাগুলোতে যানবাহনের স্বল্পতাও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে প্রশিক্ষণ। আর্থিক অপরাধ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সাইবার ক্রাইমের মতো বিষয়গুলো প্রতিরোধে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। পুলিশের যে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, তা এসব ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। আমাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে, যেখানে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রাধান্য পাবে। সেই সাথে পুলিশ কারিকুলামে নতুন নতুন সামাজিক সমস্যা এবং হুমকিগুলোও অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। দূরবর্তী স্থানে পদায়নের কারণে পুলিশ সদস্যদের পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়, যা তাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন আরও সুসমন্বিত নীতি-কৌশল। উন্নত অবকাঠামো ও পুলিশ সদস্যদের পর্যাপ্ত সুবিধাদি সরবরাহের মাধ্যমে কর্মপরিবেশের উন্নয়ন করার বিকল্প নেই। পুলিশ সদস্যদের ন্যায্য বেতন-ভাতাদি নিশ্চিত করা গেলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর থেকে আর্থিক চাপ কমে যাবে। এতে করে কাজ নিয়ে সন্তুষ্টি বাড়বে এবং তারা নৈতিক আচরণে উৎসাহিত হবেন। এআই, সাইবারক্রাইম এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ তাদেরকে আরও শক্তিশালী করবে। লিঙ্গসমতা ও বৈচিত্র্যের উদ্যোগ বাহিনীতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ সৃষ্টি করে। সর্বোপরি সুচিন্তিত ও ন্যায়সঙ্গত পদায়ন নীতি, সুসজ্জিত থানা ভবন, উপযুক্ত ব্যারাক ও আবাসন সুবিধা এবং পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধির পরিকল্পনা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি। এগুলো নিশ্চিত করা গেলেই নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার যে মহান দায়িত্ব পুলিশের ওপর অর্পিত হয়েছে তা তারা পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করতে পারবে। সেই সাথে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারবে। আইজিপি হিসেবে এগুলোর প্রতি আমি বিশেষ নজর দিতে চাই, যাতে করে দেশ একটি সত্যিকারের আধুনিক ও ন্যায়ানুগ পুলিশ বাহিনী পেতে পারে। আশার কথা হলো, জনবল ঘাটতি দূর করতে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে।

গণমাধ্যমের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী?

আলী হোসেন ফকির: সাধারণ মানুষের চারপাশে এখন নানা ধরনের মিডিয়া এবং তথ্যের স্তূপ, যা আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিতদের সম্পর্কে একটি ইমেজ গঠনে সাহায্য করে—তা ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক। সেদিক থেকে দেখলে গণমাধ্যমের প্রভাব ব্যাপক। কারণ অপরাধ সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে গণমাধ্যম হচ্ছে প্রধান শক্তি। সর্বব্যাপী বৈশিষ্ট্যের কারণে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে জনগণের মনোভাবকেও প্রভাবিত করে গণমাধ্যম। অর্থাৎ পুলিশ সম্পর্কে জনগণের ধারণার প্রাথমিক উৎস হচ্ছে গণমাধ্যম।গণতান্ত্রিক একটি সমাজে পুলিশ এবং গণমাধ্যম উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উভয়েরই উদ্দেশ্য অভিন্ন—তা হচ্ছে সাধারণ জনগণকে সেবা দেওয়া। পুলিশ এবং যে সীমাবদ্ধতার মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা কমই থাকে। পুলিশ-জনগণের মধ্যকার এই সম্পর্কে ইন্টারফেস হিসেবে কাজ করতে পারে গণমাধ্যম। এটা আরও উন্নত করতে প্রয়োজন পুলিশ ও সাধারণ মানুষের কণ্ঠ গণমাধ্যমের মধ্যে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া।গণতান্ত্রিক সমাজে পুলিশ ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক সবসময় ভ্রাতৃত্বপূর্ণ হবে এমন নয়। তবে পরস্পরের মধ্যে ন্যূনতম বোঝাপড়া ও একে অপরের ভূমিকার প্রশংসা করা উচিত। তাই গণমাধ্যমের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে তারা যেন গঠনমূলক সমালোচনার পাশাপাশি সঠিক পরামর্শ দিয়ে পুলিশকে আরও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। আমরা পুলিশ বাহিনী হিসেবে প্রস্তুত আছি জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে এবং গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সাথে কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে। এই সম্পর্কই হবে আগামীর বাংলাদেশের ভিত্তি।

আইজিপি হিসেবে জনগণের প্রতি কী আহ্বান জানাবেন?

আলী হোসেন ফকির: জনগণের সহযোগিতা ছাড়া পুলিশের একার পক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। পুলিশের কাজে জনগণের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। জনগণের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, পুলিশের কাজে সহায়তা করুন। পুলিশ আপনাদের বন্ধু; শত্রু নয়। পুলিশ সবসময়ই আইন মেনে চলা নাগরিকদের পাশে রয়েছে। একইভাবে অপরাধীদের কারণে সাধারণ নাগরিকের জীবনযাপন যাতে বিঘ্নিত না হয় সে ব্যাপারেও সচেষ্ট রয়েছে পুলিশ।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আলী হোসেন ফকির: ডিটেকটিভকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত আইজিপি জনাব মোঃ আলী হোসেন ফকির দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত আইজি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে তিনি পুলিশ সার্ভিসে প্রবেশ করেন।কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি ১৫তম বিসিএস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচের আহ্বায়ক।জনাব মোঃ আলী হোসেন ফকির ১৯৬৮ সালের ৫ এপ্রিল বাগেরহাট জেলার সদর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ