শিশু সুরক্ষা কোনো দাতব্য কাজ নয়; এটি মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (ইউএনসিআরসি) এবং বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩, এই দুটি আইনি কাঠামো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি শিশুই নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং ভালোবাসার অধিকারী। কিন্তু বাস্তব জীবনে শিশুদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা ও শোষণ এখনো একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। এই প্রেক্ষাপটে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, বিশেষ করে পুলিশের, দায়িত্ব অনেক। কারণ, আধুনিক পুলিশিং ধারণায় পুলিশকে শুধু অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশের রক্ষক ও অভিভাবক হিসেবেও কল্পনা করা হয়।
জাতিসংঘের “পলিসি অন চাইল্ড প্রোটেকশন” স্পষ্টভাবে বলে, কোনো পুলিশ, শান্তিরক্ষী বা সামরিক সদস্য শিশুর প্রতি কোনো ধরনের শারীরিক, মাশিশু আশ্রয়কেন্দ্রকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে বাংলাদেশ শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশুকে অপরাধী হিসেবে দেখা যাবে না; বরং তাকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পুলিশের দায়িত্ব শিশুকে রক্ষা করা, উদ্ধার করা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, যাতে তার ভবিষ্যৎ নিরাপদ থাকে।
যখন কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হয়, নিখোঁজ হয়, বা মানব পাচারের জালে জড়িয়ে পড়ে, তখন পুলিশের প্রথম প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করে শিশুটির পরবর্তী জীবনের গতিপথ। জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের সময় শিশুর পাশে তার অভিভাবক বা সমাজসেবা বিভাগের প্রতিনিধি থাকতে হবে, এবং প্রশ্ন করতে হবে সহানুভূতিপূর্ণ ও সহজ ভাষায়। শিশুর গোপনীয়তা সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করতে হবে; তার নাম, ছবি বা পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না। একই সাথে, শিশুর মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা দেওয়া জরুরি। এসব নিয়ম কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি মানবিক দায়িত্বও বটে।
পুলিশ সদস্যদের মধ্যে “চাইল্ড সেনসিটিভ পুলিশিং” চর্চা করা এখন সময়ের দাবি। এজন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, যাতে তারা শিশুর মানসিকতা, ট্রমা ও সংবেদনশীলতা বুঝতে শেখেন। থানায় শিশু সহায়তা ডেস্ক চালু করা, নারী ও পুরুষ কর্মকর্তা উভয়কেই প্রশিক্ষিত করা, এবং শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এনজিওগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করা, এসব পদক্ষেপ পুলিশকে আরও কার্যকর ও মানবিক করে তুলবে।
একই সাথে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি। যদি কোনো পুলিশ সদস্য শিশু নির্যাতন, শোষণ বা যৌন হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসারে কঠোর ব্যবস্থা নিতেনসিক বা যৌন নির্যাতন করতে পারবে না। তাছাড়া, তারা কোনো অবস্থাতেই স্কুল, হাসপাতাল বা হবে। এজন্য পুলিশ সদর দপ্তরে একটি চাইল্ড প্রোটেকশন ওভারসাইট সেল গঠন করা যেতে পারে, যা এসব অভিযোগের দ্রুত তদন্ত ও সমাধান নিশ্চিত করবে।শিশু সুরক্ষার এই প্রচেষ্টা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়। এখানে সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব, সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। জাতিসংঘ যেমন বহুপাক্ষিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী, তেমনি বাংলাদেশেও পুলিশকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের সঙ্গে অংশীদারিত্বে একটি সুরক্ষার জাল গড়ে তুলতে হবে। থানায় নিয়মিত শিশু-অভিভাবক সভা, স্কুলে সচেতনতা কার্যক্রম, গণমাধ্যমে প্রচার, এসব উদ্যোগ সমাজে শিশুবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে।
শেষ পর্যন্ত, শিশু সুরক্ষা কেবল আইন নয়, এটি মানবিকতার পরীক্ষা। একজন পুলিশ সদস্য যখন কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ নয়, বরং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে কোনো ভীত শিশুর চোখে আস্থা ফিরিয়ে আনেন, সেই মুহূর্তেই ন্যায়বিচারের প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠে। একটি শিশুর নিরাপত্তা মানে কেবল তার শরীরের সুরক্ষা নয়, তার আত্মবিশ্বাস, তার স্বপ্ন এবং তার ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রতিশ্রুতি। তাই বলা যায়, শিশুর হাসি ফিরিয়ে আনার প্রতিটি প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মানবিক মুখকে প্রকাশ করে।
