কাকন বাহিনী—একটি নাম, যা উচ্চারণ করলেই চরবাসীদের কণ্ঠ শুকিয়ে যেত, চোখে ভয় জমে যেত। হাসানুজ্জামান কাকন, যাকে সবাই ডাকত ‘ইঞ্জিনিয়ার কাকন’—সুশিক্ষিত, সৌদি ফেরত, মুখে ধর্মের বুলি, কিন্তু ভেতরে এক নৃশংস, ঠান্ডা মাথার খুনি।এক সময় পান্না বাহিনীর ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি, পান্নার মৃত্যুর পর হয়ে ওঠে পদ্মার অঘোষিত শাসক। তার বাহিনী নদীর চরে কুয়াশা ভেদ করে চলত স্পিডবোটে; হাতে বিদেশি রাইফেল, গলায় ওয়াকিটকি, চোখে কালো সানগ্লাস।বলা হয়, পদ্মার চরগুলোতে সন্ধ্যার পর কুকুরও ঘেউ-ঘেউ করত না—কাকনের অনুমতি ছাড়া। রাত নামলে দূর থেকে দেখা যেত চরজুড়ে জ্বলে থাকা আগুনের রেখা; ওগুলো ছিল কাকনের সৈনিকদের ‘সিগন্যাল ফায়ার’। সেই আগুনের মানে ছিল: “আজ কেউ বাঁচবে না।”কাকন বাহিনীর স্পিডবোটে আঁকা থাকত কালো ঈগলের চিহ্ন; স্থানীয়রা বলত, ওটা দেখলেই মৃত্যু আসে। তার লোকেরা প্রতিদিন ড্রেজার ঘাটে গিয়ে ইজারার নামে টাকা আদায় করত; না দিলে মারধর, গুলি, কখনো নদীতে ফেলে দিত।
রাত তখনও শেষ হয়নি, কিন্তু আকাশের পূর্ব দিগন্তে ফ্যাকাসে আলো ফুটতে শুরু করেছে। পদ্মার বুকজুড়ে ঘন কুয়াশা, নদীটা নিঃশব্দ—তবু সেই নীরবতার ভেতর যেন লুকিয়ে আছে এক অজানা তুফান। দূর থেকে ভেসে আসে মোটরের মৃদু শব্দ, যেন নিঃশব্দ পদক্ষেপে কেউ এগিয়ে আসছে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে।
আজ রাতটা অন্যরকম—এটা কোনো সাধারণ টহল নয়, এটি ইতিহাসে লেখা পড়বে এক ভয়ংকর বিশেষ অভিযান হিসেবে: অপারেশন ফার্স্ট লাইট।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহানের চোখ স্থির, ঠোঁট চেপে আছে দৃঢ়ভাবে। তিনি আজকের অভিযানের অধিনায়ক। চারদিকে নদীর মাঝখানে পুলিশের ১২০০ সদস্য, র্যাব, এপিবিএন ও নৌ পুলিশের বিশেষ ইউনিট প্রস্তুত। তাদের লক্ষ্য একটাই—দুই দশক ধরে পদ্মার বুক দখল করে রাখা ভয়ংকর সন্ত্রাসী সংগঠন ‘কাকন বাহিনী’কে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ড্রোন ফুটেজ, রাতের থার্মাল ক্যামেরা, চরবাসীর গোপন তথ্য—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে অপারেশনের নিখুঁত ব্লুপ্রিন্ট। কাকনের আস্তানাগুলো মানচিত্রে চিহ্নিত, তার গতিবিধি পর্যবেক্ষিত, এমনকি তার প্রতিটি নৌযানের ট্রান্সমিশনও ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে।
হঠাৎই ওয়্যারলেসে ভেসে আসে কণ্ঠ—“লাইট থ্রি মুভিং… টার্গেট ইন সাইট।” ঘড়ির কাঁটা তখন ৪টা ৩২। চারদিক অন্ধকার, শুধু কুয়াশার ভেতর জ্বলে ওঠে কিছু টর্চের ক্ষীণ আলো।
পুলিশ স্পিডবোটগুলো নদীর মাঝ বরাবর অদ্ভুত নৈঃশব্দে এগিয়ে চলে। নৌকাগুলোতে কেউ কথা বলে না—শুধু চোখে চোখের ইশারা। কুয়াশার ভেতর হঠাৎই দেখা যায়—একটা ছায়া!
মুহূর্তেই বাতাস চিরে ভেসে আসে গুলির আওয়াজ। কুয়াশা ভেদ করে আগুনের রেখা ছুটে যায় নদীর বুক জুড়ে। পুলিশ তখনই মেগাফোনে ঘোষণা করে—“সারেন্ডার করো! তোমাদের চারদিক ঘেরা!” কিন্তু জবাবে আসে বুলেটের ঝাঁক।
শুরু হয় এক ভয়ংকর গোলাগুলি। এ যেন পদ্মার বুকে এক মহাযুদ্ধ। বৃষ্টির মতো গুলি আসছে—নদীজল কাঁপছে, বাতাসে মিশছে বারুদের গন্ধ। এভাবে চলে প্রায় আধা ঘণ্টা।
হঠাৎ, সেই মুহূর্তে ডিআইজির নির্দেশ—“প্ল্যান বেটা—ইনিশিয়েট!” আর তাতেই পাল্টে যায় পুরো যুদ্ধের গতিপথ। পুলিশ পিছু হটে—তাদের কয়েকটি নৌকা ধীরগতিতে পিছিয়ে যায়, যেন আতঙ্কে পালাচ্ছে।
কাকন বাহিনী কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। বরং তারা দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেভাবে পুলিশ পরাজয় মেনে নিচ্ছে। তারা সমস্ত শক্তি দিয়ে পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর মধ্যে আশেপাশে থাকা অন্য নৌকাগুলো—যেগুলো যাত্রীবাহী ছদ্মবেশে ছিল—তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশের দিকে। এভাবে তারা পুলিশের পিছু নিয়ে অনেকটা নদীর বাঁকে চলে আসে।
কিন্তু হঠাৎ কাকন বাহিনীর সদস্যদের চোখে পড়ে, আশেপাশে ছোট ছোট নিভু নিভু আলো ঝলমল করছে। চতুর্দিকে কিছু ছায়ামূর্তি নড়ে উঠছে। বুঝতে আর বাকি থাকে না—পুলিশ তাদের ফাঁদে ফেলেছে। এতক্ষণ মাঝনদীতে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও তারা এখন পুলিশের পরিকল্পিত ফাঁদে দলবলসহ ঢুকে পড়েছে। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
তারা বুঝতে পারে, পুলিশের পিছু হটা ছিল নিছক এক কৌশল। মুহূর্তেই পুলিশের ছোট-বড় নৌযানগুলো চারদিক থেকে ধেয়ে আসে। বাকি দলগুলো মিলে চরের মাঝখানটা ঘিরে ফেলে। সামনে নৌকা, পেছনে এপিবিএন, ডানদিকে র্যাব, বামদিকে নৌ পুলিশ—এ যেন এক মারণফাঁদ।
ডিআইজির কণ্ঠ আবার ভেসে আসে রেডিওতে—“ফার্স্ট লাইট—অ্যাকশন!” মুহূর্তেই চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে ফ্লেয়ারগান ও ফ্ল্যাশবোমে। পদ্মার বুকজুড়ে শুরু হয় যুদ্ধের নতুন অধ্যায়। গুলির শব্দে কুয়াশা যেন কেঁপে ওঠে।
একে একে কাকন বাহিনীর আস্তানাগুলোতে আগুন ধরে যায়। নদীর বুকজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আর্তচিৎকার আর গোলাগুলির বিকট শব্দ। একে একে কাকন বাহিনীর সব নৌযান ধ্বংস হয়ে যায়। পুলিশের একটি চৌকস ইউনিট স্পিডবোটে করে পুরো এলাকা টহল দেয়।
কাকন বাহিনীর সদস্যরা জীবন বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেয়। কিন্তু পুলিশ আগে থেকেই প্রস্তুত। একে একে সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। পুলিশের ধারণা, কাকন বাহিনীর মূল নেতা এখনো ধরা পড়েনি। হঠাৎ ওয়্যারলেসে খবর আসে—“স্যার, উত্তর চরে অস্বাভাবিক মুভমেন্ট!” মুহূর্তেই ডিআইজির নির্দেশ—“ইউনিট ফাইভ, ফ্ল্যাঙ্ক বামে ঘুরে চলো!”
ড্রোনে দেখা যায়, একদল সন্ত্রাসী বালুর নিচে টানেল খুঁড়ে পালানোর চেষ্টা করছে। পুলিশ স্পিডবোটের হেডলাইট ফেলতেই দেখা যায়—মাটির নিচ থেকে উঁকি দিচ্ছে এক কালো সানগ্লাস পরা মুখ।
প্রথমে তারা ভেবেছিল সেটাই কাকন। হাতে স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, পিঠে রেডিও। সে শেষবারের মতো পাল্টা গুলি চালায়—কিন্তু এক সেকেন্ডের মধ্যে স্নাইপারের গুলি এসে থেমে যায় তার বুকের মাঝখানে।
কিন্তু না—পরে বোঝা যায়, সে কাকনের সেকেন্ড ইন কমান্ড, বাচ্চু।
ভোরের আলোয় পদ্মা তখন শান্ত। গুলির শব্দ থেমে গেছে, শুধু বারুদের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ২১ জন সন্ত্রাসী; উদ্ধার হয়েছে পাঁচটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ডজনখানেক দেশি অস্ত্র, মাদক ও নগদ অর্থ।
চরবাসীরা ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। কেউ কাঁদছে আনন্দে, কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। বৃদ্ধ কৃষক আব্দুস সাত্তার পুলিশকে বললেন, “বাবা, আজ বহু বছর পর মনে হলো আমরা বেঁচে আছি।” তাঁর চোখের জল তখন পদ্মার জলে মিশে যায়।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ হয় না। সন্ধ্যার আগে যখন দলগুলো ফিরে যাচ্ছিল, তখন এক পুলিশ সদস্য দেখতে পায়—একটি পরিত্যক্ত ঘরে দেয়ালে টাঙানো কাকনের ছবি। নিচে লেখা—“আমরাই রাজা।”
টেবিলের ওপর ছড়ানো কাগজে লিপিবদ্ধ চাঁদার হিসাব, আর এক কোণে রাখা ছোট্ট ওয়াকি-টকি—তাতে এখনো টিকটিক শব্দ শোনা যায়। কাকনের সেই সিগন্যালের অর্থ কী—পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ, নাকি আবার নতুন করে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি?
তবে একটি বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই—কাকন বাহিনীর আধিপত্য চিরতরে ভেঙে গেছে। পুলিশের নিয়ন্ত্রণে নদীজুড়ে শৃঙ্খলা ফিরেছে। আর পদ্মার বুকজুড়ে আবার কুয়াশা নামে—এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যেন নদীও বুঝে গেছে, তার বুকের রাজা বদলে গেছে চিরতরে।
