হোমপ্রবন্ধবাংলাদেশে সিপিটিইডির প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব 

বাংলাদেশে সিপিটিইডির প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব 

মোঃ আসাদুর রহমান 
,

সমাজে অপরাধ কোনো জৈবিক বা হঠাৎ জন্ম নেওয়া বিষয় নয়। এটি বহুদিন ধরে গড়ে ওঠা পরিবেশ, প্রেক্ষাপট ও সুযোগের এক জটিল ফল। একটি অন্ধকার গলি যেমন একজন ছিনতাইকারীকে সাহস জোগায়, তেমনি একটি উন্মুক্ত, আলোয় ভরা পার্ক একজন পথচারীর মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। এই বাস্তবতার গভীর উপলব্ধি থেকেই উঠে এসেছে একটি আধুনিক নিরাপত্তা ধারণা-সিপিটিইডি, যার পূর্ণরূপ ‘ক্রাইম প্রিভেনশন থ্রু এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’ বা পরিবেশগত নকশার মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধ। 

অপরাধ প্রতিরোধের ধারণা হিসেবে সিপিটিইডি অবয়ব পায় ষাটের দশকে। এর কেন্দ্রে আছে বিদ্যমান পরিবেশের সঠিক নকশা ও কার্যকর ব্যবহার, যা অপরাধ কমিয়ে এনে নাগরিকদের মধ্যে ভীতি দূর করে। সর্বোপরি জীবনমানের উন্নতি হয়। বিশ্বব্যাপী এটি এখন অপরাধ দমনের স্বীকৃত ও চর্চিত পদ্ধতি। বাংলাদেশের মতো জনবহুল, ঘনবসতিপূর্ণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলা রাষ্ট্রে সিপিটিইডি ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমাদের শহরগুলো প্রতিদিন যে গতিতে প্রসারিত হচ্ছে, তাতে সেখানে নাগরিক নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং অপরাধের ঝুঁকি-এই তিনটির ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম হিসেবে সিপিটিইডি হতে পারে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের এক নতুন ও কার্যকর দর্শন। পরিবেশগত নকশা কীভাবে অপরাধ রোধ করতে পারে? অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে। উত্তরটা খুবই বাস্তবভিত্তিক। একটি এলাকার রাস্তা যদি সরু, অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে সেখান দিয়ে নারীদের একা চলাচল অনিরাপদ হয়ে পড়ে। যদি কোনো পার্কে সীমানাপ্রাচীর ও ক্যামেরা না থাকে, তবে তা বখাটেদের আড্ডাস্থলে পরিণত হতে পারে। অর্থাৎ, অবকাঠামোর নকশায় যদি জননিরাপত্তা বিবেচনায় নেওয়া না হয়, তাহলে সেখানে অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়। আর সিপিটিইডি সেই সুযোগগুলো নির্মূল করতেই কাজ করে।

সিপিটিইডি মূলত চারটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে-প্রাকৃতিক নজরদারি, নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার, সীমানা নির্ধারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ। যদি কোনো এলাকা এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেখানে পথচারীরা সহজে সব দিক নজরে রাখতে পারেন, তাহলে সেখানে অপরাধী কোনো অপকর্ম করার আগে একাধিকবার ভাববে। যদি কোনো ভবনে প্রবেশের পথ শুধু প্রধান ফটক দিয়ে হয় এবং গেট পাহারায় থাকে, তাহলে নিরাপত্তা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়। সীমানা নির্ধারণ যেমন দেয় একধরনের মালিকানাবোধ, তেমনি অব্যবস্থাপনা দূর করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অপরিহার্য। বাংলাদেশে এই চারটি বিষয়ের প্রতিই আমরা এখনো আশানুরূপ গুরুত্ব দিইনি, যার ফলে শহর কিংবা গ্রামে অপরাধীদের জন্য ‘স্পেস’ তৈরি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ দমনের দায়িত্ব পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ বাহিনী অপরাধ দমন থেকে অপরাধ প্রতিরোধের দিকেও সমান মনোযোগ দিচ্ছে। এই প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে যদি সিপিটিইডিকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে পুলিশ বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে উঠবে আরও কৌশলী, টেকসই ও জনগণের অংশগ্রহণমুখী।

পুলিশ বাহিনী চাইলে তাদের নিজস্ব অবকাঠামো ও আশপাশের এলাকায় সিপিটিইডি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উদাহরণ তৈরি করতে পারে। একটি থানা যদি এমনভাবে নির্মিত হয়, যেখানে রয়েছে খোলা খেলার মাঠ, শিশুদের কর্নার, নারীদের বিশ্রামাগার, সুনির্দিষ্ট সীমানা, ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন আঙিনা-তবে থানার প্রতি সাধারণ মানুষের ভীতি অনেকাংশে দূর হবে। একই সঙ্গে বেড়ে উঠবে পুলিশ-জনসম্পর্কের স্বচ্ছতা ও আস্থা। পাশাপাশি আদালত চত্বর, সরকারি ভবনের প্রবেশপথ কিংবা শহরের হাট-বাজার-সবকিছু সিপিটিইডি ভাবনায় নির্মাণ ও পরিচালিত হলে আইনের প্রয়োগের আগে সামাজিক প্রতিরোধই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শুধু পুলিশ নয়, সিপিটিইডি কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন স্থপতি, নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার এবং জনসাধারণের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। যখন কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়, তখন তার নকশায় শিশুদের খেলার জায়গা, প্রবীণদের বসার স্থান, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, ছায়াযুক্ত পথ এবং সিসিটিভি স্থাপনের চিন্তা যদি অপরাধবিরোধী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসে, তখন নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা দুটোই সুরক্ষিত হয়। ঢাকার প্রতিটি অলিগলিতে যেখানে জনস্রোত, সেখানে অপরাধ প্রতিরোধ করতে হলে কেবল ফোর্স বাড়ালেই চলবে না; অপরাধ সংঘটনের সুযোগগুলো নকশাতেই নির্মূল করতে হবে।

সিপিটিইডি কেবল শহরের ধারণা নয়, গ্রামেও প্রাসঙ্গিক। একটি গ্রামে রাস্তার ধারে ঝোপঝাড় থাকলে সেখানে ইভ টিজিং, মাদক ব্যবহার বা গোপন বৈঠক হতে পারে। যদি সেসব জায়গায় নিয়মিত ছাঁটাই, আলো ও জনসম্পৃক্ত স্থান নির্মাণ হয়, তবে এসব অপরাধ দমন না করে প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলের অপরাধ এখন আর উপেক্ষণীয় নয়। তাই সিপিটিইডি ধারণাটি মাঠপর্যায়ে

জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে গ্রামীণ পুলিশ ও বিট অফিসারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।বাংলাদেশে সিপিটিইডি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ। বহু এলাকা এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যেখানে যান চলাচলের জন্য পথ নেই, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই, ছেলেমেয়েদের খেলার মাঠ নেই, এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে প্রবেশের জন্য পুলিশেরও পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই বাস্তবতাকে বদলাতে হলে ‘নিরাপত্তা-সহায়ক পরিকল্পনা’ এখন থেকে ভবিষ্যতের শহর ও গ্রাম গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ঠিক যেমনটি উন্নত বিশ্বে হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সিপিটিইডির সফল প্রয়োগ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সিপিটিইডি ধারণাটি অপরাধ প্রতিরোধের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে বহু দশক ধরে এই দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই। নিচে কিছু আন্তর্জাতিক সফল উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যেগুলো বাংলাদেশে এ ধারণার বাস্তবায়নে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে:

নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র: টাইমস স্কয়ার পুনর্গঠন প্রকল্প

১৯৯০-এর দশকে টাইমস স্কয়ার ছিল অপরাধপ্রবণ একটি এলাকা। তবে সিপিটিইডিভিত্তিক নকশা ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে পুরো এলাকা নতুনভাবে সাজানো হয়-রাস্তায় পর্যাপ্ত আলো, পথচারীর জায়গা বাড়ানো, সিসিটিভি স্থাপন, টহল বাহিনীর উপস্থিতি এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে। এর ফলে সেখানে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায় এবং এলাকাটি একটি পর্যটকবান্ধব, সুরক্ষিত জনপদে রূপ নেয়।

রটারডাম, নেদারল্যান্ডস: সেফার সিটি ইনিশিয়েটিভ

রটারডামে শহরের নকশায় ‘প্রাকৃতিক নজরদারি’ এবং ‘স্পেস অর্গানাইজেশন’-এর ওপর জোর দেওয়া হয়। ভবনের প্রবেশদ্বার রাস্তামুখী করে দেওয়া, গাড়ি পার্কিং এলাকাকে ঘরের দৃশ্যমানতার মধ্যে রাখা এবং বাচ্চাদের খেলার মাঠগুলো জনসমক্ষে নিয়ে আসা-এসব.পরিবর্তনগুলো শহরটিকে অপরাধপ্রতিরোধী করে তোলে। এখানেও নাগরিক অংশগ্রহণ ছিল সিপিটিইডির মূল ভিত্তি।

টরন্টো, কানাডা: কমিউনিটিভিত্তিক সিপিটিইডি

টরন্টোতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করে পার্ক, বাসস্টপ, ফুটপাত এবং হাউজিং প্রকল্পগুলোতে সিপিটিইডি বাস্তবায়ন করা হয়। তাদের মতে, ‘আইস অন দ্য স্ট্রিট’ ধারণা-অর্থাৎ যেখানে প্রত্যেকে একে অপরের প্রতি নজর রাখে-তা অপরাধ কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর।

ক্যাব্রামাট্টা, অস্ট্রেলিয়া: হেরোইন হটস্পট থেকে সুরক্ষিত শহরতলি

নব্বইয়ের দশকে সিডনির এই উপশহরটি ছিল মাদক ও সহিংস অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু। শহর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় প্রশাসন একত্রে সিপিটিইডির নানা কৌশল প্রয়োগ করে, যেমন-উন্নত আলোকসজ্জা, উন্মুক্ত স্থান পুনর্বিন্যাস, পুলিশ-জনগণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ প্রদান। ফলশ্রুতিতে, অপরাধ প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পায়।

জাপান: কিয়োটো শহরের ‘মাচি-কাইরি’ পদ্ধতি

জাপানে নগর পরিকল্পনায় অপরাধ প্রতিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিয়োটো শহরে বাসিন্দাদের সক্রিয় অংশগ্রহণে পথ, সীমানা এবং বিশ্রামস্থলগুলোর নকশায় সিপিটিইডির উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে শুধু নিরাপত্তা নয়, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও বজায় থাকে।

আন্তর্জাতিক এসব অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যে সিপিটিইডি একটি বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত ও কার্যকর কৌশল, যা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা হলে নগর কিংবা গ্রামীণ সমাজে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি সামাজিক আস্থা ও সম্প্রীতি বাড়াতে সহায়ক। বাংলাদেশে সিপিটিইডির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। আমাদের শহরগুলোতে যদি আলোকসজ্জা, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক নজরদারি এবং সীমানা নির্ধারণের আন্তর্জাতিক মডেল অনুসরণ করে পরিকল্পনা করা হয়, তবে সুরক্ষা শুধু বাহিনীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না-তা হবে সবার অংশগ্রহণে নির্মিত এক সম্মিলিত সংস্কৃতি।

সিপিটিইডি এখন আর কেবল নিরাপত্তানীতির একটি অংশ নয়, এটি নগরায়ণের একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে করে তোলে দায়িত্বশীল, সচেতন এবং অপরাধ প্রতিরোধে সক্ষম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রয়োগ শুরু হলে, সেটি শুধু নিরাপদ নগরী নয়, বরং একটি মানবিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও অধিকারনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণে ভূমিকা রাখবে।

নিরাপত্তা কেবল অস্ত্র, বাহিনী ও দেয়ালের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে আমরা কীভাবে সমাজকে গড়ি, কীভাবে চলার পথ তৈরি করি এবং কেমন পরিবেশে জীবন যাপন করি তার ওপর। সিপিটিইডি আমাদের শেখায়-নিরাপত্তা হলো পরিবেশবান্ধব, নান্দনিক ও পরিকল্পিত সমাজ বিনির্মাণের একটি ফল। এই চিন্তা যদি আমরা অন্তরে ধারণ করি, তবে অপরাধ রোধে আর শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, গড়ে উঠবে সক্রিয় প্রতিরোধের সংস্কৃতি।

লেখক
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ