হোমখবরাখবরখেলাধুলাকোটি দর্শকের বিশ্বকাপে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি কেমন?

কোটি দর্শকের বিশ্বকাপে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি কেমন?

ডিটেকটিভ ডেস্ক
,

উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা আর মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। পুরো বিশ্বেই ফুটবল মানুষের কাছে এক ধরনের আবেগের নাম। তাই প্রতি চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত বিশ্ব ফুটবলের এই সর্বোচ্চ আসরকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ থাকে তুঙ্গে। এবারের বিশ্বকাপ আবার বেশ কিছু দিক থেকে আগের সব আয়োজনের চেয়ে আলাদা। এবারই প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজন করছে তিনটি স্বাগতিক দেশ, যথা-যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। উত্তর আমেরিকার এই তিন দেশে ছড়িয়ে থাকা ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের আসর। একই সঙ্গে কলেবরেও বড় হয়েছে আয়োজন; প্রথমবারের মতো দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮টি, আর মোট ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৪টি।

তবে এত আলো, উৎসব ও ফুটবল-উন্মাদনার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়-এত বড় একটি আয়োজনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আসলে কীভাবে পরিচালিত হয়? কারণ বিশ্বকাপ মাঠের খেলার বাইরেও একই সঙ্গে বিমানবন্দর, হোটেল, টিম বেস ক্যাম্প, ট্রেনিং ভেন্যু, ফ্যান ফেস্ট, গণপরিবহন, সাইবার স্পেস এবং শহরের জনসমাগম ব্যবস্থাপনারও একটি বিশাল পরীক্ষা। এবারের বিশ্বকাপ যেহেতু তিনটি দেশে আয়োজিত হচ্ছে, তাই প্রতিটি দেশই নিজস্ব আঞ্চলিক ঝুঁকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জননিরাপত্তার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সবচেয়ে বড়। কারণ ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে বড় অংশই অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশটির ১১টি শহরে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা এই আয়োজনকে ৩৯ দিনের মধ্যে ৭৮টি সুপার বোল-মানের বড় ইভেন্ট সামলানোর মতো চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমন্বয়ের জন্য হোয়াইট হাউসের অধীনে আলাদা টাস্কফোর্স কাজ করছে। একই সঙ্গে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই), ফেমা, স্থানীয় পুলিশ, জরুরি সেবা সংস্থা এবং আয়োজক শহরগুলোর প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রস্তুতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে স্টেডিয়াম ও ফ্যান ফেস্টের নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা এবং ড্রোন-ঝুঁকি মোকাবিলা। ফেমা আয়োজক শহরগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মার্কিন আয়োজক শহরের জন্য ৬২৫ মিলিয়ন ডলারের ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ গ্রান্ট প্রোগ্রাম রয়েছে। সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং ড্রোন-হুমকি প্রতিরোধে ফেমার সহায়তা প্রায় ৮৪৬ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম আলোচিত নিরাপত্তা ঝুঁকি হলো অননুমোদিত বেসামরিক ড্রোন। বড় স্টেডিয়াম, ফ্যান জোন ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় ড্রোন শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা সম্প্রচার অধিকারের সমস্যা নয়; এটি নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ভেন্যু ও ফ্যান ফেস্ট এলাকায় ‘নো-ড্রোন জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। ড্রোন অপারেটররা নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশ করলে ড্রোন জব্দ, বড় অঙ্কের জরিমানা এবং ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি হতে পারেন। নিরাপত্তা বাহিনীর কাউন্টার-ড্রোন টিম সন্দেহজনক ড্রোন শনাক্ত, ট্র্যাক এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদভাবে আটক করার সক্ষমতা নিয়ে মাঠে রয়েছে। গুলি করে ড্রোন নামানোর পরিবর্তে এমন পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভিড়ের মধ্যে আতঙ্ক, ধ্বংসাবশেষ বা পার্শ্বক্ষতির ঝুঁকি কম থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে সহিংসতার ঝুঁকি। দেশটির বন্দুক-সহিংসতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে আরও সতর্ক করেছে। ফলে স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাগ চেক, শনাক্তকরণ, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই কড়াকড়ির কারণে ভ্রমণ, ভিসা ও নিরাপত্তা যাচাই নিয়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুল কাদির আর্তানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘটনা এবং ইরান দলের ট্রেনিং বেস যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেক্সিকোর তিজুয়ানায় সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, কিন্তু বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের ক্ষেত্রে সেই নিরাপত্তা যেন অংশগ্রহণ, সম্মান ও সমতার মতো মূল মূল্যবোধগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে পরিচালিত হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মেক্সিকো বিশ্বকাপের আরেক গুরুত্বপূর্ণ আয়োজক দেশ। মেক্সিকোর তিনটি শহর-মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা ও মন্টেরেই-মোট ১৩টি ম্যাচ আয়োজন করছে। মেক্সিকোর নিরাপত্তা ভাবনায় বড় বিবেচনা হলো জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, শহুরে যানবাহন ব্যবস্থাপনা, ভেন্যু নিরাপত্তা এবং কিছু অঞ্চলে মাদকচক্র-সংশ্লিষ্ট সহিংসতার পটভূমি। দেশটির প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম বিশ্বকাপ দর্শকদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন এবং ফিফাও মেক্সিকোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে সমন্বয় করছে।

তবে মেক্সিকো সিটির মতো বড় নগরীতে ম্যাচ-পরবর্তী উদযাপন, রাস্তার ভিড়, অ্যালকোহল বিক্রি, অনিয়ন্ত্রিত হকার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেছে। কানাডা এবারের বিশ্বকাপের তৃতীয় আয়োজক দেশ। টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে মোট ১৩টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কানাডা তুলনামূলকভাবে শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশের দেশ হলেও বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই কানাডা সরকার জননিরাপত্তা ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে ১৪৫ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত বরাদ্দ করেছে। এই অর্থ টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, স্থানীয় প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জরুরি সেবা সংস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত হচ্ছে। রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো স্টেডিয়াম, খেলোয়াড়, দর্শক, গণপরিবহন এবং ফ্যান কার্যক্রমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

এসব দৃশ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপে আরেকটি বড় ঝুঁকি আড়ালে লুকিয়ে আছে-সাইবার অপরাধ। বিশ্বকাপের মতো জনপ্রিয় আয়োজনকে ঘিরে নকল টিকিট, ভুয়া হোটেল বুকিং, জাল মার্চেন্ডাইজ, ফিশিং লিংক, ভুয়া স্ট্রিমিং সাইট এবং ফিফার ওয়েবসাইট নকল করে প্রতারণার চেষ্টা ব্যাপকভাবে বাড়ে। এফবিআই ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে সাইবার অপরাধীরা ফিফার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া সাইট তৈরি করে ব্যক্তিগত তথ্য, আর্থিক তথ্য এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনেও হাজার হাজার ভুয়া ডোমেইনের তথ্য উঠে এসেছে, যেগুলো বিশ্বকাপের উত্তেজনা ও টিকিটের উচ্চ চাহিদাকে ব্যবহার করে প্রতারণা চালাতে পারে।

সব মিলিয়ে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবের পাশাপাশি আধুনিক জননিরাপত্তা ব্যবস্থাপনারও এক বড় পরীক্ষা। এখানে নিরাপত্তা বলতে শুধু মাঠে পুলিশ মোতায়েন বোঝায় না। এর মধ্যে আছে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, সাইবার প্রতিরক্ষা, ড্রোন নিয়ন্ত্রণ, ভিড় ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা, সীমান্ত ও ভিসা প্রক্রিয়া, গণপরিবহন, জনসচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। মাঠে যখন গোলের আনন্দে গ্যালারি কেঁপে ওঠে, তখন সেই আনন্দকে নিরাপদ রাখতে পর্দার আড়ালে কাজ করে যায় অসংখ্য মানুষ, প্রযুক্তি ও প্রতিষ্ঠান। বিশ্বকাপের মূল সাফল্য যদিও কে ট্রফি জিতল, তা দিয়ে মাপা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে কোটি মানুষের এই উৎসব কতটা নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সম্মানজনকভাবে সম্পন্ন হলো, সেটিও এই আয়োজনের বড় অর্জন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ