ডিটেকটিভ পাবলিশার

হোমপ্রবন্ধঅভিযানের গল্পঅন্ধকারে আট টুকরো দেহ:হারিয়ে যাওয়া মাথার রহস্য

অন্ধকারে আট টুকরো দেহ:হারিয়ে যাওয়া মাথার রহস্য

মো: ইলিয়াস খান, পিপিএম
,

ভোরের আবছা আলো তখনো পতেঙ্গার খেয়াঘাটের ওপর সম্পূর্ণ ভর করেনি। চারদিকে ভয়ার্ত নীরবতা, যা কেবল দূর থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের গুঞ্জন আর হিমেল হাওয়ার রহস্যময় ফিসফিসানিতে ভাঙছিল। একরাশ রহস্যময় অন্ধকার আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে, একটি ল্যাম্পপোস্টের ঠিক গোড়ায় পড়ে ছিল একটি পরিত্যক্ত ট্রলি ব্যাগ। চারপাশে হালকা হিমেল হাওয়া, আর সেই হাওয়ার সঙ্গে মিশে আসছিল এক বিদঘুটে, অসহ্য দুর্গন্ধ।

পুলিশ পরিদর্শক সারফরাজ খান (ছদ্মনাম), যিনি সেদিন দায়িত্বে ছিলেন, তাঁর কাছে আসে একটি বেনামি টেলিফোন। ফোনের ওপার থেকে ভেসে আসে এক চাপা কণ্ঠের সতর্কবাণী—‘১২ নম্বর খেয়াঘাটের কাছে, ঝোপের আড়ালে কিছু একটা আছে, যা থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’ সংবাদটি প্রথমে তেমন গুরুত্ব পায়নি, কারণ এ ধরনের রহস্যজনক খবর প্রায়শই আসে। কিন্তু গন্ধের কথা শুনেই সারফরাজ খানের মনে কেমন যেন খচখচ করে উঠল। তিনি আর দেরি করলেন না। সঙ্গে নিলেন সহকারী এসআই আহমদ মুসাকে এবং কিছু ফোর্স। দ্রুত রওনা দিলেন ঘটনাস্থলে।

ঘटनাস্থলে পৌঁছে তারা দেখতে পান, ল্যাম্পপোস্টের নিচে একটি ট্রলি ব্যাগ পড়ে আছে। ব্যাগের চেইনগুলো সামান্য খোলা, আর তা থেকে বেরিয়ে আসছে এক পচা, বমি উদ্রেককারী গন্ধ। চারদিকে প্রচুর কৌতূহলী মানুষ জড়ো হয়েছে। সারফরাজ খান তাঁদের সামনেই ব্যাগটি খোলেন। ভিতরে যা ছিল, তা দেখার জন্য তাঁরা কেউই প্রস্তুত ছিলেন না।

প্রথম প্যাকেটে ছিল একটি সাদা-নীল লুঙ্গি এবং ছাই রঙের ফুল হাতা শার্ট। লুঙ্গি ও শার্ট সরিয়ে দেখতে পান, খাকি রঙের প্যাকেটিং স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো তিনটি প্যাকেট। প্যাকেটগুলো খুলতেই সবাই আঁতকে উঠল—ভেতরে ছিল মানবদেহের খণ্ডিত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। সেই দৃশ্য এতটাই ভয়াবহ ছিল যে উপস্থিত সবাই শিউরে উঠল, কেউ কেউ উল্টো ঘুরে বমি করতে লাগল।

এটুকু দেখে সারফরাজ খান বুঝতে পারলেন, এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। কিন্তু দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—মুখমণ্ডল এবং দেহের অবশিষ্ট অংশ—উধাও। টর্চলাইটের আলোয় ঝোপের আনাচে-কানাচে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও আর কিছু পাওয়া গেল না। আশপাশের কোনো লোকই মৃতদেহের এই খণ্ডিত অংশগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে পারল না। একটি অপরিচিত পুরুষের শরীর, যার পরিচয়হীন টুকরাগুলো পড়ে আছে নির্জন ঝোপের আড়ালে। যেন এক অদৃশ্য খুনি একটি নির্মম পাজল তৈরি করে রেখে গেছে। সাধারণ মানুষের মনে তখন দুই ধরনের সন্দেহ—হয়তো এটি মাদকচক্রের কোনো লেনদেনের ফল, অথবা কোনো প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড।

সূত্রের খোঁজে

তদন্ত শুরু হলো। সারফরাজ খান ও তাঁর টিম প্রথমে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর সহযোগিতায় আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। তদন্তে প্রথম সূত্র আসে সিসিটিভি ফুটেজ থেকে। ফুটেজে দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি একটি রিকশায় করে ব্যাগটি নিয়ে এসে ফেলে যাচ্ছে। তাদের চেহারা স্পষ্টভাবে বোঝা না গেলেও, তাদের পোশাক আর চলাফেরার ধরন থেকে পুলিশ কিছু তথ্য পায়। কিন্তু ফুটেজ অস্পষ্ট হওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

অস্পষ্ট ফুটেজ পুলিশকে ভুল পথে চালিত করে। তারা ধারণা করে, এই ধরনের নৃশংসতা হয়তো কোনো আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের কাজ। এই ভুলের কারণে তদন্তের মূল্যবান সময় নষ্ট হতে থাকে। পুলিশ শহরের হোটেল এবং বন্দর এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া শুরু করে, যেখানে বিদেশিদের আনাগোনা বেশি। কিন্তু কোনো সূত্রই তাদের প্রাথমিক ধারণার পক্ষে প্রমাণ দিতে পারেনি।

বিভ্রান্তি ও অচলাবস্থা

তদন্ত যখন এক প্রকার থমকে গেছে, তখন এক বৃদ্ধ লোক গোপনে থানায় আসে। সে জানায়, কয়েকদিন আগে এক অচেনা, বিদেশি-চেহারাওয়ালা ভদ্রলোককে ঐ এলাকায় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। এই তথ্য শুনে পুলিশ ধরে নেয়, নিহত ব্যক্তি হয়তো কোনো ভিনদেশি ব্যবসায়ী, এবং এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো আন্তর্জাতিক চক্রের অংশ। তারা মৃতদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে আন্তর্জাতিক ডেটাবেসে পাঠায়, কিন্তু কোনো ম্যাচ পাওয়া যায় না।

তদন্তে এক চরম অচলাবস্থা নেমে আসে, যা রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে তোলে। একই সাথে, নিহত ব্যক্তির পরিহিত লুঙ্গি ও শার্ট দেখে পুলিশ ধারণা করে, লোকটি হয়তো কোনো দরিদ্র বা সাধারণ পরিবারের সদস্য। এই স্ববিরোধী তথ্য পুলিশকে আরও বিভ্রান্ত করে তোলে।

মৃতের ছায়া

কয়েক দিন পর, আরেক নামহীন বৃদ্ধ সাক্ষী দাবি করে, মাঝরাতে সে একজন নারীকে ল্যাম্পপোস্টের কাছে ওই ব্যাগটি রাখতে দেখেছিল। কিন্তু তার মুখ সে স্পষ্ট মনে করতে পারে না। তার বর্ণনা থেকে তদন্তকারীরা প্রথমে মনে করে, একজন নারীই হয়তো এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি।

এই ধারণার ভিত্তিতে পুলিশ এলাকার সব নারীর ওপর নজরদারি শুরু করে। কিন্তু এই সূত্রও খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি। তবে এই তথ্যের কারণে তদন্ত আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ এখন পুলিশের কাছে দুটি ভিন্ন ধরনের সন্দেহভাজন—একজন বিদেশি পুরুষ এবং একজন স্থানীয় নারী।

অদৃশ্য জাল

হঠাৎ এক জেলে নদীর খালে মাছ ধরতে গিয়ে একটি বস্তা দেখতে পায়। সেটি উদ্ধার করে দেখা যায়, সেটি পলিথিন ও স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো। ভিতরে ছিল আরও একাংশ মানবদেহ। এই নতুন আবিষ্কার পুলিশকে চমকে দেয়। খুনির কৌশল এবার আরও স্পষ্ট হয়—লাশের অংশগুলো আলাদা আলাদা জায়গায় গুম করে দেওয়া।

পুলিশের অনুমান, এটি কোনো প্রফেশনাল হত্যাকারীর কাজ। এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে একাধিক পেশাদার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়, কিন্তু প্রমাণ না থাকায় তারা দ্রুত মুক্তি পায়। এই ঘটনার সাথে জড়িত একজন নির্দোষ সাক্ষী, মিজান কাজী, পুলিশের কাছে এসে জানায় যে সে একজন পরিচিত ব্যক্তির নির্দেশে সেই বস্তাটি ফেলে দিয়েছিল, কিন্তু সে জানত না ভিতরে কী ছিল।

আপনজনই খুনি

যখন সব সূত্রই ব্যর্থ হচ্ছে, তখন সিআইডি থেকে একটি অপ্রত্যাশিত ডিএনএ রিপোর্ট আসে। রিপোর্টটি জানায়, উদ্ধারকৃত লাশের ডিএনএ স্থানীয় একজন ব্যক্তির ডিএনএ-এর সাথে হুবহু মিলে যায়, যার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ। তদন্তের দিক সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। পেশাদার খুনি বা আন্তর্জাতিক চক্রের ধারণা বাতিল হয়ে যায়। এটি একটি পারিবারিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়।

পুলিশের হাতে আসে এক জবানবন্দি, যা পুরো কাহিনীকে উল্টে দেয় এবং পরিবারের ভেতরের সেই ভয়ানক অন্ধকারকে প্রকাশ করে। জবানবন্দিতে বলা হয়, নিহত ব্যক্তি একজন বাবা, যিনি নিজের সন্তানদের হাতেই নিহত হয়েছেন।

রহস্যভেদ

অবশেষে সেই ভয়ংকর সত্য প্রকাশ পায়—খুন করেছে নিহতের নিজেরই রক্তের সম্পর্কের মানুষ। লোভ, সম্পত্তি এবং ঘৃণার বিষ মিলে এক অমানবিক পরিণতি। নিহত ব্যক্তি হলেন হাসান আলী, এবং তাঁর ঘাতকরা আর কেউ নয়, তাঁর নিজেরই দুই ছেলে মো: মেশকাতুল হায়দার (ছদ্মনাম) এবং সিফাত (ছদ্মনাম), এবং সিফাতের স্ত্রী লিলি (ছদ্মনাম)। এই তিনজনই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা।

সম্পত্তি এবং পারিবারিক কলহের জেরে দুই ভাই এবং একজন পুত্রবধূ মিলে নিজেদের বাবাকে হত্যা করে এবং অত্যন্ত নৃশংসভাবে দেহটি খণ্ডখণ্ড করে গুম করার চেষ্টা করে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে জোয়ার-ভাটার কারণে লাশের মাথাটি আর পাওয়া যায়নি। পরিচয়হীন লাশ আসলে ছিল নিজের সন্তানের হাতে নিহত বাবা।

এই গল্প শেষ হয় না, কারণ এর শেষ নেই। এটি কেবল একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়, এটি এক করুণ সম্পর্কের গল্প। রক্তের বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়া এক নির্মম কাহিনী, যেখানে সম্পত্তি আর লোভের কাছে হেরে যায় ভালোবাসা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এক টুকরা জমি আর কিছু টাকার জন্য একজন মানুষ কীভাবে তার নিজের পিতাকে হত্যা করতে পারে? কীভাবে একটি পরিবার এমন বীভৎস পরিণতির দিকে ধাবিত হতে পারে? এই প্রশ্নগুলো হয়তো আমাদের সমাজের গভীর ক্ষতগুলোকে বারবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যায়…

লেখক
পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র)
অফিসার ইনচার্জ
কক্সবাজার সদর মডেল থানা, কক্সবাজার

 

সম্প্রতি

নাগরিক সংযোগ