বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মানব পাচার, সাইবার অপরাধ, অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতির মতো আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধগুলো আর কোনো একটি দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ থেকেও অবৈধ মানব পাচার, বিদেশে অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক অপরাধের নানাবিধ ঘটনার মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, অপরাধের আলামত, লেনদেন, ভুক্তভোগী ও অপরাধী অনেক সময় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকে। ফলে তদন্ত, তথ্য সংগ্রহ, অপরাধ প্রমাণ এবং পাচার হওয়া অর্থ বা ভুক্তভোগী উদ্ধারে কেবল প্রচলিত পুলিশিং যথেষ্ট নয়; বরং কার্যকর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, দ্রুত তথ্য বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি, যোগাযোগ, অর্থনীতি ও মানুষের চলাচল যেমন দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করছে, তেমনি সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধও আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন জাতীয় প্রচেষ্টার পরিবর্তে প্রয়োজন অংশীদারিত্ব, আস্থা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।
— জনাব মোঃ আলী হোসেন ফকির
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৬ সালের ২৯ জুন “ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি কো-অপারেশন, ইনফরমেশন শেয়ারিং অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব বাংলাদেশ পুলিশ” শীর্ষক একটি সমন্বয় সভার আয়োজন করে। এই সমন্বয় সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ পুলিশ এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে পেশাগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং কার্যকর সহযোগিতা আরও জোরদার করা। সভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, অর্থপাচার, আর্থিক অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময়, যৌথ সমন্বয় ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করা। একই সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি (ক্যাপাসিটি বিল্ডিং), লিয়াজোঁ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তি সুদৃঢ় করাও ছিল এ সভার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের রূপসী বাংলা বলরুমে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজিপি) জনাব মো. আলী হোসেন ফকির। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব জনাব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র সচিব জনাব আসাদ আলম সিয়াম। এ ছাড়া ঢাকায় অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, দূতাবাসের নিরাপত্তা কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন আইজিপি জনাব মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতায় কূটনৈতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক আস্থা এবং তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
— মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী
সিনিয়র সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
তিনি বলেন, “একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি, যোগাযোগ, অর্থনীতি এবং মানুষের চলাচল যেমন দ্রুত সীমান্ত অতিক্রম করছে, তেমনি সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধও আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন জাতীয় উদ্যোগের পরিবর্তে প্রয়োজন অংশীদারত্ব, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ।” পরবর্তীতে তিনি আরও বলেন যে, বাংলাদেশ পুলিশ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ পুলিশের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বাংলাদেশ পুলিশের আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে আইজিপি জানান যে, কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতাকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ একটি সমন্বিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কো-অর্ডিনেশন অ্যান্ড সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, এই সমন্বয় সভা একটি ‘সিঙ্গেল উইন্ডো কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে বিদেশি কূটনৈতিক মিশনগুলো বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট অপারেশনাল ও সেবাদানকারী ইউনিটগুলোর সঙ্গে সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। তথ্য বিনিময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে আইজিপি আরও বলেন, “আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তথ্যই কৌশলগত শক্তি। পারস্পরিক আস্থা ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে সময়োপযোগী তথ্য বিনিময়ই কার্যকর গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। আইজিপির বক্তব্যের পর বাংলাদেশ পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে একটি তথ্যচিত্র (ভিডিও ডকুমেন্টারি) প্রদর্শন করা হয়। এরপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত ডিআইজি বেলাল উদ্দিন। মূল প্রবন্ধে বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাস্তবতার পরিবর্তিত রূপ তুলে ধরে বলা হয় যে, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ গুরুতর অপরাধ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আন্তর্জাতিক মাত্রার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক তদন্তেই একাধিক বিচারব্যবস্থা, বিদেশি নাগরিক, আন্তঃসীমান্ত আর্থিক লেনদেন, বিদেশে অবস্থানরত আলামত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকে। ফলে কার্যকর পুলিশিং এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং কূটনৈতিক যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপরও সমানভাবে নির্ভরশীল। প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয় যে, প্রচলিত নিরাপত্তা হুমকির পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, ডিজিটাল প্রতারণা, অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, মানব পাচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর অপরাধ, ডিপফেইক প্রযুক্তি এবং তথ্য বিভ্রান্তির মতো নতুন ধরনের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব অপরাধে জড়িত চক্রগুলো প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সীমান্ত অতিক্রমের সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে আরও সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে হবে। মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়েছে যে, আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তথ্যকে এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সময়োপযোগী ও আইনসম্মত তথ্য বিনিময় সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ, সাইবার অপরাধ তদন্ত, আর্থিক অপরাধ অনুসন্ধান, মানব পাচার প্রতিরোধ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কূটনৈতিক কমিউনিটির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে শুধু প্রযুক্তি বা তথ্যের প্রাপ্যতাই যথেষ্ট নয়; কার্যকর সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং আইনসম্মত সহযোগিতার একটি সুদৃঢ় কাঠামো। অনুষ্ঠানের পরবর্তী পর্বে মূল প্রবন্ধের ওপর উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের তৎকালীন ডিআইজি ও বর্তমান অ্যাডিশনাল আইজি মো. কামরুল আহসান, ডিআইজি তাপতুন নাসরীন এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর অতিরিক্ত ডিআইজি মহিউল ইসলাম অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। আলোচনায় অনলাইন জুয়া, মব সংস্কৃতি, পুলিশ সংস্কার, কিশোর গ্যাং, শিশুবান্ধব পুলিশিং এবং কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। ডিআইজি মো. কামরুল আহসান একটি প্রশ্নের জবাবে জানান, অনলাইন জুয়া ও মব-সংশ্লিষ্ট অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষ সেল কাজ করছে। কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় ও জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি ডিভিশন এবং বিভিন্ন দূতাবাসের মধ্যে একটি ২৪/৭ জরুরি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
কূটনৈতিক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
– আসাদ আলম সিয়াম
সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
এর মাধ্যমে দূতাবাসগুলো বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে দিন-রাত যেকোনো সময় সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দৈনন্দিন আপডেট প্রদানের জন্য একটি ‘সিকিউরিটি মেসেজিং গ্রুপ’, জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগের জন্য একটি ‘ইমার্জেন্সি কল সেন্টার’ এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার বিষয়ে দ্রুত অবহিত করার লক্ষ্যে একটি ‘ইনসিডেন্ট নোটিফিকেশন সিস্টেম’ চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। কিশোর গ্যাং ও শিশুবান্ধব পুলিশিং বিষয়ে ডিআইজি তাপতুন নাসরীন কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নারী ও শিশু বিষয়ক বিশেষ সেল এবং বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক (বিপিডব্লিউএন)-এর সচেতনতামূলক কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন হাইকমিশন ও দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত এবং প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বাংলাদেশে কাজ করা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও অংশ নেন। মূল প্রবন্ধের ওপর উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে তাঁরা কূটনৈতিক নিরাপত্তা, তথ্য বিনিময়,শিশুবান্ধব পুলিশিং, গুজব প্রতিরোধ, মানব পাচার ও সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে শিশুবান্ধব পুলিশিং আরও জোরদারের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তিনি কিশোর অপরাধের শিকড় খুঁজে বের করা এবং এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। ইউনেস্কোর প্রতিনিধি এআই-নির্ভর গুজব, তথ্য বিকৃতি ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিষয়ে পুলিশকে আরও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানান এবং আধুনিক পুলিশিং পদ্ধতিকে সেই বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সভায় ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বাংলাদেশের মানব পাচারবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ও ইতালি আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। মরক্কো দূতাবাসের প্রতিনিধি ঢাকায় দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য হটলাইন চালুর বিষয়ে জানতে চান। মালয়েশিয়া দূতাবাসের প্রতিনিধি গুজব ও তথ্য বিকৃতি বিষয়ে অভিযোগ জানাতে ঢাকা-কেন্দ্রিক একটি রিপোর্টিং সেন্টার চালুর প্রস্তাব দেন এবং পরে অন্যান্য শহরেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের পক্ষ থেকে পুলিশ ও কূটনীতিকদের মধ্যে প্রতিদিনের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্য দ্রুত বিনিময়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়। আলোচনায় আরও একজন প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশের দৃশ্যমানতা বাড়ানো এবং সাইবার অপরাধ ও মানব পাচার বিষয়ে জনগণকে সঠিক তথ্য দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় অতিথিদের বক্তব্যেও কূটনৈতিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, আধুনিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এতটাই বিস্তৃত ও আন্তঃসংযুক্ত যে কোনো দেশ এককভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে না। তাঁর মতে, বৈশ্বিক অপরাধ মোকাবিলায় সংকটের মুহূর্তে নয়, বরং সংকট আসার আগেই সহযোগিতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের ধারাবাহিক অংশগ্রহণকে তিনি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য অবদানের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।” তাঁর ভাষায়, “সংকট আসার পর নয়, সংকট আসার আগেই আমাদের সহযোগিতার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।”
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “কূটনৈতিক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে নয়; বরং একটি সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।” কূটনীতিকদের নিরাপত্তা জোরদার, তাঁদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের ডিপ্লোম্যাটিক সিকিউরিটি ডিভিশনের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আস্থা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মুঃ নজরুল ইসলাম কূটনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার এবং বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় ভবিষ্যৎ যোগাযোগ আরও কার্যকর করতে হালনাগাদকৃত কনট্যাক্ট ডিরেক্টরি, লিয়াজোঁ ম্যাট্রিক্স, নির্দিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট, নিয়মিত সমন্বয় সভা, যৌথ প্রশিক্ষণ চাহিদা নিরূপণ এবং বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা আয়োজনের মতো সম্ভাব্য পদক্ষেপের দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সবশেষে অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন উপস্থিত অতিথি ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, এ আয়োজন শুধু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত একটি সভা নয়; বরং সম্মিলিত নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতি একটি যৌথ অঙ্গীকার। অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে মূল্যবান অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য তিনি সকল অতিথি ও অংশগ্রহণকারীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
ডিটেকটিভের সঙ্গে একান্ত আলাপ
আয়োজন শেষে ডিটেকটিভের সঙ্গে একান্ত আলাপে বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা ও বিদেশি কূটনীতিকরা এ আয়োজনের তাৎপর্য তুলে ধরেন। আইজিপি জনাব মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, বাংলাদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোর সঙ্গে যৌথ সহযোগিতার মাধ্যমে মানব পাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্রিপ্টোকারেন্সি-নির্ভর আর্থিক অপরাধ ও সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে কার্যকর পথ খোঁজাই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। তাঁর মতে, উদ্দেশ্যের দিক থেকে এ উদ্যোগ অত্যন্ত সফল হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার অতিরিক্ত আইজি মোসলেহ উদ্দিন বলেন, এ সভার মাধ্যমে কূটনৈতিক মিশনগুলোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমন, দ্রুত যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যেসব জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, সেগুলো মোকাবিলায় বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও অংশীদারত্ব থেকে শেখার সুযোগ এ ধরনের আয়োজন তৈরি করে। এসবি প্রধান অতিরিক্ত আইজি সরদার নুরুল আমিন এ উদ্যোগকে বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ দমন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এ ধরনের সমন্বয় ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করবে। বিদেশি কূটনীতিকরাও বাংলাদেশ পুলিশের এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন। ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেকসান্দ্রো বলেন, অবৈধ অভিবাসনসহ বিভিন্ন আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ মোকাবিলায় যৌথ সহযোগিতা জোরদার করতে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাঁর প্রত্যাশা, এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও ফলপ্রসূ করবে। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা বলেন, অপরাধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে; এ বাস্তবতায় এমন সমন্বয় সভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃরাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও তিনি প্রকাশ করেন।


বাংলাদেশে অবস্থানরত কূটনীতিক ও বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা জাতীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
কূটনৈতিক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।